[অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদের শীর্ষনেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম সম্প্রতি সরকারের প্রতি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। এরপর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হেযবুত তওহীদের নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যমের সামনে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রস্তাবের নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন করতে তাঁর মুখোমুখী হন দৈনিক দেশেরপত্রের সাহিত্য সম্পাদক রিয়াদুল হাসান।]
রিয়াদুল হাসান: বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে আমরা জুলাই-আগস্টে একটি বিরাট গণ-অভ্যূত্থান হতে দেখলাম। কিন্তু এরই মধ্যে ছাত্র সমন্বয়ক ও সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ফ্যাসিবাদী আচরণের অভিযোগ উঠছে। মানুষ আর ফ্যাসিস্ট দেখতে চায় না, কিন্তু ক্ষমতায় গেলেই সবাই ফ্যাসিস্ট হয়ে যাচ্ছে। এর সমাধান আপনাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় আছে কি না?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: আসলে আমরা যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রস্তাব করছি সেটা তো আমাদের তৈরি না, এটা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, সেই পরম প্রজ্ঞাবান আল্লাহর নাজিল করা ব্যবস্থা। আমরা কেবল সেটার রূপরেখা সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে ধরেছি। আল্লাহর দেওয়া ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ, এতে যে সকল নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠা করা গেলে আপনারা যত রকম সমস্যার কথা ভাবতে পারেন, সবকিছুর সমাধান করা সম্ভব হবে। ফ্যাসিবাদ আসলে কী? শাসক যখন স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে ও নিজের ইচ্ছাকে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়, জনমতের তোয়াক্কা না করে তখন আমরা তাকে ফ্যাসিস্ট শাসক বলি। ইসলামে কি এর আদৌ কোনো সুযোগ আছে? নেই। কারণ আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমরা বলছি- তওহীদভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তওহীদ মানেই হল আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা, বিধানদাতা নেই, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। ইলাহ মানেই হুকুমদাতা। এই কথাটা হচ্ছে আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি, সিদ্ধান্তসূত্র। যে বিষয়ে আল্লাহর কোনো হুকুম আছে, বিধান আছে সে বিষয়ে আমরা আর কারো কোনো হুকুম বিধান মানি না। এই কথার উপরেই গড়ে উঠবে আমাদের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, এই দীনে কোনো জবরদস্তি নাই। শতবার বলেছেন, তোমরা তোমাদের মনগড়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে চলবে না, খেয়ালখুশির অনুসরণ করবে না। তাহলে ফ্যাসিবাদের জায়গাটা থাকলো কোথায়? রাষ্ট্রপ্রধান তো আল্লাহর বিধানের বাইরে কোনো কথাই বলতে পারবেন না। ইসলামের নিয়ম হচ্ছে জনগণ শাসকের কাছে বায়াত নিবে একটিমাত্র শর্তে যে, শাসক আল্লাহর হুকুমের সীমানার মধ্যে থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। আল্লাহর হুকুম বা নীতিমালাগুলো কোরআনে সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা আছে যা জনগণ ও সরকার উভয়ের সামনেই পরিষ্কার। এখানে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলারও সুযোগ নেই, কারণ ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান ও জনগণের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না। রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রতি জুমায় মসজিদে হাজির হতে হয়, খোতবা দিতে হয়, জনগণের সামনে জবাবদিহি করতে হয়।
একদিকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়, অপরদিকে জনগণের সামনে জবাবদিহিতার ভয়- এই দুটো কারণে প্রকৃত ইসলামের অনুসারী শাসকরা কেউ ফ্যাসিস্ট হতে পারে নি।
আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা.)- তারা কেউ ফ্যাসিস্ট ছিলেন না, কিন্তু অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছেন। তাঁদের পরে যখন মুসলিমরা পথভ্রষ্ট হয় এবং তাদের জীবনব্যবস্থা ইসলামের পরিবর্তে রাজতন্ত্রে পর্যবসিত হয়, তখন অনেক সুলতান, রাজা-বাদশাহরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী হয়েছেন, সেটা ইতিহাস। কিন্তু তার দায় কোর’আন নেবে না, ইসলাম নেবে না। কারণ আল্লাহর রসুলই (সা.) বলে গেছেন, (আমার উম্মাহর আয়ু ৬০/৭০ বছর)। অর্থাৎ তাঁর ৬০/৭০ বছর পর থেকে এ জাতি আর প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী নেই। তাদের দায় রসুল (সা). কেন নেবেন?
আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমরা বলেছি, আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে মন্ত্রিসভা ও শুরা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করবেন, যেটা পবিত্র কোরআনের নির্দেশ। এই শুরা পরিষদের সদস্যরা কিন্তু জনপ্রতিনিধি, তারা আবার যার যার এলাকার মসজিদে ইমামতি করেন, জুমার দিনে খোতবা দেন। আমাদের প্রস্তাবনায় পরিষ্কার বলা আছে, জনগণ ততক্ষণ তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আদেশ মেনে চলবে যতক্ষণ তারা আল্লাহর নীতিমালা অনুসারে আদেশ করবেন। যখন তারা আল্লাহর নীতি লংঘন করবেন, তাদের আদেশ আর কেউ মানবে না। এই শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে গেড়ে দেওয়া হবে। সুতরাং মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বোচ্চ স্থান অর্থাৎ ইমাম পর্যন্ত সকলেই আল্লাহর হুকুম মানতে বাধ্য থাকবেন। আমরা রাষ্ট্রপ্রধানকে ইমাম হিসাবে উল্লেখ করেছি, এটা খলিফা, আমিরুল মোমেনিন, প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি যেটা ইচ্ছা বলতে পারেন। আমরা ইমাম বলেছি কারণ কোর‘আনের পরিভাষা।
রিয়াদুল হাসান: আপনি বললেন যে মজলিশে শুরার সদস্যরা হবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা কেমন হবে? বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে পার্থক্যগুলো যদি বলেন।
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: দেখুন, গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা যেটা বর্তমানে আছে তার সবকিছুই ভালো নয়, আবার সব কিছুই খারাপ নয়। আমরা ভালোগুলো প্রয়োজন মোতাবেক নিচ্ছি। তবে আপনি পার্থক্য জানতে চেয়েছেন। প্রধান পার্থক্য হলো, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক দলগুলো গড়ে তোলা হয়েছে আমরা এই সিস্টেমকে জাতির ঐক্য ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করি। রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা রাজনৈতিক দলবাজির বিকল্প সিস্টেম প্রস্তাব করেছি।
ক্ষমতার রাজনীতি, প্রতারণার রাজনীতি, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আমাদের জাতিকে ধ্বংস করে ফেলেছে। আমরা বলছি, কোনো ব্যক্তি নিজে থেকে নেতৃত্ব চাইলে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এটা ইসলামের নীতি। সরকার বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে একটি এলাকার যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি প্রার্থী প্যানেল তৈরি করবে এবং একই পোস্টারে তাদের ছবি ও পরিচয় প্রচার করা হবে।
তাদেরকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য এক টাকাও খরচ করতে হবে না, সব খরচ নির্বাচন কমিশনের। ফলে নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে আত্মপ্রচার বা অন্য প্রার্থীদের চরিত্র হননের সুযোগ থাকবে না। নির্ধারিত সময় অন্তর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রম মূল্যায়ন ও তাদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে। পাড়ায় মহল্লায় ভোট বাক্স বসানো হবে, মানুষ যার যার পছন্দের ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে আসবে। জনপ্রতিনিধিরা জামে মসজিদে ও ঈদের দিন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিনিধি হিসাবে বক্তব্য প্রদান করবেন; বিচার-আচারসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে যে কোনো নতুন পরিস্থিতি, সংকট বা চ্যালেঞ্জের সমাধান খুঁজে পেতে গবেষণা করবেন যাকে ইসলামের পরিভাষায় ইজতেহাদ বলে। আইনসভায় এসব বিষয় নিয়ে পরামর্শ করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোর সংশোধন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ধারা ও উপধারা প্রণয়ন করবেন।
বর্তমানে আমরা যে জীবনব্যবস্থার মধ্যে রয়েছি সেটা হচ্ছে মূলত ‘মাথা গোনার গণতন্ত্র’। ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতানেত্রী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী যেমন আছেন তেমনি আছেন একেবারে অজ্ঞ, নিরক্ষর, দুনিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর নারী ও পুরুষ। কিন্তু তাদের সবার ভোটের ও বিবেচনার মূল্য সমান। অগণিত ভোটার থাকেন যাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও দলের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। কিন্তু সে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে অনুমান ও অলীক কিছু ধারণা যেমন: তার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন, আমার ভোট যেন না পচে, সব দল দেখা শেষ, এবার নতুন কাউকে দিয়ে দেখি ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তার রায় দিয়ে দেয়। এখানে সস্তা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে অনেক সময় নেতাদের চেয়ে অভিনেতারা বেশি মূল্যায়িত হন। ফলে অনেক ক্রিকেটার, সিনেমার তারকা, জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী, ব্যবসায়ী, টিভি উপস্থাপক- যাদের আইন রচনা সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, তারা আইনসভার সদস্য হয়ে যায়। ফলে কোনো অবস্থাতেই এই ‘মাথা গোনার গণতন্ত্র’ দিয়ে জাতির সঠিক নেতৃত্ব উঠে আসবে না। আসা সম্ভব নয়। তাই আমরা প্রস্তাব করেছি, নির্বাচনে সবাই ভোট দিবেন না, ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন কেবল সচেতন নাগরিকগণ। নির্বাচন কমিশন ভোট দেওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য একটি স্পষ্ট মানদণ্ড তৈরি করবে।
রিয়াদুল হাসান: আপনি বলেছেন, খেলাফত রাষ্ট্রের মত জনপ্রতিনিধিরা মসজিদে জুমার দিনে বিচার-আচার করবেন। আমরা তো জানি খেলাফত ব্যবস্থায় চুরি করলে হাত কেটে দেওয়া হয়, ব্যভিচার করলে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়, সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে শিরোñেদ করা হয়? আপনারা কি এইসব শরিয়াহ আইন জারি করতে চান? তাহলে আইএস, তালেবানদের সাথে আপনাদের কী পার্থক্য?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: দেখুন, বিগত কয়েক ‘শ বছর থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইসলামভীতি ছড়ানো হয়েছে যেন অমুসলিমরা তো বটেই, মুসলিমরা পর্যন্ত শরিয়াহ আইনের নাম শুনলে ভীত হয়ে পড়ে, বলে যে আমরা কি তাহলে আবার ১৪শ বছর পিছনে সেই যুগে ফিরে যাব, মধ্যযুগীয় বর্বরতা কায়েম করব? আমরা আমাদের প্রস্তাবনায় এসব যুক্তির জবাব দিয়েছি। আসলে চুরির শাস্তি হাত কাটা মানেই যে কেউ একটি লাউ চুরি করল আর তার হাত কেটে দেওয়া হবে, বিষয়টি মোটেও তেমন না। আল্লাহর রসুল (সা.) একজন ধনাঢ্য কোরায়েশ নারীর হাত কেটে দিয়েছিলেন, যদিও তার হাত না কাটার জন্য অনেক বড় বড় সাহাবি সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু রসুল (সা.) বলেছিলেন, আমার মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করত আমি তার হাত কেটে দিতাম। অতীতে কোনো অপরাধ করলে অর্থশালী ক্ষমতাবানদের দণ্ড দেওয়া হত না, কেবল দুর্বলদের উপর আইন প্রয়োগ হত। আল্লাহর দীনে সেটার কোনো সুযোগ নেই। আবার দেখা গেছে, উমর (রা.) দুর্ভিক্ষের বছরে কোনো চোরের হাতই কাটেননি। তিনি চেষ্টা করেছেন খাদ্য সংকটের মোকাবেলা করতে। আমরা যদি ইতিহাস পড়ি তাহলে দেখব, ইসলামের প্রথম সাড়ে তিনশ বছরে চুরির দায়ে হাত কাটা হয়েছে মাত্র ৬ জন ব্যক্তির। অথচ ইসলামবিদ্বেষীদের ন্যারেটিভ শুনলে মনে হয় যেন ঘরে ঘরে মানুষের হাত কাটা হয়েছে। প্রকৃত চিত্র মোটেও তা ছিল না। হাতকাটা হচ্ছে চুরির সর্বোচ্চ শাস্তি। বর্তমানে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে, বেগমপাড়া তৈরি করা হচ্ছে, একেকজন নেতা আমেরিকা ইউরোপে শত শত বাড়ির মালিক হচ্ছেন, যেভাবে উন্নয়নের নামে জনগণের সম্পদ লুটপাট করা হচ্ছে তাদের হাত কেটে দেওয়া কি অমানবিক হবে? মোটেও নয়। বরং এই দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নেই বলেই কোনো সরকার দুর্নীতি বন্ধ করতে পারেনি, পারবেও না।
আল্লাহর চেয়ে বেশি মানবিক আমরা হতে পারব না। আল্লাহর দীন এমনই ভারসাম্যযুক্ত যে এই দীন প্রতিষ্ঠা হলে প্রকৃতপক্ষে চুরি-ডাকাতিসহ অন্যান্য সামাজিক অপরাধ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। আসবে নয়, এসেছিল।
ইসলাম এমন সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, একা একটা মেয়ে রাতের অন্ধকারে, মূল্যবান অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ অতিক্রম করতে পারত। তার মনে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা জাগত হতো না। রাস্তায় কোনো মূল্যবান দ্রব্য হারিয়ে ফেললে তা ফেরত পাওয়া যেত। বেশিদূর যেতে হবে না, আপনি এই ভারতবর্ষের সুলতানি যুগের ইতিহাস পড়েন। আমরা ঐতিহাসিক কাশিম ফিরিশতার বই থেকে তুলে ধরেছি, তিনি বলেছেন বাংলা, সোনারগাঁও থেকে শুরু করে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মাইল দূরত্বের পথে এতটাই নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল যে, শেরশাহ সুরির শাসনামলে পথচারী ও বণিকদের অনেকেই রাস্তার পাশে তাদের মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী রেখে ঘুমিয়ে পড়ত। তাদের মনে ডাকাতি হওয়ার কোনো ভয় জাগত না।
ইসলাম কেবল কঠোর আইন দিয়ে চুরি-ডাকাতি বন্ধ করেনি। ইসলামের শিক্ষার প্রভাবে মানুষের এমন চারিত্রিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি এসেছিল যে, এই সভ্যতার মানুষগুলো গোপনেও আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি সদা সতর্ক থাকত। রিপুর বশবর্তী হয়ে কেউ যদি কালেভদ্রে কোনো অপরাধ করেও ফেলত তাহলে অনুতাপে জর্জরিত হয়ে নিজেই এসে নিজের জন্য শাস্তি প্রার্থনা করত। এমন বহু হাদিস আপনি পাবেন যে ব্যভিচার করে এসে রসুলাল্লাহকে (সা.) বলছে, ইয়া রাসুলাল্লাহ আমি তো ব্যভিচার করে ফেলেছি, আমাকে শাস্তি দিন। রসুলাল্লাহ (সা.) তাকে ক্ষমা করতে চাচ্ছেন কিন্তু সে বারবার নিজেরই শাস্তি দাবি করছে। পরে বাধ্য হয়ে তাকে শাস্তি দিতে হয়েছে। আরেকটা কথা। পাথর ছুঁড়ে হত্যার যে বিধান, সেটা কিন্তু তওরাতের বিধান। ইসলামে ব্যভিচারের সর্বোচ্চ শাস্তি হলো একশ বেত। সুরা নূরে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াত আসার আগে পূর্ববর্তী কেতাব তওরাতের বিধান দিয়ে কিছু বিচার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটা রদ হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামবিদ্বেষী তারা সেটাকে ধরে রেখেছেন ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য।
রিয়াদুল হাসান: তাহলে আপনাদের প্রস্তাবিত বিচারব্যবস্থাটা কেমন হবে? আদালত থাকবে নাকি সব বিচার মসজিদেই হবে?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: না, আমরা প্রস্তাব দিয়েছি মসজিদগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। সেখানে ইমাম নিয়োগ করবে রাষ্ট্র। মসজিদের কার্যক্রম এখন যেমন শুধু নামাজ পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ আমরা সেটার বিরোধিতা করি। কারণ রসুলাল্লাহর (সা.) সময় মসজিদ ছিল ঐ সমাজের কেন্দ্রবিন্দু, বলা যায় প্রশাসনিক কার্যালয়। আমরা বলেছি, মসজিদগুলোকে আরো বেশি আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত করা যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বিচার আচার। আমাদের মূল প্রস্তাব হচ্ছে, বিচারের জন্য আমাদের দেশে প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা সালিশ ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করে আবার চালু করা। এর কারণ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পঞ্চায়েত কমিটি তৈরি করা হয়, তারা বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষকেই চেনেন, তাদের স্বভাবচরিত্র জানেন। তাই তাদের পক্ষে উভয়পক্ষের কথা শুনে একটা আপস মীমাংসা করিয়ে দেওয়া সহজ হয়। কেননা এক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ কম। এখানে বলে রাখি, ইসলাম কিন্তু আপসের পক্ষে, মিলিয়ে দেওয়া পক্ষে, শাস্তি দেওয়ার পক্ষে না। যদি সালিশের মাধ্যমে কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে সেটা আদালতে যাবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে জামে মসজিদ স্থাপন করা হবে যেখানে আদালত থাকবে। ইসলামের মসজিদ কিন্তু আজকের মত ছিল না, সেগুলো ছিল বিরাট পরিসর নিয়ে তৈরি। যেমন আব্বাসী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের নির্মিত ইরাকের সাম্বার মসজিদের আয়তন ছিল ২,০০,০০০ বর্গমিটার। সে সময় মসজিদ চত্বরের সন্নিকটে সরাইখানা স্থাপিত হত, যেখানে পথচারী, মুসাফির, দুর্গত মানুষেরা খাবার ও আশ্রয় পেত। আল্লাহর রসুল (সা.) স্বয়ং মসজিদের লাগোয়া ঘরে পরিবার নিয়ে বাস করতেন। একদল নিবেদিতপ্রাণ সাহাবিগণও মসজিদেই বসবাস করতেন যাদেরকে আসহাবে সুফ্ফা বলা হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথিদেরকেও মসজিদেই রাখা হতো। যেটা বলছিলাম, যেসব মামলা ইউনিয়ন পর্যায়ের আদালতে আসবে, সেগুলোর বিচার করার জন্য সেখানে কাজীরা থাকবেন, তারা সপ্তাহ জুড়ে বিচারকার্য করবেন। কিছু দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড জুমার দিন প্রকাশ্যে কার্যকর করা হবে যেন মানুষ ইসলামের ন্যায়বিচার প্রত্যক্ষ করতে পারে। তবে রাষ্ট্রদ্রোহ, অর্থপাচার, সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার মত জটিল ও গুরুতর মামলাগুলি উচ্চ আদালতে প্রেরণ করা হবে। অধিকাংশ মামলা স্থানীয় পর্যায়েই মীমাংসা হয়ে যাবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে মীমাংসা না হলে উপজেলা, জেলা, বিভাগ তারপর কেন্দ্রীয় আদালত রয়েছে। আমরা ইতিহাস থেকে জানি খলিফাদের যুগে মাসের পর মাস আদালতে অপরাধ সংক্রান্ত কোনো মামলাই আসতো না; মামলার জট তো দূরের কথা। সেখানে আমরা দেখছি আমাদের দেশের আদালতগুলোতে নাকি ৪৪ লক্ষ মামলা বিচারাধীন অবস্থায় জমে আছে। আমরা উপনিবেশ যুগের এই বিচারব্যবস্থার সংস্কার করার প্রস্তাব দিয়েছি। কারণ তারাই বলেন জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। আমাদের প্রস্তাবিত বিচারব্যবস্থায় এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ মামলার বিচার শেষ হয়ে যাবে। বিচার প্রক্রিয়ায় আল্লাহর হুকুমই হবে চূড়ান্ত। বর্তমানের যেসব আইন আল্লাহর আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা বাতিল করা হবে। বিচার পেতে কাউকে একটা টাকাও খরচ করতে হবে না। কারণ ন্যায়বিচার প্রদান করা রাষ্ট্রের কাজ। উকিলেরও খুব একটা দরকার পড়বে না। সরকারি উকিল থাকবে, দরকার হলে তারা আইনি সহায়তা দিবেন। এমনিতে বাদী নিজেই বিচারকের সামনে তার আর্জি পেশ করতে পারবে।
রিয়াদুল হাসান: আদালত একটি ধর্মনিরপেক্ষ জায়গা কিন্তু মসজিদ তো মুসলমানদের। তাহলে অন্য ধর্মের লোকও কি মসজিদে যেতে পারবে?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: কেন পারবে না? রসুলাল্লাহর (সা.) সময় নাজরানের খ্রিষ্টান গোত্রের প্রতিনিধিরা রসুলের (সা.) সঙ্গে কোথায় মিটিং করেছে? মসজিদের ভিতরে। সেদিন রোববার ছিল, তাদের প্রার্থনার দিন। রসুল তাদেরকে মসজিদের মধ্যেই প্রার্থনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন আর তারাও সেটা করেছিল। ইতিহাস পড়ে দেখেন। মসজিদকে আজকে আমরা যেভাবে দেখি সেটা ছিল না তো।
মসজিদ যদি রাষ্ট্রের একটি শাসনতান্ত্রিক কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটা এমনিতেই কেবল মুসলমানদের সম্পত্তি থাকে না, সেটা সেক্যুলার হয়ে যায়।
আরেকটা কথা বলেন, আল্লাহ কি কেবল মুসলমানদের সৃষ্টি করেছেন? সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের তাহলে কে সৃষ্টি করেছে? আমরা যখন স্রষ্টার দেওয়া বিধান চালু করতে বলছি, সেই বিধানকে অন্য ধর্মের লোকেরাও সমানভাবে গ্রহণ করবে। তারা কেউ যদি বলে যে, তাদের বিচারের জন্য তাদের ধর্মের বিধান লাগবে ইসলাম তো সেটাও দিতে রাজি। রসুল (সা.) কি তওরাতের বিধান দিয়ে ইহুদি নাগরিকদের বিচার করেন নাই? আসলে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ইসলাম সেক্যুলার বলতে পারেন, এখানে হিন্দু মুসলিম নাই, ধনী-গরিব নাই, নারী-পুরুষ নাই, রাজা-প্রজা নাই, আইনের চোখে সবাই সমান। এটা কেবল মুখের কথা না, ইসলাম সেটার প্রমাণ দিয়েছিল। খলিফা উমর (রা.) নিজ হাতে তার পুত্রকে শাস্তি দিয়েছিলেন প্রকাশ্যে। বেচারা মারাই গিয়েছিল। কেবল উমর (রা.) না, এমন ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে ভুরি ভুরি। সেক্যুলার কোনো সিস্টেম এমন উন্নত চরিত্রের ন্যায়বিচারক শাসক সৃষ্টি করতে পারে নাই।
রিয়াদুল হাসান: কিন্তু ইসলাম তো অমুসলিমদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেছিল, যেজন্য বহু লোক মুসলিম হতে বাধ্য হয়েছিল। এটা ন্যায়বিচার কীভাবে হল? আপনারা কি ইসলামের এই বিধানকে অস্বীকার করেন?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। ইসলামের বিরুদ্ধে এই পয়েন্টটা খুব ব্যবহার করা হয় কিন্তু আমি বলব এটা বায়াস্ড একটা ব্যাখ্যা। প্রকৃতপক্ষে জিজিয়া হচ্ছে প্রতিরক্ষা কর বা নিরাপত্তা কর। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদেরকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয়। বিনিময়ে সরকার একটি সামরিক বাহিনী তৈরি করে যার ব্যয় বহন করে সকল নাগরিক। ইসলামে কিন্তু মিলিটারি সিভিলিয়ান এমন কোনো ডিভিশন নাই, জানেন হয়ত। সকল মো’মেন, মুসলিম, উম্মতে মোহাম্মদী সামরিক প্রশিক্ষণের আওতায় আসে, দেশরক্ষার্থে সামরিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক, জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু রাষ্ট্র তো কেবল মুসলিমদের না, অন্যরাও তো রাষ্ট্রের নাগরিক। তারা তো সামরিক কাজে, প্রতিরক্ষার কাজে অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু আল্লাহর বিধান হচ্ছে যারা যুদ্ধে যাবে না তারা নামমাত্র একটি কর দিয়ে যুদ্ধের ব্যয় বহনে অংশগ্রহণ করবে। আব্বাসী খেলাফতের যুগেও বছরে একজন কর্মক্ষম ব্যক্তিকে মাত্র ১ থেকে ৪ দিনার জিজিয়া দিতে হত। সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য জিজিয়া বাড়ানো হতো, দরিদ্রদের জন্য কম রাখা হতো। আবার নারী, বৃদ্ধ, শিশু, অক্ষম, ধর্মগুরু, সামাজিকভাবে গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে এই কর থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হত। এই কর আরোপ করে অমুসলিমদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানো হয়নি, কারণ মুসলিমদের মত তাদেরকে বাধ্যতামূলক যাকাতসহ ও আরো বেশ কিছু খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয় না। কোর’আনে অর্থ দানের জন্য কুড়িটি খাতেরও বেশি উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলোর বেশিরভাগই মুসলিমদের দিতে হয়। হিসাব করে দেখেন অমুসলিমদের তুলনায় মুসলিমদের কত বেশি অর্থ বেশি ব্যয় করতে হয়। তাহলে অমুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক কী করে হয়? আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থার বইয়ে ইতিহাস থেকে দেখিয়েছি, কৃষিপ্রধান মিশরের কৃষকরা মুসলিম হলেও তাদেরকে জিজিয়া দিতে হত, কারণ তারা ফসল উৎপাদনের কারণে যুদ্ধে যেতে পারত না। রাষ্ট্রই তাদেরকে ছাড় দিয়েছিল। সুতরাং জিজিয়ার কারণে অনেক লোক মুসলিম হয়েছে এমন কথা কল্পনাপ্রসূত। ইসলামের উন্নত ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হয়েই বেশিরভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ধর্মান্তরিত হয়েছে। সিস্টেমের চাপে ফেলে ধর্মান্তরিত করা ইসলামের নীতি নয়। যদি তা-ই হত, তাহলে টানা সাতশো বছর মুসলিম শাসনের পর ভারতে অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীই খুঁজে পাওয়া যেত না।
রিয়াদুল হাসান: অর্থব্যবস্থা নিয়ে আরো কিছু বলুন। ইসলামে তো সুদ হারাম। আমরা সুদ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ কীভাবে পাবো? আমাদের জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ আসে বৈদেশিক ঋণ থেকে। অথবা ব্যাংকিং ব্যবস্থা কীভাবে চলবে?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: সুদ আল্লাহ হারাম করেছেন, তাই যে কোনো মূল্যে আমরা অর্থব্যবস্থাকে সুদমুক্ত করার পক্ষে। সুদের বিকল্প ব্যবস্থা তো আমাদের কাছে অবশ্যই আছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকল্প তো সমাজতন্ত্রও দিয়েছে। আমরাও বলি, পুঁজিবাদ একটি শোষণমূলক অর্থব্যবস্থা যা সকল সম্পদ সাপটে এনে গুটিকয় মানুষের কাছে জড়ো করে আর অধিকাংশ মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ফেলে রাখে। এ কারণেই বর্তমানে বিশ্বের ৬৩% সম্পদ মাত্র ১% ধনীর হাতে জমা হয়ে গেছে। ব্যাংকের কথা বলছেন?
ব্যাংক কি যে চায় তাকেই পুঁজি দেয়? না, দেয় না। যে লোক দেখাতে পারবে যে, তার আগে থেকেই যথেষ্ট সম্পদ আছে কিন্তু আরো চাই, শুধু তাকেই ব্যাংক ঋণ দেয়। যার কিছু নেই, তাকে ব্যাংক কখনো পুঁজি দেবে না। এক কথায় এই ব্যবস্থা তৈলাক্ত মাথায় আরও তেল দেয়, ধনীকে আরো ধনী করে, গরীবকে আরও গরীব করে। সুতরাং এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন অসম্ভব।
এই ব্যবস্থায় ধনীরা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট তৈরি করছে যার মাধ্যমে তারা অধিক মুনাফার লোভে নিত্যপণ্যসহ সকল পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। আল্লাহর দেওয়া অর্থনীতির মূলনীতি হল, সম্পদকে দ্রুতবেগে সঞ্চালিত করা, জমতে না দেওয়া। তাহলেই সম্পদের সুষম বণ্টন হতে থাকবে এবং ক্রমান্বয়ে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে আসবে। এটা হচ্ছে থিওরি। বাস্তবে আমরা কী করতে চাচ্ছি সেটা বলি। সেটা হচ্ছে ব্যবসায়িক লেনদেন হবে লাভক্ষতির ভিত্তিতে, অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে। যে বিনিয়োগ করবে তাকে পুঁজির ঝুঁকি নিতেই হবে। তবে আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, এর পাশাপাশি ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট নিশ্চিহ্ন করতে হবে যেন বড় বড় শিল্পপতিদের দাপটে ছোট-মাঝারি বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হারাতে না হয়। সেটার জন্য কয়েকটি স্তরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো সজ্জিত করতে হবে। বৃহৎ পুঁজির মালিকদের উৎপাদন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট থাকবে যেন স্বল্পপুঁজির ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকে থাকতে পারে। যেমন ঔষধ উৎপাদনকারী বৃহৎ কোম্পানি হলুদ মরিচের ব্যবসা করতে যাবে না। সেটা করবে মাঝারি বা ক্ষুদ্র পুঁজির উদ্যোক্তারা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুদভিত্তিক অর্থনীতি থাকার ফলেই কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈদেশিক ঋণের জালে জর্জরিত, আবার বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত নানামুখী ঋণের জালে বাঁধা। বর্তমানে তো সরকারের বাৎসরিক ব্যয়ের ৫১% অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে বৈদেশিক ঋণের সুদ দিতে। এভাবেই দেশ একসময় দেউলিয়া হয়ে যায়। আমাদের দেশও দেউলিয়াত্বের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে রক্ষা পেতে হলে দেশের টাকা বিদেশে পাচার হওয়া বন্ধ করতে হবে। বিদেশ থেকে দেশে রেমিটেন্স আনার জন্য আমরা দক্ষ ও দরিদ্র শ্রমিকদের বিনা খরচে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেছি। তারপর দুর্নীতিবাজদের দ্বারা বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে হবে, ভোগবাদ থেকে মানুষকে ফেরাতে হবে, কাগুজে মুদ্রার উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে এবং অর্থনীতিকে সম্পদনির্ভর করে তুলতে হবে। বিত্তবানদের দানের অর্থ মসজিদের মাধ্যমে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এতে সমাজের সকল স্তরের মানুষ উপকৃত হবে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাবে।
রিয়াদুল হাসান: আপনার প্রস্তাবিত তওহীদভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের নারীনীতি কী হবে? আপনারা নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করতে চান কি না বা নারীদের উপরে কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করবেন কিনা?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: আমরা আল্লাহর দেওয়া নারীনীতির অতিরিক্ত কোনো কিছু চাই না। রসুলাল্লাহ সেই নারীনীতি বাস্তবায়ন করেছেন। আমরা সেখানে দেখি নারীরা অবাধে মসজিদে যাতায়াত করেছে, সামাজিক সকল কাজে পুরুষের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেছে। হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণ করেছেন একজন নারী সাহাবী রুফায়দাহ (রা.), বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছেন উম্মে শেফা (রা.)। নারীর ক্ষমতায়ণে কোথাও তো কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তারা সাংসারিক কাজও করেছেন আবার ব্যবসা-বাণিজ্যও করেছেন। এমনকি রসুলাল্লাহ (সা.) তো নারীদেরকে যুদ্ধের মাঠেও নিয়ে গেছেন। সেখানে নারীরা সেকেন্ড লাইনে থেকে রসদ প্রস্তুত, চিকিৎসা সেবা ইত্যাদি সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি সংকট মুহূর্তে অস্ত্র হাতে যুদ্ধও করেছেন অনেক নারী। আল্লাহর রসুল (সা.) তো নারীদের কালো কাপড়ে আবৃত করেননি, তিনি তো মসজিদে নারী ও পুরুষের মাঝখানে কালো পর্দা টানিয়ে দেননি। আজকে ইসলামের কথা বললেই নারীনীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর কারণ আর কিছুই নয়, পর্দার বিধান নিয়ে বাড়াবাড়ি। নারী কেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে, যেখানে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল একজন মুসলিম নারী যার নাম ফাতেমা আল ফিহরি, ৮৫০ সালে মরোক্কোতে, ১০০০ সালের দিকে মারিয়াম আইজিলি অ্যাস্ট্রোলেব আবিষ্কার করেছিলেন যেটা দিয়ে সে যুগে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পরিমাপ করা হতো। নারী সংক্রান্ত যতগুলো ট্যাবু ইসলামের নামে চালানো হয়, যেমন নারীর পোশাক, বহুবিবাহ, বিয়ের বয়স, উপপত্নী, নারী নেতৃত্ব, পেশা, নারী সাক্ষী ইত্যাদির জবাব আমরা দিয়েছি বইতে। এক কথায় নারীরা শালীনতা রক্ষা করে সকল কাজে অংশ নিতে পারবে, কেবল নারী বলে জীবনের কোনো অঙ্গনে তাকে বৈষম্যের শিকার হতে হবে না। এই শালীনতা রক্ষার হুকুম কেবল নারীর জন্য নয়, পুরুষের জন্যও প্রযোজ্য। নারী তো বটেই, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও পূর্ণ মানবাধিকার ভোগ করবে এবং সকল কাজে যোগ্যতা অনুযায়ী অংশগ্রহণের অধিকার পাবে। যেহেতু আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছি তাই নারীর পোশাক-আশাক নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না, বললে সেটা ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার মতো শোনাবে।
রিয়াদুল হাসান: ঠিক আছে। আপনাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় আর কী কী গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের কথা উল্লেখ করতে চান?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: আমরা তো সেখানে প্রায় তিরিশটির বেশি সেক্টর নিয়ে আলোচনা করেছি। যেমন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা বলেছি যে, প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম জীবনমান ও মৌলিক চাহিদা পুরণ করতে রাষ্ট্র জীবনধারণ ভাতার ব্যবস্থা করবে। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমরা বলেছি ব্রিটিশদের তৈরি মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা, এই দুইমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ছিল জাতিকে পদানত করে রাখার একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। আমরা সেখানে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার প্রস্তাব করেছি যেটা কেবল বস্তুবগত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করবে না, বরং তাদেরকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করবে এবং তাদেরকে মো’মেন বানাবে, চারিত্রিক, মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে তুলবে। এতে করে শিক্ষিত লোকেরা যেভাবে দেশ গিলে খেতে চায়, তারা এর বিপরীত হবে। আমরা নোয়াখালীতে আমার গ্রামে একটি স্কুলও দিয়েছি যেখানে আমাদের এই চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টা করছি। আমরা ধর্মব্যবসার কালো থাবা থেকে জাতিকে মুক্ত করার পথ উল্লেখ করেছি। সেটা হচ্ছে সকল মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানজনক ভাতা প্রদান করা হবে, যেন তারা সাধারণ মুসল্লিদের দানভিক্ষার উপর নির্ভরশীল না থাকেন। আমরা বলেছি প্রতি ইঞ্চি উৎপাদনযোগ্য জমিকে চাষের আওতায় আনতে হবে। কেউ জমি ফেলে রাখলে নির্দিষ্ট সময় পর রাষ্ট্র সেটা অধিগ্রহণ করবে। কৃষিজমিকে তামাক চাষের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। আগে দেশের চাহিদা পূরণ করে তারপর খাদ্যপণ্য ও খনিজ সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করা হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সূর্যের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে, এজন্য সন্ধ্যার পর জরুরি ক্ষেত্রগুলো ছাড়া সকল মার্কেটপ্লেস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে। নদী ও খাল খনন করে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং একই সাথে দেশের সম্ভাব্য সকল স্থানে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সকল নাগরিককে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হবে। চিকিৎসকদের মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে। গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করলে বা গুজব রটনা করলে কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। অশ্লীলতা, মিথ্যা ও আল্লাহর অবাধ্যতা পরিহার করে যে কোনো শিল্পকলার চর্চা সেটা হোক সঙ্গীত, হোক চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য নির্মাণ বা নৃত্য সবকিছুই করার অনুমতি থাকবে। মনে রাখবেন, মোল্লাতন্ত্র আর ইসলাম এক জিনিস নয়। আজকে মোল্লাতন্ত্রের আড়ালে প্রকৃত ইসলাম হারিয়ে গেছে। যে ইসলাম জাহেল আরবদেরকে সভ্য জাতিতে পরিণত করেছিল, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা উপহার দিয়েছিল সেই ইসলাম আজকে মোল্লাতন্ত্রের চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। আমরা সেটাকে পুনরুদ্ধার করে মানুষের সামনে নিয়ে এসেছি। আমরা সরকারকে যেমন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি, তেমনি মানুষকেও জানাচ্ছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের প্রস্তাবিত এই রাষ্ট্রব্যবস্থা মানবজাতির চলমান সকল সংকটের যৌক্তিক সমাধান দিতে সক্ষম।