প্রকৃত অবৈধ কারা?

মসীহ উর রহমান:
এ কথা সকল যুক্তির ঊর্ধ্বে যে, কোনো জিনিসের স্রষ্টাই ঐ জিনিসের ন্যায়সঙ্গত বিধাতা। কারণ যিনি সেটা সৃষ্টি করেছেন তার চেয়ে ঐ জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহার, পরিচালনা-পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এই বিশাল বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ মানুষ জাতি সৃষ্টি করেছেন, এটা প্রশ্নাতীত। প্রথমেই বলে নেই যে, আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাসী অর্থাৎ নাস্তিকদের আমরা এই আলোচনা থেকে বাইরে রাখছি।  কারণ সৃষ্টি আছে, নিখুঁত সৃষ্টি আছে কিন্তু তার স্রষ্টা নেই এমন কথায় বিশ্বাসী নিরেট, স্থূল, জড়বুদ্ধিদের কাছে আমার কোনো বক্তব্য নেই।
মানবজাতির স্রষ্টা কি জানতেন না তিনি যে সামাজিক জীব মানুষ সৃষ্টি করলেন তার জন্য একটি নিখুঁত জীবনব্যবস্থাও প্রয়োজন? না হলে তাঁর সৃষ্ট ঐ জীব অর্থাৎ মানুষ জাতি নৈরাজ্যের মধ্যে বাস করতে বাধ্য হবে? স্রষ্টা চান না যে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবজাতি অন্যায়, অবিচার, রক্তপাত, ক্রন্দন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, এক কথায় অশান্তিতে নিপতিত হোক। তিনি চান তাঁর এই প্রিয় সৃষ্টি সুখে, সমৃদ্ধিতে এক কথায় শান্তিতে থাকুক। এইজন্য তিনি একটি জীবনবিধান পাঠিয়েছেন। আল্লাহর প্রদত্ত এই জীবনব্যবস্থারই নাম হচ্ছে দীনুল হক বা সত্য দীন অর্থাৎ ইসলাম। ইসলামের সর্বশেষ সংস্করণ আল্লাহ পাঠিয়েছেন তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল মোহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে। আল্লাহ তাঁকে এই দীনটি সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব অর্পণ করেন।  তাঁকে এই দায়িত্ব অর্পণের পর ধারণাগতভাবে এই পৃথিবীতে প্রচলিত সকল জীবনব্যবস্থা, বিধি-বিধান মানবজাতির ন্যায়সঙ্গত বিধাতা আল্লাহ কর্তৃক বাজেয়াপ্ত (Banned) ঘোষিত হয় এবং রসুলাল্লাহ হয়ে গেলেন পৃথিবীতে তখন আল্লাহ’র পক্ষ থেকে একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ।  এজন্যই আল্লাহ তাঁর রসুলকে বলেছেন এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য যে, ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসুল’ (সুরা আরাফ ১৫৮)।  যেহেতু এই সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা ও মালিক (রাজা) আল্লাহ, কাজেই এখানে স্রষ্টা ও মালিকের বিধানই কার্যকরী থাকবে এটাই স্বাভাবিক।  সুতরাং তাঁর প্রদত্ত বিধান, হুকুম, জীবনব্যবস্থাকে যারা অস্বীকার করবে তারাই হচ্ছে প্রচলিত ভাষায় বিদ্রোহী (Rebel)।  যেমন কোন রাজার রাজত্বে থেকে তার বিরুদ্ধাচারণ কোরে পৃথক শাসন যারা কায়েম করতে চায় তাদেরকে বলা হয় রাজদ্রোহী।
একদল বিদ্রোহীর প্রতি বৈধ শাসকের যে কথাটি বলার থাকে তা হলো, প্রথমত, তোমরা আমার আনুগত্য স্বীকার করো।  তোমাদেরকে ক্ষমা করা হবে। দ্বিতীয়ত, যদি আনুগত্য স্বীকার না করো, তোমরা আমার এলাকায় থাকতে পারবে না।  তোমরা এই ভূখণ্ড ছেড়ে অন্যত্র চোলে যাও।  আমি তোমাদেরকে আটকাবো না।  তৃতীয়ত, তাও যদি না যাও, তবে তোমাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দেব এবং আমার শাসনকে নিষ্কণ্টক করবো।
মানুষের প্রতি মানুষের স্রষ্টা, প্রভু ও বিধাতা আল্লাহর কথাও তাই। তিনি বলছেন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, তাঁর রসুলের আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো তোমাদের আদেশকারীর (আমীর)’ (সুরা নিসা ৫৯)।  তাহলে, “তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।  যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে (সুরা আহযাব ৭১)”।
দ্বিতীয়ত আল্লাহ বলেন, “সৃষ্টি যার বিধান তার (সুরা আরাফ-৫৪)।” অতএব যারা আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীতে বসবাস কোরে আল্লাহকে বিধাতা মানতে চায় না, তাদের প্রতি আল্লাহর কথা, “নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের প্রান্ত অতিক্রম করো যদি তোমাদের সাধ্যে কুলায় (সুরা রহমান ৩৩)। প্রভুর এই ঘোষণা মোতাবেক পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আর কারও বিধান বৈধ নয়।  যেহেতু আল্লাহই সকলকে সৃষ্টি কোরে তাদের আহার, বাসস্থান, আলো, পানি, বায়ু সমস্তকিছু নিরন্তরভাবে যোগান দিয়ে যাচ্ছেন, তাই এখানে তিনি ছাড়া আর কারও বিধান বৈধ হতে পারে না।  যারা অন্য কোন বিধান দিয়ে পৃথিবী চালাতে চায় তাদের উচিত নিজেরা একটি অনুরূপ নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করা, সেখানে মানবজাতির বিকাশ ঘটানো এবং তাদের লালন পালনের যাবতীয় বন্দোবস্ত করা, আলো, পানি, বায়ু, খাদ্য সরবরাহ করা, অতঃপর তাদের বিধাতা হিসাবে নিজেদের তৈরি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি দিয়ে তাদেরকে শাসন করা।  এখানে যারা আল্লাহর হুকুম দিয়ে শাসন করবে না তারা আল্লাহর ভাষায় কাফের জালেম ও ফাসেক অর্থাৎ হুকুম অস্বীকারকারী, অন্যায়কারী, অবাধ্য (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। একজন প্রতাপশালী সম্রাট তার হুকুম অমান্যকারী, অবাধ্য প্রজাদের বেলায় যে কাজটি কোরে থাকেন আল্লাহও সেটাই করবেন, সেটা হচ্ছে তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া।  সুতরাং এই আল্লাহদ্রোহীরা যদি এই পৃথিবী থেকে বিদায় না হয়, তবে তাদেরকে অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে উৎখাত করা এবং তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায়।  এটাই আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি যখন কোন জনপদ ধ্বংস করতে চাই তখন তার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎকর্ম (আল্লাহর বিধান মানা) করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেখানে অসৎকর্ম (আল্লাহর বিধান অমান্য করা) করে; অতঃপর ঐ জনপদের প্রতি দণ্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমি সেটা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি (সুরা বনী এসরাঈল ১৬)।
আল্লাহর রসুল বিদায় নেওয়ার ৬০/৭০ বছর পর থেকে আল্লাহর নাজিলকৃত দীন বিকৃত হতে আরম্ভ করে এবং উম্মতে মোহাম্মদী তাদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব অর্থাৎ সারা পৃথিবীকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে এনে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করার জিহাদ (সর্বাত্মক সংগ্রাম) ত্যাগ করে।  যতদিন এই উম্মাহ সঠিক পথে ছিল, তারাই ছিল পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়োগকৃত প্রতিনিধি অর্থাৎ খলিফা। যখন তাদের আকিদা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা (Comprehensive Concept) বিকৃত হয়ে গেলো, তাদেরকে আল্লাহ ত্যাগ করলেন।  গত ১৩শ’ বছর পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বৈধ কর্তৃপক্ষ ছিল না, সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ঘোষণা প্রদান করার অধিকারীও কেউ ছিল না। সারা পৃথিবীতে ধর্মব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত যে ধর্মটি আছে এটা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রকৃত ইসলাম নয়, কাজেই সেটা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আল্লাহর কোন সাহায্য নেই। যদি কেউ কোথাও সেই বিকৃত ধর্মটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কায়েম কোরেও থাকে, সেটা মানুষকে শান্তি দিতে পারে নি, কারণ বিকৃত ইসলাম মানুষকে শান্তি দিতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক।
যারা বলে যে, ‘না।  আমরা স্রষ্টার বিধান মানবো না’, স্রষ্টার ঘোষণা (সুরা রহমান ৩৩) মোতাবেক তাদের উচিত হবে এই পৃথিবীর অনুরূপ আরেকটি গ্রহ এবং আরেকটি মানবজাতি সৃষ্টি কোরে সেখানে গিয়ে তাদের তৈরি সব জীবনব্যবস্থা, আইন-কানুন, তন্ত্রমন্ত্র, মতবাদ (Ism, Cracy) ইত্যাদি কায়েম করা।  এই সব তন্ত্রমন্ত্রের ধারকদের এই পৃথিবী শাসনের অধিকার নেই। কারণ:
(১) যেহেতু তারা মানুষের স্রষ্টা নয়, একটি অনু পরমাণুরও স্রষ্টা নয়। [তারা কি এমন কাউকে শরীক সাব্যস্ত করে, যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি, বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা আরাফ ১৯১)।  তারা একটি খেজুর বিচীর খোসারও মালিক নয় (সুরা ফাতির ১৩)]
(২) যেহেতু তারা এই সৃষ্টিকে লালন পালন করে না। [আমি তোমাদের জন্যে জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করছি এবং তাদের জন্যেও যাদের অন্নদাতা তোমরা নও।…আমিই জীবনদান করি, মৃত্যুদান করি এবং আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী। (সুরা হেজর ২১-২৪)]
(৩) যেহেতু তারা তাদের তৈরি হুকুম ও বিধান দ্বারা মানবসমাজে আজ পর্যন্ত শান্তি আনতে পারে নি। বরং তাদের তৈরি বিধানগুলিই সকল অন্যায় ও অশান্তির কারণ। [তাদেরকে যখন বলা হয় তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তারা বলে, আমরা সংস্কারক মাত্র। সাবধান! তারাই হল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অথচ তারা তা বুঝছে না।” – সুরা বাকারা (১১-১২), “জলে স্থলে যতো বিপর্যয়, এ সবই মানুষের নিজেদের কর্মের ফল” (সুরা রুম; আয়াত-৪১)।]
তাই বিধান দেওয়ার এখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লাহরই (সুরা আহযাব ৪০)।  কাজেই যারা স্রষ্টার তৈরি পৃথিবীতে স্রষ্টার বিধান দিয়ে মানবজাতিকে পরিচালনা করে না তারা সকলেই অবৈধ কর্তৃপক্ষ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ