এম আর হাসান:
মো’মেন ও মুসলিম কোর’আনের দুটো পরিভাষা যা পৃথক অর্থ বহন করে। কিন্তু আমরা অনেকেই এই দুটোকে সমার্থক মনে করি। আসুন এই দুটো শব্দের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আল্লাহর কেতাব থেকে জেনে নেই। একইভাবে কাফের ও মোশরেকের সংজ্ঞাও আমাদের জানা প্রয়োজন। কারণ সংজ্ঞা না জানা থাকলে আমরা বুঝব কী করে আমরা মো’মেন নাকি কাফের।
মো’মেন:
মো’মেন কারা তা পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মো’মেন শুধু তারা যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান আনে, অতঃপর কোনো সন্দেহ করে না এবং সম্পদ-জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। (সুরা হুজরাত ১৫) এ সংজ্ঞার আলোকে দেখা যায় মো’মেন হওয়ার দুটো শর্ত।
১. আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান অর্থাৎ তওহীদ; ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের কোনো অঙ্গনে আল্লাহর হুকুম-বিধান ছাড়া আর কারো হুকুম-বিধান না মানার অঙ্গীকার।
২. আল্লাহর নাজিলকৃত সত্যদীন ইসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করে জেহাদ, সর্বাত্মক সংগ্রাম করা।
প্রচলিত ধারণা মতে, যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে এবং নামাজ রোজাসহ অন্যান্য আমল বেশি বেশি করে তারা হচ্ছে মো’মেন। কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা মো’মেন হওয়ার শর্ত নয়। এ বিশ্বাস তো ইবলিসেরও আছে। মো’মেন হওয়ার শর্ত হচ্ছে আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করা এবং অন্য সকল সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা; সেই সঙ্গে দীন প্রতিষ্ঠার জেহাদ করা। এই মো’মেনের সঙ্গে আল্লাহর ওয়াদা যে তিনি তাকে দুনিয়াতে কর্তৃত্ব বা খেলাফত দিবেন এবং তার সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতে দাখিল করবেন। (সুরা নূর ৫৫) সুতরাং আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞার আলোকে বর্তমানের ১৮০ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠী মো’মেন থাকে না; কেননা তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে মানুষের সার্বভৌমত্ব ও জীবনবিধান মেনে নিয়েছে এবং তারা দীন প্রতিষ্ঠার জেহাদও জাতিগতভাবে পরিত্যাগ করেছে।
মুসলিম:
আল্লাহ কোর’আনে বলেছেন, হে মো’মেনগণ! তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সুরা ইমরান ১০২) এখানে পরিষ্কার হয়ে গেল যে মো’মেন ও মুসলিম আলাদা বিষয়। মুসলিম শব্দটি এসেছে তসলিম থেকে যার অর্থ বশ্যতা স্বীকার করা, আত্মসমর্পণ করা। পবিত্র কোর’আনের একটি আয়াত থেকে মুসলিমের সংজ্ঞা জানতে পারা যায়। সেটা হচ্ছে, আরবরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। হে রসুল! আপনি বলুন, তোমরা তো ঈমান আনোনি, বরং বল, আমরা বশ্যতা স্বীকার (তসলিম) করেছি। এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল হবে না। (সুরা হুজরাত ১৪)।
সুতরাং বোঝা গেল, যারা আল্লাহর দেওয়া দীন ‘ইসলাম’- এর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়, তারা হচ্ছে মুসলিম। ইসলামের সমস্ত পণ্ডিতদের সংজ্ঞা মোতাবেক, যারা বিনা শর্তে, বিনা প্রশ্নে আল্লাহর সমস্ত হুকুমের প্রতি গর্দান পেতে দেয় (অর্থাৎ আনুগত্য করে) তারা হচ্ছে মুসলিম। এ দিক থেকেও এ জাতি আল্লাহর দীনের হুকুমের আনুগত্য করছে না। বরং তারা কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষের তৈরি হুকুম-বিধানের প্রতি গর্দান পেতে দিয়েছে। সুতরাং তারা মুসলিম নয়। যারা ইসলাম ছাড়া, কোর’আন ছাড়া অন্য কোনো জীবনব্যবস্থার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, সাদরে গ্রহণ করে তারা কোনো যুক্তিতেই মুসলিম হতে পারে না।
কাফের:
আল্লাহ বলেছেন, মানুষ দুই প্রকার- মো’মেন ও কাফের (সুরা তাগাবুন ২)। তাই মো’মেনের সংজ্ঞায় যারা পড়ে না তারা স্বভাবতই কাফের। তথাপি আল্লাহ স্পষ্ট করে কাফেরের সংজ্ঞাও জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা দিয়ে যারা হুকুম (শাসন) করে না তারা কাফের, জালেম, ফাসেক (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এ থেকেও বোঝা যায়, আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থাকে জাতীয়, রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রত্যাখ্যান করে এবং মানুষের তৈরি বা পাশ্চাত্য সভ্যতার তৈরি আইন-কানুন, জীবনবিধান দিয়ে শাসন ও বিচারকার্য পরিচালনা করায় এই মুসলিম জনগোষ্ঠী কার্যত কাফেরে পরিণত হয়েছে।
মোশরেক:
‘মোশরেক’ শব্দটি এসেছে ‘শিরক’ থেকে যার মানে হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার করা। যারা জীবনের কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মানলো আর কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি হুকুম বিধান মানলো তারা শিরক করল অর্থাৎ মোশরেক হয়ে গেল। আল্লাহ বলেন, তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ মানো আর কিছু অংশ মানো না? যারা এমনটা করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি। (সুরা বাকারা ৮৫)। আল্লাহ কোনো অবস্থাতেই শিরক ক্ষমা করবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন, অন্য ছোট বড় পাপ তিনি যাচ্ছে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন। (সুরা নিসা ৪৮, ১১৬) তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম বা অন্যায়। (সুরা লোকমান ১৩) তিনি আরো বলেছেন, মোশরেকরা নাপাক। (সুরা তওবা ২৮) এখন বাস্তবতা হচ্ছে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীটিও বর্তমানে আল্লাহর কেতাবের কিছু হুকুম মানছে, আর অধিকাংশ হুকুম মানছে না। যেমন তারা নামাজ রোজা করছে আল্লাহর হুকুমে কিন্তু জাতীয় রাষ্ট্রীয় জীবনে আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থায় মানছে মানুষের তৈরি বিধান অনুযায়ী। এটাই হচ্ছে শিরক। এই শিরক থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়, আল্লাহ ছাড়া সকল হুকুমদাতাকে অস্বীকার করা (এটাই তওহীদ) এবং আল্লাহর দীনে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করা। (সুরা বাকারা ২০৮)।
এবার আসুন উপরে প্রদত্ত সংজ্ঞার আলোকে আমরা নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে নিই।
[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ইমেইল: hezbuttawheed.official@gmail.com যোগাযোগ: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৭১১৫৭১৫৮১]