প্রকৃত জ্ঞানী কে?

আরশাদ আলি
প্রকৃত জ্ঞানী তাকেই বলা হয় যিনি জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে কোনো সীমানা খুঁজেন না। আকাশ-পাতালের, দৃশ্য-অদৃশ্যের সকল বস্তু, প্রাণী বা সত্ত্বা সম্পর্কে যার কৌতুহল বিদ্যমান। কাউকে অবহেলা করা, নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা বা অহংবোধ প্রকাশ করা কোনো জ্ঞানীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। ঘরের চার দেওয়ালের ভেতরে আবদ্ধ থেকে এই বিশাল-বিস্তৃত ব্রহ্মাণ্ডের আদ্য-পান্ত রূপ-মাধুর্য অবলোকন করা যেমন অসম্ভব, তেমনই মনের কুঠোরে কোনোরূপ সংকীর্ণতা, অন্ধত্ব বা সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্রয় দিয়ে জ্ঞানের উচ্চশিখরে আরোহণ করাও অসম্ভব। জ্ঞানীরা তাই সকল প্রকার ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থাকতে পছন্দ করেন। তারা ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল মানবসম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য কাজ করেন। আর সে কারণেই তারা বিবেচিত হন সমস্ত বিশ্বের, সমস্ত মানবজাতির সম্পদ হিসেবে।
জ্ঞান দুই প্রকার। একটি হলো স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান, যা ঐশ্বরিক; অপরটি-মানুষের অর্জিত জ্ঞান, তথা পার্থিব। এই দুই জ্ঞানের মিলন ঘটে যে সত্ত্বায় তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত জ্ঞানী। তার দ্বারা মানবতার কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু সম্ভব নয়। আর যার মধ্যে এই ভারসাম্য থাকে না, অর্থাৎ যে ব্যক্তি শুধুমাত্র স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানকেই একমাত্র জ্ঞান মনে করেন, এর বাইরের কিছুকে মূল্যায়ন করেন না তিনি প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানী নন। তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ, সংকীর্ণ, ক্ষুদ্রতায় আবদ্ধ। অন্যদিকে যিনি স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র মানুষের গবেষণালব্ধ বা অর্জিত জ্ঞানকেই একমাত্র জ্ঞান মনে করেন তিনিও ভারসাম্যহীন, প্রকৃত জ্ঞানী নন। তার এই জ্ঞান মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের পথেই বেশি ব্যয় হয়। তাই এই উভয় প্রকার জ্ঞানই মূল্যহীন, অর্থহীন। সুশ্রী এক পক্ষীর ডানাযুগল হতে একটি ডানা বিকল হয়ে গেলে কার্যক্ষেত্রে বাকি ডানার কোনো মূল্য থাকে না। সে ডানা পক্ষীর পতন এক মুহূর্ত দীর্ঘায়িত করতে পারে বটে, কিন্তু পতন ঠেকাতে পারে না। আজকের পৃথিবীর কথিত জ্ঞানীদের অবস্থাও তাই। ভারসাম্যহীন একপেশে জ্ঞান তাদের পতন ঠেকাতে পারছে না। আজকে একটি শ্রেণি বেদ, কোর’আন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক ইত্যাদি নিয়ে নিরন্তর অধ্যাপনা করে চলেছে, চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে, গ্রন্থগুলোর প্রতিটি আয়াত, ভার্স বা শ্লোক নিয়ে গবেষণা করছে, বইয়ের পর বই রচনা করছে, নতুন নতুন তাফসির, টিকা-ভাষ্য রচনা করছে; কিন্তু পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এরা যা-ই করেন, যা-ই দেখেন সবই ঐ ধর্মগ্রন্থের আলোকে। এমনকি এর বাইরের জ্ঞানকে কেউ কেউ শয়তানের জ্ঞান বলেও অভিহিত করেন। এদের ধারণা অনেকটা এমন যে, ‘আমি যা জানি সেটাই যথেষ্ট। এর বাইরে অন্য কিছুর দরকার নেই। এটুকু জানলেই স্রষ্টা আমার প্রতি খুশি থাকবেন, জান্নাত-স্বর্গ বা হ্যাভেনে প্রবেশ করাবেন, বেশি বুঝলে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে, তাই আর কোনো জ্ঞানের দরকার নেই।’ ভারসাম্যহীন ধর্মীয় জ্ঞানকে পুঁজি করে তারা উপাধি বহন করেন আলেম, পুরোহিত, ফাদার, মাওলানা, মোফাসসের, মোজাদ্দেদ, কামেল ইত্যাদি। কিন্তু উপাধি যত বড়ই হোক কার্যক্ষেত্রে তাদেরকে থাকতে হয় ‘কুয়োর ব্যাঙ’ হয়ে। গতিশীল পৃথিবীর সাথে তাদের তেমন কোনো সমন্বয় থাকে না। পৃথিবী যখন নতুন নতুন আবিষ্কারে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উন্নতি করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে রাখে উপাসনালয়ের চার দেওয়ালের অভ্যন্তরে। স্রষ্টা প্রদত্ত মেধাকে, মননশীলতাকে, সৃজনশীলতাকে আবদ্ধ করে রাখে ধর্মগ্রন্থের পাতায়। তথাপি কোনো সমস্যা হবার কথা ছিল না। তাদের এই ব্যক্তিগত অজ্ঞতার কারণে বিরাট-বিশাল জনগোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়ার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু এরা শুধু এটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকে না। তারা তাদের ব্যক্তিগত অন্ধত্ব, ক্ষুদ্রতাকে জাতির ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে। ধর্মপ্রাণ মানুষ যেহেতু তাদেরকে ধর্মেরই ধারক-বাহক মনে করে তাই খুব সহজেই তারাও ঐ অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতায় দীক্ষিত হয়। তাছাড়াও এরা ধর্মগ্রন্থগুলোতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নতুন নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করে, জন্ম হয় নতুন মত-পথ তথা অনৈক্যের। এই অনৈক্য আবার জন্ম দেয় হানাহানি, রক্তপাত, সাম্প্রদায়িকতার। পরিশেষে কেবল অশান্তিই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তাদের এই মেধা-সৃজনশীলতাকে যদি তারা স্বাভাবিকভাবে কাজে লাগাত, ধর্মের অতি বিশ্লেষণ না করে যদি তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় ততটা সহজ রাখত, এবং পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নতি-সমৃদ্ধি, তথা মানবতার কল্যাণেও আত্মনিয়োগ করত তাহলে এই ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতো না, অশান্তি সৃষ্টি হতো না, অনৈক্য সৃষ্টি হতো না। তারা ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই সফলতা অর্জন করতে পারতেন। তাদের একুল-ওকুল দু’কুলেই রক্ষিত হতো।
আবার একটি শ্রেণি প্রতিটি সৃষ্টির অণু-পরমাণু, কার্যপদ্ধতি, গঠনপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছে, এরা গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছে, অনুজীব- যাকে খালি চোখে দেখা তো দূরের কথা যার অস্তিত্ব অনুভব করাই কষ্টসাধ্য এরা তার জীবনধারণের পদ্ধতি, খাদ্য, বংশবিস্তার ইত্যাদি অতি নিখুঁতভাবে বর্ণনা করছে, এরাই বিংশ শতাব্দীর দু’টি বিস্ময়কর বস্তু- রেডিও ও টেলিভিশন আবিষ্কার করেছে; এরা সৃষ্টির অতি সূক্ষ্মতম পদার্থেরও ধর্ম বা স্বভাব নির্ণয় করছে অতি সহজভাবে, পৃথিবী থেকে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ-নক্ষত্রের মেনে চলা নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার বর্ণনা দিচ্ছে; কিন্তু এত কিছু করলেও প্রতিটি বস্তুর অন্তর্নিহিত এই ধর্ম, এই শৃঙ্খলা যে কারও না কারও পরিকল্পনারই অংশ এবং তা যে কেউ না কেউ পরিচালনা করছে তারা তা দেখতে পাচ্ছেন না। তারা সৃষ্টি দেখে, সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ বিস্ময়কর স্বভাব বা গুণ দেখেও স্রষ্টার অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারছেন না। কারণ, তাদের একচোখ অন্ধ। তারা কেবল জড়, বস্তু ও দেহ-ই দেখতে পায়। জীবন, আত্মা ও আধ্যাত্মিকতা তাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। অর্থাৎ ঐ ভারসাম্যহীনতা। তাই তারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যা কিছু আবিষ্কার করছে, দেখা যাচ্ছে তার সবগুলোরই অপব্যবহার হচ্ছে। একটি পারমাণবিক বোমা হিরোসিমা-নাগাসাকিতে যে হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তাতে আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অপব্যবহার কতটা ভয়ানক হতে পারে তার কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, কোটি কোটি আদম সন্তান নৃশংসভাবে প্রাণত্যাগ করেছে, তবে মানবজাতি অস্তিত্বশূন্য হয় নি। দুঃসহ সেই স্মৃতিগুলো বহন করে আজও তারা দিনাতিপাত করছে, অনুশোচনা করছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হলে তারপর হয়তো চোখের পানি ফেলারও কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। কারণ সে যুদ্ধে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ অপব্যবহার পৃথিবীবাসী দেখবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান যেমন আবিষ্কারকে সহজ করেছে, সৃজনশীলতাকে বিকশিত করেছে, তেমনি ধ্বংসকেও অতি সহজ বিষয়ে পরিণত করেছে। কিন্তু যাদের হাতে সে ক্ষমতা তারা যদি বস্তুবাদী না হতেন, তাদের জ্ঞান যদি স্রষ্টাবর্জিত না হতো, অর্থাৎ ভারসাম্যযুক্ত হতো তাহলে পৃথিবীবাসী কখনই ধ্বংস দেখতো না, কেবল সৃজনশীলতারই চর্চা হতো। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষতা থেমে থাকতো না, থেমে থাকতো তার অপব্যবহার।
কাজেই জ্ঞানের বিকাশ ভারসাম্যে। স্রষ্টাহীন বস্তুবাদী ধ্যান ধারণা পোষণ করে যা কিছুই অর্জন করা হোক সেটা জ্ঞান নয়। ঐ জ্ঞান দিয়ে মানুষের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। আবার মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে তুচ্ছ মনে করে, অবহেলা প্রদর্শন করে শুধুই স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞানের চর্চা করাও জড়বুদ্ধিতার শামিল। স্রষ্টা অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতার পক্ষপাতী নন। তিনি জ্ঞানার্জনকে পছন্দ করেন, ধর্মভীরুদের পছন্দ করেন, ধর্মান্ধদের নয়। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মানুষ স্রষ্টার পরিচয় জানবে, মানুষ হিসেবে তার কাজ কী, সে কোথা থেকে এসেছে সেসব প্রশ্নের উত্তর লাভ করবে। স্রষ্টার বিজ্ঞানময় সৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করে, গবেষণা করে তার মাধ্যমেও স্রষ্টাকে চিনবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানবতার কল্যাণ সাধনে স্বীয় অবদান রাখবে, মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করবে। যিনি এতে সফল হবেন তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। তিনি মানবতার সম্পদ, মানবজাতির সম্পদ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ