আদর্শিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

সওম (রোজা) কী, কার জন্য?

18 May, 2018 Super Admin 448 ভিউ
সওম (রোজা) কী, কার জন্য?

মোহাম্মদ আসাদ আলী
এ উপমহাদেশে সওম বা সিয়ামের বদলে রোজা শব্দটা ব্যবহারে আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, সওম বললে অনেকে বুঝিই না সওম কী। কোর’আনে কোথাও রোজা শব্দটা নেই কারণ কোর’আন আরবি ভাষায় আর রোজা পার্শি অর্থাৎ ইরানি ভাষা। কেবল নামাজ রোজাই নয়, আরও অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার করি যা কোর’আনে নেই। যেমন খোদা, বেহেশত, দোজখ, ফেরেশতা, জায়নামাজ, মুসলমান, পয়গম্বর, সিপারা ইত্যাদি। এই ব্যবহার মুসলিম দুনিয়ায় শুধু ইরানে এবং আমাদের এই উপমহাদেশে ছাড়া আর কোথাও নেই। এর কারণ আছে। কারণটা হলো – ইরান দেশটি সমস্তটাই অগ্নি-উপাসক ছিল। প্রচণ্ড শক্তিশালী, অন্যতম বিশ্বশক্তি ইরান ছোট্ট উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে সামরিক সংঘর্ষে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে গিয়েছিল। পরাজিত হবার পর প্রায় সমস্ত ইরানি জাতিটি অল্প সময়ের মধ্যে পাইকারিভাবে দীন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। এই ঢালাওভাবে মুসলিম হয়ে যাবার ফলে তারা ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী তা পূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হলো না অর্থাৎ তাদের আকিদা সঠিক হলো না। তারা ইসলামে প্রবেশ করলো কিন্তু তাদের অগ্নি-উপাসনার অর্থাৎ আগুন পূজার সময়ের বেশ কিছু বিষয় সঙ্গে নিয়ে ইসলামে প্রবেশ করল। ইরানীরা আগুন উপাসনাকে নামাজ পড়া বলত, সালাহ্-কে তারা নামাজ বলতে শুরু করল, তাদের অগ্নি-উপাসনার ধর্মে উপবাস ছিল, তারা সওমকে রোজা অর্থাৎ উপবাস বলতে লাগল, মুসলিমকে তারা পার্শি ভাষায় মুসলমান, নবী-রসুলদের পয়গম্বর, জান্নাতকে বেহেশত, জাহান্নামকে দোজখ, মালায়েকদের ফেরেশতা, আল্লাহকে খোদা ইত্যাদিতে ভাষান্তর করে ফেলল। শুধু যে সব ব্যাপার আগুন পূজার ধর্মে ছিল না, সেগুলো স্বভাবতই আরবি শব্দেই রয়ে গেল; যেমন যাকাত, হজ্ব ইত্যাদি। তারপর মুসলিম জাতি যখন ভারতে প্রবেশ করে এখানে রাজত্ব করতে শুরু করল তখন যেহেতু তাদের ভাষা পার্শি ছিল সেহেতু এই উপমহাদেশে ঐ পার্শি শব্দগুলোর প্রচলন হয়ে গেল। এক কথায় বলা যায় যে, আরবের ইসলাম পারস্য দেশের ভেতর দিয়ে ভারতে, এই উপমহাদেশে আসার পথে পার্শি ধর্ম, কৃষ্টি ও ভাষার রং-এ রঙিন হয়ে এল।
সওমের আকিদা
ইসলামের যেমন একটা উদ্দেশ্য আছে, তেমনি ইসলামের সকল হুকুম আহকামেরও প্রত্যেকটার আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য আছে। সত্যদীন, দীনুল হক অর্থাৎ ইসলাম আল্লাহ কেন দিলেন, কেতাব কেন নাযিল করলেন, নবী-রসুলদেরকে কেন পাঠালেন ইত্যাদি সমস্ত কিছুরই উদ্দেশ্য আছে। আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্র কোনো কিছুই যেমন উদ্দেশ্যহীনভাবে মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেননি তেমনি মানুষকেও একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন। যে কোনো বিষয়ের উদ্দেশ্য জানাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো আমল করার আগে কাজটি কেন করব এই উদ্দেশ্য জানা প্রত্যেকের জন্য অত্যাবশ্যক। সঠিকভাবে উদ্দেশ্যটা জেনে নেওয়াই হলো আকিদা সঠিক হওয়া। সমস্ত আলেমরা একমত যে আকিদা সহীহ না হলে ঈমানের কোন মূল্য নেই। এই আকিদা হলো কোনো একটা বিষয় সম্বন্ধে সঠিক ও সম্যক ধারণা (Comprehensive Concept, Correct Idea)। ইসলামের একটা বুনিয়াদী বা ফরজ বিষয় হলো সওম বা রোজা। পূর্বের অন্যান্য ধর্মগুলোর মধ্যেও উপবাস ব্রত (Fasting) পালনের বিধান ছিল যা বর্তমানে সঠিকরূপে নেই। ইসলামের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। কাজেই মো’মেনদেরকে অবশ্যই সওমের সঠিক আকিদা জানতে হবে। প্রথমত জানতে হবে সওম বা রোজা কার জন্য।
সওম কার জন্য?
সওমের নির্দেশ এসেছে একটি মাত্র আয়াতে, সেটা হলো- “হে মো’মেনগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের মতো তোমাদের উপরও সওম ফরদ করা হয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার (সুরা বাকারা-১৮৩)।” পাঠকগণ খেয়াল করুন, সওমের নির্দেশনাটা কিন্তু মো’মেনদের জন্য, আয়াতটি শুরু হয়েছে ‘হে মো’মেনগণ’ সম্বোধন দিয়ে। আল্লাহ কিন্তু বলেননি যে হে মানবজাতি, হে বুদ্ধিমানগণ, হে মুসুল্লিগণ ইত্যাদি। তার মানে মো’মেনরা সওম পালন করবে। তাহলে মো’মেন কারা? আল্লাহ সুরা হুজরাতের ১৫তম আয়াতে বলেছেন, তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও রাসুলের উপর ঈমান আনে, কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ মো’মেন। এই সংজ্ঞা যে পূর্ণ করবে সে মো’মেন। আমরা সংজ্ঞায় ২টি বিষয় পেলাম। এক, আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ঈমান অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। যে বিষয়ে আল্লাহ ও রসুলের কোনো হুকুম আছে সেখানে আর কারো হুকুম মানা যাবে না। এই কথার উপর সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত ও দণ্ডায়মান। তারপর আল্লাহর এই হুকুমকে এই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবেন। তিনি হবেন মো’মেন। তার জীবন সম্পদ মানবতার কল্যাণে তিনি উৎসর্গ করবেন। এই মো’মেনের জন্যই হলো সওম, সালাহ, হজ্ব সবকিছু।
ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি যার প্রথমেই হচ্ছে তওহীদ অর্থাৎ কলেমা। তারপরে সালাহ, যাকাত, হজ্ব ও সর্বশেষ হচ্ছে সওম (আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বোখারী)। এখানে প্রথমটি হচ্ছে ঈমান আর বাকি সব আমল। যে ঈমান আনবে তার জন্য আমল। মানুষ জান্নাতে যাবে ঈমান দিয়ে, আমল দিয়ে তার জান্নাতের স্তর নির্ধারিত হবে অর্থাৎ কে কোন স্তরে থাকবে সেটা নির্ভর করবে তার আমলের উপর। এই জন্যই রসুল (সা.) বলেছেন, “যে বললো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সেই জান্নাত যাবে (আবু যর গিফারি রা. থেকে বোখারী মুসলিম)। তাহলে এখানে পরিষ্কার দুইটা বিষয় – ঈমান ও আমল। সওম হলো আমল। আর মো’মেনের জন্য এই আমল দরকার। তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার যে মো’মেন সওম রাখবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সওম রাখতে হবে, সওমের উদ্দেশ্য কী? এ নিয়ে আমরা পরবর্তী লেখায় আলোচনা করব ইনশা’আল্লাহ।

মন্তব্য সমূহ (0)

বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আপনার মতামত দিন

ক্যাটাগরি সমূহ
আকিদা ও আদর্শ 1 হামলা 0 আদর্শিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি 1628 লাইভ আপডেট 5 সেবামূলক ও সচেতনতা কার্যক্রম 8 অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি 188 অপপ্রচারের জবাব ও আইনি লড়াই 102 নির্যাতনের ইতিহাস ও মানবাধিকার 19 কার্যক্রমের অনুমোদন ও বৈধতা 29 নিবন্ধ ও সম্পাদকীয় 122 English Articles 1 সাধারণ আলোচনা 89 প্রেস রিলিজ ও বিবৃতি 9 সাংস্কৃতিক নীতিমালা 25 সাংস্কৃতিক চর্চা 18 আমাদের নারী নীতি 31 নারী বিষয়ক কার্যক্রম 24 মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম 15 ঈদের জামাত 13 উন্নয়ন কর্মকাণ্ড 20 সভা সমাবেশ 60 সর্বধর্মীয় অনুষ্ঠান 16 সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি 45 জেলা ও কার্যালয় উদ্বোধন 32 ইফতার মাহফিল 26 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও জাতীয় দিবস উদযাপন 6 ছাত্র ও যুব সম্মেলন 4
জনপ্রিয় ট্যাগ
#মামলার অব্যাহতি #গোলটেবিল বৈঠক #হাইকোর্টের রায় #অপপ্রচার #muchleka #কোরবানি কখন কবুল হবে? #হেযবà§�ত তওহীদ #ইসলামি ইতিহাস #উগ্রবাদ #গুজব #নারী #পর্দা #প্রকৃত ইসলাম #প্রকৃত ইসলামের নারী #হেযবুত তওহীদ #হেযবুত তওহীদের নারী #ইসলাম #নোয়াখালীত #বকধার্মিকতা #মন্তব্য কলাম #মন্তব্য কলাম বাড়ছে বকধার্মিকতা #কারা সেই জান্নাতি ফেরকা? #জান্নাতি #জান্নাতি ফেরকা #মুস্তাফিজ শিহাব #চলমান সঙ্কট #মুখলেছুর রহমান সুমন #রাজনৈতিক ইসলাম #ধর্ম নিয়ে ঘৃণার রাজনীতি #রামমন্দির ও থার্ড টেম্পল #ইসলামের অপব্যাখ্যা #জাতি ভেঙে খানখান #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির #ধর্ম #পরিণাম জাতি ভেঙে খানখান #ফেরেশতা #মানুষ সৃষ্টির #মো’জেজা: কী কেন কীভাবে? #পহেলা বৈশাখ #সংস্কৃতির #সাংস্কৃতিক অঙ্গন #আমল #ঈমান #আদিবা ইসলাম #এমামুযযামান #রিয়াদুল হাসান #লা’নত নাকি পরীক্ষা #লানত #কাঁটাতারে ব্যর্থ #বিশ্বভ্রাতৃত্বের #মুসলিম #রোড টু ফিলিস্তিন #নামাজ #নামাজ কেন পড়ছেন? #মোহাম্মদ আসাদ আলী #ধর্মজীবিকা #ধর্মবিশ্বাসী #শিক্ষাব্যবস্থা #অশান্তি সৃষ্টির কারণ #এম আর হাসান #চরিত্রহীন নেতৃত্ব #বস্তুবাদী সভ্যতা #বাস্তব সমস্যা #মহানবীর (সা.) #দেশকে রক্ষা #বিশ্ব মুসলমান #মদিনার #রাকীব আল হাসান #মাননীয় এমাম #হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম #ইসলামের ইতিহাস #মো’মেনদের #দাজ্জাল #দাজ্জালকে চিনতে হবে #ধর্মব্যবসা #উম্মতে মোহাম্মাদি #তওহীদ #মো’জেজা: #মুসলিমরা আজ সংকটের সম্মুখীন #খলিফা #দীন প্রতিষ্ঠা #দীনের মূল ভিত্তি #লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ #সেরাতুল মোস্তাকিম #২৯ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী #civilized’ #deterrent #islam world #world #জীবনব্যবস্থা #প্রশ্ন উত্তর #প্রশ্নোত্তর #হেযবুত তওহীদের #hezbuttawheed #hossain mohammad salim #Resolving the Global Crisis #Students #ঐক্য ##MarathonHT #Marathon #lifestyle #ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান #workplace #religious extremists #democratic system #economic system #politics #Allah #Aqeedah of islam #God #Haj #Jihad #Kital #Prophet Muhammad #terrorism #কোরবানি #ত্যাগ #বজ্রশক্তি #সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা #সাক্ষাৎকার #হেযবুত তওহীদের বিজয় #রসুলুল্লাহর সুন্নাহ #দাসপ্রথার #জঙ্গিবাদ #আইয়্যামে জাহেলিয়াত #জেহাদ #দোয়া #সঠিক জীবন ব্যবস্থা #জ্ঞান #বাণী #ইমাম মাহদী #কবিতা #রাজনীতি #মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা #আশুরা #শহীদ #প্রকৃত ইসলামের মসজিদ #মসজিদে নারী #দাউদ খান পন্নী #ঔপনিবেশিক যুগ #সংগীত #স্বাধীনতা #খোলাফায়ে রাশেদীন #যোদ্ধাসুফি #স্বর্ণযুগের মোল্লাতন্ত্র #মানুষ সৃষ্টি #প্রকৃত ইসলামের বিয়ে #বাংলার সুলতানী যুগ #গণমাধ্যম #মহামান্য এমামুযযামানের জীবনবৃত্তান্ত #ইসলাম অর্থ #শান্তি #পাকিস্তান #দৈনিক বজ্রশক্তি #খেলাধুলা #আইনের উৎস #নির্বাচন #সংস্কৃতি #জ্ঞান-বিজ্ঞান #মহানবীর লড়াই #হজ #সাম্যবাদ ও ইসলাম #বাংলাদেশ #কোর’আন #শিক্ষা #নবুয়তপূর্ব জীবন #ইসলামবিদ্বেষী #ইতিহাস ও ইসলাম #চরমোনাই #ওমর (রা.) #তারেক বিন যিয়াদ #কর্মফল #পুঁজিবাদ #মার্কস #হারাম #সুফিবাদ #বাঙালি #মানবজীবন #মুসলিমদের ইতিহাস #প্রশ্ন #রাগ #আকিদা #কমিউনিজম #জান্নাত-জাহান্নাম #মণীষীদের জীবনী #মধ্যযুগীয় বর্বরতা #স্বর্ণযুগ #গণজোয়ার #গণপ্রতিরোধ #তওহীদী জনতা #কর্মজীবন #ইসলাম আবির্ভাব #ইসলামের বিস্তৃতি #অর্থনীতি #রিজিক #বিস্ময়কর আন্দোলন #নারী স্বাধীনতা #মোনাফেক #সাম্প্রদায়িকতা #তাকওয়া #৫ দফা কর্মসূচি #সংবাদ-সম্মেলন