হেযবুত তওহীদ

মানবতার কল্যাণে নিবেদিত

চলমান রাজনীতি: যে কারণে ইসলামি দলগুলোর সামনে কঠিন বিপদ!

আদিবা ইসলাম:
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক সক্রিয়। যদিও কিছু সংগঠন সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কর্মী স্বল্পতার কারণে পিছিয়ে রয়েছে, তবে দেশের বৃহৎ ধর্মীয় সংগঠনগুলো মাঠে তৎপর। তারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং আয়োজন করছে এবং ব্যাপক জনসমাগম ঘটাচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা, কোর’আনের শাসন বাস্তবায়ন করা তথা শরিয়াহ আইন চালু করা।

সম্প্রতি জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি এক ওয়াজ মাহফিলে বলেছেন, ‘ইসলামের অর্ধেক বিজয় ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে’। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ঘরে ঘরে আওয়াজ তুলতে হবে- কোর’আনের আইন চাই, কোর’আনের আলোকে মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই’। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, ‘আগামীর বাংলাদেশ হবে ইসলামের বাংলাদেশ’। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে দেশের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে।

তবে বাংলাদেশের এই ধর্মীয় দলগুলোর উত্থানকে ভারত, আমেরিকাসহ বিভিন্ন লবিস্ট ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল রুবিন সম্প্রতি ওয়াশিংটন এক্সামিনারে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ কি পরবর্তী আফগানিস্তান?’ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘পশ্চিমা গণমাধ্যমের মনোযোগ এড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রমশ একটি নতুন সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে, যেখানে একাধিক জঙ্গি সংগঠন ক্রমাগত শক্তি বাড়াচ্ছে। এসব গোষ্ঠী এমনভাবে সংগঠিত হচ্ছে যে, তারা আল কায়েদার চেয়েও বেশি উগ্রবাদী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’

সম্প্রতি (১৭ মার্চ) এনডিটিভিকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ক্যাথলিক ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, হত্যা ও অত্যাচার চালানো হচ্ছে, যা আমেরিকার সরকার তথা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।’ একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই। দলবদ্ধভাবে তাদের ওপর হামলা ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।’

অন্যদিকে, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে এ বিষয়ে সরব হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই তারা বাংলাদেশ নিয়ে উত্তেজনাকর সংবাদ ও গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছে, তিলকে তাল বানাচ্ছে। বিশেষ করে হিন্দু নির্যাতন, মৌলবাদের বিস্তার ইত্যাদি ইস্যুতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ও অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করছে। পাশাপাশি, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। তারা বাংলাদেশকে ধর্মীয় উগ্রবাদী ও অরাজক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে হেয় প্রতিপন্ন করতে সক্রিয়ভাবে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, গত ৫ মার্চ, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের বিষয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের ব্যাপারে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে, প্রথমত, গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশকে একটি ধর্মীয় উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের মধ্যে মৌলবাদের বিস্তার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

যদি এই ধরনের দাবী প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে যেকোনো দেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়ে যাবে, যেমনটি আমরা ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে দেখেছি। সাধারণত, তারা যেকোনো দেশে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ধর্মীয় চরমপন্থার বিষয়টিকে সামনে আনে, যাতে জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সমর্থন লাভ করা যায়। একইসাথে, মার্কিন সরকার তাদের দেশের নাগরিকদের সমর্থনও অর্জন করতে প্রচার প্রচারণা চালায়, যাতে জনগণ বিশ্বাস করে যে, এই পদক্ষেপটি নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় এবং বৈধ।

এভাবে যদি তারা বাংলাদেশে একই কৌশল গ্রহণ করার চেষ্টা করে, তবে ধর্মীয় সংগঠনগুলো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হবে। তারা তখন কঠোর নীতিমালা ও অবরোধ আরোপ করবে, সরকারের ওপর শক্তি প্রয়োগের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে। এটি আমরা হেযবুত তাহরীরের ক্ষেত্রে দেখেছি। গত ৭ মার্চ যখন তারা বায়তুল মোকাররমে মাঠে নামল, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অথবা অন্য যেকোনো চাপের কারণে সরকার তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল, যদিও সরকারের হেযবুত তাহরীরের উপর আক্রমণ করার তেমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না।

বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রগোষ্ঠীগুলি ইতিমধ্যে প্রায় একশোটি মাজারে হামলা চালিয়েছে। গত এক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রায় ২৫০০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি (৩০ জানুয়ারি ২০২৫) বিবিসি বাংলা “’তৌহিদী জনতা’ নামে হামলা কারা করছে?” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশের ১০টি ‘তৌহিদী জনতা’র হামলার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। বিবিসি চারটি ঘটনা যাচাই করে দেখেছে, যেখানে জড়িত ব্যক্তিদের একটি সাধারণ পরিচয় হলো- তারা হয় কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, নয়তো এর সমর্থক। যদিও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর নেতারা এসব হামলার দায় অস্বীকার করেছেন, তবে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে যে, মূলত তারাই ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে দাঙ্গা ও হামলার জন্য দায়ী।

২৪ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগাছা থানার ছিদামহাটে সংঘবদ্ধ মব তৈরি করে অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদের কর্মীদের ওপর একটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা যা প্রথম আলোসহ বেশ কিছু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে এসেছে। সেখানে বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় প্রায় ২০ জন আহত হন এবং দুই কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা প্রতিনিয়ত দেশে ঘটেই চলেছে।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিষয়ে যেসব কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালানোর সময় সেসব দেশে উগ্রবাদের উত্থান, জঙ্গিবাদের বিস্তার ইত্যাদি বিষয়গুলো পরিকল্পিতভাবে একযোগে প্রচার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায়, প্রথমেই টার্গেট করা হয় ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে। তখন আর বিবেচনা করা হয় না কে কট্টরপন্থী, কে মধ্যপন্থী, কে উদারপন্থী, কে সুফিবাদী বা কে রাজনৈতিক ইসলামি দল। ২০০৩ সালে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়, যার ফলে আট বছর ধরে চলা যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। সিরিয়ায় উগ্রবাদ দমনের নামে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ দেশটিকে গৃহযুদ্ধের মুখে ফেলে দেয়, পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং শরণার্থী সংকট তৈরি হয়। একইভাবে, গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া উগ্রবাদী ও মানব পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। সেখানে আজও গৃহযুদ্ধ চলছে। তালেবান দমনের নামে আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে সামরিক অভিযান চালানো হয়, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়। এমন আরো অনেক উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে।

অতএব, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধর্মীয় সংগঠনগুলোর বিরাট দায়বদ্ধতা রয়েছে। যদি কোথাও কোনো সন্ত্রাসী হামলা ঘটে বা ধর্মের নামে মব সৃষ্টি করা হয় এবং সেখানে যদি কোনো ধর্মীয় দলের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তবে দলের নেতাদের রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা না করে, বরং তাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি তারা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে তাদের কর্মকৌশল পুনর্র্নিধারণ না করেন, তবে ভবিষ্যতে তারা ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন।

[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ইমেইল: hezbuttawheed.official@gmail.com যোগাযোগ: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৭১১৫৭১৫৮১, ০১৭১১২৩০৯৭৫]

সার্চ করুন

যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক পেজের সাথে...