সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ যেমন হন

কামরুল আহমেদ

রসুলাল্লাহর প্রসিদ্ধ সাহাবী ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, “যে ব্যক্তি অধিক হাদিস জানে সে ব্যক্তি আলেম নয়। বরং যার মধ্যে তাকওয়া অধিক সে ব্যক্তিই আলেম।” (বর্ণনা ইবনে কাসীর)
এই তাকওয়ার বাস্তব রূপ হচ্ছে রসুলাল্লাহ ও তাঁর আসহাবদের পবিত্র জীবনী। আমাদেরকে তাই ধর্মব্যবসায়ী আলেম ও সত্যনিষ্ঠ আলেমদের মধ্যে তফাৎ করা জানতে হবে, নয়তো পথভ্রষ্ট আলেমের অনুসরণ দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই হারাতে হবে।

১) প্রকৃত যারা আলেম তারা কখনও অহঙ্কারী হবেন না, কারণ অহঙ্কার কেবলমাত্র আল্লাহরই সাজে। প্রকৃত আলেমরা তাদের সঞ্চিত জ্ঞানকে খুবই সামান্য মনে করবেন এবং সর্বদা অতৃপ্ত থাকবেন। তারা নিজেদেরকে কখনওই আলেম বলে মনে করবেন না, দাবি করা, প্রচার করা বা আলেম খেতাব ধারণ করা তো দূরের কথা।
২) তারা আল্লাহর দীন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করবেন না। এই জ্ঞান অন্যকে দেওয়া তারা নিজেদের ঈমানী দায়িত্ব বলে মনে করবেন।
আলী (রা.) কে রসুলাল্লাহ ‘জ্ঞান-নগরীর দ্বার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি কি আজকের আলেমদের মতো তাঁর জ্ঞান বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন? জীবিকা অর্জনের জন্য তিনি কুলির কাজ করতেন এবং যাঁতার চাক্কি পিষে যবের আটা প্রস্তুত করতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী জান্নাতের রানী মা ফাতেমার (রা.) পবিত্র হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল। এই জ্ঞানের দুয়ার আলীকেই (রা.) আমরা দেখি সিংহের বিক্রমে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। তার অনন্য সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য রসুলাল্লাহ তাঁকে আরেকটি উপাধি দিয়েছিলেন- সেটা হলো আসাদুল্লাহ বা আল্লাহর সিংহ। সুতরাং যিনি দীনের যত বড় আলেম হবেন তিনি তত বড় যোদ্ধা হবেন অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী হবেন।
৩) দীনের জ্ঞান যিনি যত বেশি অর্জন করবেন, তিনি তত বড় দানশীল হবেন। যেমন আম্মা খাদিজা (রা.), আবু বকর (রা.)। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁরা প্রত্যেকেই ঐ সমাজের প্রতিষ্ঠিত ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে করতে তারা এমন দরিদ্র হয়ে পড়েছিলেন যে, আবু বকরের (রা.) পরিবারের তিনবেলা ঠিকমত খাদ্যও জুটতো না। আর আম্মা খাদিজার (রা.) সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা বলে থাকেন যে, শি’আবে আবু তালেবে তিন বছর নির্মম অনাহারের ফলে তিনি মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত হন এবং এটাই তাঁর মৃত্যুর কারণ।
৪) প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানীরা হবেন লোহার মতো ঐক্যবদ্ধ। কোনো দুনিয়ার সম্পদের লোভ লালসা (তুচ্ছ মূল্য – সামানান কালীলা) তাদের ঐক্যে ভাঙ্গন ধরাতে পারবে না। কারণ তারা জানেন ঐক্য নষ্ট করা কুফর। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাবেন না, গীবত করবেন না। কারও কোনো ভুল থাকলে তারা সেটা তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলবেন। পক্ষান্তরে আজকের সমাজে যারা আলেম বলে পরিচিত তাদের বিষয়ে একটি কথা বলা হয় যে, দু’জন আলেম এক জায়গায় বসতে পারেন না। জাতির কোনো একটি সংকটেও তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না। তারা নিজ জাতিরই ভিন্ন মতাবলম্বী আলেমদেরকে প্রতিপক্ষ হিসাবে সাব্যস্ত করে, তাদের বিরুদ্ধে বাহাস করে, তাদেরকে ‘দাঁতভাঙ্গা জবাব’ দিয়ে কুপোকাত করতে ব্যস্ত। দুনিয়ার সম্পদের দেনা-পাওনা, রাজনৈতিক স্বার্থ ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় তাদের মধ্যে অনতিক্রম্য দেওয়াল তৈরি করে রেখেছেন। তাদেরকে কেন্দ্র করে সাধারণ জনগণও হাজার হাজার তাবুতে বিভক্ত।
৫) প্রকৃত আলেমরা হবেন সুশৃঙ্খল। আল্লাহর রসুলের হুকুমের শিকলে তারা নিজেদেরকে বন্দী রাখবেন। তাদের জাতি হবে একটি, তাদের এমাম হবেন একজন, দীন (জীবনব্যবস্থা) হবে একটি। তাদের সকলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও হবে অভিন্ন; সেটা হচ্ছে- সংগ্রামের মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করা। তারা কোনোভাবেই জাতির এমামের বা নিজ আমিরের হুকুম অমান্য করবে না, হুকুম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সেটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন যেমনটা রসুলাল্লাহর সাহাবিরা করতেন। তাদের স্ত্রী, পুত্র, সহায় সম্পদ বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-খামার ইত্যাদি বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য দুনিয়ার বুকে বেড়িয়ে পড়বেন, পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখবেন না। কিভাবে জীবনটা আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করা যায়, শহীদ হওয়া যায় এটাই হবে তাদের জীবনের একমাত্র বাসনা (Utter Desire for death). যেমন রসুলাল্লাহর কাছ থেকে ইসলামের এলেম হাসিল করেছিলেন খালেদ (রা.)। যিনি জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আল্লাহর রাস্তায় এমনভাবে বহির্গত হয়েছিলেন যেন এক প্রচণ্ড সাইমুম। ইসলামের শত্রুদের উপর আঘাত হানার জন্য তিনি যে তলোয়ার কোষমুক্ত করেছিলেন তা কখনও কোষবদ্ধ করেন নি। লাখ লাখ সুশিক্ষিত সৈন্যের রোমান পারস্য বাহিনী কখনও তাঁকে এতটুকুও বিচলিত করতে পারে নি। আজকের ইসলামের যিনি যত বড় দরবেশ তিনি তত বড় ভীরু, কাপুরুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া তো দূরের কথা সামান্য একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেও তারা সাহস পান না, পাছে মসজিদ মাদ্রাসার চাকরিটা চলে যায়। যে রসুল সারাটি নব্যুয়তি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে গেছে, তেমন ঝুঁকি থেকে সারাটা জিন্দেগি নিরাপদে গা বাঁচিয়ে হুজরা খানকায় বসে অন্যের সম্পত্তি ভোগ করে চলেছেন তারা কী করে নিজেদেরকে নায়েবে নবী, ওরাসাতুল আম্বিয়া বলে দাবি করেন ভাবতে অবাক লাগে।
৬) প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানীরা যাবতীয় অন্যায় থেকে, গায়রুল্লাহর বিধান মেনে শেরক ও কুফর করা থেকে এমনভাবে হেজরত করবেন, এমন ঘৃণাভরে সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করবেন যে, প্রয়োজনে তার জীবন যাবে, না খেয়ে থাকবে, অবর্ণনীয় দারিদ্র্যে পতিত হবে তবুও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবে না।
যারা মহানবীর (সা.) কাছ থেকে ইসলামের জ্ঞান লাভ করে ইসলামের ‘আলেম’ হয়েছিলেন তাঁদের চরিত্র এইসব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ ও মহীয়ান ছিল। অথচ দুঃখের বিষয় হলো আজ আলেম বলতে আমাদের সামনে সেই আসহাবদের জীবন ও চরিত্র ভেসে ওঠে না, ভেসে ওঠে এমন একটি শ্রেণির অবয়ব যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা না করে ইসলামকে বিক্রি করেই জীবন কাটিয়ে দিবেন বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আমরা চাই এ জাতির সত্যনিষ্ঠ আলেমদের কালঘুম ভাঙুক। যাদের উপর অন্যকে জাগানোর দায়িত্ব তারাই যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক কী হতে পারে! আল্লাহর রসুল বলেছেন, ‘আলেমগণ নবীদের ওয়ারিশ। নবীগণ দিনার বা দিরহামের উত্তরাধিকারী বানান না। তাঁরা কেবল ইলমের ওয়ারিশ বানান। অতএব যে তা গ্রহণ করে সে পূর্ণ অংশই পায়’। (হাদিস: তিরমিযী: ২৬৮২) তাই প্রকৃত আলেমগণ তারা দিনার-দিরহামের বিনিময়ে দীন বিক্রি করতে পারেন না। তারা হয়ে থাকেন আল্লাহর রসুলের আসহাবদের মতো দুর্জয়, নির্লোভ, ইসলামের জন্য সর্বত্যাগী বিপ্লবী। সেই সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সম্মান করা আমাদের কর্তব্য। তাদের মধ্যে যারা নানাবিধ কারণে এখনও ধর্মব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন কিন্তু তাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি অনুগত, যারা মুসলিম উম্মাহর করুণ দুর্দশা দেখে ব্যথিত, তাদের প্রতি কথা হচ্ছে:
আজ এই হতভাগ্য জাতিসহ সমস্ত মানবজাতি শেরক ও কুফরে ডুবে আছে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বাদ দিয়ে পাশ্চাত্য বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ অর্থাৎ দাজ্জালের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছে। অথচ আল্লাহ এই উম্মাহকে শ্রেষ্ঠতম উম্মাহ বলেছেন (সুরা ইমরান ১১০)। আমাদের আলেম সাহেবরা সামান্য কিছু অর্থের প্রত্যাশায় অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে ছোট হয়ে থাকুক এটা আমরা চাই না। এই হতভাগ্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের। দুর্নীতিবাজ সমাজপতি আর রাজনৈতিক ধান্ধাবাজেরা মনে করে অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে দিয়ে পছন্দমত ফতোয়া দেওয়ানো যায়। বস্তুত পরমুখাপেক্ষী যারা হয় তাদের আর মেরুদণ্ড বলতে কিছু থাকে না; সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা বেশিদূর এগুতে পারে না; বড় কোনো কোরবানি করার আত্মিক শক্তি তারা হারিয়ে ফেলে। তাই আমাদের কাম্য হচ্ছে, সত্যনিষ্ঠ আলেম সাহেবরা এ জাতির কল্যাণে, মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণার্থে ধর্মব্যবসা পরিত্যাগ করে ক্ষুদ্রস্বার্থ ভুলে, মতবিরোধ ত্যাগ করে তওহীদের উপরে ঐক্যবদ্ধ হোন, সত্য প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করুন। এ কাজ করতে গিয়ে তাদেরকে হয়তো কিছু অর্থকষ্ট সহ্য করতে হতে পারে, তবু ভয় না করে, আল্লাহর উপরে তাওয়াক্কাল রেখে হারাম উপার্জন বন্ধ করা তাদের অবশ্য কর্তব্য। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে উত্তম রেযেকের বন্দোবস্ত করে দেবেন এবং তাদের দুনিয়া ও আখেরাতকে সুন্দর করে দেবেন। তারা এক গৌরবময় জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাবেন।
সারা দুনিয়ায় মুসলিম জাতি আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে। বিভিন্ন কুসংস্কারে তারা নিমজ্জিত। অশিক্ষা-কুশিক্ষা তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। এ জাতিটি সংখ্যায় ১৫০ কোটি হওয়া সত্ত্বেও, বিশ্বের বিরাট ধন সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পাশ্চাত্য জাতিগুলোর দ্বারা লাঞ্ছিত, অপমানিত, নির্যাতিত হচ্ছে। তারা জাতীয় জীবনে আল্লাহ এবং রসুলের হুকুম বাদ দিয়ে পশ্চিমা সভ্যতা তথা দাজ্জালের হুকুম মেনে নিয়ে জাতিগতভাবে শেরক ও কুফরে নিমজ্জিত হয়ে আছে। এতে করে একদিকে তারা যেমন ইসলাম থেকে বহির্গত হয়ে গেছে, অপরদিকে অন্য সকল জাতির ঘৃণার পাত্রেও পরিণত হয়েছে। তারা যে পরকালের জাহান্নামের দিকে ধাবিত হচ্ছে তাও অতি পরিষ্কার। জাতির নেতারা সাধারণ শ্রেণির মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে তাদেরকে দাবিয়ে রেখে আল্লাহ রসুলের হুকুম পরিপন্থী কাজ করে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জাতির মধ্যে যারা সত্যনিষ্ঠ আলেম রয়েছেন তাদের জাতিরক্ষায় এগিয়ে আসা খুবই দরকার।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ