ঝিনাইদহে সর্বধর্মীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত

গত ৩১ আগস্ট ২০১৫ ঝিনাইদহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে হেযবুত তওহীদের এমাম, এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর প্রস্তাবনার উপরে একটি সর্বধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু ছিল- ‘সকল ধর্মের মর্মকথা, সবার উর্ধ্বে মানবতা’। দৈনিক বজ্রশক্তি ও দৈনিক দেশেরপত্রের সৌজন্যে আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ জেলা পরিষদ প্রশাসক ও আওয়ামী লীগের ঝিনাইদহ জেলা সহ-সভাপতি এ্যাড. আব্দুল ওয়াহেদ জোয়ার্দ্দার। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খ্রীষ্টিয়ান এসোসিয়েশন এর ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি রেভাঃ খোকন দাস; ঝিনাইদহ সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সহ-সভাপতি কনক কান্তি দাস; ‘আমরা কিছু করি’ সমাজ সেবা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এ্যাড. জে, মৌ চৌধুরী; ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. আব্দুর রশীদ; দৈনিক দেশেরপত্রের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহানা পন্নী (রুফায়দাহ); বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাস; বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ঝিনাইদহ জেলার সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. সুবীর কুমার সম্মাদ্দার; বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ঝিনাইদহ সদর উপজেলা শাখার সভাপতি প্রফুল্ল কুমার সরকার; আনন্দ মেলা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এম.ডি. লোটন চৌধুরী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আগত সকল অতিথিবৃন্দকে দৈনিক দেশেরপত্রের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন দৈনিক দেশেরপত্রের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহানা পন্নী (রুফায়দাহ)। তিনি তার বক্তব্যে সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মব্যবসা নিরসন করে মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য মহামান্য এমামুযযামানের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব আব্দুল ওয়াহেদ জোয়ার্দ্দার বলেন- “আমরা সবাই একই পিতা-মাতার সন্তান, এক জাতি। কিন্তু আমরা সেটা ভুলে গেছি। আর সে ভুলে যাওয়ার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন। অহিংসা পরম ধর্ম। কোনো ধর্মই হিংসার-বিদ্বেষ ও বিভেদের শিক্ষা দেয় না। কিন্তু আমরা ধর্মের অজুহাতে অহরহই হিংসার জন্ম দিচ্ছি। আজ আমাদের সম্মুখে সাম্প্রদায়িকতা এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি দ্রুত এর সমাধান অনিবার্য।” তিনি আরও বলেন- ‘যার যার ধর্মবিশ্বাস তার তার কাছে। ধর্মে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই, নেই সাম্প্রদায়িকতাও। তাই আজকের এই অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানে আমরা সকল সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়েছি। এজন্য আমরা সত্যই আনন্দিত, খুশি। আমরা এ অনুষ্ঠান থেকে শিক্ষার আলো পেয়েছি। আমরা জেনেছি কীভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি করে তার মাধ্যমে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হয়। এই দাঙ্গা-হাঙ্গামার ব্যাপারে আমাদেরকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। কাজেই আজকের এই অনুষ্ঠানটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ, মাহাত্মপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ।’তিনি যামানার এমামের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন- আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মুখ পানে এগিয়ে যাবো।

এরপর বিশেষ অতিথি নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন- “আমরা ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। সে যুদ্ধে আমাদের মধ্যে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না। আমরা হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এক জাতি হিসেবে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু পরবর্তীতে ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের মধ্যে বিভেদের মন্ত্র সঞ্চার করেছে। এটাই চিরন্তন সত্য যে, আমরা সকলে এক জাতি, একই স্রষ্টার সৃষ্টি। ইসলাম ধর্মে আছে লা ইলাহা ইল্লাহ আর হিন্দু ধর্মে আছে একম ব্রহ্মা দ্বৈত্য নাস্তি। আমাদেরকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে সেই এক স্রষ্টার বিধানের আশ্রয় নিতে হবে। তবেই আমরা মুক্তি পাবো। আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে যে, আমাদের একমাত্র শান্তির পথ- ঐক্য। শান্তি আনয়নের জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই।” এরপর বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দানকালে এ্যাড. সুবীর কুমার সম্মাদ্দার বলেন- “প্রতিটি জাতির মধ্যেই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রসুল, অবতার এসেছেন। এই মহামানবদের শিক্ষা কার্যকরি করে মানুষ শান্তিপূর্ণ সমাজ পেয়েছে। কিন্তু যখন সে শিক্ষাকে বিকৃত করে ফেলা হয়েছে, ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মকে নিয়ে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করতে শুরু করেছে তখন আবারও অশান্তির দাবানল জ্বলে উঠেছে। ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা নামক যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়েছে তার থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।”তিনি বলেন- ‘ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার জন্যই আজ এত অশান্তি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের উদাহরণ টেনে বলেন- মানুষের মানবিক অধিকারকে যদি ভূলুণ্ঠিত করা হয় তাহলে সে সমাজ নিশ্চিতভাবে অশান্তিতে পতিত হয়। আজকে সারা পৃথিবীজুড়ে যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি হয়েছে তার নিরসনে প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যামানার এমামের অনুসারীরা সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে কাজ করছে। তারা সকল ধর্মের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমামুযযামানের বড়ই প্রয়োজন ছিল।’ধর্মব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন- “ধর্মব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র অতি গভীর। কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রে ভয় পেয়ে গেলে চলবে না।” তিনি আরও শক্তভাবে ধর্মব্যবসায়ীদের মোকাবেলা করার জন্য আহ্বান জানান। তিনি বলেন- ‘মানুষে মানুষে ভুল বোঝাবুঝির অবসানকল্পে যদি প্রত্যেক জেলায় জেলায় এভাবে সম্মেলন করা যায় তাহলে এই শিক্ষাটা অনেক মানুষের মধ্যে প্রসারলাভ করবে।’ সবশেষে তিনি দৈনিক বজ্রশক্তি ও দেশেরপত্রের পথচলায় সর্বাঙ্গিন মঙ্গল কামনা করেন।

এছাড়া বিশেষ অতিথি কনক কান্তি দাস বলেন- “হিন্দু-মুসলমান একই সূত্রে গাঁথা। আমরা ভাই ভাই। আমরা যুদ্ধ করেছি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে। কিন্তু আজ আমাদের জাতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? এমন তো হবার কথা ছিল না। পত্রিকায় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, লেখনীর মাধ্যমে উদার চেতনা, সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বাসকে একই শাখার মধ্যে নিয়ে আসার এই যে প্রাণপণ প্রচেষ্টা করছে বজ্রশক্তি ও দেশেরপত্র সেজন্য আমরা তাদেরকে সাধুবাদ জানাই। ৭১ সালে যদি আমরা জয়ী না হতাম, তাহলে আজকের এই শিল্পকলা একাডেমি হতো না, এখানে যারা বসে আছেন তারা বিশেষ অতিথি, প্রধান অতিথি হতে পারতেন না। আর যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকতাম তাহলে সে যুদ্ধে জয়ীও হতাম না।” তিনি বর্তমান সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার বলে আখ্যায়িত করেন এবং সরকারকে সকল ধর্ম-বর্ণের প্রতি সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু ষড়যন্ত্র শেষ হয় নি। তিনি বারবার ধর্ম-বর্ণের বৈষম্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন- ‘বিশ্ব যখন নতুন নতুন আবিষ্কার ও প্রযুক্তিতে ভর করে সামনের পথে এগিয়ে চলছে তখন আমরা নিজেরা নিজেরা হানাহানি-রক্তপাত করে যাচ্ছি। আমরা মানবতার লঙ্ঘন করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। প্রতিটি ধর্মেই মানবতার জয়গান করা হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবেছে ঈশ্বর। কিন্তু হিন্দুধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সে শিক্ষার প্রতিফলন কোথায়? তারা কার্যত বেদের শিক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। আবার রসুলাল্লাহ তাঁর শেষ ভাষণে জাতির উদ্দেশ্যে যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো কি আজকের মুসলিমরা মেনে চলছেন? চলছেন না। বৌদ্ধরা ত্রিপিটকের কথা মানছেন না। এভাবে কোনোদিন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রত্যেককে তাদের নিজ নিজ ধর্মের শিক্ষা মেনে চলতে হবে।’এরপর এ্যাড. জে, মৌ চৌধুরী বিশেষ অতিথির বক্তব্য দানকালে বলেন- “আমরা যদি বজ্রশক্তি ও দেশেরপত্রের এই উদ্যোগে একাত্মতা প্রকাশ না করি তাহলে অকৃতজ্ঞ থেকে যাবো। কাজী নজরুল লিখেছেন- ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান’। এই মানবতার মুক্তির জন্যই বজ্রশক্তি ও দেশেরপত্র কাজ করে যাচ্ছে। আমি তাদের সর্বাঙ্গিন মঙ্গল কামনা করি।” যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে তাদেরকে ধিক্কার জানিয়ে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান তিনি। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের আরও একটি কবিতার লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন- তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি, মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী।’

নারীদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন- ধর্মব্যবসায়ীরা সব সময় নারীদের পশ্চাদমুখী করে রাখতে চায়। নারীদের অগ্রগতির পথে তারা অনেক বড় প্রাচীর হয়ে আছে। অথচ নারী হলো জাতির অর্ধাঙ্গ। নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই, নারীরা এখন বিশ্ব চালাতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে নারীদের অবদান উল্লেখযোগ্য। নারীরা যুদ্ধ পর্যন্ত করেছেন। কাজেই নারীরা কখনোই পিছিয়ে থাকবে না। ধর্মব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন- যুগে যুগে যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করেছে তারাই সফল হয়েছে। স্বার্থবাদীদের দ্বারা মানুষের কোনো উপকার হয় না। স্রষ্টা বলেছেন- তোমরা যদি মানুষকে ভালোবাসতে না পারো তাহলে আমাকে পাবে না। এই বাণীকে অনুসরণহেতু আমাদের উচিত হবে, মানবতার কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে আত্মনিয়োগ করা, নবী-রসুল-অবতারদের শিক্ষা মেনে নেওয়া। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ‘সকল ধর্মের মর্মকথা, সবার উর্ধ্বে মানবতা’ এবং ‘এক জাতি এক দেশ, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মব্যবসা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে দেশেরপত্রের দেশব্যাপী কর্মকাণ্ডের উপর নির্মিত একটি ডকুমেন্টারিও প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দেশেরপত্রের সাব এডিটর শেখ মনিরুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন শাহিন আলম।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ