ধর্মজীবীরা কখনোই আলেম নয়

সাইদুর রহমান

যে পবিত্র মানুষগুলি স্বয়ং আল্লাহর রসুলের কাছ থেকে ইসলামের আকিদা শিক্ষা করেছেন তাদের থেকে ইসলাম সম্পর্কে বেশি জানা কি সম্ভব? নিশ্চয় নয়। কিন্তু তাদের কেউ নামের আগে আল্লামা, মাওলানা জাতীয় কোনো খেতাব ব্যবহার করেছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না। খ্রিষ্টানদের বেলাতে আল্লাহ বলেছেন যে, ‘তারা তাদের ধর্মগুরু ও পাদ্রীদেরকে তাদের রব (প্রভু) বানিয়ে নিয়েছে” (সুরা তওবা ৩১)। সর্বযুগে সব ধর্মেই পুরোহিতদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আল্লাহর বিধানকে গোপন করে নিজেদের মুখের কথাকেই ধর্ম হিসাবে চালাতে চায় এবং নিজেদের কথাকে আল্লাহর কথা হিসাবে প্রচার করে নিজেরাই মানুষের রব বা মওলা সেজে বসে। সুতরাং প্রভুর আসনে বসে অর্থের বিনিময়ে পরকালীন মুক্তির টিকিট বিক্রি করার সকল দরজা ‘আসল প্রভু’ মহাপ্রভু আল্লাহ একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানের বিকৃত ইসলামেও কিছু আলেম ওলামা আছে যারা এর ব্যতিক্রম নন।
আল্লাহ পূর্ববর্তী দু’টি ধর্ম ইয়াহুদি ও ধর্মজীবী খ্রিষ্টান আলেম, বৈরাগ্যবাদী পীরদের উদাহরণ টেনে এনে এই উম্মাহকেও তাদের ন্যায় ধর্মজীবীদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন। কারণ প্রথমতঃ তারা আল্লাহর বিধানকে গোপন করে। দ্বিতীয়তঃ তারা আল্লাহর দীন বিক্রি করে, তৃতীয়তঃ তারা দীনের অতি বিশ্লেষণ করে এর মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করে এবং জাতির ঐক্য ধ্বংস করে, চতুর্থতঃ তারা সমাজের অন্যায় অবিচার অনাচার ও অবৈধ বহু কাজের প্রসার দেখলেও মানুষকে সেটা থেকে ফেরানোর চেষ্টা করে না। আল্লাহ বলেন: পীর ও আলেমগণ কেন তাদের পাপ কথা ও হারাম ভক্ষণে নিষেধ করে না? বরং এরাও যা করে তাও অতি নিকৃষ্ট। [সুরা মায়েদা-৬৩]
এভাবে আল্লাহর অমূল্য আসমানী কিতাবকে যারা আয়ত্ব করে দীনকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছেন তাদেরকে আল্লাহ তুলনা করেছেন কিতাব বহনকারী গর্দভের সাথে। আল্লাহ বলেন: যাদেরকে তওরাতের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছিল, তারা তা বহন করে নাই। তাদের দৃষ্টান্ত পুস্তক বহনকারী গর্দভ। (সুরা জুম’আ: ৫)।
কোর’আনে আল্লাহ পূর্ববর্তী ধর্মগুলির বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন এই উম্মাহর সামনে উদাহরণ হিসাবে পেশ করার জন্য যাতে এই উম্মাহ অন্তত পূর্ববর্তীদের মতো ধর্মব্যবসা করে দীনকে একটি শ্রেণির কুক্ষিগত না করে ফেলে। কারণ এই ধর্ম ইহুদিদের মতো কোনো গোত্রীয় ধর্ম নয়, কোনো আঞ্চলিক ধর্ম নয়; এটা বিশ্বজনীন, সমস্ত মানবজাতির জন্য আল্লাহর প্রেরিত শেষ দীন। তাই কোনোভাবেই একে বিকৃত করা হলে, দুর্বোধ্য করে ফেলা হলে তা সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে এবং পুরো মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যেমন বর্তমানে হয়েছে।
পক্ষান্তরে, কোরআনের বহু আয়াতে বজ্রকঠিন হুঁশিয়ারি থাকা সত্ত্বেও এই জনগোষ্ঠীর দুনিয়ালোভী কিছু ধর্মজীবী মোল্লা নামাজ পড়িয়ে, মিলাদ পড়িয়ে, জানাজা পড়িয়ে, ওয়াজ মাহফিল করে, ফতোয়া দিয়ে, বিয়ে পড়িয়ে, তালাক করিয়ে, মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজারে, পীরের আস্তানায় টাকা রোজগার করছেন। এক কথায় টাকা ছাড়া ধর্মের চাকা একেবারেই স্তব্ধ! মুফতি ও আল্লামাগণ তুচ্ছ মূল্যপ্রাপ্তি তথা সামান্য রোজগারের (সামানান ক্বালীলা) আশায় ইহুদি খ্রিষ্টানদের আদর্শের রাজনীতিকদের অবৈধ কর্মকাণ্ড ও অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে ফতোয়া দিয়ে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করেন। তারা উল্লিখিত আয়াতগুলি জানেন এবং বুঝেন এবং জেনে শুনেই তা গোপন রেখে বিনিময় গ্রহণ করেন! সত্যিকার অর্থে এই পুরোহিত শ্রেণিটি নিজেরাই এই দীনের মধ্যে একটি মূর্তিমান বে’দাত বা সংযোজন। অন্যান্য দীনের কথা বাদ দিলাম, অন্তত আখেরী নবীর উপর অবতীর্ণ ইসলামের এই শেষ সংস্করণে ধর্মজীবী পুরোহিত শ্রেণির প্রাদুর্ভাব ঘটার কোনো সুযোগ বা সদর দরজা আল্লাহ রাখেন নি। ইসলামে কোনো কালেই এই পুরোহিত বা যাজক শ্রেণির কোনো স্থান ছিল না এবং নেই, তারপরেও ইসলামের পূর্ববর্তী সংস্করণগুলিতেও ব্যতিক্রমহীনভাবে পেছনের দরজা দিয়েই এদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে তারা এই উম্মাহর মধ্যে এমনভাবে আসন গেঁড়ে বসে যেন ধর্মে এদের স্থান কেবল অবধারিতই নয়, এরাই ধর্মের ধ্বজাধারী ও কর্তৃপক্ষ (Authority) । নবীদের বিদায়ের কিছুদিন পরেই এই পুরোহিত শ্রেণির আবির্ভাব হয়েছে এবং তারা নিজেদেরকে নবীদের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার, ওরাসাতুল আম্বিয়া (Spiritual Successor) বলে ঘোষণা দিয়ে দীনকে নিজেদের কুক্ষিগত করে নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, তাদের (নবী-রসুল ও প্রকৃত) পেছনে এসেছে কিছু অপদার্থ যারা উত্তরাধিকারী হয়েছে কিতাবের; তারা নিকৃষ্ট পার্থিব উপকরণ আহরণ করেছে এবং বলেছে, ‘আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। বস্তুতঃ এর অনুরূপ সামগ্রী (পার্থিব বিনিময়) তাদের নিকট আবারও যদি উপস্থিত করা হয়, তবে তাও তারা গ্রহণ করবে। কিতাবের অঙ্গীকার কি তাদের নিকট থেকে নেওয়া হয় নি যে, তারা আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলবে না? এবং তারা তো কিতাবে যা আছে তা পড়েও (সুরা আরাফ ১৬৯)। সুতরাং তারা জেনে শুনেই হারাম খাচ্ছেন এবং এটা যে হারাম তা মানুষের কাছে গোপন রাখছেন। অন্যদিকে তারাই আবার মানুষকে রসুলের বরাত দিয়ে বলেন, ‘এবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত হালাল উপার্জন।’ এমন আরও বহু ওয়াজ তারা মানুষের উদ্দেশ্যে করেন কিন্তু নিজেরা সেগুলির পরোয়া করেন না।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ