ইতিহাসের পাতা থেকে; কৌলিন্যপ্রথার বিরুদ্ধে ইসলামের আদর্শ

ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধগুলো কেবল হৃদয়ে হৃদয়ে বিস্তার লাভ করছিল, জাহেলিয়াতের প্রভাব পুরোটা কাটে নি, তখন আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে পূর্ব থেকে চলে আসা বিভিন্ন রকমের সমাজব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবে আভিজাত্য ও কৌলীন্য প্রথা বিদ্যামান ছিল। কিন্তু মহানবী (দ.) এর আগমনের পর এ প্রথার অবসান ঘটে। কারণ আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে স্পষ্ট বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী (সুরা হুজরাত ১৩)।” কিন্তু প্রথম দিকে আরবের অনেকেই তাদের গোত্রীয় আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে ইসলামের সাম্যের মানদ- গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল।
প্রাচীন গাসসান গোত্রের গোত্রপতির ছেলে যারা নিজেদেরকে যুবরাজই মনে করতেন, জাবালা ইবন আল আইহাম ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় হজ্জ করতে আসেন। হজ্জের অনুষ্ঠান পালনের সময় একজন অখ্যাতনামা বেদুঈন ভিড়ের মধ্যে তাঁর কাপড়ের প্রান্ত মাড়িয়ে দেয়। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে জাবালা লোকটার গালে চপেটাঘাত করেন। এর ফলে লোকটি ওমরের (রা.) নিকট বিচারের দাবি করলেন। অভিযোগের উত্তরে ওমর (রা.) জাবালাকে বললেন, তিনি ক্ষমা চাইলে সেই বেদুঈন হয়তো তাকে ক্ষমা করে দিবেন নয়তো তিনি বেদুঈনকে জাবালার গালে অনুরূপ চড় মারার অনুমতি দিবেন। জাবালা এমন কঠোর সাম্যনীতির অনুশাসন এড়াবার জন্য নিজের দেশে পালিয়ে যান এবং ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেন। তিনি ভেবেছিলেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ফলে শুধু একজন দলপতি হিসেবে তার মর্যাদা পূর্বের চেয়ে বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখলেন ভিন্ন চিত্র।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমরের (রা.) শাসনামলের এই ঘটনাটি থেকে একদিকে সাম্যের পতাকাবাহী খলীফার নিষ্ঠা অন্যদিকে প্রাচীনপন্থীদের গোত্রীয় সংস্কারের প্রতি অনমনীয় মনোভাব পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। দামেশক বিজয়ের পর আবু ওবায়দাহ (রা.) যখন হেমসের দিকে অগ্রসর হলেন তখন দামেশকের উত্তর দিকে তিন দিনের দূরত্বে অবস্থিত ‘বালা বাক্কা’ এর সন্নিকটে এ ঘটনার বর্ণনা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সহ একটি চিঠি খলিফা ওমর (রা.) থেকে তাঁর হস্তগত হয়। চিঠিটি নিচে খুরশীদ আহমদ ফারিক এর ‘ওমর (রা.)- এর সরকারী পত্রাবলি’ গ্রন্থ থেকে তুলে ধরা হলো।
“কোন ইলাহ নেই আল্লাহ ছাড়া। আর মোহাম্মদ (সা.) তাঁর রসুল”
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর বান্দা আমীরুল মু’মিনীন এর পক্ষ হতে আমীনুল উম্মত [রসুলাল্লাহ (সা.) প্রদত্ত আবু ওবায়দাহ (রা.)-এর সম্মানসূচক পদবী] – এর প্রতি; সালমুন আলাইকা। আমি সেই প্রভুর প্রশংসা করছি যিনি ব্যতীত আর কেউ উপাসনার যোগ্য নেই। আর তাঁর নবী মোহাম্মদ (সা.) এর প্রতি দরূদ ও সালাম।
আল্লাহর হুকুম এবং ইচ্ছাকে পরিবর্তন করতে পারবে না কেউই। লওহে মাহফুজে যার সম্পর্কে কাফির বলে লিখে দেওয়া হয়েছে তার ঈমান নসীব হতে পারে না কখনও। আপনার অবগতির জন্য লিখেছি যে, জাবালা ইবন আয়হাম গাস্সানী তার চাচাত ভাই ও স্বগোত্রীয় নেতৃবর্গসহ আমাদের কাছে (মদীনায়) এসেছিল। আমি তাদের অভ্যর্থনা করেছি। সবাই আমার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাদের ইসলাম গ্রহণে আমি আনন্দিত হয়েছি। কেননা তাদের মাধ্যমে আল্লাহ ইসলাম ও মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। কিন্তু অদৃশ্য পর্দার অন্তরালে যা লুক্কায়িত ছিল তা আমার জানা ছিল না।
আমরা হজের জন্য মদীনা হতে মক্কায় গেলাম। জাবালাহ সাতদিন পর্যন্ত বায়তুল হারামে তাওয়াফ করল। তাওয়াফকালে এক ফাযারী আরবের পায়ের নিচে তার চাদর পড়ে যাওয়ায় তা কাঁধ থেকে খসে পড়ে। জাবালাহ রাগত চোখে ফাযারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলল যে, “তোর অকল্যাণ হউক। তুই আল্লাহর ঘরের সামনে আমায় উলংগ করে দিলি।”
প্রতি উত্তরে ফাযারী বলল, “আল্লাহর কসম, আমি ইচ্ছা করে এরূপ করি নি।” এতদসত্ত্বেও জাবালাহ তাকে এমন জোরে চপেটাঘাত করে বসল যে, এতে তার নাক যখমী হয়ে গেল এবং তার সম্মুখের দাঁত চারটি ভেঙে গেল। ফাযারী আমার কাছে ফরিয়াদ নিয়ে আসল। আমি জাবালাহকে ডাকলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি তোমার ফাযারী ভাইকে থাপ্পড় মারলে কেন এবং তার দাঁত চারটি কেন ভেঙে দিলে? তা ছাড়া তার নাকে জখমই বা করলে কেন?”
জাবালাহ বলল, “সে পায়ের নিচে আমার চাদর ফেলে আমায় উলঙ্গ করে দিয়েছে তাই। আল্লাহর কসম, যদি বায়তুল্লাহর সম্মানের খেয়াল না হতো তাহলে ওকে আমি মেরেই ফেলতাম।”
আমি বললাম “তুমি অন্যায় করেছ, এখন হয়তো সে তোমায় মাফ করে দেবে। না হয় আমি তোমার থেকে এর বদলা গ্রহণ করবো।”
জাবালা বলল, “আমার থেকে কেসাস গ্রহণ করা হবে? অথচ আমি একজন বাদশাহ, আর সে একজন সাধারণ আরব নাগরিক।” উল্লেখ্য, এখানে কেসাস বলতে ফাযারী কর্তৃক একই প্রকার একটি চপেটাঘাত জাবালাকে প্রদান করা বোঝানো হয়েছিল।
আমি বললাম, “তোমরা উভয়েই মুসলমান। তুমি কেবল উত্তম চরিত্র বলেই তার উপর প্রাধান্য পেতে পার।”
জাবালাহ আমার কাছে পরের দিন পর্যন্ত সময় প্রার্থনা করল। আমি এ ব্যাপারে ফাযারীকে জিজ্ঞেস করলে, সে রাজী হয়ে গেল। যখন রাত্র হলো, জাবালাহ তার চাচাত ভাইদের সহ উষ্ট্রপৃষ্টে আরোহণ করে সিরিয়ার দিকে পলায়ন করে ‘কালবুত তাগিয়াহ’ (অবাধ্য কুকুর রোমসম্রাট) এর কাছে গিয়ে উঠল। আমার আশা, যদি আল্লাহর ইচ্ছা হয় তবে সে আপনাদের হাতে পড়বে।
হেমস বিজয়ের পর যাত্রা স্থগিত রাখবেন। সম্মুখে অগ্রসর হবেন না। যদি হেমসবাসীরা সন্ধি করে তবে তো উত্তম। অন্যাথায় তাদের সাথে য্দ্ধু করে যাবেন। আর কায়সারে রোমে হেড কোয়ার্টারে নিজেদের গুপ্তচর নিয়োগ করবেন এবং সিরিয়ায় অবস্থানরত আরবীয় (খ্রিস্টান)-দের সম্পর্কে সব সময় হুঁশিয়ার থাকবেন। আল্লাহর অনুগ্রহ আপনার ও সমগ্র মুসলমানদের উপর বর্ষিত হউক।”
[সংগ্রহ: মো. মোস্তাফিজুর রহমান শিহাব, সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ]।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ