মো. মশিউর রহমান:
মানুষের জীবনের সর্ব অঙ্গনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ আসলেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। তারা হচ্ছে সেই অংশটি যারা কিছুতেই জাতীয় জীবনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা হোক তা চান না। যারাই আল্লাহর দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠার কথা বলে, এই শ্রেণিটি তাদের সবাইকে এক পাল্লায় ফেলে তাদের কর্ম-প্রচেষ্টাকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি বলে প্রচার করে মানুষের কাছে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চান। ইসলামে জেহাদ, কেতালের যে আলোচনা রয়েছে সেটাকেই তারা সন্ত্রাস বলে চিহ্নিত করতে চান। কিন্তু জেহাদ আর সন্ত্রাস এক জিনিস নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
জেহাদ শব্দের অর্থ সংগ্রাম, সর্বাত্মক সংগ্রাম, প্রচেষ্টা। দীন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা মানুষকে মুখে বলে, লিখে, বক্তৃতা করে, যুক্তি উপস্থাপন করে, বুঝিয়ে ইত্যাদি সবই জেহাদের অন্তর্ভুক্ত। আর কেতাল একেবারে ভিন্ন শব্দ যার অর্থ সশস্ত্র যুদ্ধ। জেহাদ ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী ইত্যাদির পর্যায়ে এবং কেতাল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা দল যদি দীন প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হাতে নেয় তবে সেটা হবে মারাত্মক ভুল। তাদের কাজ হবে মানুষকে যুক্তি দিয়ে কোর’আন-হাদিস দেখিয়ে, বই লিখে, বক্তৃতা করে মানুষকে এ কথা বোঝানো যে পৃথিবীতে নিরংকুশ শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের মধ্যে বাস করতে হলে একমাত্র পথ- যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর দেয়া জীবন বিধান মোতাবেক আমাদের জীবন পরিচালনা করা। এই কাজ কি জোর করে করাবার কাজ? এটাতো সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে কোন কিছু বিশ্বাস করানো অসম্ভব।
হেযবুত তওহীদ এই কাজটাই করার সংকল্প করেছে এবং করছে মানুষকে বুঝিয়ে, যুক্তি দিয়ে। প্রকৃত ইসলামের স্বরূপ তুলে ধরাই হচ্ছে বিকৃত ইসলামের কুফল থেকে সমাজকে রক্ষা করার একমাত্র পথ। হেযবুত তওহীদ তাই আল্লাহর সার্বভৌমত্বে মানুষকে ফিরে আসার আহ্বান করছে এবং জঙ্গিবাদের ভ্রান্তিগুলো রসুলের জীবন থেকে, কোর’আন হাদিস থেকে তুলে ধরছে। এই সত্য প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজটি করার জন্য হেযবুত তওহীদ প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে আল্লাহর রসুলের প্রক্রিয়া। তিনি কী করেছিলেন? মক্কী জীবনের তের বছর তাঁর আহ্বান অর্থাৎ বালাগ ছিল ব্যক্তি ও দলগত পর্যায়ে। তাই তিনি ও তাঁর দল সর্বপ্রকার অত্যাচার, মিথ্যা দোষারোপ, নির্যাতন সহ্য করেছেনÑ কোনো প্রতিঘাত করেননি। হেযবুত তওহীদের মোজাহেদরাও আজ ৩০ বছর ধরে মানুষকে তওহীদের, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে আহ্বান জানিয়ে আসছে, এটা করতে যেয়ে তারা বিরুদ্ধবাদীদের গালাগালি খাচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, মার খাচ্ছে প্রচণ্ডভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, এমনকি আমাদের পাঁচজন সদস্য শহীদ হয়েছেন।
আল্লাহর রসুলের তের বছরের মক্কী জীবনও ছিল শুধু এক তরফা নির্যাতন। তারপর মদীনার মানুষ যখন তাঁর তওহীদের ডাক গ্রহণ করল, তখন তিনি হিজরত করে সেখানে যেয়ে রাষ্ট্র গঠন করলেন। যেই রাষ্ট্র গঠন করলেন তখনই নীতি বদলে গেল। কারণ রাষ্ট্র কোনোদিন ব্যক্তি বা দলের নীতিতে টিকে থাকতে পারে না। তিনি যখন মদিনাবাসীর অবিসংবাদিত নেতা হলেন তখন তাঁকে বিচারক হিসাবে বিবাদের মীমাংসা করতে হল, অপরাধীদের বিচার করতে হল, শাসক হিসাবে বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক দপ্তর (মসজিদ) প্রতিষ্ঠা করতে হল, সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দিতে হল। আল্লাহর রসুল হিসাবে তিনি তাদেরকে কোর’আন শিক্ষা দিতেন এবং তাদের আত্মিক ও শারীরিক উপযুক্ততা সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন। ভূখণ্ডের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য তখন তাঁর প্রয়োজন হবে অস্ত্রের, সৈনিকের, যুদ্ধের প্রশিক্ষণের। নবগঠিত রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান হিসাবে আল্লাহর রসুলও প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ নিলেন। তিনি অপরাপর রাষ্ট্রনায়কদের মতোই জাতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যুদ্ধ করলেন, প্রয়োজনে সন্ধি করলেন। এগুলো সবই করলেন যখন তাঁর হাতে একটি জাতি তাদেরকে পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল তারপর অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পর। সুতরাং রসুলাল্লাহর প্রদর্শিত পথ মোতাবেক তওহীদ ভিত্তিক এই সত্যদীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি গোষ্ঠী বা দলগতভাবে কোনো কেতাল অর্থাৎ সশস্ত্র যুদ্ধ নেই, আছে শুধু তওহীদের, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের আহ্বান, বালাগ দেয়া। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আছে সশস্ত্র যুদ্ধ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অস্ত্র, যুদ্ধ ইত্যাদি যদি আইনসম্মত না হয় তবে পৃথিবীর সব দেশের সামরিক বাহিনীই বে-আইনি, সন্ত্রাসী। কোর’আন ও হাদিসে যে জেহাদ ও কেতালের কথা আছে তা রাষ্ট্রগত। বিভিন্ন সময়ে যেসব মুফতিরা ইসলামবিদ্বেষীদেরকে হত্যার ফতোয়া দিচ্ছেন আর যারা চাপাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই হত্যাকে রসুলাল্লাহর করা সামরিক অভিযানের সঙ্গে এক করে দেখাতে চাচ্ছে তারা কি এই দণ্ড প্রদানের জন্য জাতি কর্তৃক মনোনীত বিচারক, নাকি গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল? বিচারক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া দূরের কথা জাতি যাদেরকে চেনেই না, তারা কোন অধিকারে, কোন ক্ষমতাবলে অপরকে কতলের রায় প্রদান করছেন? তারা কি মাদ্রাসায় কিছু মাসলা মাসায়েল শিখে নিজেদেরকে নিজেরাই রাষ্ট্রের ‘কাজী’ বলে সাব্যস্ত করছেন?
আমরা কোর’আন-হাদিস দেখিয়ে, যুক্তি দিয়ে, প্রমাণ দিয়ে মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করছি যে তওহীদ ভিত্তিক দীন, জীবনব্যবস্থা ছাড়া মানুষের জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তার আর কোনো বিকল্প পথ নেই। বর্তমান অশান্ত পৃথিবীই তার প্রমাণ। এখানে জোর জবরদস্তির কোনো স্থান নেই, মানুষকে জোর করে কোনো কিছু বোঝানো যায় না এটা সাধারণ জ্ঞান। মানুষ যদি একে গ্রহণ করে তবে দেশে তওহীদ ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, তারা পার্থিব ও পরকাল দুই জীবনে শান্তি ও গৌরবের অধিকারী হবে। আর যদি মানুষ আমাদের ডাকে সাড়া না দেয়, মানুষের সার্বভৌমত্বকেই আঁকড়ে ধরে থাকে তাহলে তারা এর পরিণাম ভোগ করবে। তবে প্রচলিত সিস্টেমের ধারক-বাহক-অনুসারীরা আমাদের যতই বিরোধিতা করুক, আল্লাহর সত্যদীনকে সমুন্নত করার প্রচেষ্টা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।
[লেখক: মুখপাত্র, হেযবুত তওহীদ; ইমেইল: hezbuttawheed.official@gmail.com যোগাযোগ: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৭১১৫৭১৫৮১, ০১৭১১২৩০৯৭৫]