মুসলিমরা অগণিত পথের কোন পথে যাবে?

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে স¦াধীন করা হয়েছিল লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে। এই দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। এটা নিয়েই আমার কথা। আমাদের দেশের ১৫ কোটি মানুষ মুসলমান। আমি প্রশ্ন রাখতে চাই যারা আলেমরা আছেন তাদের কাছে। আপনারা আমার ভুল ধরেন যে আমি মাদ্রাসায় পড়ি নাই। আমি ইসলামের কথা বলার কে? তাহলে অত্যন্ত সহজ সরল কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর আপনারা দিবেন আমাকে, আশা করি। আমার জাতি সম্পর্কে ভাবনার অধিকার কি আমার নাই? পর্যালোচনা করার অধিকার নাই? আমার জাতি যদি উদ্বাস্তু হয়, আমি উদ্বাস্তু হব না? আমার দেশের নারী যদি বেইজ্জত হয়, আমার অসম্মান হবে না? আমার মাটি যদি দুশমনের করায়ত্বে হয়, তাহলে আমি কি উদ্বাস্তু শিবিরে যাব না? তাহলে আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আপনারা লক্ষ লক্ষ আলেম, লক্ষ লক্ষ মুফতি, লক্ষ লক্ষ মুহাদ্দিস, লক্ষ লক্ষ হাফেজে কোর’আন, ইমাম সাহেব, মুসল্লি, আপনারা পীর, পীরের মুরীদ, কোটি কোটি। সারা পৃথিবীতে মার খাই আমরা। একটা ভূখ- রক্ষা করতে পারি না। আপনারা আমার প্রশ্নের উত্তর দিন- আমরা ছিলাম এক জাতি, সেরা জাতি। এই অবস্থায় কেন আমরা আসলাম? কোনটা ঠিক আপনাদের ইসলামের? আমার সরল প্রশ্ন।
আল্লাহ একজন, রসুল একজন, কেতাব একটি, রসুল যে জাতি তৈরি করলেন সেই জাতি একটি। পেটে পাথর বেঁধে, গাছের লতা-পাতা খেয়ে, শত্রুর আঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি যেই জাতি কষ্ট করে তৈরি করলেন উম্মতে মোহাম্মদী সেই জাতি ছিল অখ-। অর্থাৎ এক আল্লাহ, এক রসুল, এক কেতাব, এক জাতি। আজ আমরা কয় খ- হয়েছি? হাজার হাজার। কোনটা ঠিক? আপনারা বিবেককে উন্মুক্ত করুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন- কোনটা ঠিক? ঢাকার পীর মানেন না মানিকগঞ্জের পীরকে, উত্তরবঙ্গের পীর মানেন না দক্ষিণবঙ্গের পীরকে, শিয়া বলে সুন্নী কাফের, সুন্নী বলে শিয়া কাফের, আহলে হাদিস বলে ওহাবি কাফের, দেওবন্দী বলে ওহাবী কাফের, সরকারি আলিয়া মানে না ক্বওমিদেরকে, ক্বওমি মানে না সরকারিদেরকে, এত রং, এত পথের কোনটা ঠিক? ধর্মের নামে আজকে শত শত রাজনৈতিক দল করা হয়েছে। বামপন্থীদের যত দল তার চেয়ে ইসলামপন্থীদের দলের সংখ্যা অনেক বেশি। একেক দলের একেক মার্কা, একেক কর্মসূচী, একেক মনোগ্রাম, কেউ যান সরকারি দলে, কেউ বিরোধী দলে, কেউ বোমাবাজি করেন, কেউ কক্টেল ফাটান, কেউ ঘরের মধ্যে বসে থাকেন। কোনদিকে যাবে মানুষ? জঙ্গিবাদী দল, বোকো হারাম, আইএস, আল-কায়েদা, তালেবান থেকে শুরু করে আমাদের এইদিকে বাংলাভাই, জেএমবি, কতকিছু। আমি বলতে চাই, আল্লাহ এক, রসুল এক, কেতাব এক, উম্মাহ এক, এত রং! এত দল! এত পথ! কেন? কোনটা ঠিক আপনারাই বলুন।
আজকে এ প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। তা না হলে আমরা বাঁচব না। আমি এমনি এমনি একথা বলি নাই। আমাদের এখানে শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমান। অতীতে আমাদের ঈমানকে হাইজ্যাক করা হয়েছে বার বার। হাইজ্যাক করে জাতিবিনাশী কর্মকা- ঘটানো হয়েছে। মানুষ আল্লাহকে পাওয়ার জন্য, রসুলকে পাওয়ার জন্য ওই সমস্ত ভুল পথে পা বাড়িয়েছে। একদল বলেছে আমাদেরকে টাকা দাও, আমরা তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাব। মানুষ জায়গা-জমি, গবাদি পশু, স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে ঐ সমস্ত ধর্মব্যবসায়ীদেরকে টাকা দিয়েছে। আর এক দল অপরাজনীতি করে, ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে বুঝিয়েছে যে আমরা ইসলামী দল, আমাদেরকে ভোট দাও, আমরা কোর’আনি শাসন কায়েম করব, ইসলামি শাসন কায়েম করব, ইসলামের হুকুমত কায়েম করব, শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব। মানুষ আল্লাহকে পাওয়ার জন্য, রসুলকে পাওয়ার জন্য ঐ সমস্ত ভুল পথে পা বাড়িয়েছে। আরেক দল জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটিয়ে, মানুষের বুকে বোমা মেরে আল্লাহ-রসুলের নাম বলে চালিয়ে দিয়েছে। তারা বলেছে আমরা জেহাদ করছি, কেতাল করছি। এই দেখ রসুল করেছেন, কোর’আনে কেতালের কথা উল্লেখ আছে, মানুষ কোনদিকে যাবে? কোনটা ঠিক? আর ওই যে বললাম, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া যেখানে যান, হাজার হাজার পীর। একেক পীরের একেক তরিকা, একেক কর্মসূচি, পোশাক একেক রকম, তাহ্লীল একেক রকম, তরবিয়্যাত একেক রকম। আল্লাহর রসুলের তরিকা কি এতটা ছিল?
এখন আমরা যারা মুসলমান আমাদের দুশ্চিন্তাটা কোথায়? এই একখণ্ড মাটি, যেই মাটিতে আমার পূর্বপুরুষের অস্থিমজ্জা মিশে আছে, যেই মাটিতে ফসল ফলিয়ে আমার ক্ষুণিœবৃত্তি করছি, যেই মাটিতে আমি সেজদা করি, আমার প্রিয় জন্মভূমি এই বাংলার পবিত্র মাটি যদি আজকে মিয়ানমারের মতো হয়, আমি কোথায় দাঁড়াব? একটা গ্রামে যদি এক বাড়িতে ডাকাত ঢুকে অন্যবাড়ির বাসিন্দাদের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন নাই? কি করবেন এখন? আমার প্রশ্ন হচ্ছে এখানে। তাহলে আমাদের কি করণীয়? কোনটা ধরব আমরা? ইসলাম কোনটা ঠিক? আল্লাহ এক, রসুল এক, জান্নাতে যাওয়ার পথ কি এতটা? না। জান্নাতের পথও নিশ্চয়ই একটা।
ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহে বা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার দরকার নাই। আপনারা সবাই বোঝেন যে কোনটা হালাল, কোনটা হারাম। শুকরের গোস্ত খাওয়া হারাম না হালাল? চুরি-ডাকাতি করা হারাম না হালাল? ভাইয়ে-বোনে বিয়ে করা হারাম না হালাল? নারীর ইজ্জত লুণ্ঠন করা হারাম না হালাল? এসব প্রশ্নের উত্তর বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কারো? হচ্ছে না। সবাই পরিষ্কারভবে বুঝতে পারছেন। তাহলে ধর্মের ব্যাপার আসলে সবাই এত অন্ধ কেন? কেন বলেন যে, মৌলবী সাহেব যা বলবে তাই ঠিক, আমরা ভাই ধর্মের বিষয়ে তেমন কিছু বুঝি-সুঝি না? কিন্তু অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হবে না। জনগণকে এখন বুঝতে হবে।
আমাদের মাননীয় সরকারকে আমরা পত্রিকার মাধ্যমে, চিঠি দিয়ে, আমাদের অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ তথা মন্ত্রী মহোদয়, সাংসদবৃন্দ থেকে শুরু করে গ্রামের মেম্বার চেয়ারম্যান পর্যন্ত সকলকে আমাদের জনসভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে এ প্রস্তাবনা আমরা তাদের সামনে উপস্থাপন করেছি। তাদেরকে বলেছি আপনারা আসুন, বসুন, আমাদের বক্তব্য শুনুন। এই সংকট ধর্ম থেকে উদ্ভূত। এটাকে মোকাবেলা করতে হবে ধর্ম দিয়েই। শুধু শক্তি দিয়ে পারবেন না। সিরিয়ার মুসলমানরা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে নাই, ইরাকের মুসলমানরা নিজেদেরকে হেফাজত করতে পারে নাই, আফগানিস্তানের মুসলমান মাটি, ইজ্জত, ধর্ম রক্ষা করতে পারে নাই। কারণ তাদের কারো কাছে সেই সত্য ছিল না যা দিয়ে এই ধর্মের অপব্যবহারকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যায়, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে রক্ষা করা যায়। কিন্তু বাংলার মাটিতে সেই সত্য এসে গেছে। বাংলার মাটিকে আমরা রক্ষা করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
একটাবার চিন্তা করে দেখুন তো, এত বড় কথা আমরা কী করে বললাম? কীভাবে বললাম? আমাদের দেশের সচেতন বিশেষজ্ঞ মহল এমন কি সরকার প্রধানও বহু বার বলেছেন, এই জঙ্গিবাদী সংকট কেবল শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করা যাবে না। এর জন্য একটি সঠিক আদর্শ লাগবে। ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যা জনগণকে বুঝাতে হবে। মাননীয় সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত প্রশ্ন, ইসলামের সঠিক শিক্ষা, সঠিক ব্যাখ্যা কে জনগণকে বোঝাবে? যারা স্বার্থের জন্য ওয়াজ করে তাদের কথায় মানুষের ভিতরে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করে না। তাদের কথায় সমাজের কোনো অপরাধী তার অপকর্ম ত্যাগ করে না, সমাজের কোনো সুদখোর তার সুদের ব্যবসা ত্যাগ করে না, কোনো মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদ সত্যনিষ্ঠ হয়ে যায় না। তাহলে কে বিনা টাকায় ওয়াজ করবে, কে এই সংকটকে জীবন-সম্পদ ও আত্মা দিয়ে মোকাবেলা করতে নামবে? রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে আপনারা আলেম সম্মেলন করেন। তাদের পিছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। আমি জানতে চাই, নিজের ঘরে খেয়ে, নিজের টেলিফোন বিল ব্যবহার করে, নিজের গাড়ির তেল পুড়িয়ে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, মাটির জন্য, দেশের জন্য কয়জন আলেম কাজ করছেন? এটা জানার অধিকার কি আমার নাই? আমার দেশকে ভালোবাসি, আমার মানুষকে ভালোবাসি, আমি চাই না আমার চোখের সামনে তারা ধ্বংস হয়ে যাক। এজন্যই আমরা বলেছি মাননীয় সরকার, হবে না। আদর্শ তাদের কাছে নাই। তারা ধর্মকে রুটির,রুজির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। মানুষের কাছ থেকে ধর্মের নামে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ উদ্ধার করতে করতে তারা সত্য থেকে লক্ষ কোটি মাইল দূরে চলে গিয়েছে। তাদের কোনও কথায় জনগণের চরিত্রের মধ্যে কোন আঁচড় পড়বে না। জনগণের আত্মা পরিবর্তন হবে না। জনগণ তাদেরকে বিশ্বাস করবে না। এখন ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যা, যেটাকে বলে Counter Narrative, পাল্টা ওফবড়ষড়মু সেটা দিয়ে ধর্মের সকল অপব্যাখ্যাকে প্রতিহত করতে হবে। একটা ভুল আদর্শ দ্বারা তারা মানুষকে পথভ্রষ্ট করছে। পাল্টা আদর্শ দিয়ে তাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে। এখানেই হেযবুত তওহীদের প্রয়োজন। সেই পাল্টা আদর্শটা কি? আমার এক-দুইটি কথা বুঝলে হবে না। একটু মনস্থির করে ধীর মস্তিষ্কে বসে চিন্তা করতে হবে। আমার পুরো বক্তব্য শুনতে হবে। তারপরে সেটার উপযোগিতা বিচারের ভার আপনাদের দিয়ে দিলাম।
[১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখ সোমবার ঢাকার উত্তর বাড্ডায় অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভায় হেযবুত তওহীদের এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণের খ-াংশ। সম্পাদনায় মো. রিয়াদুল হাসান। বক্তব্যের পরবর্তী অংশ দেখুন আগামীকাল।]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ