তাকওয়া ও হেদায়াহ কি এক জিনিস?

এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী:

চৌদ্দশ’ বছর আগে মহানবী (দ:) পৃৃথিবীর মানুষের জন্য যে দীন, জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসে সমস্ত জীবনের সাধনায় আরবে প্রতিষ্ঠা কোরেছিলেন এবং তাঁর নিজের হাতে গড়া জাতির উপর সেটাকে সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অর্পণ কোরে আল্লাহর কাছে চোলে গিয়েছিলেন, সেই দীনটি আর আজ আমরা যে দীন অনুসরণ কোরি এই দু’টি দীন শুধু যে একই দীন নয় তাই না, এ দুটি পরস্পরবিরোধী, বিপরীতমুখী দু’টো দীন। এই দুইটি দীনের মধ্যে মিল শুধু দৃশ্যত বাইরের; ভেতরে এ দু’টি বিপরীতধর্মী। কারা এই সত্য গ্রহণ কোরে সেই প্রকৃত দীন তাদের জীবনে আবার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ‘জেহাদ’ কোরবেন, কারা এ সত্য প্রত্যাখ্যান কোরবেন তা আমি জানি না। আমার হাতে হেদায়াতের শক্তি নেই, হেদায়াতের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর কাছে। তিনি অনুগ্রহ কোরে যাদের হেদায়াত কোরবেন, শুধু তারাই হেদায়াত হবেন আর তিনি যাদের হেদায়াত কোরবেন না, আমার মত লক্ষ মানুষও তাদের সত্য দেখাতে পারবে না। যাই হোক, আমি এখানে হেদায়াহ ও তাকওয়া সম্পর্কে বর্তমানের বিকৃতি শোধরানোর চেষ্টা কোরব। দীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদী বিষয় আকিদা ও ঈমানকে যেমন একই বিষয় কোরে ফেলা হোয়েছে তেমনি হেদায়াহ ও তাকওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে এ দু’টি বিষয়কেও এক কোরে ফেলা হোয়েছে।
আমাদের বর্তমান বিকৃত আকিদায় আমরা ইসলামকে যে দৃষ্টিতে দেখি তাতে ‘ধর্মকর্ম’ করে না এমন একটি লোককে যদি উপদেশ দিয়ে নামাজ রোজা করানো যায়, যাকাত দেয়ানো যায়, মিথ্যা পরিহার করানো যায়, সত্য কথা বলানো যায়, এক কথায় সব রকম অন্যায়-মিথ্যাচার থেকে তাকে বাঁচিয়ে পবিত্র জীবন-যাপন করানো যায়, তবে বলা হয় লোকটি হেদায়েত হোয়েছে। ভুল বলা হয়, সে হেদায়াত হয় নি, সে তাকওয়া অবলম্বন কোরেছে অর্থাৎ মুত্তাকী হোয়েছে। হেদায়াত ও তাকওয়া দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ বিরামহীনভাবে চোলতে থাকে। এর এক মুহুর্তও ছেদ নেই, এর ছেদ মানেই মৃত্যু। আর চলা মানেই, পথ চোলছে মানেই, কোন না কোন পথে চোলছে। সঠিক পথেও চোলতে পারে, ভুল পথেও চোলতে পারে। হেদায়াত অর্থ সঠিক পথে চলা। আল্লাহ ও রসুল (দ:) যে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যে গন্তব্য স্থান নির্দিষ্ট কোরে দিয়েছেন সেই পথে চলা। সেটা কোন পথ? সেটা হোল ‘সেরাতুল মোস্তাকীম’’ সহজ-সরল পথ। ‘সেরাতুল মোস্তাকীম’ কী তা তাকওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
এবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ কোরল যে মাটি দিয়ে তৈরি তোমার খলিফা আদমকে (মানবজাতিকে) তোমার দেখানো পথ থেকে বিচ্যুত কোরে তাকে তার নিজের তৈরি করা পথে নিয়ে যাবো যে পথে চলার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে মানুষের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে অশান্তি, অবিচার এবং যুদ্ধ ও রক্তপাত (ফাসাদ ও সাফাকু-দ্দিমা)। আল্লাহ এবলিসের ঐ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কোরলেন এবং তাকে বোললেন, আমি মানুষ জাতির মধ্যে আমার নবী-রসুল পাঠিয়ে এমন পথ দেখাবো- যে পথে চোললে তারা তোমার ঐ অশান্তি-অবিচার, অত্যাচার ও রক্তপাতের মধ্যে যেয়ে পড়বে না। আমার নবী-রসুলদের দেখানো পথে চোললে তারা সুবিচার ও শান্তির মধ্যে বাস কোরবে। এই পথের নাম দিলেন তিনি সেরাতুল মোস্তাকীম; সহজ সরল পথ। এই সহজ সরল পথ কী? এটা হোল “লা এলাহা এল্লাল্লাহ” আল্লাহ ছাড়া আর কোন এলাহা, বিধানদাতা নেই; উপাস্য নেই, প্রভু নেই, কাজেই আর কারো আদেশ নিষেধ না মানা; জীবনের কোন ক্ষেত্রে আর কারো আইন-কানুন না মানা অর্থাৎ প্রকৃত তওহীদ। আল্লাহ তার প্রদর্শিত পথ এত সহজ কেন কোরলেন? এই জন্য কোরলেন যে মানুষ যদি তার আইন, আদেশ নিষেধ ছাড়া অন্য কোন আইন, জীবন-বিধান না মানে তবেই এবলিস পরাজিত হবে। সে আর মানুষকে অন্য কোন পথে পরিচালিত কোরতে পারবে না এবং মানুষও অশান্তি, অবিচার আর রক্তপাতের মধ্যে পতিত হবে না। কাজেই মানবজাতির মধ্যে যারা এই সেরাতুল মোস্তাকীমে চোলবে তারা আল্লাহর দলে, আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোন জীবন-বিধানকে স্বীকার কোরবে সেটা সম্পূর্ণই হোক বা আংশিকই হোক, তারা এবলিসের দলে। বিকৃত আকিদায় তারা ব্যক্তি জীবনে সারারাত নামাজ পড়লেও সারা বছর রোজা থাকলেও সেই এবলিসের দলে। এই সহজ সরলতাকে বোঝাবার জন্য রসুলাল্লাহ (দ:) বোলেছেন- মানুষের সাথে আল্লাহর চুক্তি হোচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে এলাহ বোলে স্বীকার কোরবে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে চুক্তি হোচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাকে জান্নাত দেবেন। এখানে নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদির কোন শর্ত আল্লাহ রাখেন নি। এই হোল সহজ সরল পথ, সেরাতুল মোস্তাকীম। এই পথে চলা হোল হেদায়াতের পথে চলা, এই হোল আল্লাহর দেয়া দিক-নির্দেশনা।
এখন তাকওয়া। তাকওয়ার অর্থ সাবধানে জীবনের পথ চলা। কোথায় পা ফেলছেন তা দেখে পথ চলা। অর্থাৎ জীবনের পথ চলায় ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-অঠিক দেখে চলা, অসৎ কাজ পরিহার কোরে সৎ কাজ কোরে চলা। কোর’আনের অনুবাদগুলিতে তাকওয়া শব্দের অনুবাদ করা হোয়েছে, ‘আল্লাহভীতি’ দিয়ে, ইংরেজিতে “ঋবধৎ ড়ভ এড়ফ” দিয়ে। তাতে প্রকৃত অর্থ প্রকাশ পায় না। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় এর মাপকাঠি আসবে কোথা থেকে? এর মাপকাঠি অবশ্যই আল্লাহ ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি দিয়েছেন সেইটা, অন্য কোন মাপকাঠি নয়। কাজেই সে হিসাবে আল্লাহভীতি এবং ঋবধৎ ড়ভ এড়ফ শব্দগুলো চলে এবং সেই হিসাবেই তাকওয়া শব্দের অনুবাদ হিসাবে ওগুলো ব্যবহার করা হোয়েছে। ইংরাজি অনুবাদে আল্লামা ইউসুফ আলী অনুবাদ কোরেছেন Fear of God বোলে এবং মোহাম্মদ মারমাডিউক পিকথল কোরেছেন Mindful of duty to Allah অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে চেতনা বোলে। প্রকৃত পক্ষে তাকওয়া শব্দের মর্ম হোল আল্লাহ ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি নির্দিষ্ট কোরে দিয়েছেন, সেই মাপকাঠি মোতাবেক জীবনের পথে চলা। যারা অমন সাবধানতার সঙ্গে পথ চলেন তাদের বলা হয় মুত্তাকী। তাহোলে দেখা যাচ্ছে তাকওয়া ও হেদায়াত দু’টো আলাদা বিষয়। তাকওয়া হোচ্ছে সাবধানে পথ চলা আর হেদায়াত হোচ্ছে সঠিক পথে চলা। আরও পরিষ্কার করার চেষ্টা কোরছি। আপনি আপনার গন্তব্য স্থানের দিকে যেতে দু’ভাবে যেতে পারেন। অতি সাবধানে পথের কাদা, নোংরা জিনিস এড়িয়ে, গর্ত থাকলে গর্তে পা না দিয়ে, কাঁটার উপর পা না ফেলে চোলতে পারেন। ওভাবে চোললে আপনার গায়ে ময়লা লাগবে না, আছড়ে পড়ে কাপড়ে কাদামাটি লাগবে না। আবার পথের ময়লা, গর্ত, কাঁটা ইত্যাদির কোন পরওয়া না কোরে সোজা চলে যেতে পারেন। ওভাবে গেলে আপনি আছাড় খাবেন, গায়ে-কাপড়ে ময়লা কাদামাটি লাগবে। আর হেদায়াত হোচ্ছে আপনি এ উভয়ভাবের যে কোনও ভাবে যে পথে চোলছেন সে পথ সঠিক হওয়া, অর্থাৎ সে পথ আপনাকে আপনার প্রকৃত গন্তব্য স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিনা। পথ যদি সঠিক না হোয়ে থাকে অর্থাৎ হেদায়াত না থাকে তবে আপনার শত সাবধানে পথ চলা অর্থাৎ শত তাকওয়া সম্পূর্ণ বিফল, কারণ আপনি আপনার গন্তব্যস্থানে পৌঁছবেন না। আর যদি সঠিক পথে অর্থাৎ হেদায়াতে থাকেন ও চলেন তবে তাকওয়া না কোরেও গায়ের কাপড়ে মাদামাটি লাগিয়ে আপনি আপনার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যাবেন আপনি সফলকাম হবেন। অর্থাৎ তাকওয়া এবং হেদায়াতের মধ্যে বুনিয়াদেই পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সেই সাথে এটাও দেখা যাচ্ছে যে – হেদায়াহ না থাকলে তাকওয়া অর্থহীন এবং সেই হেদায়াত, সঠিক পথটি হোল সেরাতুল মোস্তাকীম, সহজ সরল পথ, জীবনের কোন ক্ষেত্রে এক আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান না মানা, তওহীদ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ