প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আত্মিক অধঃপতন

ওবাইদুল হক বাদল:
ব্রিটেনের বিচার মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পরিসংখ্যান বিভাগ কিছুদিন আগে এক ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর ইংল্যান্ডে ৮৫ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া আরও ৪ লাখ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, ২০১২/১৩ সালে ৩৫ ভাগ যৌন অপরাধ ঘটেছে শিশুদের বিরুদ্ধে, যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের ৯০ ভাগ নারীই পরিচিত লোকদের লালসার শিকার। শুধু খোদ ব্রিটেন নয় পশ্চিমা সভ্যতার ধারক-বাহক প্রায় দেশেই একই অবস্থা। আমেরিকার জাতীয় আইন বিভাগের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতি বছর ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৮৬৮ জন নারী ধর্ষিত হয়। উপরোক্ত পরিসংখ্যান যে কোন সুস্থ ও চিন্তাশীল মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আর মানবজাতির জন্য এ এক বিরাট লজ্জা। এই অবস্থার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্মার্ট ফোন ও ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। ৫৪ ভাগ কিশোর পর্নোগ্রাফিতে মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। যান্ত্রিক প্রযুক্তি একদিকে যেমন জীবনকে সহজলভ্য করছে অন্যদিকে এর অপব্যবহার মানুষকে পশুবৎ আচরণ করতে বাধ্য করছে। কোন জিনিস ভালো কি মন্দ তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই জিনিসের ব্যবহারের ওপর। একটা অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি বা খুন করা যায়, সেই অস্ত্রই খুনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে অসহায়কে রক্ষা করা যায়। অস্ত্র নিজে দায়ী নয়, যে সেটাকে ব্যবহার করবে সে দায়ী। পাশ্চাত্য সভ্যতা বর্তমানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে অন্যায়ভাবে। রেডিও-টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মানুষকে ভালো অনেক কিছুই শিক্ষা দিতে পারত কিন্তু এগুলি বর্তমানে মানুষকে হত্যা, সহিংসতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপরাধ, নগ্ন যৌনতা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে তাকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে দিচ্ছে। এই যৌনতা, নগ্নতা, বেহায়পনা, শিশু নির্যাতন-এক কথায় সমস্ত রকম অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধের জন্য অনেক সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র‌্যালি, সমাবেশ, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টকশো প্রভৃতি করা হচ্ছে, বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, প্রচলিত আইন কঠোর থেকে কঠোরতর করা হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে দিন দিন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলোচকগণের সামনে ভয়ঙ্কর রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তারা প্রচলিত মূল্যবোধের বাইরে কোন কথা বলেন না। প্রচলিত মূল্যবোধে কখনও বর্তমানের এ সমস্ত অশ্লীল কার্যকলাপ বন্ধ হবে না। তার প্রমাণ পরিসংখ্যান। অথচ আমরা যদি একটু পিছন দিকে তাকাই, যে সময় স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ পৃথিবীতে কার্যকর ছিল তখন যুবতী নারী গায়ে স্বর্ণের অলঙ্কার আচ্ছাদিত করে শত শত মাইল নির্ভয়ে অতিক্রম করত। বর্তমানে যা কল্পনাও করা যায় না। কল্পনা করা যাক বা না যাক, স্বীকার করা হোক বা নো হোক- এর পরিণতি থেকে আমরা রেহাই পাচ্ছি না। বাইরে আমরা খুবই চাকচিক্য চেহারা আর সুখী সুখী ভাব দেখালেও অন্তরের দিক থেকে চূড়ান্ত দৈন্যতায় ভুগছি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর আত্মহত্যার তালিকার দিকে তাকালেই আমরা এই বাস্তবতা টের পাই। মানুষ সাধারণত পরিসংখ্যান দেখে চোখ ছানাবড়া করে ফেলে, কিন্তু পরিবেশের সাথে মিশে থাকায় উপলব্ধি করে কম। যার কারণে মানুষের ঐ শক্তিটুকু ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যায়। কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে এই সভ্যতার ভেতরটা এতই ফাঁপা হয়ে গেছে যে সামান্য বাতাসেই এটি যে কোন সময় ধূলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে নৈতিকতাহীনতার এই নারকীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে, সভ্যতাকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রচলিত মূল্যবোধ ত্যাগ করে মানুষের সামনে স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ