যান্ত্রিক সভ্যতার কালো দিক

মাননীয় এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর লেখা থেকে

দাজ্জাল ও বর্তমান ইহুদী-খ্রিষ্টান বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ একই। বস্তু ও যান্ত্রিক শক্তিই এর বাহন কিন্তু তাই বলে বৈজ্ঞানিক যান্ত্রিক প্রযুক্তিটাই খারাপ বা বর্জনীয়, এ ধারণা যেন কারো মনে না আসে। কোন জিনিস ভালো কি মন্দ তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই জিনিসের ব্যবহারের ওপর। একটা অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি বা খুন করা যায়, সেই অস্ত্র দিয়েই খুনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে অসহায়কে রক্ষা করা যায়। অস্ত্র নিজে দায়ী নয়, যে সেটাকে ব্যবহার করবে দায়ী সে। দাজ্জাল বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে অন্যায়ভাবে। চিকিৎসা, কৃষি, আবহাওয়া ইত্যাদি কতকগুলি বিষয়ে ঐ প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও তার প্রধান অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে সামরিক ক্ষেত্রে। এ কথা প্রমাণ করার দরকার পড়ে না, পাশ্চাত্য সভ্যতার সরকারগুলির সামরিক খাতে ব্যয়ের সাথে অন্যান্য খাতে ব্যয়ের একটি তুলনাই এ কথা পরিষ্কার করে দেবে। সামরিক খাতে ঐ ব্যয়ের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাকি পৃথিবীকে পদানত করে রাখা। তেমনিভাবে দাজ্জালের সৃষ্ট রেডিও টেলিভিশন মানুষকে ভালো অনেক কিছু শিক্ষা দেবার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা, সহিংসতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপরাধ, নগ্ন যৌনতা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে তাকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে দিচ্ছে।
আল্ল্লাহ যে বিরাট, বিশাল বিশ্ব-জগৎ সৃষ্টি করেছেন তা তিনি বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই করেছেন। আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে তিনি তাকে সব জিনিসের নাম শেখালেন (সুরা বাকারা ৩১)। সব জিনিসের নাম শেখানোর অর্থ কি? এর অর্থ হচ্ছে কোন জিনিসের কি কাজ, কোন জিনিস দিয়ে কি কাজ হয় তা শেখানো, এক কথায় বিজ্ঞান, কারণ সমস্ত সৃষ্টিটাই বৈজ্ঞানিক। আর আদমকে (আ.) শেখালেন অর্থ মানুষ জাতিকে শেখালেন। কোর’আনের এই আয়াত এই অর্থ বহন করে যে, মানুষ অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে এই বৈজ্ঞানিক মহাসৃষ্টির অনেক তথ্য, অনেক রহস্য জানতে পারবে। মানুষ জাতির বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে আবিষ্কার করছেন আল্লাহর সৃষ্ট কোন জিনিস দিয়ে কী হয়, আর তা প্রযুক্তিতে ব্যবহার করছেন। আল্লাহ তাঁর কোর’আনে তাঁর বিরাট সৃষ্টি সম্বন্ধে ভাববার, গবেষণা করার জন্য বারবার বলেছেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে নফল এবাদতের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।
আল্লাহর ঐ আদেশ অনুযায়ী কাজ করার ফলে এই মুসলিম জাতিতে অতীতে বিরাট বিরাট জ্ঞানী, বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে, যাদের কাজের ওপর, গবেষণার ফলের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি সম্ভব হয়েছে। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী মুসলিম বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে বিজ্ঞানে, চিকিৎসায়, দর্শনে, প্রকৌশলীতে, রসায়নে, এক কথায় বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বিরাট অগ্রগতি করার পর আকিদার বিকৃতিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ছেড়ে, অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এই জাতি যখন ফতোয়াবাজি শুরু করলো তখন স্বভাবতই সেটা অজ্ঞানতার ও অশিক্ষা-কুশিক্ষার অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হলো। আর তাদের কাজের, গবেষণার পরিত্যক্ত ভিত্তির ওপর অগ্রগতি করে দাজ্জাল তার বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির বিশাল ইমারত গড়ে তুললো। পদার্থ বিজ্ঞানে ইবনে হাইসাম, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনা, আল নফীস, আল রাজী, অংক শাস্ত্রে আল খাওয়ারিযমী, আলকিন্দী, আল ফরগানী, সাধারণ বিজ্ঞানে ওমর খাইয়াম, বিবর্তনবাদে ইবনে খালদুন প্রমুখ মনীষীরা বিজ্ঞানে প্রতি অঙ্গনে গবেষণা করে যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, আজ দাজ্জালের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির শক্তি তারই ফল। দাজ্জাল অন্যায় ও অপব্যবহার করছে বলেই বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও যন্ত্র বর্জনীয় হতে পারে না- বর্জনীয় হচ্ছে ওর অপব্যবহার।
যেহেতু আল্লাহ তাঁর খলীফা আদমকে (আ.) নিজ হাতে সৃষ্টি করে তাকে জ্ঞান বিজ্ঞান শেখালেন, সেহেতু মনে রাখতে হবে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান কোন বিশেষ জাতির বা বিশেষ সভ্যতার সম্পদ নয়। সৃষ্টির পর থেকেই মানবজাতি এই জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রগতি করে আসছে। অতীতে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, গবেষণা করে ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন তাদের সেই ভিত্তির ওপর বর্তমানের গবেষক, বিজ্ঞানীরা নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান যোগ করছেন এবং আজকের বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলকে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীরা আরও সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এতে কোন জাতির, কোন সভ্যতার মালিকানা নেই, এর মালিকানা সমগ্র মানবজাতির। বীজগণিত (Algebra) আল খাওয়ারিযমী এবং ত্রিকোণমিতি (Trigonometry) আল বাত্তানী আবিষ্কার করেছেন বলেই যেমন ঐ বিজ্ঞান মুসলিম জাতির সম্পদ নয় তেমনি আপেক্ষিক তত্ত্ব (Theory of Relativity) অ্যালবার্ট আইনষ্টাইন আবিষ্কার করেছেন বলেই তা ইহুদী জাতির সম্পদ নয়- সবগুলোই সমগ্র মানবজাতির সম্পদ।
মানুষের ইতিহাসে দেখা যায় যে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, গবেষণা করে তাকে অগ্রগতির পথে নিয়ে গেছে। যখন যে জাতি বা সভ্যতার প্রাণশক্তি (Dynamism) বৃদ্ধি পেয়েছে সেই জাতি বা সভ্যতা জ্ঞান, বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে এবং সমগ্র মানবজাতি তা থেকে উপকৃত হয়েছে। এখানে আল্লাহর রসুল একটি হাদীসের উল্লেখ প্রয়োজন। তিনি বলেছেন- জ্ঞান আহরণের জন্য চীনেও যাও (হাদীস- আনাস (রা.) থেকে বায়হাকী, মেশকাত)। বিশ্বনবীর সময় জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে (Science and Technology) চীনদেশ ছিলো পৃথিবীতে সবচেয়ে উন্নত, তাই তিনি তাঁর অনুসারীদের (উম্মাহ) তদানিন্তন পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞানের কেন্দ্র চীনে যেয়ে ঐ জ্ঞান আহরণের আদেশ দিয়েছেন।
এ কথা আহাম্মকেও বুঝবে যে এই হাদীসে ‘জ্ঞান’ শব্দ দিয়ে তিনি দীনের জ্ঞান বোঝান নি, কারণ আল্লাহর রসুলকে মদীনায় রেখে দীনের জ্ঞান শেখার জন্য চীনে যাওয়ার, যে চীন তখনও ইসলামের নামই শোনে নি, কোন অর্থই হয় না। বিশ্বনবী এখানে ‘জ্ঞান’ বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বুঝিয়েছেন। মহানবীর ঐ আদেশের সময় এই জাতিটি, যেটা বর্তমানে মুসলিম বলে পরিচয় দেয়, সেটা জীবিত (Dynamic) ছিলো, এবং জীবিত ছিলো বলেই সেটা নেতার আদেশ শিরোধার্য করে জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে পৃথিবীর শিক্ষকের আসন অধিকার করে নিয়েছিলো। তারপর আল্লাহ ও রসুল জ্ঞান বলতে যা বুঝিয়েছেন তা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে যখন এ জাতি ‘জ্ঞান’ কে শুধু ফতোয়ার জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলো তখন এটা অশিক্ষা-কুশিক্ষায় পতিত হয়ে মৃত হয়ে গেলো এবং আজও সেই মৃতই আছে।
আল্লাহ ‘জ্ঞান’ বলতে কি বুঝেন? মুসা (আ.) একবার আল্লাহকে সাতটি প্রশ্ন করেছিলেন। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিলো- আল্লাহ! আপনার বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানী কে? আল্লাহ বললেন, “যে জ্ঞানার্জনে কখনো তৃপ্ত হয় না এবং মানুষের অর্জিত জ্ঞানকেও যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞানের মধ্যে জমা করতে থাকে (হাদীসে কুদসী- আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বায়হাকী ও ইবনে আসাকির; আল্লামা মুহাম্মদ মাদানী (র.) এর ‘হাদীসে কুদসী’ গ্রন্থের ৩৪৪ নং হাদীস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)।” এখানে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে আল্লাহ জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি তাঁর দেয়া জ্ঞান যা তিনি সৃষ্টির প্রথম থেকে তাঁর নবী-রসুলদের মাধ্যমে তাঁর কেতাবসমূহে মানবজাতিকে অর্পণ করে আসছেন, যার শেষ কেতাব বা বই হচ্ছে আল-কোর’আন। এটা হচ্ছে অর্পিত জ্ঞান। আর মানুষ পড়াশোনা, চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যে জ্ঞান অর্জন করে তা হলো অর্জিত জ্ঞান। মুসার (আ.) প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ নির্দিষ্ট করে ‘মানুষের অর্জিত জ্ঞান’ বললেন, শব্দ ব্যবহার করলেন ‘আন্-নাসু’, মানুষ। অর্থাৎ যে আল্লাহর অর্পিত জ্ঞান, অর্থাৎ দীন সম্বন্ধে জ্ঞান, এবং মানুষের অর্জিত জ্ঞান -এই উভয় প্রকার জ্ঞান অর্জন করতে থাকে এবং কখনোই তৃপ্ত হয় না অর্থাৎ মনে করে না যে তার জ্ঞানার্জন সম্পূর্ণ হয়েছে, আর প্রয়োজন নেই, সেই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানী, আলেম। বর্তমানে যারা নিজেদের আলেম, অর্থাৎ জ্ঞানী মনে করেন, আল্লাহর দেয়া জ্ঞানীর সংজ্ঞায় তারা আলেম নন, কারণ শুধু দীনের জ্ঞানের বাইরে মানুষের অর্জিত জ্ঞানের সম্বন্ধে তাদের সামান্যতম জ্ঞানও নেই এবং সেই জ্ঞান সম্বন্ধে পিপাসাও নেই। (সম্পাদনায়: মুস্তাফিজ শিহাব, সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি)

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ