ওবায়দুল হক বাদল:
গণতন্ত্র স্পষ্টত শিরক:
আমরা সকলেই জানি যে, ‘শির্ক’ আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ শরিক করা, অংশীদার মনে করা, সমকক্ষ মনে করা ইত্যাদি। ইসলামে এই শিরক এমন একটি অপরাধ যার কোনো ক্ষমা নেই।
আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা: আয়াত ৪৮।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ (সা.)’ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম, বিধান ছাড়া কারো হুকুম মানব না। অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক তথা জীবনের সর্ব অঙ্গনে আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম মানব না এই অঙ্গীকার এই শপথ করেই একজন মানুষ মুসলিম হয়। এবং এর উপর অটল ব্যক্তিই মুসলিম। কেউ যদি এই শর্তকে প্রত্যাখ্যান করে সে কাফের অর্থাৎ অস্বীকারকারী। কেউ যদি মানার অঙ্গীকার করেও না মানে অথবা মুখে বলে মানি কিন্তু অন্তরে সন্দেহ পোষণ করে কিংবা হৃদয়ে ধারণ না করে সে মোনাফেক। আর কেউ যদি এই অঙ্গীকার করার পর আল্লাহর কিছু হুকুম মানে আর কিছু হুকুম না মানে কিংবা অন্য কারোটা মানে তাহলে সে মোশরেক।
আল্লাহ বলেন, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান করো? সুতরাং তোমাদের যারা এরূপ করে তাহাদের প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা, অপমান এবং কেয়ামতের দিন কঠিনতম শাস্তি (সুরা বাকারা ৮৫)”
গণতন্ত্রের শর্ত হলো- ‘জনগণকে শাসন করবে জনগণ’। আর ইসলামের শর্ত হলো জনগণকে শাসন করবে আল্লাহ। গণতন্ত্রে আইন- বিধান রচনা করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতারা। আর ইসলামের আইন বিধান দিয়েছেন আল্লাহ। যারা মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে নিজেদের মুসলিম দাবি করে তারা যদি আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের চর্চা করে এবং আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে, প্রত্যাখ্যান করে গণতান্ত্রিক সিস্টেমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা তৈরি আইন কানুন তসলিম করে নেয় এবং তার দ্বারা জীবন পরিচালনা করে তাহলে তা স্পষ্টই আল্লাহকে অংশী করা হয়। তাছাড়া গণতান্ত্রিক সিস্টেমে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবন ছাড়া সামাজিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক তথা জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুমকে মান্য করার কোনো সুযোগ থাকে না। এই সিস্টেম যদি শিরক না হয় তাহলে শিরক বলতে আর কিছু থাকতে পারে না।
আরো একটু সহজ করে বলি। মানুষ সামাজিক জীব। জীবন পরিচালনার জন্য তার আইন, কানুন, বিধান প্রয়োজন। গণতন্ত্রের দাবি হলো এসব বিধি-বিধান মানুষ নিজেই তৈরি করে নিবে। অপরদিকে ইসলাম বলে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই ভালো জানেন কোন নিয়মে, কোন আইন-কানুন, বিধান তথা সিস্টেমে চললে সে শান্তিতে থাকতে পারবে। তাই ইসলামের দাবি জীবন পরিচালনার বিধি-বিধান আল্লাহ দিবেন। অর্থাৎ বিধানদাতা একজনই আর তিনি হলেন আল্লাহ। গণতন্ত্র বলছে, বিধানদাতা আমরা মানুষেরাই। আর ইসলাম বলছে, বিধানদাতা আল্লাহ। মানুষ যদি মানুষের বিধান মান্য করার শপথ নেয় তাহলে সে মানুষের প্রতি ঈমান আনল আর যদি সে আল্লাহর বিধান মানার শপথ নেয় তাহলে সে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল।
যারা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো বিধানদাতার বিধান মানবে না তাদের শপথবাক্য হচ্ছে লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর বিধান না মেনে অধিকাংশ জনগণের তৈরি বিধান ছাড়া অন্য বিধান মানতে রাজি নয় তাদের শপথবাক্য হওয়া উচিত- লা-ইলাহা ইল্লান্নাস।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একটি ভুল প্রক্রিয়া:
শত শত বছর থেকে ইসলামকে ‘ব্যক্তিগত ধর্ম’ হিসাবে পালন করার কারণে ইসলামের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা কালের গর্ভে একপ্রকার হারিয়ে গেছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বহুদলীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচনের যে রোডম্যাপ পশ্চিমা প্রভুরা রেখে গেছেন, ইসলামের রাজনৈতিক পদ্ধতি সেটার সঙ্গে খাপ খায় না। তবু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একদল ইসলামি পণ্ডিত ইসলামকে জোর করে গণতন্ত্রের মডেলের সাথে খাপ খাওয়াতে উঠে পড়ে লেগেছেন এবং গত শতাব্দী থেকে তারা ইসলামের এরকম একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা (Narrative) দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। তারা আবিষ্কার করেছেন ‘গণতান্ত্রিক ইসলামী দল’। তাদের ব্যাখ্যা মোতাবেক আল্লাহর রসুল সারাজীবন রাজনীতি করেছেন। তারা রসুলাল্লাহর জেহাদ বা সংগ্রামকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে মেলাচ্ছেন। তারা বলছেন যে, এই যুগে নির্বাচনই হচ্ছে জেহাদ, আর ইসলামী দলের ব্যালট পেপার হচ্ছে জান্নাতের টিকেট। তাদের বয়ান মোতাবেক প্রকৃতপক্ষে ইসলামই হচ্ছে সবচেয়ে ‘গণতান্ত্রিক’ ধর্ম। ইসলামের ইতিহাসকেও তারা সেভাবে বর্ণনা করেছেন, যেমন উমর (রা.)-এর শাসনে ‘শুরা’ বা পরামর্শ সভা ছিল এবং শাসক সিদ্ধান্ত নিতেন তবে জনগণের মতামতও নিতেন। সুতরাং উমর (রা.) গণতান্ত্রিক ছিলেন! আবার রসুলাল্লাহর (সা.) ওফাতের পর আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন সাধারণ জনগণের মনোনয়নের ভিত্তিতে, কাজেই এ তো গণতন্ত্রেরই তদানীন্তন রূপ!
প্রশ্ন হচ্ছে- রসুল (সা.) কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন? না। তিনি তো কম জনপ্রিয় ছিলেন না। তাকে সবাই বিশ্বাস করত, মান্যও করত। তিনি চাইলেই রাতারাতি নেতা বনে যেতে পারতেন। তিনি কি নেতা হয়ে আল্লাহর বিধান কায়েমের চেষ্টা করতে পারতেন না? তিনি কেন এই পদ্ধতি অনুসরণ করলেন না? করলেন না এই কারণেই যে, সেটা হবে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া। তাকে আরবের নেতা বানানোর প্রস্তাবও দিয়েছিলেন আবু জাহেল আবু সুফিয়ানরা। তাতেও তিনি রাজি হননি। তিনি মানুষকে কালেমার দিকে তওহীদের দিকে ডাক দিলেন। যারা তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন তাদেরকে কালেমার উপর ঐক্যবদ্ধ করলেন। একটি জাতি উম্মাহ তৈরি করলেন। তিনি বর্তমান ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর মতো কৌশলের নামে কোনো ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেননি। তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে জেহাদ ও কেতালের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয় পৃথিবীর যত নবী রসুল জাতিকে শাষণ করেছেন কেউই প্রচলিত সিস্টেমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না।
কেমন ছিল ইসলামে নেতা নির্বাচন পদ্ধতি:
ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, রসুলের (সা.) ওফাতের পর আবু বকর (রা.) কি খলিফা হবার জন্য নিজেকে নির্বাচিত করেছিলেন? তিনি কি বলেছিলেন যে আমাকে খলিফা নির্বাচিত করুন? আবু বকর কেবল চেয়েছিলেন নেতৃত্ব যেন আনসারদের মধ্যে না গিয়ে মুহাজিরদের মধ্যে থাকে। কারণ রসুলের (সা.) সান্নিধ্য যেমন তারা বেশি পেয়েছেন তেমনি তাঁর আদর্শও তাঁরা বেশি ধারণ করতেন। তাদের ত্যাগ-তিতীক্ষাও ছিল বেশি। সুতরাং মুহাজিররাই নেতৃত্ব দানের জন্য আনসারদের থেকে যোগ্য। পরবর্তীতে যখন সিদ্ধান্ত হলো যে, নেতৃত্ব মুহাজিরদের মধ্যেই থাকবে তখন তিনি ওমরের (রা.) নাম প্রস্তাব করেন।
কিন্তু ওমর (রা.) খলিফার দায়িত্ব নিতে আপত্তি জানান। তিনি আবু বকরকে (রা.) নিজের থেকে বিজ্ঞ ও যোগ্য মনে করেন। এরপর তিনি আবু বকরের (রা.) হাত ধরে তাঁর হাতে বায়াত নিলেন। তখন সবাই আবু বকরের (রা.) নেতৃত্ব মেনে নিলেন। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন। এটাও গণতন্ত্র আর এখন গণতন্ত্রের নামে যে চর্চা বর্তমানে করা হচ্ছে সেটাও গণতন্ত্র! দুটি কি এক? ইসলামের যোগ্য ব্যক্তিটিও নেতা হতে চাইতেন না আর গণতন্ত্রে অযোগ্য ব্যক্তিরাই নেতা হবার জন্য লালায়িত, নেতা হবার জন্য হেন পন্থা নেই যা এপ্লাই করে না।
রসুল (সা.) এর ওফাতের পরমুহূর্তে আবু সুফিয়ান আলীকে (রা.) ওয়াসওয়াসা দেন যে, তুমি রসুল (সা.) এর ব্লাড, তাঁর জামাতা, প্রথম সারির মুসলিম; খলিফা হবার হক একমাত্র তোমারই। এভাবে বিভিন্ন পরামর্শ দিতে থাকেন আলীকে (রা.)। কিন্তু যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আলী (রা.) তাতে কর্ণপাত না করে তাকে এমন পরামর্শ দিতে নিষেধ করে আবু বকর (রা.) এর হাতেই বায়াত গ্রহণ করেন।
আবু বকর (রা.) অসুস্থ হবার পর বিশিষ্ট কয়েকজন আসহাবের সাথে পরামর্শ করে ওমরকে (রা.) খলিফা নির্বাচনের কথা বিবেচনা করেন। তখন কি তিনি সকল মুসলিমের মত নিয়েছিলেন? নেন নি। অপরদিকে আবু বকর যখন ওমরকে খলিফা নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন, ওমর (রা) তা শুনে নিজেই বেঁকে বসেন, খলিফার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। আরো যোগ্য কাউকে নির্বাচনের অনুরোধ করেন।
এদিকে তালহা (রা.) ওমর (রা.) কে খলিফা নির্বাচনের সিদ্ধান্তের কথা শুনে রেগে-মেগে অস্থির। রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে খলিফাকে গিয়ে বলেন, আমিরুল মুমেনিন আপনি কি দেখেন নি যে, রসুল (সা.) এর সম্মুখেও ওমর সাধারণ মানুষের সাথে কেমন দুর্ব্যবহার করত? তারপরেও কেন তাকে খলিফার দায়িত্ব দিতে চাচ্ছেন আপনি?
খলিফা হবার আগে রগচটা ওমরকে (রা.) মুসলিমরা যতটা ভালোবাসতেন তার থেকে বেশি ভয় করতেন। এখনকার মতো তখন যদি ভোট হতো তাহলে ওমরকে কতজন ভোট দিতেন তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু আবু বকর (রা.) জনগণের থেকে ওমরকে (রা.) বেশি চিনতেন। তাই সঠিক মানুষটিকেই নির্বাচিত করেছিলেন তিনি। যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়।
ওসমানের (রা.) সময়ের ঘটনাও ব্যতিক্রম নয়। ওমর (রা.) আততায়ীর হাতে যখম হবার পর যে কজন সাহাবীর নাম খলিফা হবার জন্য নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একে একে পাঁচজনই তাদের দাবি ছেড়ে দিয়েছিলেন। নিজেদের থেকে ওসমানকে (রা.) বেশি যোগ্য মনে করেছিলেন তারা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন থেকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয় তখন থেকেই ইসলামের ধ্বংস শুরু হয়।
নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম বলে, নেতৃত্বের আকাক্সক্ষাই নেতৃত্ব দানে অযোগ্যতার প্রমাণ। প্লোটো বলেন, শাসনে অনিচ্ছুক শাসকই শ্রেষ্ঠ শাসক। আর যে শাসন করার লোভেই শাসক হয় সে হল নিকৃষ্ট শাসক।
আর শুরা পদ্ধতির কথা বলে যারা গণতন্ত্রকে ইসলামের নেতা নির্বাচনের পদ্ধতির সাথে তুলনা করে এক করে দেখতে চান তাদের প্রতি কথা হলো- আমার বাবার নাকের সাথে আপনার বাবার নাকের একটু মিলের কারণে আমার বাবা আপনার বাবা হয়ে যান না।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলামের নেতা নির্বাচন পদ্ধতিতে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই নেতা নির্বাচিত হয়। তবে সেখানে গণতন্ত্রের মতো দলবাজি, স্ট্যান্ডবাজি ও ক্ষমতার লালসা থাকে না। ইসলামে গণতন্ত্র থাকতে পারে কিন্তু গণতন্ত্রে ইসলাম থাকতে পারে না। বর্তমানে বিশ্বময় ইসলামি গণতন্ত্রের যে মার্কেটিং চলছে সেটা গণতান্ত্রিক ইসলাম। কিন্তু কোথাও ইসলামি গণতন্ত্র নেই। আর গণতান্ত্রিক ইসলাম ইসলামই নয়। কোথাও ইসলাম প্রতিষ্ঠা হলে তবেই সেখানে ইসলামি গণতন্ত্রের প্রশ্ন আসে।
তাছাড়া গণতন্ত্র কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সিস্টেম, নেতা নির্বাচনের পদ্ধতিমাত্র। পক্ষান্তরে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের যেমন স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাষনব্যবস্থা রয়েছে তেমনি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সিস্টেমও রয়েছে।
ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব কি না?
ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েই তারা রাজনীতির মাঠে আছে। তবে সরকার গঠন করলে ক্ষমতায় গিয়ে তারা ইসলামি বিধান প্রতিষ্ঠা করবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে।
ইসলাম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন তারা আল্লাহর দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠা করতে চান পশ্চিমাদের দেওয়া কর্মসূচিতে। তারা এত বল্দ নয় যে, আপনারা তাদের সিস্টেম ইউজ করে তাদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করে ফেলবেন। তারা হয়ত মনে করছে যে, গণতন্ত্র ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য বেস্ট পন্থা। কারণ এখানে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে, ঈমানী চেতনাকে উজ্জীবিত করে সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব। আর ক্ষমতায় একবার যেতে পারলেই কেল্লা ফতে, সব ইসলামিক করে ফেলব। কিন্তু বাস্তবতা বলে, এরকম চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে আসছে, ব্যর্থ হতে বাধ্য। গত ২শ বছরে এই চেষ্টাটা করা হয়েছে কিন্তু কেউ পারে নি। পারবেও না। কারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার ধারণাটা অনেকটা অন্যের জমিতে নিজের বাড়ি বানানোর মতো বোকামী।
আলজেরিয়ায়, ৮০-৯০% সমর্থন ছিল ইসলামি সালভেশন ফ্রন্টের। তারাও চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তীতে নিষিদ্ধ হয়েছে। তিউনেশিয়ায় ইসলামপন্থী দল আন্নাহাদাও ব্যর্থ হয়েছে। মিশরের ইখওয়ানুল মুসলেমিনের প্রভাব ছিল মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। ইখওয়ানুল মুসলেমিন সরকার গঠন করে ইসলামি বিধান প্রচেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতন হয়। এখন তারা সেদেশে নিষিদ্ধ। দলপ্রধান মুরসির ফাঁসি হয় পরবর্তীতে জেলে মারা যান তিনি।
আল্লাহর রসুল (সা.) যে প্রক্রিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠ সম্ভব নয়। সরকার হয়ত গঠন করতে পারে, সরকারের অংশও হতে পারে। কিন্তু সংবিধান চেঞ্জ করে আল্লাহর সংবিধান চালু করবে, এমন ইচ্ছা কখনোই পূরণ হবে না। যতই সংখাগরিষ্ঠের সূত্র ধরে আগাক না কেন। বড়জোড় সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযুক্ত করতে পারবে, এর বেশি না। যদি এমন কোনো প্রচেষ্টা চালায় তবে অবস্থা ইসলামি সালভেশন ফ্রন্ট, ইখওয়ানুল মুসলেমিনের মত হবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলো ইখওয়ানুল মুসলেমিন কিংবা ইসলামি সালভেশন ফ্রন্টের তুলনায় একটা ফোটার মতো। এত শক্তিশালী দল হয়েও তারা ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে আমাদের দেশের দলগুলোর সম্ভাবনা কতটুকু!
সবচেয়ে বড় কথা হলো, কেউ যদি আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলাম নিয়ে না দাঁড়ায় তাহলে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করবেন না। আর আল্লাহর সাহায্য ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
ইসলামী গণতন্ত্রের স্বরূপ:
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন কোনো সুযোগ নেই, যেখানে বিভিন্ন আদর্শের দল গঠন করা যাবে এবং বিভিন্ন মতবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যাবে। রসুলাল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা কখনোই নানামুখী আদর্শের উপর রাজনৈতিক দল গঠন করেননি। বরং মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলিম, আউস, খাজরাজের আটটি গোত্র, সেগুলোর অধীনে আরো তেত্রিশটি গোত্র এবং তিনটি ইহুদি গোত্র বনি কুরায়জা, বনি নাজির, বনি কাইনুকা ও তাদের অধীনে আরো বিশটি ছোট গোত্রকেও এক জাতিভুক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, বাদ-মতবাদ, সামাজিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শসহ সকল বিভেদের প্রাচীর ভেঙে মানুষকে এক জাতিভুক্ত হিসাবে ঐক্যবদ্ধ করা।
ইসলামে জাতির ঐক্য ধ্বংসকারী রাজনৈতিক দলাদলি নিষিদ্ধ। বহুদলীয় রাজনীতি ইসলামের ঐক্য চেতনার পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, বাদ-মতবাদ, সামাজিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শসহ সকল বিভেদের প্রাচীর ভেঙে মানুষকে এক জাতিভুক্ত হিসাবে ঐক্যবদ্ধ করা। আল্লাহ চান, মো’মেনরা যেন গলিত সীসার মত নিশ্চিদ্র ঐক্যের প্রাচীর গড়ে তোলে (সুরা সফ ৬১:৪), ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (তওহীদ) ধারণ করে (সুরা ইমরান ৩:১০৩)।
তবে রাষ্ট্রের মূলনীতি অর্থাৎ তওহীদভিত্তিক ঐক্যচেতনার প্রতি সম্মান ও আনুগত্য বজায় রেখে রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে জনগণের সমস্যাদি তুলে ধরার জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকতে পারে।