যে প্রার্থনা স্রষ্টা কবুল করেন না

Untitled-17-279x300

রাকীব আল হাসান:

বর্তমানে ধার্মিক ব্যক্তিদের একটি বিশেষ কাজ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করা, দোয়া করা। এক শ্রেণির ধর্মীয় নেতারা, আলেম, মাশায়েখ, পুরোহিতরা এই দোয়া চাওয়াকে বর্তমানে একটি আর্টে, শিল্পে পরিণত করে ফেলেছেন। লম্বা ফর্দ ধরে লম্বা সময় নিয়ে স্রষ্টার কাছে এরা দোয়া করতে থাকেন। যেন এদের দোয়া মোতাবেক কাজ করার জন্য স্রষ্টা অপেক্ষা করে বসে আছেন। ইসলাম ধর্মের আলেম সাহেবরা মাঝে মাঝে বিশেষ প্রার্থনা বা মোনাজাতেরও ডাক দেন এবং তাতে এত লম্বা সময় ধরে মোনাজাত করা হয় যে হাত তুলে রাখতে রাখতে মানুষের হাত ব্যথা হয়ে যায়। অজ্ঞানতা ও বিকৃত আকিদার কারণে সকল ধর্মের অনুসারীরাই ভুলে গেছেন যে কোনো জিনিসের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা না করে শুধু তাঁর কাছে চাইলেই তিনি তা দেন না, ওরকম প্রার্থনা তাঁর কাছে পৌঁছে না। আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ নবীকে (সা.), যাঁকে তিনি প্রিয়তম বন্ধু বলে ডেকেছেন তাঁকে যে কাজের ভার দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন সে কাজ সম্পন্ন করতে তাঁকে কী অপরিসীম পরিশ্রম করতে হয়েছে, কত অপমান-বিদ্রƒপ-নির্যাতন-পীড়ন সহ্য করতে হয়েছে- যুদ্ধ করতে হয়েছে- আহত হতে হয়েছে। তিনি ওসব না করে বসে বসে আমাদের ধর্মীয় নেতাদের মতো আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই তো পারতেন। আল্লাহর কাছে বিশ্বনবীর (সা.) দোয়াই বড়, না আমাদের আলেম মাশায়েখ, পুরোহিতদের দোয়া বড়? শুধুমাত্র দোয়াতেই যদি কাজ হতো তবে আল্লাহর কাছে যার দোয়ার চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর কারো দোয়া নেই- সেই রসুল (সা.) ঐ অক্লান্ত প্রচেষ্টা (জেহাদ) না করে সারাজীবন ধরে শুধু দোয়াই করে গেলেন না কেন? তিনি তা করেন নি, কারণ তিনি জানতেন যে প্রচেষ্টা (সর্বাত্মক সংগ্রাম) ছাড়া দোয়ার কোন দাম আল্লাহর কাছে নেই। তাঁর আগেও বহু নবী রসুল গত হয়েছেন যাঁদের সকলকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সঙ্কটের প্রবলতায় কম্পমান হতে হয়েছে। মুসাকে (আ.) আমালেকা, মাদায়েন প্রভৃতি জনপদবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে, ঈসাকে (আ.) সম্মুখীন হতে হয়েছে ধর্মব্যবসায়ী ও শাসকশ্রেণির নির্যাতনের। কৃষ্ণ (আ.) কে যুদ্ধ করতে হয়েছে আপন মামার বিরুদ্ধে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের (আ.) পক্ষের প্রায় সকল সৈন্যের বিনাশ ঘটেছিল। পঞ্চপাণ্ডব ও কৃষ্ণ (আ.) জীবন বাজি রেখে এই যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত অধর্মকে বিনাশ করার প্রয়াস করেছেন এবং সফল হয়েছেন, তাঁরা প্রচেষ্টা না করে প্রার্থনা করেন নি। প্রচেষ্টাহীন দোয়া দিয়ে যদি কাজ হতো তাহলে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় এই যুদ্ধ ও রক্তপাত ঘটানোর কী প্রয়োজন ছিল?
তবে সেই নবী রসুলগণ যে দোয়া করেন নি তা নয়, শেষ নবীও দোয়া করেছেন কিন্তু যথা সময়ে করেছেন অর্থাৎ চূড়ান্ত প্রচেষ্টার পর, সর্বরকম কোরবানির পর, জান বাজি রাখার পর যখন আমলের আর কিছু বাকি নেই তখন। বদরের যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগের মুহূর্তে যখন মোজাহেদ আসহাব তাদের প্রাণ আল্লাহ ও রসুলের তরে কোরবানি করার জন্য তৈরি হয়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন, যুদ্ধ আরম্ভ হবার প্রাক্কালে, শুধু সেই সময় আল্লাহর হাবিব আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন তাঁর প্রভুর সাহায্য চেয়ে। ঐ দোয়ার পেছনে কী ছিল? ঐ দোয়ার পেছনে ছিল আল্লাহর নবীর (সা.) চৌদ্দ বছরের অক্লান্ত সাধনা, সীমাহীন কোরবানি, মাতৃভূমি ত্যাগ করে দেশত্যাগী হয়ে যাওয়া, পবিত্র দেহের রক্তপাত ও আরও বহু কিছু এবং শুধু তাঁর একার নয়। ঐ যে তিনশ’ তের জন ওখানে তাঁদের প্রাণ উৎসর্গ করার জন্য নামাজের মতো সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো ছিলেন, তাদেরও প্রত্যেকের পেছনে ছিল তাঁদের আদর্শকে, দীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা, দ্বিধাহীন কোরবানি, নির্মম নির্যাতন সহ্য করা। প্রচেষ্টার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শেষ সম্বল প্রাণটুকু দেবার জন্য তৈরি হয়ে ঐ দোয়া করেছিলেন মহানবী (সা.)। ঐ রকম দোয়া আল্লাহ শোনেন, কবুল করেন, যেমন করেছিলেন বদরে। কিন্তু প্রচেষ্টা নেই, বিন্দুমাত্র সংগ্রাম নেই, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত তুলে দোয়া আছে অমন দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না। বদরের ঐ দোয়ার পর সকলে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, অনেকে জান দিয়েছিলেন, আমাদের ধর্মীয় নেতারা দোয়ার পর পোলাও কোর্মা খেতে যান। খেয়ে আসার সময় পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে আসেন। ঐ দোয়া ও এই দোয়া আসমান জমিনের তফাৎ।
আল্লাহ বলেছেন, “যে যতখানি চেষ্টা করবে তার বেশি তাকে দেয়া হবে না (কোর’আন, সুরা নজম, আয়াত-৩৯)।” মসজিদে, বিরাট বিরাট মাহফিলে, লক্ষ লক্ষ লোকের এজতেমায় যে দফাওয়ারী দোয়া করা হয়, যার মধ্যে মসজিদে আকসা উদ্ধার অবশ্যই থাকে- তাতে যারা দোয়া করেন তারা দোয়া শেষে দাওয়াত খেতে যান, আর যারা আমীন আমীন বলেন তারা যার যার ব্যবসা, কাজ, চাকরি ইত্যাদিতে ফিরে যান, কারোরই আর মসজিদে আকসার কথা মনে থাকে না। ওমন দোয়ায় বিপদ আছে, হাত ব্যথা করা ছাড়াও বড় বিপদ আছে, কারণ অমন দোয়ায় আল্লাহর সাথে বিদ্রƒপ করা হয়। তার চেয়ে দোয়া না করা নিরাপদ। যে পড়াশোনাও করে না পরীক্ষাও দেয় না- সে যদি কলেজের প্রিন্সিপালের কাছে যেয়ে ধর্ণা দেয় যে, আমার ডিগ্রী চাই, ডিগ্রী দিতে হবে। তবে সেটা প্রিন্সিপালের সঙ্গে বিদ্রƒপের মতোই হবে। আমাদের দোয়া শিল্পীরা, আর্টিস্টরা লক্ষ লক্ষ লোকের এজতেমা, মাহফিলে দোয়া করেন- হে আল্লাহ! তুমি বায়তুল মোকাদ্দাস ইহুদিদের হাত থেকে উদ্ধার করে দাও এবং এ দোয়া করে যাচ্ছেন ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম থেকে, ঐ সময়ে যখন দোয়া করা শুরু করেছিলেন তখন দোয়াকারীরা আজকের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম ছিলেন এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তনও এখনকার চেয়ে অনেক ছোট ছিল। যেরুজালেম ও মসজিদে আকসা তখন ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই মহা মুসলিমদের প্রচেষ্টাহীন, আমলহীন দোয়া যতোই বেশি লোকের সমাবেশে এবং যতোই বেশি লম্বা সময় ধরে হতে লাগল ইহুদিদের হাতে আরবরা ততোই বেশি মার খেতে লাগল আর ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তনও ততোই বাড়তে লাগল। আজ শুনি কোন জায়গায় নাকি ২০/২৫ লক্ষ মুসলিম একত্র হয়ে আসমানের দিকে দু’হাত তুলে দুনিয়ার মুসলিমের ঐক্য, উন্নতি ইত্যাদির সাথে তাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসের মুক্তির জন্য দোয়া করে। আর আজ ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়তন প্রথম অবস্থার চেয়ে তিন গুণ বড় এবং পূর্ণ যেরুজালেম শহর বায়তুল মোকাদ্দাসসহ মসজিদে আকসা তাদের দখলে চলে গেছে এবং মুসলিম জাতির ঐক্যের আরও অবনতি হয়েছে এবং সকল জাতির হাতে আরও অপমানজনক মার খাচ্ছে। অর্থাৎ এক কথায় এরা এই বিরাট বিরাট মাহফিলে, এজতেমায়, মসজিদে, সম্মেলনে যা যা দোয়া করছেন, আল্লাহ তার ঠিক উল্টোটা করছেন। যত বেশি দোয়া হচ্ছে, ততো উল্টো ফল হচ্ছে। সবচেয়ে হাস্যকর হয় যখন এই অতি মুসলিমরা গৎ বাঁধা দোয়া করতে করতে ‘ফানসুরনা আলাল কওমেল কাফেরিন’-এ আসেন। অর্থ হচ্ছে “হে আল্লাহ! অবিশ্বাসীদের (কাফেরদের) বিরুদ্ধে (সংগ্রামে) আমাদের সাহায্য কর (সুরা বাকারা-২৮৬)।” আল্লাহর সাথে কি বিদ্রƒপ। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লেশমাত্র নেই, দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নেই, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে তাতে যোগ দেয়া দূরের কথা, তাতে কোন সাহায্য পর্যন্ত দেয়ার চেষ্টা নেই, শুধু তাই নয় গায়রুল্লাহর, দাজ্জালের তৈরি জীবনব্যবস্থা জাতীয় জীবনে গ্রহণ করে নিজেরা যে শেরক ও কুফরীর মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছেন, এমন কি তার বিরুদ্ধে যেখানে সংগ্রাম নেই সেখানে কুফরের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে? এ শুধু হাস্যকর নয়, আল্লাহর সাথে বিদ্রƒপও। তা না হলে দোয়ার উল্টো ফল হচ্ছে কেন? যারা দোয়া করাকে আর্টে পরিণত করে, কর্মহীন, প্রচেষ্টাহীন, আমলহীন, কোরবানিহীন, সংগ্রামহীন দোয়া করছেন তারা তাদের অজ্ঞতায় বুঝছেন না যে তারা তাদের ঐ দোয়ায় আল্লাহর ক্রোধ উদ্দীপ্ত করছেন, আর তাই দোয়ার ফল হচ্ছে উল্টো। তাই বলছি ঐ দোয়া করার চেয়ে দোয়া না করা নিরাপদ।
মহাভারতে একটি কথা আছে, “গৃহে যখন আগুন লাগে যজ্ঞে আহুতি দিয়ে তখন পুণ্যলাভ হয় না”। অর্থাৎ গৃহে আগুন লাগলে প্রথম কর্তব্য সেই আগুন নিভিয়ে গৃহের সকলকে রক্ষা করা। আর সেই আগুন নিভানোর জন্য প্রার্থনা নয় প্রচেষ্টাই আগে প্রয়োজন, এর পর প্রার্থনা। আপনি যদি প্রচেষ্টা ত্যাগ করে শুধু প্রার্থনা করতে থাকেন তবে আগুনে পুড়ে গৃহের সকলেই মারা যেতে পারে এবং এর জন্য দায়ী থাকবেন আপনিই।
দাজ্জালের বিধান মেনে নেওয়ার ফলে সমগ্র মানবজাতি যখন অন্যায়, অবিচার, হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, রক্তপাত, হত্যা, ধর্ষণ তথা চরম অধর্মে লিপ্ত তখন আমাদের প্রধান কর্তব্যই হলো মানবজাতিকে এই চরম অশান্তি থেকে বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করা, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা। প্রচেষ্টা না করে শুধু প্রার্থনা করলে এই কাজে সফলতা আসবে না।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ