হেযবুত তওহীদ কি আলেমদের বিরুদ্ধে?

উত্তর দিয়েছেন:
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, এমাম, হেযবুত তওহীদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা সরসারি বিভিন্ন ব্যক্তি আমাদের প্রতি অভিযোগ করে থাকেন যে, আমরা আলেমদের বিরোধিতা করি অর্থাৎ আমরা নাকি আলেম বিদ্বেষী। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের বিরুদ্ধে ওয়াজে বলা হয়ে থাকে আমরা আলেমদের প্রতি বিদ্বেষ ছাড়াচ্ছি যার মাধ্যমে আমাদের অভিপ্রায় হলো, সাধারণ মানুষের আলেমদের প্রতি যে শ্রদ্ধা রয়েছে তাকে নিঃশেষ করে দেওয়া ও এর মাধ্যমে তাদের ইসলাম থেকে আলাদা করে দেয়া।

এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এ অভিযোগটি যারা করেন তারা আসলে আমাদের বক্তব্য না বুঝে করেন। আমরা আসলে আলেম বিদ্বেষী নই। আমরা জনসভা, সেমিনার ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, আলেম মূলত দুই প্রকার। এক, সত্যনিষ্ঠ আলেম ও দুই, ফেতনা সৃষ্টিকারী আলেম। নবী করিম (স.) এর দুইটি হাদিস পর্যবেক্ষণ করলেই আমরা এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারি। আল্লাহর রসুল কখনই সকল আলেমকে এক পাল্লায় মাপেন নি। একটি হাদিসে রসুল বলেছেন, “এমন এক সময় আসবে যখন আসমানের নিচের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব হবে তাদের আলেম সমাজ। তারা ফিতনা সৃষ্টি করবে ও সেই ফিতনা তাদের দিকেই ধাবিত হবে।” অপর এক হাদিসে আল্লাহর রসুল বলেছেন, ‘আলেমগণ নবীদের ওয়ারিশ। নবীগণ দিনার বা দিরহামের উত্তরাধিকারী বানান না। তাঁরা কেবল ইলমের ওয়ারিশ বানান। অতএব যে তা গ্রহণ করে সে পূর্ণ অংশই পায়’ (তিরমিযী: ২৬৮২)। তাই প্রকৃত আলেমগণ হয়ে থাকেন আল্লাহর রসুলের আসহাবদের মতো দুর্জয়, নির্লোভ, ইসলামের জন্য সর্বত্যাগী বিপ্লবী। সেই এলেমকে যারা ধারণ করেন তারাই হচ্ছেন আলেম। নবীদের অবর্তমানে তারাই সে জ্ঞান বিতরণ করেন।

লক্ষ্য করুন, দুইটি হাদিস থেকে দুই শ্রেণীর আলেমের রূপ পাওয়া যায়। প্রথমটি সেই সকল আলেম যারা ফিতনা অর্থাৎ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাদের জ্ঞান, তাদের এলেমকে তারা ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ রক্ষার অভিপ্রায়ে। তারা নিজেদের এই জ্ঞান দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, জঙ্গিবাদী কর্মকাÐ ঘটায়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, অপরাজনীতিতে সহায়তা করে, সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনকে ত্রাস করে তুলে। তাদের এই জ্ঞান মধু নয় – বিষ। আমরা এই সকল স্বার্থপর আলেমদের বিরুদ্ধে। আমরা এদের বিরুদ্ধে কথা বলি, এদের বিরুদ্ধাচরণ করি।
সকল আলেমকে এক পাল্লায় মাপলে চলবে না। ইমাম বুখারী (র.) এর হাদীস সংগ্রহের ব্যপারটিই চিন্তা করুন। তিনি সাড়ে ছয় লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করেন যার অধিকাংশই ছিল ভুয়া, অর্থাৎ জাল হাদীস। তিনি সেগুলো থেকে বাছাই করে সাড়ে ছয় হাজার সহিহ হাদীস লিপিবদ্ধ করেন। তাহলে যারা সেই সকল জাল হাদীস রচনা করলো তারা কী করে সত্যনিষ্ঠ আলেম হতে পারেন? আমরা কী করে তাদের অনুসরণ করতে পারি?
আমরা সেই সকল আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যারা সত্যনিষ্ঠ। যাদের জ্ঞান মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, যারা জ্ঞান বিতরনের জন্য কোন বিনিময় নেন না, নিজেদের জ্ঞানের অপব্যবহার করে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড ঘটান না তাঁরাই সত্যনিষ্ঠ আলেম। তাঁরা আল্লাহ থেকে আগত সত্যকে ধারণ করে ও সত্যকে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে সদা নির্ভীক থাকেন। রসুলে পাক (স.) এর কাছে যে জ্ঞান ছিল তা থেকে সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ করেছেন হযরত আলী (রা.)। আল্লাহর রসুলের একটি হাদিসই রয়েছে যেখানে তিনি বলছেন, “আমি জ্ঞানের শহর হলে আলী সেই শহরের দরজা।” সেই সুবাদে আলী (রা.) সত্যনিষ্ঠ আলেমদের শিরোমণি। তার জীবনযাপনের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করি তবে আমরা দেখতে পাবো তিনি কখনই তাঁর সেই জ্ঞান দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেনি। তিনি কখনই সে জ্ঞানের কোন বিনিময় নেন নি। একদিন রসুল তনয়া ও আলী (রা.) এর স্ত্রী মা ফাতিমা (রা.) একদিন তাঁকে বললেন ঘরের কাজে সহয়তা করার জন্য একজন লোক প্রয়োজন। আলী (রা.) তখন বললেন, তিনি গৃহকর্মী রাখতে সক্ষম নন। মা ফাতিমা নিজেই নিজের কাজ করতেন। যব থেকে আটা ভাঙানোর জন্য যাঁতা পিষতে পিষতে তাঁর হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল। আলী (রা.) রসুলের সাথে থেকে ও তাঁর ওফাতের পরও আল্লাহর রাস্তায় কঠোর সংগ্রাম করে গেছেন। যারা এই প্রকার নির্ভীক, অন্যায়ের কাছে মাথানত করেন না, সামান্য অর্থের বিনিময়ে দীনকে নিজের এলেমকে বিক্রি করেন না তাদের আমরা সালাম জানাই, শ্রদ্ধা করি।
আমাদের বিরুদ্ধে আলেমবিদ্বেষের যে অভিযোগ আনা হয় তার কারণ আমাদের সম্পর্কে জনগণকে ভুল বুঝানো হয়। এই ভুল বুঝানোর কাজটিই করে ধর্মব্যবসায়ী, ফিতনা সৃষ্টিকারী আলেম সমাজ- যাদেরকে আল্লাহর রসুল আসমানের নিচে সর্বনিকৃষ্ট জীব হিসেবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এবং যাদের আমরা বিরোধিতা করি। যারা ফিতনা সৃষ্টি করে, ধর্মব্যবসা করে, সমাজে দাঙ্গা-হাঙ্গামার বিস্তার ঘটায় তাদের বিরুদ্ধে কী আমাদের কথা বলা উচিত নয়? তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে নয়তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা হলো না। আপনারা জানেন আমরা হেযবুত তওহীদ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি তাই আমাদের তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেই হবে। আমাদের হেযবুত তওহীদের মধ্যেও আলেম রয়েছে। তারা সক্রিয়ভাবে আমাদের আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। তাহলে বোঝা যায় যে আমরা একতরফাভাবে সকল আলেমের বিরোধিতা কখনই করি নি।

আলেমদের ব্যাপারে আমাদের সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মনে করা হয় যারা মাদ্রাসা থেকে বের হচ্ছেন, যাদের নামের আগে আল্লামা, মাওলানা, মুফতি এই রকম পদবী লাগানো থাকে তারা হচ্ছেন প্রকৃত আলেম। কিন্তু এই ধারণা মোটেও ঠিক নয়। মুসা (আ.) একবার আল্লাহকে সাতটি প্রশ্ন করেছিলেন। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল- আল্লাহ! আপনার বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানী কে? আল্লাহ বললেন- যে জ্ঞানার্জনে কখনো তৃপ্ত হয় না এবং মানুষের অর্জিত জ্ঞানকেও যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞানের মধ্যে জমা করতে থাকে [হাদীসে কুদসী- আবু হরায়রা (রা.) থেকে বায়হাকী ও ইবনে আসাকির; আল্লামা মুহাম্মদ মাদানী (র.) এর হাদীসে কুদসী গ্রন্থের ৩৪৪ নং হাদীস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)। সুতরাং একজন আলেম দীনের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দুনিয়ার জ্ঞানও অর্জন করবেন। একজন আলেম হবেন নিরহংকারী, তিনি সদা জ্ঞানের জন্য তৃষ্ণার্ত থাকবেন। তিনি হবেন বিনয়ী, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা এধরণের আলেমদের মোটেও অসম্মান করতে পারি না। আমরা শুধু চাই যারা আলেম রয়েছেন তারা মো’মেন হন। আপনারা মো’মেন হলেই আমাদের সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ