কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে

মুস্তাফিজ শিহাব
আল্লাহ যে কয়েকটি আসমানী কিতাব মানবজাতির উদ্দেশে প্রেরণ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হল আল কোর’আন। কোর’আন আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ আসমানী কিতাব যার মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান প্রদান দিয়েছেন। এর আগে যে সকল কিতাব এসেছে তা ছিল কোন নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠির জন্য, কিন্তু এই শেষ কোর’আন এসেছে পুরো মানবজাতির জন্য। কোর’আনে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতি কিভাবে জীবনযাপন করলে পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এক কথায় জীবনের সকল পর্যায়ে শান্তির সাথে বসবাস করতে পারবে তার উপায় প্রদান করেছেন। কিন্তু আজ মানবজাতির ভিতরে কোর’আন বিদ্যমান কিন্তু কোথাও কোন শান্তি নেই।
আল্লাহর রসুলের একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে তিনি বলেছেন শেষ যামানায় এমন এক সময় আসবে যখন ইসলাম শুধু নাম থাকবে, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, মসজিদগুলো হবে লোকে লোকারণ্য কিন্তু সেখানে কোন হেদায়াহ থাকবে না। আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব। তারা ফেতনা সৃষ্টি করবে, অতঃপর তাদের ফেতনা তাদের দিকেই ধাবিত হবে (আলী রা. থেকে বায়হাকি, মেশকাত)। বর্তমান সময়ের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তবে দেখতে পাব মুসলিম দুনিয়ায় কোর’আন শুধু অক্ষর হয়ে রয়েছে। আমাদের প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই কোর’আন রয়েছে কিন্তু সে কোর’আনের হুকুম আমাদের সামগ্রিক জীবনের কোনো অঙ্গনে পালন করছি না, ব্যক্তিগতভাবে দু একটা খেয়াল খুশি মতো করার চেষ্টা করছি। ফলে কোর’আন আমাদের সমাজকে শান্তিপূর্ণ করতে পারছে না। আমরা শুধু সেই কোর’আনকে তেলাওয়াতের জন্য গুছিয়ে রাখছি ও ভাবছি তেলাওয়াত করলেই সওয়াব হবে, প্রতিটি অক্ষরে আমরা সওয়াব পাবো। এ কথাটিই রসুল বলেছেন যে, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে। কিন্তু আল্লাহ এই কোর’আনকে শুধু সওয়ার কামাইয়ের জন্য কী নাযিল করেছেন? মোটেও না। আল্লাহ এই সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাবকে সর্বশ্রেষ্ট রসুলের উপর প্রেরণ করেছেন মানুষের সামগ্রিক জীবন পরিচালনা করার জন্য। কোর’আনে স্পষ্ট রয়েছে যারা আল্লাহর নাজেলকৃত বিধান দিয়ে হুকুম করে না তারা কাফের, ফাসেক ও জালেম (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)।
আজ পৃথিবীতে কোথাও কোর’আনের কোন বিধান চলে না। কোর’আন আজ শুধুই একখণ্ড পবিত্র গ্রন্থ ছাড়া এই জাতির কাছে কিছুই না। কিন্তু আল্লাহর রসুলের অনেক সাহাবী পূর্ণাঙ্গ কোর’আন দেখেন নি। তবুও তাঁরা অর্ধদুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে যে জাতির উপর কোর’আন নাযিল হয়েছে সে জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সম্বোধন করেছেন। কারণ এই কোর’আনের দিক নির্দেশনা মান্য করলে এ জাতির মধ্যে এমন পরিবর্তন আসবে যার পরিণতিতে তারা জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে সমস্ত দুনিয়ায় অন্যান্য জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে এবং এমনটিই হয়েছিল। আমরা ছিলাম শ্রেষ্ঠ জাতি। আমরা ছিলাম শিক্ষকের জাতি। কিন্তু আজ আমরা অন্য জাতির গোলাম। আজ আমাদের ঘরে ঘরে কোর’আন কিন্তু আমাদের সেই জ্ঞান, সেই ঐশ্বর্য নেই।
যেই কোর’আনের সুধা আহরণের মাধ্যমে উম্মতে মোহাম্মদী পুরো অর্ধেক দুনিয়ায় নিজেদের আধিপত্য, জ্ঞান, প্রজ্ঞা বিস্তারে সক্ষম হলো সেই একই কোর’আন আমাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু তাঁরা ছিল গতিশীল, কর্মঠ, সাহসীহৃদয়, দুর্বিনীত, বুদ্ধিমান আর আমরা পরিণত হয়েছি ভীরু, অচল, নিথর, কাপুরুষে। আমরা কোর’আন দিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছি। একদল কোর’আনের আয়াতকে গোপন করছে, আয়াতকে বিক্রি করছে, তার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। আরেকদল পাড়া মহল্লা কাঁপিয়ে কোর’আন তেলাওয়াত করছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে কোর’আন নাজিল হলো সেটাই হচ্ছে না। মানবজাতির মুক্তির পথ নিয়ে এসেছিল কোর’আন, মানবজাতিকে সকল অন্যায় অশান্তি থেকে মুক্ত করতে এসেছিল কোর’আন কিন্তু সে কোর’আন আজ নির্জীব মলাটে বন্দী। তাই রসুল বলেছেন, কোর’আন শুধু অক্ষর থাকবে, এর কোন প্রয়োগ (Implementation) থাকবে না।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ