শোনা কথায় বিশ্বাস মুসলমানের কাজ নয়

মো. মোস্তাফিজুর রহমান শিহাব:
আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেছেন, “যদি আসমান ও জমিনের মাঝে তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ থাকতো তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত (সুরা আম্বিয়া ২২)।” কোর’আনে এরকম বহু আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ তাঁর একত্বের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে মানুষকে ঈমান আনতে আহ্বান করেছেন। না বুঝে ঈমান আনতে তিনি কখনও বলেন নি। বহু জায়গায় চিন্তা করার জন্য বলেছেন, “তোমরা কি চিন্তা করবে না?” (সুরা নাহল ১৫-১৭) অতএব মুসলমান জাতিকেও এখন যুক্তিশীল, চিন্তাশীল হতে হবে।
জনগণকে এখন নিজের মগজ খাটাতে হবে, অন্যের মগজ ব্যবহার করলে চলবে না। মুসলমান জাতি কখনই গুজব নির্ভর ছিল না। আল্লাহর রাসুল কখনই গুজব বা হুজুগকে প্রাধান্য দেন নি। ইতিহাসের ছোট্ট একটি ঘটনার মাধ্যমে তা বোঝা যায়, “আল্লাহর রাসুলের ছেলে ইব্রাহিম যেদিন ইন্তেকাল করলেন সেদিন সূর্য গ্রহণ হলো। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, তিনি মনে হয় সত্য নবী, কারণ তাঁর ছেলে মৃত্যু বরণ করেছে বলেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। চলো সবাই তাঁর কাছে ঈমান আনি।” রাসুলাল্লাহ এসব আলোচনা শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন এবং বললেন, “আমি শুনতে পেলাম তোমরা বলাবলি করছো আমার ছেলে ইন্তেকাল করেছে বলে সূর্য গ্রহণ হয়েছে। এটা ভুল! আমার ছেলের হায়াত শেষ তাই সে ইন্তেকাল করেছে। এর সাথে সূর্যগ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই। সূর্যগ্রহণ প্রাকৃতিক নিয়মের অংশ।” ইচ্ছা করলে তিনি চুপও থাকতে পারতেন। কারণ এতে করে অনেক লোক তাঁর উপর ঈমান আনতো। কিন্তু তিনি তা করলেন না, তিনি সকল গুজব, হুজুগের ডালপালাকে কেটে শিকড়সহ উপড়ে ফেলে দিলেন। কিন্তু আজ তাঁর অনুসারী দাবিদার জনগোষ্ঠীটি অনেকটাই গুজব নির্ভর হয়ে পড়েছে।
তারা চিন্তাভাবনা ছাড়াই ফেসবুকের মত অনির্ভরযোগ্য মাধ্যমের প্রচারণাকেই বিশ্বাস করে। এখানে প্রচুর ফেইক আইডি আছে যার মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। অথচ আমরা দেখি ফেসবুকে প্রচারিত একটি বানোয়াট ছবিকে ভিত্তি করে হাজার হাজার মুসল্লি ফেতনাবাজ আলেম মওলানাদের প্ররোচনায় কোনো একটি সম্প্রদায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, মানুষ হত্যা করছে, কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করে দিচ্ছে, অন্য ধর্মের উপাসনালয় গুড়িয়ে দিচ্ছে। এতে কি ইসলামের উপকার হচ্ছে? না! বরং ক্ষতি হচ্ছে। প্রকৃত মুসলমান কখনই হুজুগ আর গুজবের উপর ভিত্তি করে কাজ করে না। তারা কাজ করে সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিতভাবে। তারা জেনে বুঝে কাজ করে। কোর’আন, হাদিসে কী নির্দেশ দেয়া আছে, তাদের এমাম কী নির্দেশ দিয়েছেন সেই মোতাবেক কাজ করে। কিন্তু এটা কিভাবে হলো যে একটা ইস্যু তৈরি করে দেওয়া হলো, আর লক্ষ লক্ষ মুসলমান হৈ হৈ রৈ রৈ করে সেদিকে ছুটতে লাগল? যখন কোন ইস্যু সৃষ্টি হয় তখন সরকারের ঘুম হারাম হয়ে যায়। বায়তুল মোকাররমের সামনে হাজার হাজার পুলিশ, র‌্যাব রাইফেল হাতে পাহারা দেয় কারণ নামাজের পর বিক্ষোভ হবে। যে নামাজ মানুষকে ঐক্যের শিক্ষা দেয়, ইমামের তাকবীরের সাথে সাথে আনুগত্য করতে শেখায় সে নামাজ শেষ করে মানুষগুলো অনৈক্য সৃষ্টির জন্য উন্মাদের মতো কোনো রকম চিন্তাভাবনা ব্যতীত অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন মুসলিম জাতি এমন হয়ে গেল?
মুসলিমদের এখন সুপরিকল্পিতভাবে, সুচিন্তিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই ইসলামের উপকার হবে। এখন তাদের কাজের ফলে ইসলামের বদনাম হচ্ছে। এই সাধারণ জ্ঞান বিবর্জিত আচরণ পরিহার করলে মানুষ আবার এই দীনের সৌন্দর্য দেখে আকৃষ্ট হবে। মুসলমানদের মনে রাখতে হবে, চিন্তাভাবনাহীন প্রতিটা কাজের জন্য, প্রতিটা কথার জন্য হাশরের দিন আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ