সাম্যবাদীর হতাশা

মুস্তাফিজ শিহাব

ইসলাম একটি সার্বজনীন দীন বা জীবনব্যবস্থা। ইসলামে সকল প্রকার মানুষের সব বয়সের উপযোগী বিধানাবলি দেয়া হয়েছে। ইসলামে সাদা-কালো, আশরাফ-আতারাফ, ধনী-গরীব ইত্যাদির কোন ভেদাভেদ নেই। বর্তমান দুনিয়ায় সাম্য নিয়ে কথা বললেই সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের প্রসঙ্গটা আসে। কিন্তু কমিউনিজম যে সাম্যের কথা বলেছিল তার বহু আগেই আল্লাহর রসুল তার চেয়ে শান্তিদায়ক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন।

সমাজতান্ত্রিকরা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের সর্বস্ব পণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন কখনোই বাস্তব রূপ লাভ করে নি, যদিও তারা পৃথিবীর বিরাট অংশে সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের সেই আদর্শও এখন পচে গেছে। সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ধারক চীন ও রাশিয়াতেও এখন আর সমাজতন্ত্রের চিন্তাধারার প্রতিফলন দেখা যায় না। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার গোড়ার দিকে জীবনব্যবস্থা হিসাবে ইসলামের বিভিন্ন শিক্ষা ও দর্শনকে, বিধি-বিধানকে তার সঙ্গে অঙ্গীভ‍ূত করার চিন্তা লেনিন করেছিলেন কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত করা যায় নি।

ইসলাম যে সাম্যের কথা বলে সে শুধু তত্ত্বেও সীমাবদ্ধ নয়। তিনি হাবশী বেলালকে (রা.) আল্লাহর রসুল পবিত্র কাবার উপরে উঠিয়েছিলেন এটা প্রমাণের জন্য যে মানুষ সবার উর্ধ্বে। মানুষ মানুষের দাস হয় না, সকল মানুষ এক স্রষ্টার দাস। তিনি বলেছেন, তোমাদের নেতা যদি কোনো ক্ষুদ্রমস্তিষ্ক কান কাটা নিগ্রো ক্রীতদাসও হয় তবু তাকে মানবে। মিসরের রোমান গভর্নর মকোকাসের দরবারে যখন মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি হিসাবে নিগ্রো আবু উবায়দা ইবনে সামিত (রা.) গিয়ে দাঁড়ান তখন মকোকাস তাঁর সাথে কথাই বলতে চান নি। কিন্তু মুসলিমদের আমির হিসাবে তাঁর সঙ্গেই মকোকাসকে কথা বলতে হয়। এখানেই ইসলামের সাফল্য। মহানবী তাঁর অভিজাত কোরায়েশ বংশীয় চাচাতো বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তদাস যায়েদের (রা.) সাথে। ইসলাম বিকৃত হয়ে যাওয়ার অনেক পর পর্যন্ত ইসলামের এই সাম্যের শিক্ষা জাতির মধ্যে বিরাজিত ছিল।

‘Captain Mark Sykes এর Darul Islam’ নামক বইয়ে উল্লেখিত একটি ঘটনায় সেই সাম্যের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি। লেখক নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “জিজী কুর্দদের প্রতাপান্বিত সর্দার আগা ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে অভ্যর্থনা করার জন্য যে দরবার তাতে রইলেন আগা স্বয়ং, তাঁর সেনাপতি, একজন অন্ধ ভিক্ষুক, একটি খ্রিষ্টান দোকানদার, টেলিগ্রাফ অফিসের জনৈক কেরানি, দুইজন খানসামা, ইয়াকুব, আমি এবং একজন কসাই-যে চামড়া নিতে এসেছিল, আমরা সবাই একসঙ্গে বসে কফি খেলাম।” ইসলাম ছাড়া আর কোনো মতবাদ পেরেছে শাসক আর শাসিতের মধ্যে এই সাম্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে?

সেই সাম্যের ইসলামকে বিকৃত করে আজ ধর্মজীবীরা ব্যবসায়ের পণ্যে পরিণত করেছে। এই ইসলামকে একদল যেমন নিজেদের ব্যবসার পণ্য বানিয়েছে অপরদিকে আরেকদল স্বার্থপর গোষ্ঠি এই ইসলাম দিয়ে অপরাজনীতি করছে। কেউ বা একে সন্ত্রাসবাদের হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। সেইসব বিকৃতির বেড়াজাল ছিন্ন করে আমাদেরকে এখন ইসলামের প্রকৃত রূপটির সন্ধান করতে হবে, প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় আলোকিত হতে হবে। যারা কমিউনিজমকে আশ্রয় করে মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন তাদেরকে বলব, আপনার সংগ্রামকে ফলপ্রসূ করার পথ পাওয়া গেছে, সেই সঠিক আদর্শটি পাওয়া গেছে। মানুষের অশ্রুতে যদি আপনার হৃদয় সিক্ত হয়, ঘুঁনে ধরা সমাজকে যদি আপনি পুনর্নির্মাণ করতে চান, সর্বপ্রকার অবিচার, অত্যাচার ও শোষণের প্রতিবাদে যদি আপনার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে তাহলে চোখ মেলে দেখুন- সত্যের পথ দৃশ্যমান।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ