রসুলাল্লাহ (সা.) জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তওহীদের ভিত্তিতে

মোহাম্মদ আসাদ আলী

এটা ইতিহাস যে, নবুয়্যত লাভের পর আল্লাহর রসুল সর্বপ্রথম যেই কাজটি আরম্ভ করেছিলেন তা হচ্ছে – তওহীদের উপর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং এই কাজটিই তিনি মক্কার তেরোটি বছর ধরে চালিয়ে গেছেন, অন্য কোনোদিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও করেননি। সমস্ত আরবে তখন যুদ্ধের মহামারী। তিনি জনগণের তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে যুদ্ধ-রক্তপাতের ক্ষতিকর দিক বোঝাতে পারতেন। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিতে পারতেন। চোর, ডাকাত, মদখোর, সুদখোরদের ওয়াজ নসিহত করে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা করতে পারতেন। অশ্লীলতায় ছেয়ে যাওয়া সমাজকে পরিশুদ্ধ করতে প্রচার-প্রচারণা, ক্যাম্পেইন চালাতে পারতেন। নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য নারী সহায়তা কেন্দ্র খুলতে পারতেন। এতিম শিশুদের নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে এতিমখানা তৈরি করতে পারতেন। যুদ্ধ-সংঘাতে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর জন্য আশ্রয়শিবির স্থাপন করতে পারতেন। মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে সৎ জীবনযাপনের উপদেশ দেওয়ার জন্য তাবলিগ দল গঠন করতে পারতেন। অশিক্ষা-কুশিক্ষার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারতেন। কিন্তু ইতিহাস বলে তিনি এসবের কিছুই করলেন না, (অর্থাৎ এগুলো শান্তি প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ নয় তা নিশ্চিত হয়ে গেল) তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে কেবল একটি কথার দিকে মানুষকে ডাকতে লাগলেন- হে মানুষ! বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই এবং মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসুল। এই ছোট একটি বাক্যই হচ্ছে এই দীনুল হকের ভিত্তি, এই মূলমন্ত্রের উপরই গড়ে উঠবে ইসলামের সভ্যতা।

এই যে আল্লাহর রসুল অন্য কোনোদিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধু তওহীদের প্রচারকার্যে ব্রতী হলেন, এর কারণ কী?

প্রথমত, গুরুত্বের অগ্রাধিকার। যেই সমাজে তওহীদ নেই, আল্লাহর হুকুম চলে না, সেই সমাজে সবার আগে তওহীদ প্রতিষ্ঠাই মুখ্য কর্তব্য। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রসুল জানতেন যদি আরবরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তওহীদের স্বীকৃতিপূর্বক ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তাহলে আল্লাহর দেওয়া সত্যদীন কায়েম হবে, ফলে মানুষকে ওয়াজ-নসিহত করে অন্যায়-অপকর্ম থেকে ফেরানোর প্রয়োজন পড়বে না। আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সমস্ত সমাজ নিজ থেকেই পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে। তখন আর একজন একজন করে মানুষকে ধরে ধরে বোঝাতে হবে না মদ খেও না, সুদ খেও না, অশ্লীলকার্য করো না, রক্তপাত করো না ইত্যাদি। মানুষ চাইলেও আর ওই পথে পা বাড়াতে পারবে না, কারণ সেই অন্যায়-অপকর্মের পথটিই রুদ্ধ হয়ে যাবে। তৃতীয়ত, হাজারো দল-উপদল-গোত্র-মতবাদে বিভক্ত মানুষগুলোকে একটি নূন্যতম শর্তের উপরে ঐক্যবদ্ধ করা, যেটার মধ্যে সবাই আসতে পারে। এই নূন্যতম শর্তটিই হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। জান্নাতে যাবার জন্য এর চাইতে নূন্যতম কোনো শর্ত আর নেই, কাজেই তওহীদের ভিত্তিতেই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা শুরু করলেন আল্লাহর রসুল।

আল্লাহর রসুল দেখলেন সমাজে যতরকম অন্যায়, অপকর্ম চলছে তার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে জাতির পরিচালকরা, হর্তাকর্তা ও ধর্মব্যবসায়ী পুরোহিতরা। তারাই এসবের বেনিফিশিয়ারী। তাদের স্বার্থ মোতাবেক তারা হুকুম দিয়ে সমাজ পরিচালনা করে, আর সেই স্বার্থের খেসারত দেয় হাজার হাজার মানুষ নির্যাতিত হয়ে, নিপীড়িত ও শোষিত বঞ্চিত হয়ে। এই অনাচারের যবনিকাপাত টানতে হলে সমাজের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- ‘আমরা হুকুম মানবো একমাত্র আল্লাহর’। অমুক পুরোহিত কী হুকুম দিলেন, অমুক গোত্রপতি কী হুকুম দিলেন, অমুক রাজা-বাদশা কী হুকুম দিলেন ইত্যাদি আমরা দেখব না, আমরা শুধু দেখব আল্লাহ কী হুকুম দিলেন। আল্লাহ হচ্ছেন যাবতীয় ন্যায় ও সত্যের উৎস, কাজেই সকল প্রকার ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, সব মানুষের মঙ্গল সাধনার্থে, নির্ভুল হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই আছে। আমরা কোনো মানুষের গোলামী করব না, ধনী-গরীব, সাদা-কালো, রাজা-প্রজা সকলেই আল্লাহর গোলাম, আমরা সবাই গোলামী করব একমাত্র আল্লাহর।

এই সিদ্ধান্ত যদি জনগণ নেয় তাহলেই তাদের মুক্তি, হাজারো রোগ-ব্যাধিতে জর্জরিত মৃত্যুপথযাত্রী এই জাতির এটাই একমাত্র ওষুধ যা তাদের দেহে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। কাজেই আল্লাহর রসুল নবুয়্যত লাভের মুহূর্তটি থেকে মদীনায় হিজরত পর্যন্ত ১৩টি বছর নিবিষ্টচিত্তে কেবল তওহীদের দিকেই মানুষকে ডেকে গেছেন। একটি সময় এল, যখন মদীনার মানুষ তওহীদের স্বীকৃতি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হলো, আল্লাহর রসুল তাদেরকে নিয়ে গড়ে তুললেন ছোট্ট একটি অখ- জাতি। ওই ঐক্যবদ্ধ জাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বিচারিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক জীবনে যখন যেই বিধানের প্রয়োজন হলো আল্লাহ পবিত্র কোর’আনের মাধ্যমে তা পাঠাতে থাকলেন। ইতিহাস স্বাক্ষী, তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবার অনতিবিলম্বেই জাতি উন্নতি ও প্রগতির কোথায় গিয়ে দাঁড়াল তা আজকের দুনিয়াতে কল্পনাও করা যায় না। পরবর্তী দশ বছর আল্লাহর রসুল অক্লান্ত সংগ্রামের মাধ্যমে বাকি আরব উপদ্বীপকেও ওই শান্তি ও নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে এনে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আরবে কী পরিবর্তন এসেছিল তার কয়েকটি নমুনা দিচ্ছি।

অনৈক্য-হানাহানিতে লিপ্ত দাঙ্গাবাজ আরবদেরকে ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করেছিল তওহীদ। বংশানুক্রমিক শত্রুতা আর রক্তপাতে নিমজ্জিত আরব জাতিকে একে অপরের ভাই বানিয়ে দিয়েছিল। আরব-অনারব, আশরাফ-আতরাফ, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-নিরক্ষরের আকাশ-পাতাল মর্যাদার ব্যবধান দূর করেছিল। মর্যাদার একমাত্র মানদ- নির্ধারিত হয়েছিল “তাকওয়া” অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় বেছে সাবধানে জীবন যাপন করা। যিনি যত ন্যায়ের পক্ষাবলম্বনকারী তিনি ছিলেন তত মর্যাদাবান। যে সমাজে দাসদেরকে মানুষ মনে করা হত না, তওহীদ প্রতিষ্ঠার পর সেই সমাজের ক্রীতদাস বেলালকে (রা.) ক্বাবার ঊর্ধ্বে উঠিয়ে (মক্কা বিজয়ের পর) আল্লাহর রসুল বুঝিয়ে দিয়েছিলেন- সবার ঊর্ধ্বে মানুষ, সবার উপরে মানবতার স্থান। আল্লাহর কাছে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষের মূল্য তাঁর ক্বাবার চেয়েও অধিক। কৃতদাস যায়েদ ও তার পুত্র উসামাকে সেনাপ্রধান বানিয়ে রসুল প্রমাণ করলেন- যোগ্যতা ও তাকওয়ায় যে শ্রেষ্ঠ সেই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। বংশ-আভিজাত্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নয়। এই সাম্যবাদী আদর্শ লাখ লাখ বেলাল, যায়েদদের অন্তরে মুক্তির তুফান সৃষ্টি করেছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সাম্প্রদায়িক ও গোত্রগত বিভাজন আরব সমাজের পশ্চাদপদতার অন্যতম কারণ ছিল। তওহীদ এই বিভাজন দূর করে সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-বংশের মানুষকে এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কে কোন ধর্মের, কে কোন বর্ণের, কে কোন গোত্রের- তা বিবেচ্য বিষয় ছিল না, যারাই ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারাই হয়ে গেছে একে অপরের ভাই ভাই। নির্যাতিত-নিপীড়িত, শোষিত মানুষ, যারা বেঁচে থাকত গোত্রপতি, সমাজপতি ও যাজক-পুরোহিতদের কৃপাগুণে, যাদের কোনো অধিকার ছিল না, সম্মান ছিল না, যাদের মাথাকাটা যাবার জন্য সমাজপতিদের একটি সিদ্ধান্তই যথেষ্ট ছিল, তওহীদ তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিল। ওই দাসশ্রেণির মানুষই এক সময় তাদের ‘আমিরুল মু’মিনিনের’ গায়ের জামা কীভাবে বানানো হলো তার কৈফিয়ত জানতে চেয়েছে, জনসম্মুখে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে অর্ধ-পৃথিবীর শাসককে। শুধু ওই সময়ের পৃথিবীতেই নয়, এমন দৃষ্টান্ত আজকের যুগেও কেউ স্থাপন করতে পারে না। তওহীদ ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিয়েছে, বাস্তুহারাকে বাস্তু দিয়েছে। কে কোথায় কী সমস্যায় পড়ে আছে তার সমাধান করার জন্য রাতের আঁধারে রাস্তাঘাটে, অলি-গলিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন তওহীদের ঝাণ্ডাবাহী মো’মেনদের খলিফা, অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা। তওহীদে ঐক্যবদ্ধ হবার ফলে এমন স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা একটি খেজুরপাতার ছাউনি দেয়া মসজিদে বসে রাজ্য শাসন করতেন। যার আবার একটির বেশি জামা ছিল না। যে ব্যক্তি তটস্থ থাকতেন তার শাসনের অধীনে কেউ কোথাও কষ্ট পাচ্ছে কিনা, একটি কুকুরও না খেয়ে থাকছে কিনা সেই দুশ্চিন্তায়। ঘুম এলে গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়তেন। যার যখন ইচ্ছা খলিফার সাথে দেখা করত, সমস্যা বলত, সমাধান হয়ে যেত।

মূল কথা হচ্ছে তওহীদ মানুষের বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান করতে পেরেছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, তওহীদের ওই ঐক্যবদ্ধনী থেকে বহু শতাব্দী পূর্বেই আমরা বিচ্যুত হয়ে গেছি। পৃথিবীময় মুসলিম বলে পরিচিত আজকের ১৬০ কোটির জনসংখ্যাটি তওহীদের মহাসড়ক থেকে বহু আগেই বিচ্যুত হয়ে মিথ্যার অন্ধকার অলি-গলিতে ঢুকে পড়েছে, শয়তান বহু শতাব্দী আগেই আমাদেরকে সেরাতুল মোস্তাকীম ভুলিয়ে দিয়ে ডাইনে-বাঁয়ে ছিটকে দিয়েছে। কিন্তু সেরাতুল মোস্তাকীম হারিয়ে বিভিন্ন ফেরকা, মাহজাব, তরিকা ইত্যাদির কানাগলিতে ঢুকে পড়েও এই জাতির প্রত্যেকেই ভাবছে একমাত্র তারাই সঠিক পথে আছে, অন্যরা পথভ্রষ্ট। আজ একজন ইহুদিকে মুসলিম বানানো বা মুসলিমকে খৃষ্টান বানানো যতটা কষ্টসাধ্য, একজন শিয়াকে সুন্নি বানানো, সুন্নিকে শিয়া বানানো তার চেয়েও বেশি কষ্টসাধ্য। সুতরাং ইসলামের নামে তৈরি হওয়া সমস্ত ফেরকা-মাজহাব-তরিকার মানুষ কোনো একদিন নির্দিষ্ট কোনো ফেরকায় প্রবেশ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে, সবাই সুন্নি হয়ে যাবে অথবা সবাই শিয়া হয়ে যাবে, সবাই হানাফি হয়ে যাবে বা সবাই হাম্বলি হয়ে যাবে, সবাই এক পীরের মুরিদ হয়ে যাবে বা সবাই এক দলের অনুসারী হয়ে যাবে- এমন আশার পালে কস্মিনকালেও যে হাওয়া লাগবে না তাতে সন্দেহ নেই। যেটা সম্ভব হতে পারে তা হচ্ছে- একটি সাধারণ বক্তব্যের ভিত্তিতে সবাইকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসা, কারো ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ব্যক্তিগত আচার-প্রথা, ব্যক্তিগত মতবাদের দিকে না তাকিয়ে জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবে সবাইকে একটি কথার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা। আর তেমন সর্বজনগ্রাহ্য ঐক্যসূত্র একটিই আছে, সেটা এই দ্বীনের মূলমন্ত্র, ভিত্তি- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আমরা আল্লাহর হুকুম ছাড়া অন্য কারো হুকুম মানি না। এই ঐক্যসূত্র দিয়ে আল্লাহর রসুল আরবের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মানুষগুলোকে যখন শত্রুতা ভুলিয়ে একে অপরের ভাই বানাতে পেরেছিলেন তখন আমরাও এই আশায় বুক বাঁধতে পারি যে, বর্তমানের অনৈক্য-সংঘাতে জর্জরিত মানুষগুলোও তওহীদের এই বৈপ্লবিক ঘোষণার মধ্য দিয়েই হারিয়ে ফেলা সেরাতুল মোস্তাকীমে ফিরে আসতে সক্ষম হবে ইনশা’আল্লাহ। সেই লক্ষ্যেই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ