নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার পোরকরা গ্রাম। হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের গ্রামের বাড়ি এখানেই। ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ এ বাড়িতেই সশস্ত্র হামলা চালিয়ে হেযবুত তওহীদের দুই সদস্যকে নৃশংসভাবে খুন করে ধর্মব্যবসায়ী একটি শ্রেণি। কী হয়েছিল সেদিন, কীভাবে ইতিহাসের জঘন্যতম এ হামলার পট রচনা হয়েছিল তা জানতে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হবে। তো চলুন দেখা যাক-

১৯৯৯ সাল থেকেই পোরকরা গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হক মেম্বারের পরিবারসহ আশেপাশের আরও আট-দশটি বাড়ির ৪০-৫০জন ব্যক্তি হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। যারা জানেন না তাদের জন্য একটু বলে রাখা দরকার যে, হেযবুত তওহীদ হচ্ছে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের কর্মীরা ইসলামের নামে চলমান সকল প্রকার ধর্মব্যবসা, অপরাজনীতি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সচেতন করে চলেছে। এরই অংশ হিসেবে হেযবুত তওহীদ দেশজুড়ে শত শত আলোচনা সভা, জনসভা, সেমিনার, প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, মতবিবিনময় সভা ইত্যাদি আয়োজন করে মানুষকে অন্যায়, অবিচার, অসত্য, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, ধর্মব্যবসা ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়েছে। যেহেতু এই আন্দোলন সকল প্রকার ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তাই স্বভাবতই এই আন্দোলনের কর্মীদেরকে এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়।

হেযবুত তওহীদের দুই সদস্যের নিথর দেহ।

২০০৯ সালের হামলা

২০০৯ সালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে স্থানীয় ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ইন্ধনে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার শুরু হয়। ধর্মভীরু মানুষকে বোঝানো হয় হেযবুত তওহীদ খ্রিস্টান হয়ে গেছে। মসজিদের খুৎবায়, ওয়াজে-মাহফিলে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অপপ্রচার অব্যাহত রাখা হয়। গ্রামবাসীকে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে ভুলভাল তথ্য দিয়ে উত্তেজিত করা হতে থাকে। এভাবে ধর্মভীরু মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম বানিয়ে নেয় ধর্মজীবী ষড়যন্ত্রকারীরা। তারপর একদিন সুযোগ বুঝে হেযবুত তওহীদের সদস্যদের উপর হামলা চালায় তারা। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় আটটি বাড়ি। লুণ্ঠিত হয় টাকা-পয়সা, আসবাবপত্র। পৈশাচিক ওই আক্রমণে সেদিন নারী-শিশুসহ হেযবুত তওহীদের অনেক সদস্য গুরুতর আহত হয়। পরিহাসের বিষয় হলো- বর্বরোচিত ওই হামলায় ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের 

Previous
Next

করে তাদেরকে জেলে ঢোকানো হয়। আর আক্রমণকারী ষড়যন্ত্রকারীরা এলাকা দাপিয়ে বেড়ায় নির্বিঘ্নে। এরপর আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হলে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা পুনরায় তাদের আবাসভূমিতে ফিরে গিয়ে নতুনভাবে বাড়ি নির্মাণ করে। তারা অতীতের দুঃসহ স্মৃতিকে মুছে ফেলে গ্রামের আর দশজনের মতই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকে। কিন্তু স্থানীয় ষড়যন্ত্রকারী জঙ্গিবাদী জামাত-হেফাজত-চরমোনাইদের অপপ্রচার বন্ধ থাকে নি একদিনের জন্যও। তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে নতুন কোনো ইস্যুর সন্ধানে যাতে করে আবারও ২০০৯ সালের নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

মাননীয় এমামের জনসমাবেশ

৮ বছর পর সোনাইমুড়িতে মাননীয় এমামের জনসভা

আপামর জনতার অংশগ্রহণ

সেই ঘটনার পর  নিজ জন্মস্থান নোয়াখালির সোনাইমুড়ি থেকে আরো ৭টি পরিবারের সাথে সপরিবারে বের করে দেওয়া হয়েছিল মাননীয় এমামকে। ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণিটি সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে সত্যকে স্বীকৃতি দানকারী এই পরিবারগুলোকে খ্রিস্টান অপবাদ দিয়ে বিতাড়িত করে তাদের জন্মস্থান থেকে, জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয় তাদের বসতভিটা। সেই সোনাইমুড়িতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে তিনি প্রত্যাবর্তন করেন বিজয়ীর বেশে। হাজার হাজার জনতা তাকে বরণ করে  নেয় । সেদিনের  বৈরী আবহাওয়া, বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা মুগ্ধচিত্তে তার বক্তব্য শুনেছেন তারা। আর ওয়াদা করেছেন, সমাজের যাবতীয় মিথ্যা, অন্যায়, অবিচার, ধর্মের নামে বিরাজিত অধর্ম, ধর্মব্যবসা, অপরাজনীতির বিরুদ্ধে হিজবুত তাওহীদের সংগ্রামে সাথী হওয়ার।

এক যুগেরও বেশি সময় পর আপনজনদের কাছে পেয়ে আবেগে আপলুত হয়েছেন তিনি। ক্ষমা করেছেন সেই সরল-মনা মানুষগুলোকে যারা ষড়যন্ত্রকারীদের প্ররোচনায় তাকে ভিটেছাড়া করেছিল। হৃদয়ে এখনও বাজছে তার সেই প্রেমমাখা কথাগুলো, “এটা প্রতিশোধের সময় নয়, এটা হিংসার সময় নয়, এটা একে অপরকে ভালোবেসে সমাজকে সুন্দর করে গড়ে তোলার সময়। কিন্তু যারা ষড়যন্ত্রকারী, যারা আজও মিথ্যার চাদরে সত্যকে আবৃত করে রাখার সর্বপ্রকার চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাদেরও স্মরণে রাখা উচিত এক যোদ্ধার কণ্ঠে উচ্চারিত বজ্রধ্বনি, “হে ষড়যন্ত্রকারীরা, হে জালেমরা, মনে রেখ, তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। সত্য যখন আসে তখন মিথ্যার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে।”

মসজিদ তৈরির সিদ্ধান্ত

দীর্ঘদিন ধরে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে একটি অপপ্রচার চালানো হয় যে, আমরা নামাজ পড়ি না। তাদের এই কথাটি যে সবৈর্ব মিথ্যা, তা প্রমাণ করার জন্য মাননীয় এমাম সিদ্ধান্ত নেন তিনি তার বাড়ির আঙিণায় একটি মসজিদ নির্মাণ করবেন। এ লক্ষ্যে আশেপাশের কয়েকটি জেলা থেকে হেযবুত তওহীদের কিছু সদস্য নির্মাণকাজে অংশ নিতে সেখানে যান। এলাকার গন্যমান্য লোকদের দাওয়াত দিয়ে মসজিদ নির্মাণকার্যের উদ্বোধনও করা হয়, দোয়া, মিলাদ, মিষ্টিমুখ করা হয়। আর এ ব্যাপারটিকেই ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণিটি তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা যেন সেখানে মসজিদ নির্মাণ না করতে পারি সেজন্য তারা সেখানে প্রচার করে যে, ‘হেযবুত তওহীদ খ্রিষ্টান, তারা সেখানে গির্জা নির্মাণ করছে’।

মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন
নির্মাণাধীন মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর

সীমাহীন অপপ্রচার

বেনামী লিফলেট বিলি, মুঠোফোনে তালাশের ভিডিও প্রচার, মসজিদের মাইকে মাইকে হামলার উস্কানি

হামলার ঘটনার ২ (দুই) দিন আগে “হেযবুত তওহীদ কুফরি সংগঠন” শীর্ষক একটি বেনামী উস্কানিমূলক হ্যান্ডবিল জনগণের মধ্যে, বাজারে বাজারে বিতরণ করা হয়। জানা যায়, পাঞ্জাবি, টুপি পরা কয়েকটি যুবক মটর সাইকেলে করে চৌমুহনি থেকে এসে হ্যান্ডবিলটি জুমার আগে গ্রামের মসজিদগুলোতে দিয়ে গেছে। তারা কারা সে হদিস এখনো কেউ বলতে পারে না, তবে পরবর্তী কিছু কার্যক্রম থেকে ধারণা করা হচ্ছে এরা ধর্মভিত্তিক কিছু দলের কর্মী। মসজিদের ইমামরা সেই হ্যান্ডবিল পড়ে পড়ে শুনিয়ে মুসল্লিদেরকে উত্তেজিত করেন।
তারা এলাকায় জোর অপপ্রচার চালাতে লাগল যে, হেযবুত তওহীদ 

হচ্ছে কুফরী সংগঠন, এরা অনেক আগেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে, এবার তারা গ্রামে গীর্জা নির্মাণ করতে চাচ্ছে। 

তালাশের মিথ্যাচারের জবাব

এদেরকে প্রতিরোধ করা সবার ঈমানী দায়িত্ব। এদেরকে হত্যা করা ফরজ। এদেরকে গ্রামে থাকতে দিলে কারও ঈমান থাকবে না ইত্যাদি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে বর্বরোচিত এ হামলার পিছনে মদদ ও ইন্ধন যুগিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের তালাশ অনুষ্ঠানের একটি পর্ব। ধর্মব্যবসায়ী ও তাদের অনুসারীরা এই উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যানির্ভর অনুষ্ঠানটিকে ষড়যন্ত্রের গুটি হিসাবে ব্যবহার করেছে। তারা প্রত্যেকের মোবাইলে মোবাইলে এ অনুষ্ঠানটি দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষকে হামলার উস্কানি দিয়েছে।

এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তারা ব্যপক অপপ্রচার চালিয়ে হামলার দিন মানুষকে সংগঠিত করেছে। সিক্রেট গ্রুপ খুলে 

হামলার পরিকল্পনা, অস্ত্রশস্ত্রসহ নানা রকম হামলার সরঞ্জাম একত্রিত করেছে। যার কিছু আভাস পাওয়া যায়, আমাদের পোস্টে তাদের কমেন্টে। এমনকি হামলার পূর্বে তারা আগাম ইঙ্গিত দিয়ে আমাদের বিভিন্ন সদস্যদের ইনবক্সে হামলার হুমকি দিয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপ, পেজ এবং পোস্টে জেহাদের নামে খ্রিষ্টান মারতে সাধারণ মানুষদের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফেসবুকে অপপ্রচারের কিছু নমুনা

এভাবে সেই ধর্মের ধ্বজাধারী শ্রেণিটি যারা যে কোনো ইস্যুতে মানুষের ধর্মানুভূতিকে উস্কে দিয়ে দাঙ্গা বাঁধাতে পটু তারাই সোনাইমুড়িতে হেযবুত তওহীদের উপর হামলার পটভূমি রচনা করে। ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে আমরা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে। স্বশরীরে গিয়ে ওসি সাহেব ও এসপি মহোদয়কে জানাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও মৌখিকভাবে জানানো হয়। তারা সবাই আশ্বাস দেন যে তারা বিষয়টি দেখবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বিষয়টির যথাযথ গুরুত্ব উপলব্ধি করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়। যে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে জেনেও প্রশাসন কেন আগে থেকেই সজাগ হলো না তার উত্তর আমরা আজও পাই নি।

হামলার দিন

১৪ মার্চ ২০১৬, রৌদ্রজ্জ্বল সকালে হাজার হাজার মানুষে গ্রাম ভরে গেল। দূর দূরান্ত থেকে বাস ভর্তি করে মানুষ এসে হাজির হলো পোরকরায়। সবার মুখেই এক স্লোগান- ‘গীর্জা ভাঙ্গো, খৃষ্টান মার।’ তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। মসজিদের মাইকেও একই ঘোষণা ভেসে এল- ‘গীর্জা ভাঙ্গো, খৃষ্টান মার।’সেই দাঙ্গা সৃষ্টিকারী আলেমরা তাদের মাদ্রসার ছাত্রদেরকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে মিছিল করে আসেন। তারা স্মারকলিপি দেয়ার নাম করে মাদ্রাসার কয়েকটা ছেলেকে নিয়ে টিএনও অফিসের দিকে যান। ফর্মালিটি রক্ষার জন্য ইউএনও’র কাছে স্মারকলিপি পেশ করার উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও মূলত তাদের ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী পরিকল্পনা আগে থেকেই সাজানো ছিল।

মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যবহার করে জনসাধারণকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা

দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা প্রস্তুত রেখেই তারা মিছিল বের করে। এরই মধ্যে ইউএনও কার্যালয়ে যেতে পুলিশি বাধার মুখে পড়লে এবং পুলিশ স্থানীয়ভাবে বিষয়টির মীমাংসা করবে বলে শান্তনা দিলে তারা পরিকল্পনা ভেস্তে যাবার আশঙ্কায় এবার তৎক্ষনাৎ হেযবুত তওহীদের সদস্যদের ঘরবাড়ি অভিমুখে রওনা দেয়। অপপ্রচারের ষোলো কলা পূর্ণ হয় যখন তারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয় যে, হেযবুত তওহীদের সদস্যরা তাদের উপর হামলা করেছে। ব্যস, এবার সবাই আরও ক্ষিপ্ত হয়ে একযোগে আমাদের নিরাপরাধ কর্মীদের উপর হামলে পড়ে।

শুরু হলো ব্যপক হামলা। নির্মাণাধীন মসজিদটিকে তারা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিল। সেখানে যত ইট আনা হয়েছিল সেগুলো আমাদের সদস্যদের উপর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। এভাবে চার পাঁচ ঘণ্টা ধরে তারা আমাদের বাড়ি-ঘর আর সদস্যদের উপর হামলা চালালো যার ফলে যারা সেখানে ছিলেন প্রত্যেকেই মারাত্মক ভাবে আহত হলেন।

এরপর যখন স্থানীয় থানা পুলিশ এলো তখন পুলিশের সামনেই সন্ত্রাসীরা বাড়ির আঙিনার ভিতরে ঢুকে আমাদের দুজনকে প্রথমে পাথর মেরে মেরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর তাদের বুকের উপর চেপে বসে কয়েকজন তাদের হাত পা চেপে ধরল। হাতপায়ের রগ কেটে দিল। একজন গরু জবাই করা লম্বা ছুরি দিয়ে জবাই করে ফেলল। তাদের চোখ উপড়ে নিল। হাত পায়ের রগ কেটে দিল। এরপরও তাদের শরীরের উপর ক্রমাগত প্রহার চালাতে চালাতে এক পর্যায়ে পেট্রল ঢেলে তাদের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিল। তারা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেলেন। আর বাকীদেরকে আহত বিকলাঙ্গ করল, হাত কেটে ফেলল, পা ভেঙ্গে ফেলল। এ দীর্ঘ সময়ে তারা ফোনে ও ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে শত শত দলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে এনে জড় করল। ফেসবুকে তারা প্রকাশ্যে ‘খ্রিষ্টানদের’ হত্যা করার জন্য আহ্বান জানাতে লাগল। তাদের ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ ছবিগুলো প্রকাশ করতে থাকল।

নোয়াখালী থেকে জেলা পুলিশ আমাদের আহত অবরুদ্ধ মরণাপন্ন সদস্যদেরকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলল তখন তাদেরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হত্যা করার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশ ও বিডিআর বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে গেল। অনেকেই ঘটনাটিকে সাধারণ ঘটনার আবহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচার করল যে এটি নাকি গ্রামবাসীর সাথে সংঘর্ষ ছিল। প্রকৃত সত্য তা নয়। তারা সাধারণ মানুষ ছিল না, তাদের অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সহিংসতার দৃশ্য দেখেন। তবে হামলাকারী অস্ত্রধারীরা ছিল ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের সক্রিয় কর্মী, প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী, মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক মহল। তারা গাছ কেটে মহাসড়ক অবরোধ করল। গাছ সরাতে গেলে পুলিশের উপর হামলা চালাতে লাগল। যখন পাঁচ ঘণ্টা তুমুল সংঘর্ষের পর উদ্ধারকৃত হেযবুত তওহীদের নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধদেরকে থানায় নিয়ে রাখা হলো, তখন সন্ত্রাসীরা থানার উপর হামলা চালাল।

পর্দার আড়ালে থেকে হামলার ইন্ধন জুগিয়েছিল যারা

এই হামলার ঘটনার পেছনে রয়েছে কয়েকটা গ্রুপ –

১. স্থানীয় জামায়াত শিবির

২. স্থানীয় হেফাজত

৩. স্থানীয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন

৪. স্থানীয় মসজিদের কিছু আলেম

৫. পোরকরা গ্রামের দুই-তিনটি পরিবার পূর্ব শত্রুতার জের হিসাবে ইন্ধন যুগিয়েছে

৬. অধিকাংশ লোকই এসেছে বাইরে থেকে।

পত্রিকার প্রকাশিত সেদিনের ঘটনাবলি

আমাদের সংবাদ সম্মেলন

এই ঘটনার পরদিন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূফায়দাহ পন্নী। এছাড়াও ঘটনার ১ বছর পর আরো একটি সংবাদ সম্মেলন করে হেযবুত তওহীদ। সেখানে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের দ্রুত বিচারের দাবী করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত দাবীসমূহ:

১. আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক এবং দ্রুত বিচার করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

২. যে নামঠিকানা বিহীন, মিথ্যা ও উস্কানিমূলক তথ্য সংবলিত হ্যান্ডবিলটি বিতরণের মাধ্যমে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটানো হলো, সেটা কোথায় রচনা করা হয়েছিল, কারা রচনা করেছিল, কারা সেগুলো মসজিদে মসজিদে বিতরণ করেছিল তাদেরকে সনাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক।

৩. আমাদের নির্দোষ আহত সদস্যদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার  করা হোক।

৪. এখনও সন্ত্রাসীরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে হত্যার হুমকি প্রদান করে যাচ্ছে। এই ব্যাপারে দ্রুত আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

৫. উক্ত ঘটনায় ভস্মীভূত ঘরসমূহ পুনর্নিমাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হেযবুত তওহীদ সদস্যদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

মামলা ও আসামীর সংখ্যা

এই ঘটনার পরপরই হেযবুত তওহীদের পক্ষ থেকে ৫টি মামলা দায়ের করা হয়। এতে আসামী করা হয় ৪৯৫জনকে। এরমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে জেল খাটছেন, কিছু সংখ্যক আসামী জামিনে আছেন তবে অধিকাংশই এখনো ধরাছোয়ার বাইরে আছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি

১. এজাহারে উল্লেখিত মোট ৮৩ জন আসামির মধ্য থেকে মাত্র অল্প কয়েকজনকে আজ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হয়েছে। নুরুল আলম মুন্সী, জহিরসহ বহু চিহ্নিত আসামিকে গ্রেফতারই করা হয় নি। তবে ইতোমধ্যে পুলিশ যাদেরকে গ্রেফতার করেছে এবং যারা স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করেছে তারা যে কোনো উপায়েই হোক সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে এবং এলাকায় দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীগণ আশঙ্কা করছেন যে এরা যে কোনো মুহূর্তে আবারো হুজুগ সৃষ্টি করে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

২. ১নং আসামিসহ কোনো একজন আসামিকেও আজ পর্যন্ত রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় নি যে কারা আমাদের দুই সদস্যকে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করল, কারা তাদের হাত পায়ের রগ কেটে দিল, কারা পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করল, কারা অস্ত্র অর্থ সরবরাহ করল, কারা বিভিন্ন জেলা থেকে সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে আনল।

৩. ফেসবুকে হুমকি-ধামকি, অপপ্রচার অব্যাহত রয়েছে। আমরা কয়েকটি প্রমাণ দিয়ে থানায় জিডি করেছি কিন্তু সেগুলোর কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আক্রান্তদের অনেকেই এখনও বাড়িঘরে ফিরতে পারছে না সন্ত্রাসীদের ভয়ে।

মন্তব্য করুন