বেগম রোকেয়া এবং প্রকৃত নারী স্বাধীনতা

begum-rokeya-sakhawatকাজী আব্দাল্লাহ আল মাহফুজ:

বাংলাদেশের নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। তিনি বাঙালি নারীদের অশিক্ষা-কুশিক্ষা এবং পশ্চাদপদতা থেকে মুক্তির জন্য এক আলোকবর্তিকার মতো আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ নারীসমাজকে শিক্ষায়, জ্ঞানে বিজ্ঞানে আলোকিত করতে, সামাজিক উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের ভূমিকাকে দৃঢ়তর করতে। নারীদের নিয়ে তার সকল কর্মকাণ্ড ও সাহিত্যে সে কথার প্রতিফলন ঘটে। তিনি লিখেছেন ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কী রূপে? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খুঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনাদর্শ ও লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’ কিন্তু দুঃখের বিষয় সমস্ত কূপমণ্ডূকতা থেকে নারী মুক্তির জন্য তার কঠোর সংগ্রামকে আজ নারী স্বাধীনতার নামে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে একশ্রেণির মানুষ। যারা পাশ্চাত্য ধ্যান ধারণাকে, সংস্কৃতি, উশৃঙ্খলতা, বেপরোয়া জীবনযাপন ও পোশাক পরিচ্ছদকেই নারী স্বাধীনতার মানদণ্ড ধরে নিয়ে বেগম রোকেয়ার অনবদ্য কর্মকাণ্ডের সাথে মিশ্রিত করে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তাদের সাথে বেগম রোকেয়ার উদ্দেশ্য ও আদর্শের কোনো মিল নেই এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত। অপরদিকে ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজালে আটকে আরেকশ্রেণি নারীদের সেই পশ্চাদপদতার মধ্যেই ঠেলে দিয়েছে। এক কথায় আমাদের সমাজের নারীরা এখন পর্যন্ত পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারে নি, যা চেয়েছিলেন বেগম রোকেয়া।
এই মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর। তখন ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশ জাতির গোলাম। একটা গোলাম জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিক্ষা-দীক্ষায় পশ্চাদপদ হবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের তৎকালীন সমাজও এ অবস্থার বাইরে ছিল না। ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য এই পশ্চাদপদতার সুযোগ নিল পুরোমাত্রায়। তারা এ জাতিকে গোলাম থেকে তষ্য গোলামে রূপান্তর করার জন্য যে কটি পদক্ষেপ নিয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই একটি জাতির মনমগজে যে কোনো কিছু সহজেই গেঁথে দেয়া যায়। তাদেরকে যা গেলানো যায় তারা তাই গিলতে শিখে নেয়। তাই তারা তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করল: একটি সাধারণ শিক্ষা যে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিতরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য একদল কেরনি তৈরি করবে। ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা এই সাধারণ শিক্ষাকে সহজেই গ্রহণ করে নিলেও মুসলিমরা পারল না। তৎকালীন মুসলিম সমাজ আগে থেকেই ধর্মীয় কুসংস্কারে আকণ্ঠ ডুবে ছিল তাই তারা সাধারণ শিক্ষাকে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। এছাড়া ইসলামের সংগ্রামী চরিত্র ক্ষীণ হয়ে গেলেও যা অবশিষ্ট ছিল, তা- ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ ও তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ইত্যাদি আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াল। ফলশ্র“তিতে তারা ফন্দি আঁটল যেভাবেই হোক মুসলিমদের সংগ্রামবিমুখ করতে হবে। তারা শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি শাখা তৈরি করল। তৎকালীন বড় লাট ওয়ারেন হেস্টিংকস ১৭৮০ সালে কোলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে পূর্ব থেকে চলে আসা ইসলামের সকল ধরনের বিকৃত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও মতভেদে পরিপূর্ণ এমন এক সিলেবাস তৈরি করল যা মুসলিমদেরকে সম্পূর্ণরূপে কূপমণ্ডূতার অতল গহ্বরে তলিয়ে দিল। তারা ১৪৬ বছর ধরে ২৬জন খ্রিস্টান পণ্ডিত দিয়ে আমাদের ইসলাম শেখালো। তারা এমনভাবে ইসলাম শেখালো যে মাদ্রাসায় শিক্ষত হয়ে তারা যেন ধর্ম বিক্রি ছাড়া আর কোনোভাবে আয়রোজগার করতে না পারে। ফলে সমাজে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হলো ধর্মীয় কুসংস্কার, বিকৃত মাসলা মাসায়েল, ফতোয়াবাজী, মতভেদ। সেই কুসংস্কারের বেড়াজালে আটকে গেল নারীসমাজ। একসময়ের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতির মেয়েরা হয়ে গেল চারদেয়ালের মাঝে বন্দী। সকল প্রকার সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নারীরা হয়ে গেল বিচ্ছিন্ন, পশ্চাদপদ।
এর ফলে মুসলিম সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। মুসলিম নারীরা হয়ে গেল গৃহপালিত পশুর মতো। তাদের সকল অধিকার হরণ করে যে বিকৃত ইসলামটা সমাজে চালু হয়ে গেল তাতে ক্রমান্বয়ে মানুষ অন্তর থেকে ইসলাম বিমুখ হয়ে পড়তে লাগল। অপরদিকে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ভাগ সাধারণ শিক্ষায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা অগ্রসর হয়ে ব্রিটিশদের অনুকরণ করে, তাদের রাজা বাদশাদের ইতিহাস, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে অনুগত কেরানি বনে গেল। দ্বিতীয়ভাগ মাদ্রাসা শিক্ষার কূপমণ্ডূকতা, সমাজে অসম্মান, অভাব-অনটন ইত্যাদি দেখে অনেক মুসলিমরাও তাদের সন্তানদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত কেরানি বানানোর চেষ্টায় নেমে গেল। সেখান থেকে যারা শিক্ষা গ্রহণ করল তাদের কোনো ইসলামি জ্ঞান থাকল না, তার ইতিহাস যা জানল তাও ইংরেজদের ইতিহাস, তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান যা শিখল তা একজন উপযুক্ত কেরানি হওয়ার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু। সুতরাং ইংরেজদের প্রতি ভালবাসায় বুঁদ হয়ে আরেক পরত গোলামির শেকল মুসলমানরা গলায় পরে নিল। তারা নিজেদের ইতিহাস ভুলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিততের অবজ্ঞা করতে গিয়ে একসময় ইসলামকেই অবজ্ঞা করতে লাগল। তথাপি সমাজের একটা বিরাট অংশ ধর্মীয় কুসংস্কারের মধ্যে ডুবে রইল। তৎতালীন কুসংস্কার ও পশ্চাদপদ নারীদের উদ্ধার করতে ব্রত হলেন বেগম রোকেয়া। তিনি বললেন ‘ভগিনীগণ চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হউন! মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কন্যে আমরা জড়োয়া অলঙ্কার রূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সম্বরে বল আমরা মানুষ।’
আজ ইংরেজরা চলে গেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের গোলামির চরিত্র বদলায় নি। তাদের অন্ধ অনুকরণে সমাজের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত একটি শ্রেণি আজ তাদের রীতি-নীতি, তাদের পোশাক-আশাক, তাদের চালচলন, তাদের উশৃঙ্খলতা, তাদের ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব সবই রপ্ত করেছে তষ্য গোলামের মতো। আর মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণি নারী স্বাধীনতার বিরোধিতায় এমনভাবে লিপ্ত হয়েছে যেন মেয়েরা বাচ্চা ধারণ, লালনপালন ও স্বামীসেবা ছাড়া আর কিছু না করে। তারা আমাদের কাছে যে গোলামি চেয়েছিল আমরা তা কড়ায়গণ্ডায় পর্ণূ করতে সক্ষম হয়েছি। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষতরা একবারের জন্যেও পবিত্র কোর’আন খুলে দেখে নি যে- আল্লাহ নারীদেরকে কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছেন, তারা প্রকৃত ইসলামের ইতিহাস পড়ে দেখেন নি যে ইসলামের নারীরা সমাজে সর্বক্ষেত্রে কতটুকু অবদান রেখেছেন। আর মাদ্রাসায় শিক্ষতরা তাদের ধর্মব্যবসা, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির ক্ষতির কথা চিন্তা করে ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস মানুষের আড়ালে নিয়ে গেছে, প্রচার করে দিয়েছে মাদ্রাসাশিক্ষায় শিক্ষিত আলেম না হলে কারো কোর’আন বোঝার সাধ্য নেই। উভয় শ্রেণির এই আহাম্মকির ফলে আজ আমাদের সমাজের নারীদের মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই। ৯০ বছরের বৃদ্ধ দাদী এমনভাবে পর্দা করেন যে তাকে তার পুত্ররাও চিনতে ভুল করবে, কিন্তু তার ২০ বছরের নাতনী পাশ্চাত্যের অনুকরণে অনেকটা বেআব্র“ হয়ে বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ যার জন্য আল্লাহর নির্ধারিত পর্দা করা ফরজ নয় সে বিকৃত ইসলামের পর্দাপ্রথা অনুসরণ করে এমনভাবে চলছে যা আল্লাহ বলেন নি কিন্তু যার ওপর পর্দা ফরজ সে বেআব্র“ অবস্থায় চলাফেরা করছে। (এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে আমি বিকৃত ইসলামের পর্দার কথা বলছি না আমি পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ যে পর্দা করার কথা বলেছে, রসুলের সময় নারীগণ যে পর্দা গায়ে রেখে যুদ্ধ করেছেন আমি সেই পর্দার কথা বলছি)। সবকিছু মেলালে দেখা যাবে আমরা এক তালগোলে অদ্ভুত রকমের সমাজব্যবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছি। আমরা ইংরেজও নই আবার বাঙালিও নই, সংকর এক নতুন প্রজাতি। আজ ঐসকল বুর্জোয়াদের তৈরি গণতন্ত্রের নামে যে জীবনব্যবস্থা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তা প্রকারান্তরে আমাদের গলায় গোলামির ফাঁস আরো শক্ত করে পরিয়ে দিয়েছে। এই সিস্টেমটাই হলো ঐক্যবিমুখ, স্রষ্টাবিমুখ, আত্মাহীন এক অমানবিক সিস্টেম। এর যাঁতাকলে পড়ে নারী স্বাধীনতার নামে, সম অধিকারের নামে সমাজের প্রতিটি স্তরে ভাঙ্গনের যে বিষ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তার পরিণতি এখন আমরা পুরোমাত্রায় ভোগ করছি। এই সিস্টেম আজ সমাজকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দলাদলি, অনৈক্য, পারিবারিকভাবে বিভেদ এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী পর্যন্ত এক বিছানায় ঘুমাতে পারে না। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম নারীর যে স্বাধীনতা দিয়েছে, যে অধিকার দিয়েছে তা অকল্পনীয়, অভাবনীয়। সেই স্বাধীনতা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র কেউই দিতে পারে নি। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন(১) মু‘মিন নর ও মু‘মিন নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে- সুরা আনফাল-৭১; (২) পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ।- সুরা নিসা-৩২; (৩) ‘আমি তোমাদের মধ্যে কর্মে নিষ্ঠ কোনো নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ। সুরা আল এমরান-১৯৫, (৪) মু’মিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ ভাল কাজ করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কাজের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার দান করব। সুরা নাহল-৯৫। এই আয়াতগুলোতে কি আল্লাহ নারী পুরুষের বিশেষ কোনো ব্যবধান রেখেছেন? ব্যবধান তো রাখেনই বরং তিনি বলেছেন একে অপরের বন্ধু, প্রত্যেকে যা রোজগার করবে তার প্রাপ্য অংশ তার এমনকি তিনি বলেছেন নারী পুরুষ একে অপরের অংশ। পবিত্র ক
োর’আনেই এই কথাগুলোরই প্রতিফলন ঘটেছিল রসুলাল্লাহ ও তার সাহাবীদের জীবনে। আল্লাহর রসুলের যুগের নারীদের রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল কাজে অংশগ্রহণ, মসজিদে গিয়ে জুমাসহ পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে সালাহ আদায় এমনকি যুুদ্ধক্ষেত্রেও অবাধ বিচরণ ছিল। তারা মহানবীর সামনা-সামনি বসে আলোচনা শুনতেন, শিক্ষা গ্রহণ করতেন, মহানবীকে প্রশ্ন করে জরুরি বিষয় জেনে নিতেন, অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শও দিতেন। এ সময় মহানবী ও মেয়েদের মাঝে কোনো কাপড় টাঙ্গানো ছিল এই ব্যাপারে কেউ কোনো দলিল দেখাতে পারবে না। নারীরা মহানবীর (দ:) সাথে থেকে যুদ্ধ করেছেন, শত্র“দের হামলা করেছেন, সৈন্যদের খাবার, পানীয় ও অন্যান্য রসদ সরবরাহ করেছেন, আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। ওহুদের যুদ্ধে রসুলাল্লাহ (দ:) যখন সাংঘাতিক আহত হন, তখন কাফেরদের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে রসুলাল্লাহকে প্রতিরক্ষা দেওয়ার জন্য তলোয়ার হাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন উম্মে আম্মারা (রা.)। পরবর্তীতে রসুলাল্লাহ বলেছিলেন, “ওহুদের দিন যেদিকে তাকাই কেবল উম্মে আম্মারাকেই (রা.) দেখতে পেয়েছি।” যে যোদ্ধাদেরকে তারা খাবার, পানীয় এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ করেছেন, চিকিৎসা ও সেবা দিয়েছেন তারা অধিকাংশই ছিলেন বর্তমান আলেমদের ভাষায় “বেগানা পুরুষ”। মসজিদে নববীর এক পাশে তৈরি করা হয়েছিল যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা। এই বিশেষ চিকিৎসা ইউনিটের অধ্যক্ষ ছিলেন একজন নারী, রুফায়দাহ (রা.)। পক্ষান্তরে ব্রিটিশরা, আজ যাদের জীবনব্যবস্থা দিয়ে দুনিয়া চলছে তারা নারীদেরকে ভোটের অধিকার দিয়েছে ১৯২৮ সনে, যার এখনও একশ বছর হয় নি। তারা সেনাবাহিনীতে মেয়েদের অন্তর্ভুক্ত করেছে তারও একশ বছর হয় নি। যুদ্ধাহতদের সেবা দেওয়ার জন্য ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে নার্সিং জগতে দেবীর আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়, তাকে আধুনিক নার্সিং-এর পুরোধা বলা হয়, কিন্তু ১৪০০ বছর আগের রুফায়দাহর (রা.) কথা এই এ জাতিকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আজ ধর্মব্যবসায়ী কূপমণ্ডূক আলেমদের অপপ্রচারে, বিকৃত পর্দাপ্রথার মাধ্যমে এই জাতির অর্ধাংশ নারীদেরকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে, কেননা প্রকৃত ইসলামের নারী অবলা নয়। পর্দাপ্রথা ছাড়াও আরও হাজারো রকম ফতোয়ার বেড়াজালে বিকৃত ইসলাম নারীদেরকে আটকে রাখে। এইসব ভ্রান্ত বিষয় বিকৃত ইসলামের আলেমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন, যার দ্বারা ইসলাম-বিদ্বেষীদের অপপ্রচারের পালে আরও হাওয়া লাগে। তারা মনে করে পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা এসে নারীজাতিকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কোরে ধর্মীয় অন্ধত্ব, পশ্চাদপদতা ও অশিক্ষার কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতা নারীদেরকে মুক্তি দেয়ার শ্লোগান তুলে পণ্যে পরিণত করেছে। নারীদের ব্যাপারে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি আমরা দেখতে পাই তা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, এটা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার কারণে পশ্চিমা প্রভাবাধীন গণমাধ্যমগুলি বিকৃত ইসলামের কূপমণ্ডূকতার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে যে ইসলাম নারীদের অবরুদ্ধ করে রাখে, মানুষের বাক-স্বাধীনতায়, চিন্তার স্বাধীনতায়, চলাফেরার স্বাধীনতায় বিঘ্ন ঘটায়, তাই যে কোনোভাবেই হোক ইসলামের উত্থানকে রোধ করতে হবে।
যেহেতু এদেশের ৮৫ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীদের প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পেতে এবং বেগম রোকেয়ার যে ইচ্ছা ‘আমি চাই সেই শিক্ষা যাহা তাহাদিগকে (নারীদেরকে) নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে।’ এবং তার সেই কথা ‘নারী পুরুষ দেহের দুটি চোখ স্বরূপ, মানুষের সব রকমের কাজকর্মের প্রয়োজনেই দুটি চোখের গুরুত্ব সমান’ বাস্তবায়ন করতে প্রকৃত ইসলামের ছায়াতলে না এসে এ জাতির মুক্তি মিলবে না। নারীদের সকল নিগ্রহ, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা এমনকি সম্ভ্রমের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারে দীনুল হক, প্রকৃত ইসলাম।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ