মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই দুর্দশার হেতু কী? (২য় পর্ব)

রিয়াদুল হাসান:
আল্লাহর অসংখ্য প্রতিশ্রুতি কোর’আনময় ছড়িয়ে আছে যার দ্বারা এ কথা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় যে মো’মেনরা কখনও অন্য কোনো জাতির গোলামে পরিণত হতে পারে না। আল্লাহ স্বয়ং তাদের অভিভাবক এবং তিনিই তাদেরকে পৃথিবীর কর্তৃত্ব প্রদান করবেন বলে ওয়াদাবদ্ধ (সুরা নূর ৫৫), তাদেরকে যুদ্ধ ও শান্তি সর্বাবস্থায় সাহায্য করা ও বিজয়ী করা তাঁর নিজের জন্য কর্তব্য (সুরা রূম ৪৯, সুরা ফাতাহ ২৩) নির্ধারণ করে নিয়েছেন। সুতরাং সেই মুসলিমরা যখন অন্যের গোলাম হয়, অন্যের তৈরি জীবনব্যবস্থার দ্বারা শাসিত হয় তখন এই অবস্থায় একটাই সিদ্ধান্ত হতে পারে যে, তারা আর আল্লাহর দৃষ্টিতে মো’মেন নয়, মুসলিম নয়, উম্মতে মোহাম্মদী তো অবশ্যই নয়। পূর্বে যারা ইসলামকে গ্রহণ করে মানবকুলে শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ করেছিল, যাদের দায়িত্ব ছিল অত্যাচারীর কবল থেকে অসহায় মানুষকে উদ্ধারকল্পে সমগ্র পৃথিবীতে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, সেই মুসলিমরাই যখন ব্রিটিশের তৈরি দীন, জীবনব্যবস্থা মেনে নিল তখন তাদের উপর আল্লাহ, মালায়েকগণ ও সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত লা’নত বর্ষিত হতে শুরু করল যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। সেই লানতের ফলেই- (১) তারা সর্বত্র, সকল জাতির হাতে মার খাচ্ছে, (২) তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, আকল্ এমনভাবে উঠে গেছে যে হাজার মারলেও বুঝতে পারছে না কেন এই মার, (৩) বিশ্বের কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েই তারা ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। এগুলোই হচ্ছে একটি লা’নতপ্রাপ্ত জাতির চিহ্ন যা পূর্বের সকল লা’নতপ্রাপ্ত, অভিশপ্ত জাতির মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়েছে।
৪.ঔপনিবেশিক আমলের প্রবর্তিত মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা: মুসলিমরা যখন ইউরোপীয় জাতিগুলোর পদানত হলো তখন এই দাসত্বের বেড়ি থেকে যেন তারা কোনোদিন মুক্ত না হতে পারে এজন্য প্রয়োজন ছিল মুসলিমদেরকে পাশ্চাত্যের মানসিক দাসে পরিণত করা এবং এমন একটি বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দেওয়া যা ব্যক্তিগত বিষয়ের বাইরে তাদেরকে চিন্তাভাবনা করার বোধটুকুও কেড়ে নেবে।
এই পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা একাধারে দুটো শিক্ষাব্যবস্থা চালু করল। একটাতে তারা প্রশাসনিক কাজে ইংরেজদের ফাইফরমাশ খাটা আর হিসাব নিকাশের কাজগুলো করার জন্য কেরানি আর্দালি হওয়ার জন্য যতটুকু শিক্ষা প্রয়োজন ততটুকু দিল। সেখানে ধর্মের ব্যাপারে সন্দেহ, অবজ্ঞা ও বিদ্বেষ শেখানো হলো। একে আমরা বলি আধুনিক শিক্ষা। মুসলিম জাতি ছিল পূর্ববর্তী শাসক। তাদের মাথা থেকে সেই স্মৃতি মুছে দেওয়ার জন্য তাদেরকে জীবিকাচ্যুত করা হলো এবং কৃষকের জাতিতে পরিণত করা হলো। তাদেরকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগও দেওয়া হলো না। তাদের জন্য করা হলো মাদ্রাসা শিক্ষা। সেখানে খ্রিষ্টান ওরিয়েন্টালিস্ট অর্থাৎ প্রাচ্যবিদগণ নিজেরা সিলেবাস কারিকুলাম তৈরি করে নিজেরাই অধ্যক্ষ থেকে ১৪৬ বছর ধরে এই দাস মুসলিমদেরকে ‘ইসলাম’ শিখিয়েছে। সেখানে তারা ইসলামের আত্মা তওহীদ অর্থাৎ হুকুম মানবো শুধু আল্লাহর এই কথাটিই শেখায় নি। উম্মতে মোহাম্মদীর উদ্দেশ্য কী সেটাও শেখায় নি। তাদেরকে শেখানো হলো শুধু ব্যক্তিগত আমল কোনটা কীভাবে করতে হয়, উঠতে বসতে নানাবিধ দোয়া-কালাম পাঠ করা, সুর করে আরবি পড়া, মিলাদ পড়া, হায়েজ নেফাসের মাসলা মাসায়েল, টাখনু, দাড়ি, টুপি ইত্যাদি। আয়-উপার্জন করে সংসার চালানোর মতো কোনো শিক্ষা তাদের দেওয়া হলো না। ফলে ব্রিটিশদের শেখানো ঐ বিকৃত বিপরীতমুখী ষড়যন্ত্রমূলক ইসলামটাকেই তারা ওয়াজ করে বিক্রি করতে লাগলেন। এখন আমরা ‘ইসলাম’ বলতে যেটা বুঝি সেটা আল্লাহ-রসুলের ইসলাম তো নয়-ই বরং ঐ ব্রিটিশ খ্রিষ্টানদের তৈরি করা একটি ইসলাম। এ নিয়েই আমরা ‘গর্বিত মুসলিম।’
৫.পরাশক্তিগুলোর ইসলামকে লক্ষ্যবস্তু করা: শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা বা অপপ্রচার যুদ্ধের অপরিহার্য কৌশল। মুসলিমরা যখন ঐক্যহীন হয়ে সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল তখন তাদের বিরুদ্ধে ইউরোপের জনগণকে উন্মাতাল করে তুলতে ইসলামের বিরুদ্ধে কয়েক শতাব্দী জুড়ে সীমাহীন প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। তখন শত-সহস্র বই লেখা হয়েছে, বক্তৃতা দেওয়া হয়েছে ইসলাম ও ইসলামের নবীকে হেয় করে। সেগুলো থেকেই খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের উপর পাশবিক বর্বর হামলা চালাতে নৈতিক সমর্থন লাভ করে। তারপর একটা পর্যায়ে ইউরোপ গোটা মুসলিম বিশ্বকেই দখল করে নেয়। তখন সংস্কৃতি, শিক্ষা, পত্রিকা, শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে সেই ইসলাম বিদ্বেষ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যা মুসলিম-অমুসলিম সব শ্রেণির মানুষের মনেই ইসলামের প্রতি একটি বিদ্বেষভাব, অবজ্ঞা সৃষ্টি করে দেয়। একটি পরিসংখ্যানে জানা যায় শুধু ১৮০০ সন থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত এই দেড়শ বছরে যখন ছাপাখানার প্রযুক্তি আজকের মত অগ্রসর ছিল না, এই সময়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ৬০,০০০ হাজার ইংরেজি বই লেখা হয়েছে। তার পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত এই প্রোপাগান্ডার মধ্যে বহুবিধ মাত্রা যুক্ত হয়। সমাজতন্ত্রের পতনের পর পশ্চিমা পুঁজিবাদী বøক তাদের সামনে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা হিসাবে দেখতে পায় মুসলমানদেরকে। এর কারণ এই মুহূর্তে কেবল মুসলিমদের কাছেই আছে এমন একটি জীবনব্যবস্থা ও ঐশী গ্রন্থ যার দ্বারা তারা পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণরূপে শাসন করতে পারবে বলে বিশ্বাস করে। এছাড়াও কোনো জাতিকে চিরকাল পদানত করে, দুর্বল বানিয়ে রাখা যায় না, কেননা দুর্বলতা থেকেই তারা একসময় শক্তি সঞ্চয় করে, শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার প্রেরণা লাভ করে। এটা অনুধাবন করেই সমাজবিজ্ঞানীরা ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মুখোমুখি অবস্থানের নাম দিয়েছেন দ্যা ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশান বা সভ্যতার সংঘাত। এখানে তাদের টার্গেট ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে দেওয়া।
৬.ইসলাম পুনঃপ্রতিষ্ঠা ভ্রান্তপথ আবিষ্কার: পশ্চিমারা গত কয়েক দশক ধরে অসাম্প্রদায়িকতার মুখোস পরে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের নামে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে যা প্রতিহত করার কোনো শক্তিই এই জাতির নেই। মুসলিমদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অংশ যখন এর প্রতিবাদে ক্ষুদ্র সামর্থ নিয়ে অসম লড়াইতে অবতীর্ণ হচ্ছে তখন তাদেরকেই জঙ্গি বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এই জঙ্গিবাদীদেরকে আবার পশ্চিমাদেরই একটি অংশ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য, মুসলিমপ্রধান দেশগুলোয় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও গৃহযুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার জন্য। যে কোনো সংগ্রামেই কোনো না কোনো চেতনা কাজে লাগানো হয়, কোথাও দেশপ্রেম, কোথাও ধর্ম, কোথাও কোনো মতবাদকে আশ্রয় করেই মানুষ বিপ্লব করার জন্য একত্র হয়। এই চরমপন্থী গোষ্ঠীটি তাদের যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের সদস্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে ইসলামের চেতনাকে ব্যবহার করছে। এটা করতে গিয়ে তাদের সকল কাজকেই ইসলামের আলোকে ন্যায়সঙ্গত বলে মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন পড়ছে। এজন্য তারা হাদিস কোর’আন ঘেটে এখান থেকে এক লাইন, ওখান থেকে এক লাইন তুলে এনে দলিল হিসাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করছে। এখন মুসলিমরা অন্ধত্বের এমন একটা পর্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছে যে তারা গোটা ইসলামটা আর এক নজরে দেখতে পায় না। অন্ধের হাতি দেখার মত দলিল দেখে সেটাকেই মান্য করার চেষ্টা করে। নিজেদের সাধারণ জ্ঞান বুদ্ধি সব খুইয়ে তারা দাড়ি টুপি লেবাস পরা ব্যক্তিদের উপর ঈমান এনেছে, তারা যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে সেটাকেই তারা ঐশীবার্তা বলে নীরবে মেনে নেয়। পবিত্র কোর’আনে প্রচুর যুদ্ধের আয়াত আছে। কিন্তু সেই আয়াত কোন প্রেক্ষাপটে, জাতির কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছিল সেটা না বুঝে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেটার বাস্তবায়ন করা শুরু করে দিয়েছে এই জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী। তাদের ধ্যান ধারণা, আকিদা এখন পর্যন্ত জাতির অধিকাংশ লোক জানেই না, অথচ তাদের উপরই এই গোষ্ঠী তাদের মনমতো একটি জীবনব্যবস্থা ইসলামের নামে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে। এই কাজ যে রসুলাল্লাহর সুন্নাহ মোতাবেক হচ্ছে না সেটা বোঝার মত বুদ্ধি বা জ্ঞান কোনোটাই তাদের নেই। তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নাম নিয়ে, কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদের কথা বলে যা করছে তার পরিণামে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে অস্ত্রবিক্রি করে লাভবান হচ্ছে তাদেরই কথিত শত্রুপক্ষ। এতে করে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মুসলিমদেরই বাসভূমি, নগর, বন্দর, সভ্যতা ও সম্পদ। জঙ্গিবাদের দ্বারা ইসলামও আক্রান্ত, মুসলিমও আক্রান্ত। তাই জঙ্গিবাদ এখন ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, আর জঙ্গিরা তাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শত্রু। রাজনৈতিক ইসলামও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমনই একটি ভ্রান্ত পথ যা এখন সর্বত্র ব্যর্থ হয়ে বিদায়ের ক্ষণ গুনছে। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে যে জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি (সুরা ইমরান ১১০), সেই জাতির আজ এই দুর্দশা কেন তা আশা করি সংক্ষিপ্তরূপে ফুটিয়ে তোলা গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুর্দশা থেকে তারা কী করে পরিত্রাণ পেতে পারে? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে, মুসলিম জাতিকে এখন একটি কথাকে আশ্রয় করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সেই কথাটি হচ্ছে- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই।” এটাই হচ্ছে তওহীদ। এর মর্ম হচ্ছে- আমরা প্রতিটি ন্যায়ের পক্ষে, সত্যের পক্ষে এবং প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মিথ্যার বিরুদ্ধে একদেহ এক প্রাণ হয়ে একজন নেতার নেতৃত্বে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হবো। একশ ষাট কোটি মুসলিম হাজারো ভাগে বিভক্ত থাকলেও তারা একই আল্লাহ, এক রসুল, এক কেতাবের অনুসারী। মৌলিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই, তখন গৌণ বিষয়গুলো বিস্মৃতি হয়ে আপাতত
এই সংকটকালে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়াটা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অনিবার্য। (সমাপ্ত)

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ