আল বেরুনী ৯৭৩ খ্রি.-১০৪৮ খ্রি. (২য় পর্ব)

(প্রথম পর্বে প্রকাশের পর) সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং আল বেরুনী কয়েকবার সুলতানের সাথে ভারতে এসেছিলেন। তিনি তৎকালীন ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি দেখে বিস্মিত হন। পরবর্তীতে রাজসমর্থন নিয়ে ১০১৯-১০২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ভারতে অবস্থান করে সেখানকার জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে মিলিত হয়ে তাঁদের সঙ্গে ভূগোল, গণিত ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে মতের আদান প্রদান করে সেখানকার জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে মিলিত হয়ে তাঁদের সঙ্গে ভূগোল, গণিত ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে মতের আদান প্রদান করেন এবং সেখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল হিন্দ’। তৎকালীন সময়ের ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় অনুশাসন জানার জন্যে এটি একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। অধ্যাপক হামার নেহের লিখেছেন, “As a result of his profound and intimate knowledge of the country and it’s people, the author left us in his writing the wealth of information of undying interest on civili “ation in the sub-continent during the first half at eleven century.” আল বেরুনী ভারত থেকে গজনীতে প্রত্যাবর্তন করার কিছুদিন পরেই সুলতান মাহমুদ ইন্তিকাল করেন এবং তাঁর পুত্র সুলতান মাসউদ ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান মাসউদও আল বেরুনীকে খুব সম্মান করতেন। এ সময়ে আল বেরুনী রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘কানুনে মাসউদী’। এ সুবিশাল গ্রন্থখানা সর্বমোট ১১ খণ্ডে সমাপ্ত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গ্রন্থটিতে আলোচনা করা হয়। ১ম ও ২য় খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে; ৩য় খণ্ডে ত্রিকোণমিতি; ৪র্থ খণ্ডে- Spherical Astronomy; ৫ম খণ্ডে গ্রহ, দ্রাঘিমা, চন্দ্র, সূর্যের মাপ; ৬ষ্ঠ খণ্ডে-সূর্যের গতি; ৭ম খণ্ডে চন্দ্রের গতি; ৮ম খণ্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমান ও গ্রহণ; ৯ম খণ্ডে-স্থির নক্ষত্র; ১০ম খণ্ডে ৫টি গ্রহ নিয়ে এবং একাদশ খণ্ডে-আলোচনা করা হয়েছে জ্যোতিষশাস্ত্র সম্পর্কে। এ অমূল্য গ্রন্থটি সুলতানের নামে নামকরণ করায় সুলতান মাসউদ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে আল বেরুনীকে বহু মূল্যবান রৌপ্য সামগ্রী উপহার দেন। কিন্তু আল বেরুনী অর্থের লোভী ছিলেন না। তাই তিনি এ মূল্যবান উপহার রাজকোষে জমা দিয়ে দেন। আল বেরুনী বহু জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতার ইতিহাস, মৃত্তিকা তত্ত্ব, সাগর তত্ত্ব এবং আকাশ তত্ত্ব মানবজাতির জন্যে অবদান রেখে গেছেন।
ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের মতে বেরুনী নিজেই বিশ্বকোষ। একজন ভাষাবিদ হিসেবেও তিনি ছিলেন বিখ্যাত। আরবী, ফারসী, সিরিয়া, গ্রীক, সংস্কৃত, হিব্রু প্রভৃতি ভাষার উপর ছিল তাঁর পাণ্ডিত্য। ত্রিকোণমিতিতে তিনি বহু তথ্য আবিষ্কার করেছেন। কোপার্নিকাস বলেছিলেন, পৃথিবীসহ গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে অথচ কোপার্নিকাসের জন্মের ৪২৫ বছর পূর্বেই আল বেরুনী বলেছেন, “বৃত্তিক গতিতে পৃথিবী ঘোরে।” তিনি টলেমি ও ইয়াকুবের দশমিক অংকের গণনায় ভুল ধরে দিয়ে তাঁর সঠিক ধারণা দেন। তিনিই সর্বপ্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণা এবং আর্টেসীয় কূপ এর রহস্য উদঘাটন করেছিলেন।
জ্যোতিষ হিসেবেও তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল অত্যাধিক। তিনি যেসব ভবিষ্যৎবাণী করতেন সেগুলো সঠিক হতো। তিনি শব্দের গতির সাথে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন। তিনি এরিস্টটলের ‘হেভেন’ গ্রন্থের ১০টি ভুল আবিষ্কার করেছিলেন। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্কও তিনি আবিষ্কার করেন। সূত্র ও শুদ্ধ গণনায় আল বেরুনী একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন যার বর্তমান নাম The Formula of Interpolation. পাশ্চাত্যের পণ্ডিতগণ এটিকে নিউটনের আবিষ্কার বলে প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ নিউটনের জন্মের ৫৯২ বছর পূর্বেই আল বেরুনী এটি আবিষ্কার করেন এবং একে ব্যবহার করে বিশুদ্ধ সাইন তালিকা প্রাপ্ত করেন। এরপর এ ফর্মূলা পূর্ণতা দান করে তিনি একটি ট্যানজেন্ট তালিকাও তৈরি করেন। তিনিই বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা হয়, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হবে কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না; এ সত্য আবিষ্কার করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানেও তাঁর অবদান ছিল সর্বাধিক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনি একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থে তিনি বহু রোগের ঔষধ তৈরির কলাকৌশল বর্ণনা করেছেন। অধ্যাপক হামারনেহ বলেছেন, “শুধু মুসলিম জগতেই নয় পৃথিবীর সমস্ত সভ্য জগতের মধ্যে আল বেরুনীই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি খ্রিষ্টপূর্বকাল থেকে তাঁর সময়কাল পর্যন্ত ঔষধ তৈরি করার পদ্ধতি ও তাঁর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বিজ্ঞানী আল বেরুনী বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। মৃত্যুর ১৩ বছর পূর্বে তিনি তাঁর রচিত গ্রন্থের যে তালিকা দিয়েছেন সে অনুযায়ী তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪টি। পরবর্তীতে ১৩ বছরে তিনি আরো গ্রন্থ রচনা করেন। উপরে উল্লেখিত গ্রন্থগুলো ছাড়া উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে- ‘কিতাবুত তাফহিম’। এটি ৫৩০ অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে অংক, জ্যামিতি ও বিশ্বের গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ‘ইফরাদুল ফাল ফিল আমরিল আযযাল’- এটিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছায়াপথ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ‘আল আছারুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালিয়া’-এটিতে পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ‘যিজে আবকন্দ’ (নভোমণ্ডল ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত), ‘আলাল ফি যিজে খাওয়ারিজমি’ (যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বিশাল আকৃতির শতাধিক গ্রন্থ এক ব্যক্তির পক্ষে রচনা করা যে কত দুঃসাধ্য ব্যাপার তা ভাবতেও অবাক লাগে। আল বেরুনী ছিলেন সর্বকালের জ্ঞানী শ্রেষ্ঠদের শীর্ষ স্থানীয় এক মহাপুরুষ। তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৌলিক আবিষ্কারের উপরই গড়ে উঠেছে আধুনিক বিজ্ঞান। যদিও আল বেরুনী আজ বেঁচে নেই; কিন্তু তাঁর নাম জেগে থাকবে উজ্জ্বল তারকার ন্যায়। দশম শতাব্দীর শেষ এবং একাদশ শতাব্দীতে যার একান্ত সাধনায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিগন্ত এক নব সূর্যের আলোতে উদ্ভাসিত হয়েছিল তিনি হলেন আল বেরুনী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক। তিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহই সকল জ্ঞানের অধিকারী।
এ মনীষী ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। আস্তে আস্তে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। কোন চিকিৎসাই তাঁকে আর সুস্থ করে তুলতে পারে নি। অবশেষে ৪৪০ হিজরীর ২ রজব মোতাবেক ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার ৭৫ বছর বয়সে আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরকম বহু প্রতিভাধর মনীষীর কথা এ যুগে চিন্তাই করা যায় না। কারণ তখন ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ। আর এখন মুসলিম পণ্ডিতরা তাদের যাবতীয় চিন্তা-গবেষণা বিনিয়োগ করেছে ব্যক্তিগত জীবনের মাসলা-মাসায়েলের পেছনে। আজ তারা অধঃপতিত, অপমানিত, নিকৃষ্ট জাতি। যতদিন জাতি তাদের বোধশক্তি ফিরে না পাবে, ততদিন তাদের এ দুর্দশা কাটবে না, জন্ম হবে না কোন মহাবিজ্ঞানীর। (সংগ্রহ: মো. আবু ফাহাদ, আবুল কালাম আজাদ সম্পাদিত ‘শত সেরা মনীষী’ গ্রন্থ থেকে)

আরও পড়ুন:

আল বেরুনী ৯৭৩ খ্রি.-১০৪৮ খ্রি. (প্রথম পর্ব)

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ