পাশ্চাত্যের ঋণের শিকলে যখন আমরা বন্দী

মোহাম্মদ আসাদ আলী

এটা ইতিহাস যে, সামরিক ক্ষমতাবলে প্রাচ্যের প্রায় সবক’টি দেশ দখল, শাসন ও শোষণ করার পর যখন পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলো আপাতভাবে প্রাচ্যকে স্বাধীনতা দিয়ে চলে গেল, তখন ক্ষমতা দিয়ে গেল তাদেরই শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের তাঁবেদার একটি শ্রেণির হাতে যারা শুধু চামড়ার রংটুকু ছাড়া সর্বোতভাবে ছিল পাশ্চাত্যের প্রধিনিধি। অতঃপর এই বাদামী ইংরেজ, কালো ফরাসি আর হলদে ওলন্দাজ স্পেনিশরা তাদের অশিক্ষিত নিরক্ষর জাতিগুলির উপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করলো।  তাদের এই ছড়ি ঘোরানোর ধরন, শাসনপদ্ধতি তারা শিক্ষালাভ করেছিল বিগত প্রভুদের কাছে থেকেই। এখন শুরু হলো নকলের পর্ব। পাশ্চাত্যও এটাই চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল যেন তাদের উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও প্রাচ্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের অনুসরণ তথা গোলামি করে। আর এই নব্য ক্ষমতাধররা সে পথকেই প্রশস্ত করলো।

প্রাচ্যের এই হীনমন্য নেতৃত্বকে পাশ্চাত্য বঝালো যে, তোমরা অতি গরীব (গরীব কিন্তু তারাই করেছে, তারা অধিকার করার আগে প্রাচ্যের এই দেশগুলি ঐসব ইউরোপীয় দেশগুলির চেয়ে বহু ধনী ছিল, এটা ইতিহাস), এখন তোমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি করতে হবে। কারণ মানব জীবনের মুখ্য, মুখ্য কেন, একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে সম্পদ অর্জন কোরে জীবনের উপভোগ। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নতি করতে গেলে আমাদের মতো কল-কারখানা বসাতে হবে। তোমাদের দেশগুলিকে শিল্পায়ন করতে হবে। শিল্পায়ন করতে গেলে টাকার দরকার হবে। তোমাদের তো টাকা নেই। (টাকা তো আমরা এই কয়েক শতাব্দী ধরে শুষে নিয়েছি)। কোন চিন্তা নেই, আমরা অত্যন্ত মহানুভব, টাকা আমরা ধার দেব, তোমরা কল-কারখানা লাগানো শুরু কোরে দাও। পাশ্চাত্যের বিগত প্রভুদের এই মহানুভবতার আসল উদ্দেশ্য ছিল অন্য। উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক অধিকার ছেড়ে আসতে বাধ্য হলেও অর্থনৈতিক আধিপত্য অক্ষুন্ন রাখা। সুদখোর মহাজন যেমন মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ধার কর্জ দিয়ে খাতককে ঋণে জর্জরিত কোরে একদিন তার সর্বস্ব নিয়ে নেয় ঠিক সেই উদ্দেশ্য। মানসিকভাবে পাশ্চাত্যের দাস, প্রাচ্যের নেতৃত্ব পাশ্চাত্যের ঐ প্রস্তাব যে প্রত্যাখ্যান করবে না সে সম্বন্ধে কোন প্রশ্নই ওঠে না। তারা ঐ প্রস্তাব লুফে নিয়েছিল তা ইতিহাস। শুধু লুফে নেন নি, ইহুদি প্রবর্তিত সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় রাজী হয়ে ঐ ঋণ গ্রহণ করেছেন প্রাচ্যের মুসলিম নেতৃত্ব, যারা নামাজও পড়েন, রোযাও রাখেন, হজ্বও করেন কেউ কেউ পীরের মুরীদ এমনকি অনেকের কপালে সাজদার দাগও হয়ে গেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মেই সে ঋণ প্রাচ্যের দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারে নি। বরং দিনের পর দিন নতুন নতুন ঋণের জালে আটকে প্রাচ্যের জাতিগোষ্ঠিগুলো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কেন সফল হয়নি তা ব্যাখ্যা কোরছি।

স্বাধীনতা পাবার পর প্রাচ্যের অধিকাংশ দেশগুলির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে ও সেই সব দেশের সামরিক বাহিনীকে শাসনভার হাতে নিয়ে কঠোরতার সাথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। একদিকে চরিত্রহীনতার জন্য কাজে ফাঁকি, কর্মবিমূখতা, ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থকে জাতির স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়া ইত্যাদি, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন সরকার বদল, আন্দোলন, কথায় কথায় ধর্মঘট ইত্যাদি এই দুই মিলে কোন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, কোন বড় শিল্পায়নকে সুষ্ঠুভাবে কাজে পরিণত করতে দেয়নি। কাজেই বিগত প্রভুদের কাছ থেকে বিরাট অংকের ঋণ এনে প্রাচ্যের নেতৃত্ব তাদের কাক্সিক্ষত জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন করতে পারে নি, মান আরও নেমে গেছে। মাঝখান থেকে এই দেশগুলির উপর সুদে আসলে যে অংকের ঋণ দাঁড়িয়েছে তা দেখলে মাথা ঘুরে যায়। উন্নয়নের ব্যর্থতার জন্য আসল শোধ করা দূরের কথা শুধু সুদটুকুই এই সব দেশ দিতে পারছে না। কাজেই ঋণের অংক লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলছে। বিগত পাশ্চাত্য প্রভুরা যা চেয়েছিল তা পূর্ণমাত্রায় অর্জন করেছে। প্রাচ্যের জাতিগুলির গলায় ঋণের শেকল লাগিয়ে তারা শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নয়, অন্যান্য বহুদিক দিয়ে কর্তৃত্ব কোরে চলেছে। তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে, ঐ অসম্ভব বিরাট অংকের ঋণের বোঝা ঐ নেতাদের ঘাড়ে নয়, ঐ বোঝা আসলে তাদের দেশগুলির জনসাধারণের ঘাড়ে। ঋনের শুধু সুদের একটা অংশ আদায় করার জন্য এই নেতৃত্ব করের উপর কর, খাজনার উপর খাজনা আরোপ কোরে চলেছেন, তা সত্ত্বেও ঋণের বোঝা বেড়ে চলছে। এই সব দেশের প্রতিটি মানুষের ঘাড়ে হাজার হাজার টাকার ঋণের বোঝা কিন্তু তারা জানে না। ঐ যে গরীব কৃষক ক্ষেতে হাল দিচ্ছে, সে জানে না যে, যাদের তারা ইউরোপের নকল করা প্রথায় ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচিত করেছে তারা তার প্রতিনিধি হয়ে পাশ্চাত্যের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার, পাউণ্ড ঋণ নিয়েছে। ঐ যে নিু ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অফিস কর্মচারীরা সকাল- সন্ধা অফিস যাচ্ছেন আসছেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছেন, সবাই বেখবর যে, তাদের প্রত্যেকের মাথার উপর বিরাট অংকের ঋণ চেপে আছে এবং তা দিতে হবে, আজ হোক আর কাল হোক। আসল বাদ দিন শুধু সুদের একটা ক্ষুদ্র অংশ পরিশোধ করার জন্য জনসাধারণের উপর নতুন নতুন কর ধরা হচ্ছে, পুরানো কর ক্রমাগত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আজ একথা পাশ্চাত্যের মহাজন জাতিগুলি ও প্রাচ্যের খাতক জাতিগুলি উভয়ের কাছেই পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে যে, এইসব অর্ধাহারী, অনাহারী প্রায় উলঙ্গ জাতিগুলির আর সাধ্য নেই ঐ বিরাট ঋণ শোধ করার। এতে অবশ্য মহাজন জাতিগুলির ক্ষতিবৃদ্ধি নেই, তাদের কোন লোকসান হবে না। কারণ ঋণ দেবার সময়ই তারা যেসব শর্ত আরোপ করেছিল এবং গদগদ চিত্তে প্রাচ্যের নেতৃত্ব যে সব শর্ত মেনে নিয়েছিল তার বদৌলতে ইতোমধ্যেই তারা সুদে আসলে ঋণের টাকা উঠিয়ে নিয়েছে। আজ আসল টাকা না পেলেও তাদের কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু কাগজে পত্রে বিরাট টাকা তাদের পাওনা হয়ে আছে, যার ফলে প্রাচ্যের নেতৃত্ব করজোড়ে মহাজনদের সামনে দাঁড়িয়ে দয়া প্রার্থণা করছেন, আরও ঋণ চাইছেন। আরও ঋণ চাইছেন এই জন্য যে, আরও ঋণ না হলে তাদের চলবে না। ঋণ নিয়ে এবং সে ঋণ সদ্ব্যবহার কোরে উন্নতির বদলে অবনতি হবার ফলে এখন এইসব দেশ এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য অর্থাৎ ভিক্ষা না নিলে এদের বাজেট করাই অসম্ভব, সুদের একটা আংশিক পরিশোধও অসম্ভব। তাই বাহ্যত টিকে থাকার জন্যই আরও ঋণ, আরও খয়রাত দরকার। নতুন নতুন ঋণ নিয়ে ঐ ঋণের টাকা দিয়েই কিছু কিছু সুদ এরা শোধ করছেন। কিন্তু নতুন ঋণ নতুন সুদের পাহাড় গড়ে উঠছে, যা আসলে যার যার দেশের জনসাধারণের উপর চাপছে। আজ পাশ্চাত্যের কাছে প্রাচ্যের প্রায় সব কটি দেশের, বিশেষ কোরে মুসলিম দেশগুলির শুধু হাড্ডি-মজ্জা নয়, আত্মা পর্যন্ত দেনাবদ্ধ হয়ে গেছে।

পাশ্চাত্যের ঋণ দেবার প্রস্তাবে এই নেতৃত্ব গদ গদ চিত্তে যে সোনার শেকল নিজেদের গলায় নিলেন এবং যার যার দেশের জনগণের গলায় পরালেন সে শেকল শুধু যে সুদের পর্বত তৈরী কোরে অর্থনৈতিক দাসত্ব চাপিয়ে দিয়েছে তাই নয়, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ঐ শেকল কম প্রভাব বিস্তার করে নি। ঋণাবদ্ধ খাতকের জীবনে মহাজনের প্রভাব কতখানি তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যে সম্পূর্ণভাবে বুঝবে না। মহাজনকে খুশী রাখতে খাতককে কতদূর যেতে হয় তা যে কোন একজন খাতকতে জিজ্ঞাসা করুন। ঋণগ্রস্ত এমন খাতককে বৃদ্ধ মহাজনের মন রক্ষার জন্য কিশোরী মেয়েকে তার কাছে বিয়ে দিতে হয়েছে অনেক। ঋণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তাই। খাতক রাষ্ট্রগুলিকেও ইচ্ছায় অনিচ্ছায় মহাজন রাষ্ট্রগুলির বহুবিধ ইচ্ছাকে পূরণ করতে হয় তাদের খুশী রাখার জন্য। সেটাই করে যাচ্ছে এই প্রাচ্যের দেশগুলি।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ