প্রশ্ন/উত্তর

হেযবুত তওহীদ অরাজনীতিক সংস্কারমূলক সামাজিক আন্দোলন। বর্তমানে ডানপন্থী-বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ইত্যাদি বিভিন্ন ফরমেটের দল আছে, সেগুলোর গঠনতন্ত্র, কর্মসূচি ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করা হলে হেযবুত তওহীদ ইসলামিক দল নয় আবার ধর্মনিরপেক্ষ দলও নয়। হেযবুত তওহীদের বক্তব্য, দর্শন, কর্মসূচি, কর্মপদ্ধতি সবই এর নিজস্ব।

আমাদের আন্দোলন অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, পশ্চিমা বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’দাজ্জালের অপশক্তির বিরুদ্ধে, সর্বপ্রকার অনৈক্যের বিরুদ্ধে, বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে, অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে অযৌক্তিক বিশ্বাস, কথা ও আচরণের বিরুদ্ধে, এক কথায় সকল অধর্মের বিরুদ্ধে। আমাদের আন্দোলন সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, ঐক্যের পক্ষে, শান্তির পক্ষে।

যেহেতু হেযবুত তওহীদ একটি অরাজনীতিক সংস্কারমূলক আন্দোলন, তাই মাননীয় এমামুয্যামান এ আন্দোলন গঠন করার পর থেকে আজ পর্যন্ত সর্বশ্রেণির হাজার হাজার লোক এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। অনেকে কেবল সমর্থন দিয়েছেন, অনেকে এ সত্য প্রচারে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন। কিন্তু কিছুদিন কাজ করার পর তাদের সিংহভাগই আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এই নিষ্ক্রিয়তার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে, হেযবুত তওহীদের কাজ স্বতস্ফূর্তভাবে মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করে করতে হয়। এটা ইসলামের নীতি যে, ইসলামের কাজ করে, এবাদত করে এর কোনো পার্থিব বিনিময় গ্রহণ করা যাবে না। নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে, সময় দিয়ে কাজ করতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ যারা নিতে পারেন তারাই হেযবুত তওহীদে সক্রিয়ভাবে টিকে থাকেন। এভাবে বহু এসেছে, বহু চলে গেছে। অতি সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি যখন আমরা ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ, অপরাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান নিয়ে মাঠে নেমেছি, পত্রিকা আর ডকুমেন্টারি ফিল্ম নিয়ে কাজ করছি, আমাদের বক্তব্য যখন সাধারণ মানুষ সরাসরি জানতে পারছে তখন এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দু হাত তুলে আমাদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানিয়েছেন। যদি জনসমর্থনের কথা বলেন এই লক্ষ লক্ষ জনতাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত। যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তারাও সত্যের অংশীদার। তবে সক্রিয় সদস্য যারা সার্বক্ষণিকভাবে আন্দোলনের কাজ করছে, এমন কয়েকশত লোক আমাদের আছে। এর বেশি হবে না।

এই প্রশ্নটা আমাদেরকে প্রায়ই করে থাকেন এবং করাটা খুব স্বাভাবিক। যহেতু অনেকগুলো ইসলামী সংগঠন আছে আমাদের দেশে যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের থেকে অর্থ পেয়ে থাকেন। তাই আমাদের ক্ষেত্রেও এ প্রশ্নটি তোলা আমরা অযৌক্তিক মনে করি না। যার অর্থের উৎস গোপন এবং অবৈধ তার প্রতি কেউ নৈতিক আস্থা রাখবে না এটা স্বাভাবিক কথা।

আমরা আমাদের এমামুয্যামান থেকে যেটা শিখেছি তা হচ্ছে যে, মানুষের জীবন এবং সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার মধ্যেই রয়েছে মোমেনের জীবনের এবং মানুষের জীবনের ইহকাল এবং পরকালের সফলতা। মাননীয় এমামুয্যামানের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্য মানুষের কল্যাণে, আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য যারা ‘হেযবুত তওহীদ’ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তারা প্রায় সবাই সমাজের খেটে খাওয়া শ্রেণির দরিদ্র সাধারণ মানুষ, যাদের তিনবেলা অন্ন সংস্থান করাই কষ্ট হয়ে যায়। তথাপিও তারা তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ আন্দোলনের কাজে ব্যয় করে থাকেন এবং বিবিধ ফান্ডে জমা দেন। অতীতে যারাও বা কিছুটা অবস্থাসম্পন্ন ছিলেন বা ভালো চাকরি করতেন তাদের অধিকাংশই নিজেদের জমি-জমা, সম্পদ এমনকি ঘরবাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়ে মানবতার কল্যাণে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তারাও এখন হকারি করে চলেন, রিক্সা চালান, কায়িক শ্রমের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং সেখান থেকেই আন্দোলনের ব্যয়ভার বহনে সহযোগিতা করেন। আমাদের এমামুয্যামানও তাঁর সমস্ত কিছু এ আন্দোলনের জন্য দান করে গেছেন। তারপর যখন কোনো সভা হয়, সেমিনার হয় বা কোনো বই ছাপানো দরকার হয়, হ্যান্ডবিল প্রয়োজন হয় তখন তারা উদ্যোগ নিয়ে টাকা তুলে তার ব্যয় নির্বাহ করছেন।

অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়েই মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। এখন আমাদের এই উত্তরে যদি কেউ সন্তুষ্ট না হন তাহলে আমরা বলব, আপনি আমাদের সঙ্গে একটু থাকুন এবং স্বচক্ষে দেখুন; আমরা যা খাই সেটাই আপনারা খাবেন। দেখুন, আমরা আসলে কিভাবে আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনা করি। বিদেশ থেকে অথবা কোনো বিশেষ মহল থেকে অর্থ আসে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন আল্লাহর রহম হেযবুত তওহীদের বেলায় চলে না। কারণ, হেযবুত তওহীদ পরিচালনার নীতি হিসেবে এমামুয্যামান শুরুতেই নিয়েছিলেন যে আমরা বাহিরের কারও কাছ থেকে কোনরূপ অর্থ গ্রহণ করব না। এ পর্যন্ত আল্লাহর রহমে আমরা বাহিরের কারও কাছ থেকে এক পয়সাও নেই নি। তার অর্থ এই নয় মানবতার কাজ আমাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে অন্য অর্থসম্পন্ন লোকেরা করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন। কিন্তু আমরা আমাদের কাজের বিনিময়ে কোনো অর্থ নিব না। আয় রোজগারের ক্ষেত্রে আন্দোলনের নীতি হল কর্মক্ষম আমাদের কেউ বেকার থাকতে পারবে না, তাদেরকে কোন না কোন কর্ম করতে হবে। এজন্য এখানে অবৈধ অর্থের আগমন অসম্ভব ইনশাআল্লাহ।

, আমাদের পিছনে অনেক বড় শক্তি আছে। বিরাট বিশাল শক্তি আছে। অসম্ভব, অসীম শক্তি আছে। এত বড় শক্তি পেছনে না থাকলে আমরা এই বিশ্বজোড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবনেও দাঁড়াতে পারতাম না। আমাদের কি আছে? কিচ্ছু নেই। সমাজে আমাদেরকে কেউ চেনে না। আমাদের কোনো পরিচিতি নাই, আমরা সাধারণ পরিবারের লোক সবাই। আমাদের তেমন অর্থনৈতিক সামর্থ্যও নাই। গরিব নিঃস্ব লোক সবাই। আমরা দাঁড়িয়েছি এই পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা দাজ্জালের বিরুদ্ধে, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, এই পাহাড় পরিমাণ অন্ধকারের বিরুদ্ধে। যমুনা নদীর স্রোতকে উল্টে দেয়ার মতো প্রায় অসম্ভব কাজ নিয়ে আমরা দাঁড়িয়েছি। আমাদের পিছনে এই বিরাট শক্তি হলেন মহান রাব্বুল আলামিন। যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন, যিনি একটি অণু পরমাণু থেকে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। যিনি ‘কুন’ শব্দ দিয়ে সব কিছু সৃষ্টি করেন এবং যিনি একদিন সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিবেন। যিনি প্রত্যেকটা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন। আল্লাহ ভরসা, হাসবুন আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এত বড় শক্তি আমাদের সঙ্গে আছে, আমরা কাউকে পরোয়া করি না। এজন্য বলি আমরা বলি কোর’আনের ভাষায় যত পারো ষড়যন্ত্র করো আমাদেরকে বিরাম দিয়ো না।

আমরা মনে করি বিভিন্ন তরিকা, মাজহাব, ফেরকার নামে দুঃখজনক বিভাজন সৃষ্টি করে জাতিটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক আল্লাহ, এক রসুল, এক কোর’আন, এক জাতি হওয়ারই কথা ছিল। সমস্ত পৃথিবীতে ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহর রসুল যে জাতিটি গঠন করলেন সে জাতিটাকে তিনি সংগ্রামের দিকে পরিচালিত করে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। তারপর স্ত্রী, পুত্র পরিজন, সহায়, সম্পত্তি সব কিছু কোরবান করে দিয়ে সেই উম্মতে মোহাম্মদীর সদস্যরা দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়লেন। তারা অর্ধ পৃথিবীতে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। একটা পর্যায়ে এসে এ উম্মতে মোহাম্মদী তাদের উদ্দেশ্য ভুলে গেল। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ করে শিয়া-সুন্নি, শাফেয়ী-হাম্বলি হলো, নকশাবন্দিয়া, মুজাদ্দেদিয়া ইত্যাদি হলো। তারা আর উম্মতে মোহাম্মদী রইলেন না, এক জাতি রইলেন না। আল্লাহ তাদেরকে লানত দিলেন। ফলে তারা এখন সমস্ত দুনিয়ায় অন্য জাতিগুলোর গোলাম। তারা আজকে আল্লাহর গজবের বস্তু। কাজেই আমরা হেযবুত তওহীদ কোনো নির্দিষ্ট তরিকাপন্থি না। আমরা প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হবার চেষ্টা করছি, কারণ উম্মতে মোহাম্মদীর জন্যই জান্নাত সুনিশ্চিত, আল্লাহর রসুল তাদেরকেই শাফায়াত করবেন। 

হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী নিজস্ব কোন সামরিক নীতি গ্রহণ করেন নাই, তিনি মহানবীর নীতি অর্থাৎ ইসলামের রূপটাকেই তুলে ধরেছেন।

আল্লাহর তওহীদ ভিত্তিক সত্যদীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার নীতি হচ্ছে জেহাদ। আদর্শিক লড়াই যেকোনো যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা জেহাদের অন্তর্ভুক্ত, এরপর আছে সশস্ত্র যুদ্ধ যাকে কেতাল বলা হয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নীতি যে জেহাদ তার মধ্যে আদর্শিক লড়াই ও সামরিক লড়াই উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। আদর্শিক লড়াই যে কেউ করতে পারে কিন্তু সশস্ত্র যুদ্ধ ইসলামের নীতি মোতাবেক কেবল সার্বভৌম রাষ্ট্র করতে পারে, ব্যক্তি বা দল সেটা করতে পারে না। করলে তা অবৈধ হবে। কিন্তু আদর্শিক ও সামরিক যুদ্ধ উভয়টাই ইসলামের নীতি, যখন যেটা প্রয়োজন সেটাই প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য আসে নি, এর আওতা সমগ্র মানবজাতি ও সমগ্র বিশ্ব। উম্মতে মোহাম্মদীর দৃষ্টিভঙ্গিও তাই বিশ্বকেন্দ্রিক হতে হবে। কিন্তু সমগ্র বিশ্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠা একবারে হওয়া সম্ভব নয়, যেহেতু তা চিরকালই বিভিন্ন সার্বভৌমত্বের অধীনে খণ্ডিত অবস্থায় আছে। শেষ নবীর আনীত জীবনব্যবস্থাটি আকীদাগতভাবে সমস্ত দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠার নীতি হলো সামরিক। খেয়াল করলে দেখবেন, এ প্রসঙ্গে প্রতিবার এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী সমস্ত দুনিয়াতে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটা আসলে এমামুয্যামানের ব্যবহার না, আল্লাহ কোর’আনে ‘ফিল আরদ’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। সমগ্র পৃথিবীতে, সকল জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে কেবল ইসলামই নয়, যে কোনো আদর্শ বা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে এই সামরিক নীতি গ্রহণ করতে হয়েছে, সেটা সাম্যবাদই হোক, রাজতন্ত্রই হোক বা গণতন্ত্রই হোক। প্রচার দ্বারা, যুক্তিতর্ক দ্বারা মাহাত্ম্য বর্ণনা করে হয়তো একটি ব্যবস্থা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সমস্ত দুনিয়া জুড়ে, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের সমস্ত জনপদে, পাহাড়ে, সমতলে, মরুভূমি-বনাঞ্চল-দ্বীপাঞ্চলের মানুষকে একটি সিস্টেমে আনতে হলে সেটা প্রচারের দ্বারা অসম্ভব। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশে গণতন্ত্র নেই সেখানে পশ্চিমারা গণতন্ত্র আনার নামে সামরিক নীতিই প্রয়োগ করছে। বলতে পারেন এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। তবে প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনসাধারণকে মোটিভেট করেও কিছু কিছু এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। উদাহরণ: মদীনা। অন্য অনেক এলাকাতেও পরবর্তীতে বিনা যুদ্ধে ইসলাম (শান্তি) প্রতিষ্ঠা করা গেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুদ্ধ হয়েছে। তাই ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামরিক পদক্ষেপের গুরুত্ব কোনো মুসলিম বা সত্যনিষ্ঠ মানুষ অস্বীকার করতে পারবে না, করলে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ এটি কোর’আনে বলেছেন। সমস্ত পৃথিবীতে যতক্ষণ একটি মানুষও কষ্টে থাকবে, একটি জনপদেও ফেতনা থাকবে ততক্ষণ উম্মতে মোহাম্মদীর উপর স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শেষ হবে না। এই সত্যটিই এমামুয্যামান তাঁর বইতে তুলে ধরেছেন। সকল নবী ও রসুল এসেছেন মানুষকে অশান্তি থেকে মুক্তি দিতে, তাঁদের জাতির উপরেও সেই একই দায়িত্ব বর্তায়। বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় ঘটলে এ কারণেই জাতিসংঘসহ অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও হস্তক্ষেপ করে, প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপও নেয়, (যদিও তাদের মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন)। সুতরাং শান্তির লক্ষ্যে যুদ্ধ সর্বযুগে কর্তব্য বলে স্বীকৃত।

আল্লাহ বলেছেন, সমস্ত পৃথিবীতে সশস্ত্র সংগ্রাম কর যতক্ষণ না ফেতনা দূর হয়ে দীন (শান্তিময় জীবনব্যবস্থা যা ফেতনার বিপরীত) প্রতিষ্ঠিত হয় (সুরা আনফাল ৩৯)। কাজেই এমামুয্যামান বইতে যে কথাটি বলেছেন, এর তাৎপর্য হলো একটা অঞ্চল না, একটা এলাকাতে না, সমস্ত দুনিয়াময় ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং তা সম্পূর্ণরূপে করতে হলে সামরিক ছাড়া আর কোনো ভাবে সম্ভব নয়। আপনি আলোচনা করে মাহাত্ম্য বর্ণনা করে, যুক্তি দিয়ে বই লিখে হয়ত একটি নির্দিষ্ট কিছু লোককে এই সত্যের পথে আনতে পারবেন, কিন্তু সমস্ত দুনিয়ার মানুষকে আনা অসম্ভব। পৃথিবীর কোন মতবাদ এই পর্যন্ত তা পারে নি। সেই জন্য আল্লাহ অতি প্রাকৃতিক, অতি যৌক্তিক এই নীতিটি শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশনে উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য নির্ধারণ করেছেন আর এমামুয্যামান সেটাই উল্লেখ করেছেন। যারা ইসলামের যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বলে অপপ্রচার করে, তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে তাদের দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সহিংস পন্থায় বহুদূর যাওয়া যায়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। যেমন ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু এদেশের অধিকাংশ লোকের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়া হয় নাই। অবশেষে পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধ সামরিক মোকাবেলার দ্বারাই পাকিস্তানকে পরাভূত করা গেছে। এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। আমি যেটা বুঝানোর চেষ্টা করছি যে, সমস্ত দুনিয়াময় একটা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শেষ পর্যন্ত সামরিক নীতি লাগবে। কারণ একটি ছোট এলাকা হলে কথা ছিল, বিষয়টা সারা দুনিয়ার। পুরো দুনিয়াবাসীকে আলোচনা করে, বুঝিয়ে শুনিয়ে একটি সিস্টেমের মধ্যে আনতে পারবে না, মুখের কথায় এত বড় কাজ হবে না, এটা অসম্ভব। কারণ অধিকাংশ মানুষই তাদের অভ্যস্ত বিশ্বাসের প্রতি যুক্তিহীন ও অন্ধ থাকে। বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে একটি আদর্শকে সবাই মেনে নেয় না। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতা কেউ বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দেয় না। পুরো জনগোষ্ঠী ইন্টেলেচুয়াল হলে একটা কথা ছিল। তাই পৃথিবীর সমস্ত আদর্শ যথা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সবকিছুই সামরিক পন্থাতেই বিজয় লাভ করছে। কাজেই এটা একটি প্রাকৃতিক নীতি, এটা ইসলামেরও নীতি। ইসলামের একটি নাম তাই দীনুল ফিতরাহ বা প্রকৃতিনির্ভর জীবনব্যবস্থা। এই সত্যকে কোনো সত্যনিষ্ঠ মানুষ অস্বীকার করতে পারবে না।

মুমিনের সংজ্ঞা আর বৈশিষ্ট্য এই দুইটাকে অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। সুরা মুমিনুনের প্রারম্ভে যেটা আছে সেটা হলো বৈশিষ্ট্য, আর সুরা ‘হুজুরাতের’১৫ নম্বর আয়াতে আছে মুমিনের সংজ্ঞা। সংজ্ঞা হলো, আল্লাহ বলেছেন, মু’মিন শুধু তারাই, যারা আল্লাহ ও রসুলের প্রতি বিশ্বাস ধারণ করে, এর উপর দৃঢ়পদ থাকে এবং জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে। (সুরা হুজরাত ১৫)। অর্থাৎ যারা সত্যের পক্ষে এবং মিথ্যার বিপক্ষে অবস্থান নেবে এবং নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে মানবতার কল্যাণসাধনে আত্মনিয়োগ করবে তারাই মুমিন। এই কাজগুলো যিনি করবেন তাঁর চরিত্রে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হবে যেগুলো তার ব্যক্তিত্বে প্রকাশিত হবে। যেমন সুরা মু’মিনুন এ আছে, মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী-নম্র, যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত, যারা যাকাত দান করে থাকে এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে সাবধান থাকে এবং যারা তাদের নামাযসমূহের খবর রাখে। সুরা ‘আহযাবের’৩৫ নন্বর আয়াতে বলেছেন যে, আনুগত্যকারী, বিনীত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, দানশীল, সিয়াম পালনকারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী মুমিন-মুসলিম পুরুষ ও নারীর জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রেখেছেন। এমনি করে খুঁজলে কোর’আনে মুমিনের ৩০ টিরও বেশি চারিত্রিক গুণাবলীর কথা আমরা জানতে পারি। যে মোমেনের চরিত্রে এই গুণগুলো বিকশিত হবে, যত বেশি বিকশিত হবে তিনি মুমিনদের মধ্যে তত উচ্চ স্তরে উন্নীত হবেন। কিন্তু মোমেনের খাতায় নাম ওঠাতে হলে প্রথমে সংজ্ঞা পূরণ করতে হবে। আগে স্কুলে ভর্তি হতে হয়, তারপরে কেউ ভালো ছাত্র হয় কেউ খারাপ ছাত্র হয়। এগুলো হচ্ছে তাদের বৈশিষ্ট্য কিন্তু ছাত্র হতে হলে ভর্তি হতে হবে। এটা ছাত্রের সংজ্ঞা। তেমনি মোমেনের সংজ্ঞা হচ্ছে সুরা হুজুরাতের ১৫ নম্বর আয়াত। এখন কেউ যদি বৈশিষ্ট্যগুলিকেই মুমিন হওয়ার শর্ত মনে করেন, সেক্ষেত্রে নবী-রসুল ছাড়া পৃথিবীতে কোনো মানুষই এই সবগুলো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এক জীবনের সাধানায়ও পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারবে না, অতএব মুমিনও হতে পারবে না কেউ, জান্নাতেও যেতে পারবে না। কাজেই এটা অসম্ভব।

আমরা ঢালাওভাবে জাতিকে কাফের, মোশরেক বলছি না।  হেযবুত তওহীদ বলছে, জাতি কার্যত কাফের-মোশরেক হয়ে গেছে। এখানে কিন্তু আলেমরা দুটো ভাগ করেছেন, যেমন শেরকের ক্ষেত্রে বলা হয় আমলগত শেরক আর বিশ্বাসগত শেরক। আমরা বলি, জাতির যে ব্যক্তিগণ আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, যারা অন্যান্য বাধ্যতামূলক বিষয় যেমন নবী-রসুল, কেতাব, হাশর, তকদির ইত্যাদিতে বিশ্বাস করেন তারা বিশ্বাসগতভাবে মুমিন দাবি করতে পারেন, কিন্তু তাদের আমল বা কাজকে বিবেচনায় নিলে অর্থাৎ কার্যত তারা কাফের ও মোশরেক ছাড়া কিছুই না। মক্কার কাফেররাও কিন্তু তাদের মত আল্লাহয় বিশ্বাস করতো, নামাজ, রোযা, হজ্ব, কোরবানি ইত্যাদি আমল করত, কিন্তু জাতীয় জীবনে আল্লাহর বিধান মানতো না, তাই তারা কাফের মোশরেক ছিল। একইভাবে এই জাতিটিরও আল্লাহ-রসুলের প্রতি বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও, কার্যত তারা কাফের। কারণ তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও দীনকে প্রত্যাখ্যান করে পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতার তৈরি জীবনব্যবস্থা ও মূল্যবোধকে জাতিগতভাবে বরণ করে নিয়েছে। জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখান করার কারণে এরা কাফের হয়ে গেছে। এটা আমাদের কথা না, আল্লাহর কথা এবং আল্লাহর রসুল যে কারণে আবু জাহেল, আবু লাহাবদের কাফের বলেছেন সেই একই কারণে আমরা এ জাতিকে কার্যত কাফের ও মোশরেক বলছি।

হ্যাঁ। সৃষ্টি বা ক্রিয়েচার হিসাবে পৃথিবীর সমস্ত গরু যেমন এক জাতি, তেমনি পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এক জাতি। এই হিসাবে আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্তু গরুরা গরুদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না, একের অধিকারে অন্যে হস্তক্ষেপ করছে না। মানুষ সেটা করছে তাই কার্যত তারা এক জাতি নেই, তারা হাজার হাজার দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। এদের সবাইকে একতাবদ্ধ না করা গেলে রক্তপাত, হানাহানি বন্ধ হবে না- এটাই আমরা বলতে চাই। আমরা পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতিকে বলছি যে, তোমরা এক জাতি আরেক জাতিকে হামলা করো না, ধ্বংস করো না, খনিজ সম্পদ লুটে নিও না, পানি আটকে রেখে কষ্ট দিও না, সেও তোমার ভাই, সেও মানুষ। আল্লাহ সৃষ্টি আলো, বাতাস, পানিতে তোমার যেমন অধিকার তেমনি তারও অধিকার। তুমি যে আল্লাহর সৃষ্টি, সেও ওই আল্লাহরই সৃষ্টি। তোমরা উভয়ই আদম-হাওয়ার সন্তান। ভাই-ভাই লড়াই করলে পিতা-মাতা যেমন খুশি থাকতে পারে না তেমনি তোমাদের ভ্রাতৃঘাতী লড়াই দেখে তোমাদের আদি পিতা-মাতা কষ্ট পাচ্ছেন। তোমরা এক জাতি। আমরা সকলের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করতে চাই যে, অনুভূতির দিক থেকে সকল মানুষই এক জাতি।

তখন মানুষ চিন্তা করবে যে, তাদের বর্ডার তারা রাখবে কিনা, দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝে কোনো বেড়া থাকবে কি থাকবে না, সেটা সময়ই বলবে। এখানে তো বর্ডার তুলে ফেলার বা সরকার সরিয়ে ফেলার কোনো প্রশ্ন আসছে না। আমরা তো আসল কাজটিই করতে পারছি না। আমরা চাই একজাতির ধারণা সৃষ্টি করতে। বর্তমানে আমেরিকানরা চিন্তা করছেন ইরাকিরা মরলে মরুক, আমেরিকানরা বেঁচে থাকলেই হলো, আবার ভারতীয়রা হয়তো ভাবছেন, পাকিস্তানিরা মরলে মরুক, আমরা বাঁচলেই যথেষ্ট। আমরা এই ভাবনাটাকে অস্বীকার করে, আমরা ভাবতে চাই, তারাও আমার ভাই। আমার ভাই মরুক এটা আমি চাই না। এই ধারণাটা সবার মধ্যে আসলে মনের মধ্যে যে বর্ডার সেটা লুপ্ত হয়ে যাবে, তখন কাঁটাতারের বর্ডার কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারবে বলে মনে করি না। তখন একদেশের সীমানায় নদীতে বাধ দিয়ে ভাটির দেশকে মরুকরণ করা হবে না। সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ। আমাদের নিজেদের দেশের মধ্যে তো কোনো বর্ডার নেই। তাহলে আগে আমরা এই ষোল কোটি এক হই না কেন? আমাদের মধ্যেও তো এই ভ্রাতৃত্বের ধারণা নেই। আমরা ভাবি অমুকে আওয়ামী লীগ, অমুকে বিএনপি, অমুকে হিন্দু, অমুকে চাকমা। আগে তাদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হতে হবে যে, আমরা ভাই ভাই। আজ হিন্দুর ঘরে মুসলিম খায় না, প্রতিবেশী বাঙালির ঘরে আগুন দেয় চাকমা, চাকমাকে আক্রমণ করে বাঙালি। আগে এই দেওয়াল ভাঙতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, স্রষ্টার কোনো জাত নেই, তাই মানুষেরও কোনো জাত নেই। সবাই একজাতি, কেউ উপজাতি নয়, কেউ সংখ্যালঘু নয়। এক মানুষের ঘরে আরেক মানুষ খেলে কারো জাত যাবে না। এই শিক্ষাটা ব্যাপকভাবে প্রসার করে আমরা ধারণাগতভাবে মানবজাতিকে একজাতি করতে চাই।

আমাদের নবীজী এসেছেন সমস্ত দুনিয়ার মানুষের জন্য। আল্লাহ বলছেন, “হে মুহাম্মদ (দ.)! ঘোষণা করে দেও, ওহে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি মহান আল্লাহর রসুল।” (সুরা আরাফ-১৫৮)। কাজেই তিনি সমস্ত মানব জাতির জন্য রসুল, তিনি রহমাতাল্লিল আলামিন। সমস্ত মানুষকে সুখ-শান্তি দেওয়ার জন্য ওনার আবির্ভাব হয়েছে, আর সুখ-শান্তির প্রথম শর্ত হচ্ছে ঐক্য।

সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা উম্মতে মোহাম্মাদির উপর রেখে যাওয়া আল্লাহর রসুলের দায়িত্ব। এখন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যারা শত-সহস্র বছর থেকে তারা বিভিন্ন পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন কারণে সংঘাত-সংঘর্ষ করতে করতে আজকের এ পর্যায় এসেছে। হিন্দু দেখতে পারে না মুসলমানদেরকে, মুসলমান দেখতে পারে না হিন্দুকে। তারা একে অপরের ধর্মকে গালাগালি করে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছে যারা খ্রিষ্টান শব্দটি গালি হিসাবে ব্যবহার করে। আবার পাশ্চাত্যের অনেক দেশে মুসলমানদেরকে হাজার উপায়ে নিগ্রহ করা হয়, থুথু দেওয়া হয়, মেয়েদের হেজাব টেনে খুলে দেওয়া হয়, বাসা ভাড়া দেওয়া হয় না, সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এখন এই পৃথিবীর বাস্তবতার আলোকে আপনি সমস্ত জাতি-গোষ্ঠিীকে এক মঞ্চে, এক প্লাটফর্মে কিভাবে আনবেন? তারা তো কোর’আনকে স্বীকার করে না, নবীকে স্বীকার করে না, আপনারা তাদেরকে স্বীকার করেন না।

আমরা বলতে চাচ্ছি যে, অন্তত কয়েকটা মৌলিক বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। প্রতিটি ধর্মের মূল সত্য হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। এটাই সকল ধর্মের শ্বাশ্বত শিক্ষা। এই শিক্ষাকে পরিত্যাগ করে কেউ ধার্মিক হতে পারবে না, সে যতই উপাসনা, পূজা, অর্চনা করুক না কেন। আমরা প্রতিটি ধর্মগ্রন্থ থেকে মিলগুলো খুঁজে নিয়ে তাদেরকে এক ঐক্যসূত্রে বাঁধতে চাই। আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ না হতে পারি সেজন্য হাজার হাজার গ্রন্থ লেখা হয়েছে, কিন্তু আমরা বলছি, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য একটি লাইনও যদি আমরা পাই, সেটাকে সূত্র ধরে আমাদের আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কিন্তু আমরা একটি লাইন না, আমরা হাজার হাজার লাইন উপস্থাপন করছি বাইবেল থেকে, কোর’আন থেকে, বেদ থেকে, গীতা থেকে। আমরা বলেছি যে, সকল নবীই এসেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে, কেতাবগুলিও এসেছে আল্লাহর থেকে যদিও সেগুলো পরবর্তীতে বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। কাজেই আপনারা এই কথাগুলো স্বীকার করেন যে; আমরা এক স্রষ্টার সৃষ্টি, এক পিতা-মাতা আদম-হাওয়ার সন্তান, আমাদের নবী-রসুলরা এক আল্লাহর থেকে আসছেন। সকলের শিক্ষাগুলো একই, সেই একই শিক্ষাটা কি? এক কথায়, মানবতার কল্যাণসাধনই স্রষ্টাকে পাওয়ার একমাত্র উপায়।

ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বই হচ্ছে মানবসমাজের শ্বাশ্বত ইতিহাস। এই দ্বন্দ্বে সত্য হচ্ছে শুভশক্তি আর মিথ্যা হচ্ছে অপশক্তি। যাবতীয় সত্য এসেছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে, সত্যের ফল হচ্ছে শান্তি, ঐক্য, সম্প্রীতি, মানবতা। পক্ষান্তরে মিথ্যার ফল হচ্ছে অশান্তি, অনৈক্য, বিদ্বেষ ও পাশবিকতা। সুতরাং কোনো স্বার্থের দ্বারা প্রণোদিত হয়ে যারাই মিথ্যার পক্ষ অবলম্বন করে, মিথ্যার বিস্তার ঘটায় তারাই অপশক্তি। তারা মানবসমাজের অশান্তির কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যারা ধর্মের প্রকৃত সত্যগুলোকে গোপন করে এবং ধর্মকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে তারা সমাজে মিথ্যার বিস্তার ঘটায়। সুতরাং তারা বড় একটি অপশক্তি। যারা জনসেবার নামে রাজনীতি করেন আর ব্যক্তিগত আয়-উন্নতির জন্য দুর্নীতি, লুটতরাজ করেন তারা একটি বড় অপশক্তি। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অপশক্তি হচ্ছে দাজ্জাল অর্থাৎ Ôইহুদি-খ্রিষ্টান বস্তুবাদী সভ্যতা’, যা আত্মাহীন, আত্মকেন্দ্রিক, জড়বাদী, ভোগবাদী, স্বার্থপর একটি জীবনযাত্রায় মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলেছে। পরিণামে মানুষ দিন দিন পশুতে পরিণত হয়েছে। আজ আমাদের ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিহিংসা আর স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে হানাহানি, রক্তপাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ধর্মব্যবসা ও স্বার্থের রাজনীতি চলছে তার মূল হোতা এই পাশ্চাত্য জড়বাদী সভ্যতা। একেই আল্লাহর রসুল রূপকভাবে বলেছেন যে আখেরি যুগে একটি বিরাট শক্তিশালী দানব আসবে যার এক চক্ষু কানা হবে অর্থাৎ সে শুধু জড়ের দিক, বস্তুর দিক দেখবে, আত্মার দিক দেখবে না। তার কপালে কাফের লেখা থাকবে। কাফের শব্দের তাৎপর্য হচ্ছে সে স্রষ্টার প্রেরিত মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করবে, তার দ্বারা মানবতার অকল্যাণ হবে, অশান্তি বিস্তার হবে। আমরা এই সব অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর কথা বলছি।

 হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী যখন হেযবুত তওহীদ গঠন করেছেন তখন থেকেই তিনি একটি কথা প্রায়ই বলতেন, হেযবুত তওহীদ যে কাজ নিয়ে দাঁড়িয়েছে, দুনিয়াবি হিসাবে এ এক অসম্ভব কাজ। অল্প কিছু মানুষ দাঁড়িয়েছে এই বড় যমুনা নদীর স্রোত উল্টে দেওয়ার জন্য। আমাদের মত কয়েকজন দরিদ্র্য সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, অস্ত্র নেই, শক্তি নেই, এই আমরা যে দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি সে দাজ্জাল বর্তমান দুনিয়ার প্রভুর আসনে উপবিষ্ট। তার হাতে রয়েছে বিরাট সামরিক শক্তি, সমস্ত মিডিয়া, বিশাল অর্থ-সম্পদ। কাজেই এত বিরাট অপশক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব ব্যাপার। ‘হেযবুত তওহীদ’ সেই দাজ্জালের তুলনায় একটা বিন্দু বা একটা ক্ষুদ্র কণার মতো। এই অসম শক্তির মোকাবেলা কী আদৌ সম্ভব?

হ্যাঁ। এই অসম শক্তির মোকাবেলা করতে সক্ষম কেবলমাত্র সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ। তিনিই আমাদের শক্তি। তিনিই হেযবুত তওহীদের দ্বারা বিরাট দাজ্জালকে পরাজিত করবেন ইনশাল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা হতোদ্দম হয়ো না, নিরাশ হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।” যদি আমরা আল্লাহকে আমাদের সমুদয় জীবন-সম্পদ দিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাই তাইলে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি ওয়াদাবদ্ধ-অঙ্গিকারাবদ্ধ যে তিনি তাদের পৃথিবীময় কর্তৃত্ব দিবেন, এই হলো আল্লাহর ওয়াদা (সুরা নুর ৫৫)। তাছাড়া ২০০৮ সনে যাত্রাবাড়ীতে এমামুয্যামানের ভাষণের মধ্যে দিয়ে আল্লাহ স্বয়ং এক মহান ম’জেজা ঘটিয়েছিলেন, সেখানে তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, তিনি হেযবুত তওহীদ দিয়ে সমস্ত দুনিয়াময় তার সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করবেন। এটা শুধু আমাদের ঈমান নয়, এটা আমরা জানি, এটা আমাদের ইলমাল ইয়াকীন বা নিশ্চিত জ্ঞান। এমামুয্যামান বলেছেন, ‘পৃথিবীতে হেযবুত তওহীদ’ দিয়ে সত্যদীন প্রতিষ্ঠা হবে না, হয়ে গেছে। এটা অতীতের মতো সত্য। আল্লাহ এনশাল্লাহ বিজয় করবেন। কারণ হেযবুত তওহীদ’আল্লাহর। একে অশান্তির বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিজয়ী করার দায়িত্ব আল্লাহর। কীভাবে সম্ভব? ঐ যে বললাম, আল্লাহ করবেন। তবে শর্ত হলো, আমাদের জীবন-সম্পদ দিতে হবে। আমরা আমাদের শর্ত পূরণ করার চেষ্টা করছি।

ধর্মের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে কিছু দেখলেই, কিংবা সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ঐক্যসৃষ্টির কোনো উদ্যোগ দেখলেই অনেক পণ্ডিতমন্য ব্যক্তি দীনে এলাহীর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যারা দীনে এলাহী সম্পর্কে জানেন না তাদেরকে বিভ্রান্ত করা। আমরা মনে করি, আমাদের বক্তব্য এবং দীনে এলাহী সম্পর্কে না জানার কারণেই এমন প্রশ্ন ওঠে। প্রকৃত ইসলাম আর দীনে এলাহী কি এক জিনিস? আল্লাহর রসুলও সকল আহলে কেতাবকে বলেছেন, এসো আমরা এমন একটি বিষয়ের উপর মিলিত হই যে বিষয়ে তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, সেটা হচ্ছে আমরা একমাত্র প্রতিপালক আল্লাহর এবাদত করব (সুরা ইমরান ৬৪)। সুতরাং সকল ধর্মের অনুসারীদের ঐক্য আল্লাহরই অভিপ্রায়। বিগত তেরশ বছর ধরে ইসলাম বিকৃত হতে হতে আজকে সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গেছে। আল্লাহর দয়ায় আমরা আবার সেই সত্য এসলাম লাভ করেছি। সব ধর্মের মানুষের জন্যই শেষ রসুল এসেছিলেন, তিনি যেমন সব ধর্মের মানুষের কাছে গিয়েছেন আমরাও সব ধর্মের মানুষের কাছেই যাচ্ছি। সমগ্র মানবজাতিকে এক মহজাতিতে পরিণত করে তাদের শান্তিময় সহাবস্থান নিশ্চিন্ত করাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষয। আমাদের এই ধারণার সঙ্গে দীনের এলাহীর দূরতমও কোনো সাদৃশ্য নেই।

কারণ দীনে এলাহী ছিল সম্রাট আকবরের একটি রাজনৈতিক কূটকৌশলমাত্র। প্রাচীনকাল থেকে ভারতে ডজন এর উপর ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজস্থানের রাজপুতনারা। ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় তারা সম্রাট আকবরের বিরূদ্ধে চরম সাম্প্রদায়িক অসন্তোষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সাম্প্রদায়িকতার এ বিষবাষ্প থেকে ভবিষ্যতে মোঘল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার পথ খুঁজতে থাকেন আকবর। তিনি রাজপুত কন্যা যোধাবাঈসহ বিভিন্ন রাজপরিবারের মেয়েদেরকে বিয়ে করে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, অনেকের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। কিন্তু তার গৃহীত এসকল পদক্ষেপগুলোকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি স্থায়ী মোঘল ধর্মীয় নীতি। এটাই হলো দীনে এলাহি। বিরাট ভূ-ভারতের বিভিন্ন দূরবর্তী রাজ্যের শক্তিমান হিন্দু রাজাদের পক্ষে রাখার জন্য তিনি সনাতন ধর্মের প্রচলিত পূজা-পদ্ধতিগুলো নিজ ধর্মে গ্রহণ করেন এবং একটি একটি করে ইসলামের সকল বিধি-বিধানকে বাদ দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি বিরাট সুযোগ-সুবিধার লোভ দেখিয়েও হিন্দু-মুসলিম থেকে মাত্র ১৯ জন অনুসারী সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, যারা কিনা তার মৃত্যুর পরই যার যার ফিরে যায়। মুসলিমরা (যদিও প্রকৃত মুসলিম নয়, কার্যত কাফের মোশরেক) এ ধর্মটি মেনে নিতে পারে নি কারণ এর প্রধান উপাদানই ছিল সূর্যের উপাসনা করা। বাদশাহ পণ্ডিতদের কাছ থেকে সূর্যকে বশীভূত করার মন্ত্র শিখেছিলেন যা তিনি মাঝরাত্রে ও ভোরে পাঠ করতেন। এ ধর্মে আগুন, পানি, গাছ, গাভী ও নক্ষত্র পূজাও করা হত। দীনে এলাহীর কলেমা ছিল লা ইলাহা ইল্লালাহু আকবারু খলিলুল্লাহ। এ ধর্মে বাদশাহকেও সেজদা করতে হত। সূদ ও জুয়া ছিল বৈধ। খাস দরবারে জুয়া খেলার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হয় এবং জুয়াড়ীদেরকে রাজকোষ থেকে সুদি কর্জ দেয়া হত। মদ্যপান করাও হালাল সাব্যস্ত করা হয়। বাদশাহ স্বয়ং দরবারের নিকট একটি শরাবখানা খুলে দেন। নববর্ষের অনুষ্ঠানে আলেম, কাজী ও মুফতিগণকেও শরাব পানে বাধ্য করা হত। শহরের বাহিরে বিভিন্ন জায়গায় পতিতাদের বসতি স্থাপন করে ব্যাভিচারকে আইনসিদ্ধ করা হয়। বার বৎসরের পূর্বে বালকদের খৎনা করা নিষিদ্ধ করা হয়। এই ধর্মাবলম্বী কোন লোকের মৃত্যু হলে তার গলায় কাচা গম ও পাকা ইট বেঁধে তাকে পানিতে নিক্ষেপ করা হতো। যেখানে পানি পাওয়া যেত না, সেখানে মৃতদেহ জ্বালিয়ে দেওয়া হতো অথবা পূর্ব দিকে মাথা ও কাবার দিকে পা দিয়ে দাফন করা হতো। গরু, উট, ভেড়া প্রভৃতি জন্তুর গোশত হারাম বলে ঘোষিত হয়েছিল, ঈদুল আযহার সময়ও এগুলো কোরবানি করা যেতন না। পক্ষান্তরে বাঘ ভাল্লুকের গোশত হালালের মর্যাদা লাভ করে। এমন আরো অনেক আছে যা বিস্তারিত লেখার জায়গা এটা নয়। মোট কথা সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিরোধিতা করাই ছিল দিন-ই-ইলাহির মূল উদ্দেশ্যের পেছনে মূল প্রেরণা ছিল রাজনীতি। সম্রাট আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীর পিতার নীতিতেই রাষ্ট্র চালাতেন, ফলে তাকে মুসলিমদের বিদ্রোহে পড়তে হয় এবং তিনি সম্মুখযুদ্ধে পরাজিতও হন, তার সেনাবাহিনীও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। অনন্যোপায় জাহাঙ্গীর দীনে এলাহি ত্যাগ করার শর্তে দিল্লির সিংহাসন ফিরে পান। এহেন দীনে এলাহীর সঙ্গে হেযবুত তওহীদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ কোথায় মেলে সেটাই আমাদের বোধগম্য নয়। হেযবুত তওহীদ ১৩০০ বছরের বিকৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ইসলামের বহু সত্যকে পুনর্জীবন দিয়েছে এবং রসুলাল্লাহর প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হওয়ার জন্য আপ্রাণ সাধনা করছে, সমগ্র দুনিয়াতে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেদের জীবন-সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই যারা কথায় কথায় দীনে এলাহীর কথা বলেন আসলে তারা এ বিষয়ে কতটুকু জানেন সেটাই প্রশ্ন। আমাদের মতে আগে তাদের দীনে এলাহীটা পড়া উচিত, হেযবুত তওহীদের লেখাগুলোও পড়া উচিত, তারপর নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলে আপনিই উত্তর পেয়ে যাবেন।

অন্যান্য ধর্ম বলে যে বিভক্তি সৃষ্টি করা হয় তা অসত্য ও অন্যায়। আমি বলছি ঈসা (আ.) আমার নবী, তাঁর অনুসারীরা আমার ভাই। আমি তো অন্যান্য ধর্মকেও আমার ধর্ম বলছি। মুসা (আ.) আমারও রাসুল, আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি, তাঁর নিদের্শাবলীকেও সত্য বলে শিরোধার্য মনে করি। মুসা (আ.) এর উম্মাহ বলে দাবিদার ইহুদিরা আমার বাবা আদম-হাওয়ারই সন্তান। মহাভারতে যারা এসেছেন কৃষ্ণ, মনু, যুধিষ্ঠির তাঁরাও একই স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসছেন, তাঁদের স্রষ্টা তো আলাদা স্রষ্টা নয়। তাঁদের কেতাবগুলো আমার আল্লাহরই পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তাই ওগুলো আমারও ধর্মগ্রন্থ। সনাতন ধর্ম মানে হল চিরন্তন শাশ্বত ধর্ম, ইসলামের একটি নাম দীনুল কাইয়্যেমা, তার মানেও চিরন্তন শাশ্বত জীবনবিধান। ধর্ম তো একটাই, আপনারা অন্য ধর্ম বলেন কেন? আমরা কোনো ধর্মের অনুসারীদের প্রতি তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষ পোষণ করি না, আমাদের সংগ্রাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সেটা যে ধর্মের লোকই করুক, যে রাজনীতিক মতবাদের লোকই করুক। ইসলামের আকীদা মোতাবেক সকল নবী-রসুল ও তাঁদের আনীত কেতাবগুলোর উপর ঈমান আনা অবশ্য কর্তব্য বা ফরদ। একজন নবীকে শ্রদ্ধা করলাম আরেকজনকে অস্বীকার করলাম বা অশ্রদ্ধা করলাম তবে তো আমি মোমেনই হতে পারব না। ইসলাম অর্থই শান্তি, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা মানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। জোর করে লেবাস চাপিয়ে দেওয়া নয়, একটি নির্দিষ্ট আইন-বিধান একটি জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া নয়। প্রত্যেক মানুষ যার যার বিশ্বাস নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবে। কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না, কেউ কারো অধিকার বিনষ্ট করবে না, কোনো মানুষ অপর কোনো মানুষের থেকে ক্ষতির আশঙ্কা করবে না। মেজরিটি, মাইনরিটি কথাগুলো ইসলামে নেই কারণ এসব কথা ভাইয়ের বেলায় খাটে না। আমার ভাইয়ের সম্পদ আর ইজ্জত রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।

ইসলামি রাষ্ট্র বলতে মানুষ বুঝে দাড়ি-টুপি, নামাজ, রোজা সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এগুলো মানুষ মনে করে ইসলাম। আর ইসলামি শাসন বলতে এখন মানুষ বুঝে তালেবানি শাসন মোল্লা ওমরের শাসন, সৌদি আরবের শাসন- এগুলোকে মানুষ মনে করে ইসলামি শাসন। আর ইসলামি দল বলতে এখন দু রকমের দল বোঝানো হয় যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করে, যারা ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ করে। কাজেই ইসলাম বলতে এখন মানুষের মনে যে ধারণাটা আসে সেটা নিয়ে আমাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস একটু ভিন্ন। প্রচলিত যে ইসলামি রাষ্ট্র, এমন রাষ্ট্র আমরা চাই না। আমাদের ধারণা মোতাবেক ইসলাম হলো শান্তি। এটা এমন একটি সিস্টেম যা প্রয়োগ করার ফলে ন্যায় সুবিচার শান্তি আসবে সেই ১৪০০ বছর আগে যেটা হয়েছিল। মানুষ যেন দরজা খুলে ঘুমাতে পারে, মানুষ যেন নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে পথ চলতে পারে। তাদের সকল মানবাধিকার রক্ষিত হবে, তাদের অবাধে কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে। এমন একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থার নামই হলো ইসলাম। আমরা সেই ইসলাম চাই। জাতিসংঘ তৈরি হয়েছে এই ইসলামের জন্য অর্থাৎ শান্তির জন্য। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি ইসলামের জন্য, মানে শান্তির জন্য। কাজেই ইসলাম প্রিয় মানুষ কিন্তু পৃথিবীতে সিংহভাগ, দাঙ্গাপ্রিয় লোক অল্প। ঐ অর্থে আমরা ইসলাম চাই, মানে শান্তি চাই। ইসলামে জোর করার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত নির্দিষ্ট আকারের বোরখায় আবৃত না করলে বেত্রাঘাত করা হতো, আরবে এখনো নির্দিষ্ট ড্রেসকোড বাধ্যতামূলক। পুলিশ বাহিনী রাখা হয়েছে, কেউ নামাযে না গেলে পিটানো হয়, জোর করে নামাজে দাঁড় করে দেওয়া হয়। এটাতো ইসলাম না। এমন ইসলাম সৃষ্টি করা হয়েছে পরবর্তীতে। এসব জোর জবরদস্তির কারণেই তো মানুষের মন থেকে ইসলাম উঠে গেছে। ইসলাম বলতে তারা এখন জবরদস্তিই মনে করে, আফগানিস্তান মনে করে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম হলো উদারনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা এখন বলিষ্ঠভাবে বলতে চাই, বেত দিয়ে পিটিয়ে নামাজে নেওয়া, মেয়েদেরকে বোরখা পরতে বাধ্য করা, জোর করে দাড়ি রাখাতে হবে, দাড়ি না রাখলে সেনাবাহিনীতে জায়গা হবে না, ফুটবল ক্রিকেট খেলা যাবে না, গান গাওয়া, ছবি আঁকা যাবে না এসব ধ্যানধারণা ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু এগুলোকেই ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিকৃত ইসলামের বিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম। আমরা এখন মানবজাতিকে বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষকে সত্যমিথ্যার পার্থক্য বুঝাচ্ছি, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝাচ্ছি। এখন যদি আপনি বলেন ইসলামি রাষ্ট্র চান কি না, আমার কথা হলো যে রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ হবে মানুষের সমস্ত অধিকার সে লাভ করবে এটাই ইসলামি রাষ্ট্র।

কোর’আনের শাসন চাওয়া ও না চাওয়ার বিষয়টি বর্তমান যুগের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ইসলামের কথা বললেই শুরুতেই চলে আসে কোর’আনী শাসনের কথা। তাই হেযবুত তওহীদ যখন প্রকৃত ইসলামের রূপরেখা মানুষের সামনে তুলে ধরছে তখন এ প্রশ্নটির উত্থাপন খুবই প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিসংগত। কোর’আন চাই কি চাই না এ প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয় কারণ বিষয়টি নিয়ে আমদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি আর বর্তমান প্রচলিত ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক কথায় এর উত্তর দিলে তা অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে এবং শ্রোতা ভুল বার্তা পাবেন।

কোরআন অর্থাৎ আজকে গ্রন্থাকারে যে কেতাবটি আমরা দেখতে পাচ্ছি তা হচ্ছে বিভিন্ন বিধি বিধান সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা হঠাৎ করে আল্লাহর রসুল পান নি, এটি ২৩ বছরে একটি সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন সঙ্কট, বিভিন্ন সমস্যা, বিভিন্ন প্রশ্নের আলোকে নাযেল হওয়া আল্লাহর বিধি বিধানের সমষ্টি। এই কোর’আন হুট করে নাযিল হয়নি, রসুলাল্লাহও হুট করে এটি প্রতিষ্ঠা করে শরিয়াহগুলো প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন নি। এই ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণা- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, একে বলা হয় তওহীদ। আজকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার অধিকাংশ লোকেরাই তওহীদ কী জানে না। কলেমা তো শুধু মুখস্থ বললেই হবে না, যিকির করলেই হবে না। এর মানে কী, তাৎপর্য্য কী, দাবি কী জানতে হবে। এটি আসলে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একটি চুক্তি যে চুক্তির উপর মানবজাতির পার্থিব জীবনের শান্তি-অশান্তি এবং পারলৌকিক জীবনের জান্নাত-জাহান্নাম নির্ভর করছে। কীভাবে? সর্বপ্রথম মানুষকে বুঝতে হবে যে, স্রষ্টার বিধান সর্বোত্তম, তাঁর চেয়ে বেশি কেউ জানে না যে কীসে মানবজাতি শান্তিতে থাকবে। এটা যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বোঝার পর তাদেরকে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, তাহলে আমরা আল্লাহর বিধান যে বিষয়ে আছে সে বিষয়ে নিজেরা বিধান তৈরি করব না, আল্লাহরটাই মানব। আল্লাহরটা মানার মানসিকতা আসলে তখন মানুষ দেখবে যে আল্লাহ কী বিধান দিচ্ছেন। আজ কলেমার মানে করা হয়, একমাত্র আল্লাহকেই সেজদা করতে হবে, ডাকতে হবে, তাঁরই জন্য নামাজ-রোযা করতে হবে ইত্যাদি। কলেমার এই ভুল ব্যাখ্যা মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে এ জাতির মনে মগজে গেড়ে গেছে। এই বিকৃত ইসলামে যার গুরুত্ব এক নম্বর সেটাকে একশত নম্বরে রাখা হয়েছে আর যেটার গুরুত্ব একশত নম্বর সেটাকে বানানো হয়েছে এক নম্বর। মানবদেহে নখের গুরুত্ব আর হৃৎপিণ্ডের গুরুত্ব কি সমান? ইসলামের উদ্দেশ্য শান্তি, কিন্তু দাড়ির সঙ্গে সমাজের শান্তি-নিরাপত্তার কী কোনো সম্পর্ক আছে? অথচ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানেই আগে দাড়ি প্রতিষ্ঠ, টুপি প্রতিষ্ঠা, জোব্বা আর বোরখা প্রতিষ্ঠা। ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানেই চোর-ডাকাত ধরে হাত পা কেটে দেওয়া। জেহাদ মানেই যেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, ভিন্ন সম্প্রদায়ে উপাসনালয়ে, সিনেমা হলে, আদালতে চোরাগোপ্তা বোমা মারা। ইসলাম সম্পর্কে যে সমাজে এমন কু-ধারণা, সেখানে কোরআনের শাসন আরোপ করলেও শান্তি আসবে না। প্রতিটি কাজের একটি ধারাবাহিকতা আছে, এ ধারাবাহিকতাও একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। এই নিয়ম না মেনে যদি গায়ের জোরে একটি দণ্ডবিধি, জীবনব্যবস্থা কোনো জাতির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সমাজে অসন্তোষ আরো বাড়বে। কারণ এ সমাজে ধর্মব্যবসায়ীদের দীর্ঘ অপপ্রচারের ফলে ইসলামের প্রকৃত ধারণাটাই বিকৃত হয়ে রয়েছে। পক্ষান্তরে, পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার দ্বারা তাদের মন-মগজ আমূল বিবর্তিত ও প্রভাবিত। ফলে এ সমাজের মানুষগুলো ন্যায় অন্যায়ের মানদণ্ড জানে না, জানলেও পরোয়া করে না, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য কি, ধর্ম কি, মানবজাতির প্রকৃত এবাদত কি তা বোঝে না, তারা লেবাসকেই মনে করে ধর্ম। আমি শুধু স্বল্পশিক্ষিত শ্রেণির কথা বলছি না, গোটা জনগোষ্ঠী যারা ইসলামপ্রিয় এবং ইসলামবিদ্বেষী সবাই ধর্ম বলতে এসব আনুষ্ঠানিকতা, লেবাস, বোরকা, অভ্যাস অনভ্যাস এবং কোর’আনের কয়েকটি আইন-কানুনকেই বোঝেন। ধর্মব্যবসায়ীদের অর্থ দেওয়াকেই মুসল্লিরা সওয়াবের কাজ মনে করে। ধর্মব্যবসা অর্থাৎ নামাজ পড়ানো থেকে শুরু করে ধর্মের যে কোনো কাজ করে টাকা নেওয়া যে আল্লাহ হারাম করেছেন এটা সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষ জানেনই না। সুতরাং ইসলাম প্রতিষ্ঠা বলতেই তারা বোঝেন যে ইসলামটা মোল্লাদের হাতে আছে সেটাই ক্ষমতাসীন হওয়া অর্থাৎ থিয়োক্রেসি বা মোল্লাতন্ত্র কায়েম হওয়া। এটাকে কোনোভাবেই শিক্ষিত, যুক্তিশীল, সভ্য মানুষ মেনে নিতে পারে না, এটাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠাও বলা যায় না।

আজ তারা এবাদত বলতে বোঝে মসজিদ আর খানকায় গিয়ে পড়ে থাকা, যিকির করা। এটা করে কি দেশে শান্তি আসবে না এসেছে কোনো কালে? আগে ধর্মবিশ্বাসীদেরকে বোঝাতে হবে যে এবাদত হচ্ছে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা যে সমাজে মানুষ নিরাপদে থাকবে, পিকেটারের ইট খেয়ে হাসপাতালে যেতে হবে না, সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে, আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, কোনো নারী ধর্ষিত হবে না, কষ্টের উপার্জন ঘুষখোর বা ছিনতাইকারীর পকেটে যাবে না, বেকারত্বের ঘানি নিয়ে কেউ আত্মহত্যা করবে না, কেউ যেন ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না, কেউ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে না। এমন সমাজ তৈরি করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করাই জেহাদ, এটাই বড় এবাদত।

বর্তমানে সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই পশ্চিমা বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থাকে জাতীয় জীবনব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করে তা পালন করে চলছে। আমরা মনে করি, এটা এমন একটি সিস্টেম যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা আমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে দাসে পরিণত করার জন্য চাপিয়ে দিয়ে গেছে। সুতরাং এ সমাজের মানুষকে হুট করে কোরআনের শাসনের কথা বলা অবান্তর ও অযৌক্তিক হবে। এজন্য আল্লাহর রসুলও তা বলেন নি। আপনি যদি রসুলের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে চান, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান, শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তবে রসুলাল্লাহ যেভাবে শুরু করেছিলেন আপনাকেও সেভাবেই শুরু করতে হবে, রসুলের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। কারণ তিনি হচ্ছেন উত্তম আদর্শ, উসওয়াতুল হাসানা। তিনি দাড়ি রেখেছেন বিধায় আপনিও ঐভাবে দাড়ি রাখবেন এই জন্য নয়, দাড়ি সব মানুষেরই হয়। তাই একটি নির্দিষ্ট স্টাইলের দাড়ি রাখানোর, নির্দিষ্ট পোশাক পরানোর জন্য আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন এমন ধারণা মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। তিনি দাড়ি রাখার আদর্শ নিয়ে আসেন নি, তিনি এসেছেন মানবজীবন থেকে সকল অন্যায় দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে। পবিত্র কোরআনে অন্তত তিনটি স্থানে আল্লাহ মহানবীর আগমনের উদ্দেশ্য এবং কাজ কী তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘আল্লাহ সঠিক দিক নির্দেশনা ও সত্য জীবনব্যবস্থাসহ তাঁর রসুল প্রেরণ করেছেন এই জন্য যে রসুল যেন একে অন্যান্য সকল জীবনব্যবস্থার উপর বিজয়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন (সুরা তওবা ৩৩, সুরা ফাতাহ ২৮, সুরা সফ ৯)। এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি প্রথমে কী করলেন? প্রথমে তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে আহ্বান জানালেন। মক্কার লোকেদের কলেমা বোঝালেন, তওহীদ বোঝালেন। মক্কার লোকেরা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিল না। তিনি প্রথমে তাদের আল্লাহর বিধান কেন মানতে হবে তা বোঝালেন, ঐক্য বোঝালেন, একক নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা বোঝালেন। তখন তারা ধীরে ধীরে কলেমা বুঝতে পারল তখন রসুলাল্লাহকে তাদের নেতা হিসাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হলো। বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করল তাঁকে কেন্দ্র করে। মক্কায় যে তেরো বছর ছিলেন এ দীর্ঘ সময়ে সেখানে তাঁর অনেক আনুগত্যশীল অনুসারী তৈরি হয়েছিলেন, তিনি কিন্তু ইচ্ছা করলে একটি সহিংস অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁর প্রধান বিরোধীদেরকে হত্যা করে তাঁর আদর্শকে মক্কাবাসীদের উপর চাপিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, কারণ অধিকাংশ লোকের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে শাসনক্ষমতা নিলেও নিরাপদ সমাজ গঠন করা যায় না। একবার মক্কার শাসন ক্ষমতা তাঁকে দেওয়ার প্রস্তাবও তাকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটাও প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি দেখেছেন তিনি যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করতে চান তখনও জনগণ সেটা বোঝে নি, তারা তাদের পূর্ববর্তী জীবনবিধান বা ধারণা নিয়েই থাকতে চেয়েছে। তাই রসুল অপেক্ষা করেছেন তাঁর আদর্শটা জনগণের কাছে গৃহীত হওয়ার জন্য। এভাবে অপেক্ষা করে ১৩ বছর শুধু তওহীদের আহ্বান করে গেছেন। মক্কাবাসীকে এ কথাই বুঝিয়েছেন যে তোমরা সমস্ত ন্যায় অন্যায়ের মাপকাঠি হিসাবে আল্লাহকে মেনে নাও। এটাই সমস্ত জীবনের মঙ্গল। কিন্তু গুটিকয় লোক বাদে সবাই প্রত্যাখ্যান করল। এরই মধ্যে মদিনাবাসীদের মধ্যে একটি বড় অংশ তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হলো এবং তাঁকে নিজেদের পরিবারের মতো করে আশ্রয় দিতে সম্মত হলো। তিনি মদিনায় চলে গেলেন, কারণ সত্য প্রতিষ্ঠাই তাঁর মিশন। যারা সত্য গ্রহণে আগ্রহী তাদের কাছেই তিনি যাবেন। তখন মদিনাকেন্দ্রীক একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজব্যবস্থা কায়েম হলো। সেই ঐক্যবদ্ধ সমাজ নেতা হিসাবে রসুলাল্লাহকে মেনে নিলেন, তারা তাদের যাবতীয় সমস্যার সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে রসুলকে মেনে নিলেন। সেখানে বসবাসকারী সকল ধর্মের অনুসারীদেরকে নিয়ে তিনি একটি ঐক্য ও নিরাপত্তাচুক্তি করলেন। যখন একটি জাতি রসুলাল্লাহকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হলো তারপর থেকে তাদের যাবতীয় সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ একটার পর একটা বিধান নাজেল করতে থাকেন। এ বিধানগুলোর সমষ্টিই হচ্ছে আজকের কোর’আন। এখন আমাদের এ দেশের অবস্থার প্রেক্ষাপটে আপনি যদি শ্লোগান তোলেন যে আল্লাহর আইন চাই, শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন কমিটি করেন তাহলে এসব কথা হবে লোকভুলানো কথা, প্রতারণামূলক রাজনৈতিক শ্লোগান। কারণ আমাদের দেশের জনগণ ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য বোঝে না, তারা বিকৃত ইসলামকেই ধর্ম বলে মানে। সেই ধর্ম এখনো ধর্মব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত এবং জনগণ তাদেরকেই সমীহ করে চলে। ধর্মব্যবসা যে ইসলামে নিষিদ্ধ, ধর্মব্যবসায়ী আলেমরা যে আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব তা তারা জানেই না, তাই ধর্মব্যবসায়ীদেরকে তারা টাকা দিয়ে পালন করে। ঐক্যের বিরুদ্ধে কথা বলা যে কুফর সেটাও তারা জানে না, তাই তারা এখনো নিজেদেরকে শিয়া, সুন্নি, হানাফি বলে বিশ্বাস করে, নিজেদের মধ্যে ফেরকা মাজহাবের দেওয়ালকে লালন করে। এমনকি পশ্চিমাদের বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থাই সর্বোৎকৃষ্ট বলে তারা মনে করে, পশ্চিমাদেরকেই প্রভু মনে করে, তাদের তৈরি ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের উপর ভিত্তি করা শত শত রাজনীতিক দলে বিভক্ত হয়ে নিত্য দাঙ্গা-ফাসাদ, হানাহানি, মারামারিতে লিপ্ত। অর্থাৎ চূড়ান্ত অনৈক্য বিরাজিত। সেখানে এখনই এ জাতির সামনে কোরআনের শাসন চান কি চান না’, না বলে আমাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে সমাজের মানুষগুলোকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝানো, ঐক্যের সুবিধা, অনৈক্যের অসুবিধাগুলো বুঝানো। তাদেরকে সর্ব উপায়ে বোঝানো যে, কোন কাজ করলে সেটা আল্লাহর এবাদত হবে, কোন কাজ আল্লাহর কাছে প্রিয়। জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বের করে মানুষগুলোকে সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের মধ্যে একটি জাতীয় ঐক্যবোধের চেতনা জাগ্রত করাই হবে আমাদের প্রথম কাজ। তারপর সমস্ত জাতি যখন এই কথার উপর ঐক্যবদ্ধ হবে যে, আমরা ষোল কোটি মানুষ সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, হকের পক্ষে থাকব তখন তারা সিদ্ধান্ত নেবে যে, তাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হবে কীসের ভিত্তিতে হবে। সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে যারা রাতারাতি একটি সংবিধান প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে চান তাদের ভুলটাও তুলে ধরতে হবে যেন কেউ সেই পথে পা না বাড়ায়। মনে রাখতে হবে, ইসলাম কেবল কয়েকটি বিধানের সমষ্টি নয়, এটি একটি সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন যার স্থায়িত্ব হতে পারে হাজার হাজার বছর। একটি সভ্যতার সঙ্গে একটি জাতির পরিচয়, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, পেশা, সামগ্রিক জীবন, শিল্প, সাহিত্য, গান, স্থাপত্য, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পোশাক আশাক সবকিছু জড়িত থাকে। সুতরাং একটি বই থেকে কয়েকটি আইন চালু করে দিলেই কি সেটাকে সভ্যতা বলা যাবে? যাবে না। সর্বশ্রেণির মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনো একটি সভ্যতা গড়ে ওঠে না। এ কারণেই তালেবানরা রাজ্যজয় করতে পারলেও মানুষের মনজয় করতে পারে নি। যেটা রাতারাতি প্রতিষ্ঠা হয় সেটা রাতারাতি উৎখাতও হয়। রাতারাতি বিপ­বের দ্বারা সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হয় নি, বহু ঘাত প্রতিঘাত সইতে হয়েছে, বিশ্বময় এই মতবাদগুলোর ইতিবাচক নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়েছে, হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে, গণমাধ্যমে ঝড় তোলা হয়েছে। এভাবে এই আদর্শগুলো মানুষের মনে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, তারপর চলেছে পরীক্ষা নীরিক্ষা, সংস্কারসাধন। আদর্শ প্রতিষ্ঠার এটিই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক রীতি। যারা সহিংসতার মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন তারা কোথাও সফল হন নি, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, এমন কি সমাজতন্ত্রের পথিকৃৎগণও তাদেরকে সমর্থন দেন নি।

আল্লাহ চান মানুষজাতি যেখানেই থাকুক ঐক্যবদ্ধ থাকুক। কারণ তিনি মানুষকে সামাজিক জীব হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তাদের সেই সমাজে জুলুম না থাকুক, অবাধ বাক স্বাধীনতা থাকুক, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি না থাকুক, শাসকের জবাবদিহিতা থাকুক এটাই আল্লাহ চান। আমরাও এটা চাই। আমরা মানুষকে এগুলোর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই- কারণ ঐক্যবদ্ধ না হলে এই চাওয়া কখনোই পূর্ণ হবে না। এক কথায় মানুষ ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয় তাহলেই সমাজের মধ্যে যদি শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের এই ঐক্যের মাধ্যমে ইসলামের অধিকাংশ বিধান আপনিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বাদ থাকে শুধু দণ্ডবিধি বা পিনাল কোড। সেটা জনগণই ঠিক করে নেবে যে তারা এই পিনাল কোড চায় কি চায় না। যদি তারা কোর’আনের পিনাল কোড না চায় সেটা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের নীতি বিরুদ্ধ। এমনকি আমরা এও বলছি না যে কেবল কোরআনই স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা। যারা সনাতন ধর্মাবলম্বী তারা হয়তো কোর’আনের বদলে বেদের বিধানকে উত্তম মনে করবেন, ইহুদিরা চাইবে তওরাতের বিধান। অসুবিধা নেই, ওগুলো সবই স্রষ্টারই বিধান। ওগুলো দিয়েও শান্তি এসেছে। মদিনায় ইহুদিরা কোর’আনের বিধানের বদলে তওরাতের বিধান দিয়ে নিজেদের বিশ্বাসঘাতকতার দণ্ড কামনা করেছিল, কারণ সেটাকেই তারা সুবিচার বলে বিশ্বাস করত। রসুলাল্লাহ সেটা মোতাবেকই তাদের বিচার করেছিলেন। এখনো কোনো অপরাধী যদি ব্রিটিশ পিনাল কোড মোতাবেক নিজের দণ্ড চায়, তার উপর জোর করে কোর’আনের কানুন চাপিয়ে দেওয়াকে আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করি না। রাষ্ট্রগঠনের আধুনিক সংজ্ঞায় জনগণের ইচ্ছার অভিব্যক্তিই হচ্ছে রাষ্ট্র। জনগণ কী চায় সেটাই মুখ্য। জনগণ যদি বলে আমরা তিনশত বছর ব্রিটিশ রুল দেখেছি। এটা আমাদেরকে শান্তি দিতে পারে নাই, তাহলে তারা সেটা আর মানবে না। আর যদি বলে আমরা এই অশান্তির মধ্যেই থাকতে চাই। তাহলে ধর্ম সেটাকে উৎপাটন করে জোর করে কোর’আনের বিধান চাপিয়ে দেবে না। কারণ জোর করা ধর্মের কাজ নয়, সেটা অধর্মের কাজ।

তবে আমরা দ্ব্যার্থহীনভাবে বলছি যে, পশ্চিমা সভ্যতার যে জীবনব্যবস্থা মানুষকে শান্তি দিচ্ছে না, দিতে পারবে না। কারণ এগুলো মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত বিধান আর স্বল্পজ্ঞানী মানুষ যে এক মিনিট পরে কী হবে তাও জানে না, সে কখনোই মানবজাতির শান্তির জন্য নিখুঁত একটি জীবনবিধান রচনা করতে পারে না। এগুলো প্রতারণামূলক ব্যবস্থা, এরা মানবাধিকারের কথা বলে, বাকস্বাধীনতার কথা বলে, রাষ্ট্রের কাজে মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলনের কথা বলে, সুবিচারের কথা বলে, সাম্যবাদের কথা বলে কিন্তু কিছুই দিতে পারে না। কিন্তু স্রষ্টার বিধানে এগুলো দেওয়া অতীতেও সম্ভব হয়েছিল, এখনও সম্ভব। এই বিশ্বাসটা আগে মানুষের মনে আমরা সৃষ্টি করতে চাই, তাহলে মানুষের সামনে কোনটা সত্য আর কোনটা প্রতারণা তা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। তখন মানুষই তার পথ বেছে নেবে। তবে আমরা মনে করি, আল্লাহর দেওয়া বিধানের চেয়ে সত্য, ন্যায়নিষ্ঠ, সুবিচারপূর্ণ কোনো বিধান হতে পারে না, তথাপি সেটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আল্লাহর নীতি পরিপন্থী।

ধর্মনিরপেক্ষতা যদি ধর্মহীনতায় পর্যবসিত হয় তাহলে তা মানবজাতিকে আত্মিকভাবে ভারসাম্যহীন করবে, মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আত্মাহীন পশুতে পরিণত হবে- যার প্রমাণ বর্তমান সময়। আর জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য ধর্মকে বিসর্জন করার প্রয়োজন নেই, ধর্মকে বাদ দিলে জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যবহার হয় মানুষের ক্ষতিসাধনে। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইসলামের সোনালি যুগে অর্থাৎ ১২৫৮ সনে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমরাই ছিল শিক্ষকের আসনে। ঐ সময়ে ইউরোপে চলছিল মধ্যযুগীয় বর্বর যুগ। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানে ইউরোপীয়দের একচেটিয়া আধিপত্য যার ভিত্তি রচনা করে গেছেন মুসলিম বিজ্ঞানীরাই। এটা ইতিহাস যদিও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে।

দু’টি কারণ। (এক) একটি সমাজের শান্তি নির্ভর করে ঐ সমাজটি যে সিস্টেম দিয়ে পরিচালিত হয় সেই সিস্টেম বা জীবনব্যবস্থার উপর। জীবনব্যবস্থা ত্রুটিযুক্ত হলে শান্তি আসবে না, ত্রুটিহীন হলে শান্তি আসবে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে পাশ্চাত্য সভ্যতার তৈরি বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থা চালু আছে। এ জীবনব্যবস্থাগুলো মানুষের তৈরি বিধায় অবশ্যই ত্রুটিযুক্ত, তাই এর ফলও অশান্তি। আপনি বিষ খেয়ে সুস্থ থাকার আশা করবেন এটা কি যৌক্তিক?

(দুই) ধর্ম বর্তমানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের উপাসনা, আচার-অনুষ্ঠানের একটি বিষয়। এর সঙ্গে পার্থিব জীবনের কোনো যৌক্তিক সম্বন্ধ নেই। এর পুরো বিষয়টাই আখেরাত কেন্দ্রিক। তাই সমাজের শান্তি অশান্তিতে ধর্মের কোনো যোগাযোগ নেই। উপরন্তু প্রতিটি ধর্মই আজ ধর্মব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত। তারা সেগুলো দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে চলেছে এবং যে যেভাবে পারছে মনগড়া ব্যাখ্যা করছে, বিকৃত করছে। এসব বিকৃত ধর্ম দিয়ে কীভাবে শান্তি আসবে। ফর্মুলা ভুল হলে কী কখনো অংক মেলে?

ইসলাম আসলে কি এবং কেন, তা আগে আমাদের বুঝতে হবে। এটা পরিষ্কার হলে আমরা বুঝতে পারব আসলে দাড়ি, টুপি, পাগড়ির সাথে এসলামের সম্পর্ক কতটুকু।

ইসলাম শব্দটি এসেছে সালাম’থেকে যার অর্থ শান্তি। শান্তি ও ইসলাম সমার্থক। সমস্ত রকম অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, মারামারি, রক্তপাত থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য আল্লাহ আদম থেকে শুরু করে শেষ রসুল পর্যন্ত সকল নবী-রসুল-অবতারদের মাধ্যমে যে জীবন-ব্যবস্থা পাঠিয়েছেন তার নাম আল্লাহ রেখেছেন ইসলাম। সকল সত্যই ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। সত্য হচ্ছে শান্তির উৎস, মিথ্যা যাবতীয় অশান্তির উৎস। আল্লাহর দেওয়া এই সত্যময় জীবন-ব্যবস্থা, দীনুল হক যদি মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচার-ব্যবস্থায় অর্থাৎ তার সমগ্রিক জীবনে চর্চা করে তাহলে তারা শান্তিতে থাকবে। এই শান্তির নামই ইসলাম। ১৪০০ বছর আগে এই শান্তি এসেছিল অর্ধেক দুনিয়াতে।

এই হল ইসলাম শব্দের শাব্দিক ও প্রায়োগিক অর্থ। এই ধারণা মোতাবেক ইসলামের সাথে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জুব্বার সম্পর্ক কোথায়? ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা অর্থাৎ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই ইসলাম নামক জীবন-ব্যবস্থার এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং যারা আমাদের শরীরে ইসলাম নাই এই প্রশ্ন করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, একটি দেশের সব মানুষ যদি দাড়ি রাখে, টুপি পরে, জোব্বা গায়ে দেয় কিন্তু তাদের সামষ্টিক জীবনের ঐ বিষয়গুলো যদি ইসলামের না হয় তাহলে কি সেই দেশে শান্তি এসে যাবে? আসবে না। কারণ ইসলাম আসার আগেও আরবের মানুষগুলো আরবীয় পোশাকগুলো পরত, তাদেরও দাড়ি ছিল। আসলে এই শেষ দীনে কোন নির্দিষ্ট পোষাক হতে পারে না, কারণ এটা এসেছে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য। পৃথিবীর মানুষ প্রচণ্ড গরমের দেশে, প্রচণ্ড শীতের দেশে, নাতিশীতোষ্ণ দেশে, অর্থাৎ সর্বরকম আবহাওয়ায় বাস করে, এদের সবার জন্য এক রকম পোষাক নির্দেশ করা অসম্ভব। তা করলে এ দীন সমস্ত মানব জাতির জন্য প্রযোজ্য হতে পারত না, সীমিত হয়ে যেতো। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (দ.) তা করেনও নি। বিশ্বনবীর (দ.) সময়ে তার নিজের এবং সাহাবাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ও তখনকার আরবের মোশরেক ও কাফেরদের পরিচ্ছদ একই ছিল। বর্তমানেও আরবে মুসলিম আরব, খ্রিষ্টান আরব ও ইহুদি আরবদের একই পোষাক-পরিচ্ছদ। দেখলে বলা যাবে না কে মুসলিম, কে খ্রিষ্টান আর কে ইহুদি। ইসলামে পোশাকের ব্যাপারে আল্লাহ এমন বিশ্বজনীন একটি নীতি দিয়েছেন যা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের জন্যই অনুসরণযোগ্য, সেটা হচ্ছে তিনি পুরুষদের জন্য সতর নির্দ্ধারণ করেছেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত (এ নিয়েও মতভেদ আছে)। আল্লাহ বা রসুল কেউই বলে দেন নি যে দেহের এই স্থান কী পোশাক দিয়ে আবৃত করতে হবে।

টুপি ইহুদী, শিখ বা অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুরাও পরেন, তাদেরও দাড়ি আছে, তারাও জুব্বা পরেন, তাদের অনেকেই পাগড়ি পরেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাড়ি, টুপি, জোব্বা সবই ছিল। আল্লাহর অস্তিত্বে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী হিসাবে পরিচিত অনেকেরই দাড়ি ছিল যেমন কার্ল মার্কস, চার্লস ডারউইন, আব্রাহাম লিঙ্কন প্রমুখ। হয়ত বলতে পারেন তাদের টুপি, জুব্বা, পাগড়ি, দাড়ি মুসলিমদের মত না। হ্যাঁ, তা হয়ত ঠিক, কিন্তু টুপির আকার-আকৃতি ও রং নিয়ে, জুব্বার আকার-আকৃতি নিয়ে, পাগড়ির রং, দাড়ির পরিমাণ ইত্যাদি নিয়ে আলেম ওলামাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতবিরোধে গিয়ে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া একপ্রকার মুর্খতা বলেই আমরা মনে করি। গত কয়েক শতাব্দী ধরে এ জাতির দুর্ভাগ্যজনক পরাজয়ের কারণ এগুলিই। অথচ এটা ইতিহাস যে রসুলের সাহাবিদের অনেকেরই গায়ে জোব্বা তো দূরের কথা ঠিকমত লজ্জাস্থান ঢাকার মত কাপড় সংস্থান করতেও কষ্ট হতো।

কোন সন্দেহ নেই, বিশ্বনবী (দ.) তার অনুসারীদের একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের দাড়ি রাখতে বলেছেন। কেন বলেছেন? এই জন্য বলেছেন যে, তিনি যে জাতিটি, উম্মাহ সৃষ্টি করলেন তা যেমন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তেমনি বাইরে থেকে দেখতেও যেন এই উম্মাহর মানুষগুলি সুন্দর হয়। আদিকাল থেকে দাড়ি মানুষের পৌরুষ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে। সিংহের যেমন কেশর, ময়ূরের যেমন লেজ, হাতির যেমন দাঁত, হরিণের যেমন শিং, তেমনি দাড়ি মানুষের প্রাকৃতিক পৌরুষ সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য নষ্ট না করার উদ্দেশ্যেই দাড়ি রাখার নির্দেশ।

দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বা ইত্যাদিকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বিষয় বলছি না বা কোন রকম অসম্মানও করছি না। আমরা শুধু বলছি এই দীনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আজ যেমন উল্টো হয়ে গিয়েছে তেমনি এর বাহ্যিক দিকটিও বিকৃত দীনের আলেমরা অপরিসীম অজ্ঞতায় উল্টে ফেলেছেন। দাড়ি রাখা, বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি এই দীনের বুনিয়াদী কোন ব্যাপার নয় অর্থাৎ ফরদ নয়, সুন্নত। তাও রসুলের একেবারে ব্যক্তিগত সুন্নত যে ব্যাপারে রসুলাল্লাহ তাঁর একটি অন্তীম অসিয়তে বলেছেন, হে মানবজাতি! আগুনকে প্রজ্জলিত করা হয়েছে এবং অশান্তি অন্ধকার রাত্রির মতো ধেয়ে আসছে। আল্লাহর শপথ, আমি আমার থেকে কোনো কাজ তোমাদের উপর অর্পণ করিনি, আমি শুধু সেটাই বৈধ করেছি যেটা কোরা’আন বৈধ করেছেন, আর শুধু সেটাই নিষেধ করেছি যেটা কোর’আন নিষেধ করেছে। রসুলাল্লাহর প্রথম জীবনীগ্রন্থ সিরাত ইবনে ইসহাক গ্রন্থে এ কথাটি আছে। সুতরাং দাড়ি-টুপি (লেবাস) যদি এই দীনের কোন ফরদ বা বুনিয়াদী বিষয় হতো, তবে কোর’আনে একবার হলেও এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হতো। আল্লাহর রসুল এটা সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবস্থা, পোশাক, চেহারা বা সম্পদ কোন কিছুর দিকেই দৃষ্টিপাত করেন না, তিনি দেখেন তোমাদের হৃদয় এবং তোমাদের কাজ।’ [আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মুসলিম]।

তাই দাড়ি ইসলামের চিহ্ন’দাড়ি না রাখলে ইসলামের কথা বলা যাবে না’এ ধারণা সঠিক নয়। সেজন্য হেযবুত তওহীদে কেউ যদি দাড়ি রাখতে চায় আমরা এটুকুই বলি, যদি দাড়ি রাখেন তবে, রসুল যেভাবে দাড়ি রাখতে বলেছেন সেভাবে রাখুন যেন সুন্দর, পরিপাটি দেখায়। রসুলাল্লাহর যে কোনো সুন্নাহই কল্যাণকর, তাই ব্যক্তিগত জীবনেও রসুলাল্লাহর যা কিছু অনুসরণ করা হবে তাতে মানুষ কল্যাণ পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আগে কোনটা? আজ সারা পৃথিবীতে কোথাও আল্লাহকে বিধানদাতা হিসাবে মানা হচ্ছে না। মুসলিম নামের এই জনসংখ্যাও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতাকে বিধাতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। এ কারণে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা কাফের-মোশরেক হয়ে আছে। আল্লাহর রসুল বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন মানুষ তাহাজ্জুদ পড়বে কিন্তু ঘুম কামাই করা হবে, সওম রাখবে কিন্তু না খেয়ে থাকা হবে (হাদিস)। রসুলাল্লাহ বর্ণিত সেই সময়টি এখন। যেখানে তাহাজ্জুদ, সওমের মত একনিষ্ঠ আমলও বৃথা যাবে, সেখানে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বার মত আমল গৃহীত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

বর্তমানে মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে, ইসলাম মানেই দাড়ি, টুপি, মসজিদ, মাদ্রাসা, আলেম ওলামা, সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত, আযান দেয়া, হজ্জ করা ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম শব্দের অর্থ হলো শান্তি অর্থাৎ ন্যায়বিচার, ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শৃংখলা, আনুগত্য, কোথাও অভাব নেই, অনটন নেই, দুঃখ নেই, যন্ত্রণা নেই এমন একটা পরিস্থিতির নাম ইসলাম। এই ১৬ কোটি বাঙালি কি মসজিদ মাদ্রাসায় বসবাস করে? না। তারা সর্বত্র বিরাজমান। মানুষ যেখানে আছে সেখানেই সত্য পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য।

আমরা মসজিদ মাদ্রাসায় কাজ করছি না, এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। বেশ কিছু মাদ্রাসায় আমরা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ইতোমধ্যে করেছি। পত্রিকা তো যাচ্ছেই। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে কাজ করা আমাদের নীতি নয়। আমরা আমাদের কর্মকাণ্ডে সর্বশ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততা আশা করি। কিন্তু মসজিদ মাদ্রাসায় যারা থাকেন তাদের অধিকাংশই ধর্মব্যবসায়ী এবং আমরা ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছি। এ কারণে ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের কাজে সহযোগিতা করা দূরে থাক, গত ২০ বছর ধরে ঘোর বিরোধিতা করে আসছে। এখনও তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তথাপিও আমরা আশাবাদী যে, সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সহযোগিতা পেলে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ব্যাপক আকারে কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।

আসলে নাম কোন ভাষায় রাখা হলো সেটার চেয়ে নামের অর্থই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে আমাদের মনে হয়। আমাদের সবার নাম কি আমাদের মাতৃভাষায়? না। আমাদের দেশের প্রধান রাজনীতিক দলগুলো যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এগুলো একটাও তো বাংলা ভাষায় নয়, উর্দু-বাংলা-ইংরেজি মেশানো। ‘হিযব’ শব্দের অর্থ দল, ইংরেজিতে লীগ বা পার্টি বলতে পারেন, তওহীদ অর্থ একত্ববাদ বা ওয়াহদানিয়াত। বাংলায় একেশ্বরবাদ বা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দল বলতে পারেন। সুতরাং নাম যে ভাষায়ই রাখা হোক তাতে আপত্তির কিছু দেখছি না। সেই সঙ্গে এটাও বলে রাখা ভালো, আরবি ভাষাকে শ্রদ্ধা করলেও আমাদের কাছে প্রয়োগের দিক থেকে আমাদের মাতৃভাষার গুরুত্ব সর্বাধিক। বাংলায় আমরা মনের ভাব বিনিময় করি, যে কোনো সত্য আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার বিকল্প নেই। স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে মাতৃভাষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শেষ নবী যেহেতু আরবে এসেছেন, তাই আরবিতেই তিনি কথা বলেছেন, কোরআনও আরবিতেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, “আমি সব নব-রসুলকেই তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি যাতে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেন।” (সুরা ইব্রাহীম ৪)সুতরাং আখেরি নবী অন্য দেশে আসলে অন্য ভাষাতেই কেতাব আসত।

বাংলাদেশে হিজবুত তাহরীর নামে হঠাৎ করে একটা দলের উদ্ভব হয়েছে কয়েক বছর আগে। তাদেরকে বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কাকতালীয়ভাবে তাদের নামের সাথে হেযবুত তওহীদের নামের আংশিক মিল আছে। এমন মিল তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুসলিম লীগেরও আছে, তাতে কি মুসলিম লীগের কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের উপর বর্তেছে? বর্তায় নি। আপনার নাম আব্দুর রহমান, আরেকজন আছেন জঙ্গি শায়খ আব্দুর রহমান। এখন একই নাম হওয়ার জন্য আপনাকে যদি হয়রানি করা হয় সেটা কি উচিত হবে, আর এজন্য কি আপনি আপনার পিতৃদত্ত নাম পরিবর্তন করে ফেলবেন? ফেলবেন না। কুড়ি বছর আগে হেযবুত তওহীদ নামটি রাখা হয়েছিল, তখন তাহরীর এদেশে ছিলই না। তথাপি এই আংশিক মিলের কারণে আমাদেরকে অহেতুক সন্দেহ এবং হয়রানির স্বীকার হতে হচ্ছে, আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এটা যৌক্তিক নয়। আমরা গত কুড়ি বছরে সন্দেহ করার মতো কোনো কাজ করি নি, করবও না এনশা’আল্লাহ। আমাদের কোনো গোপন কর্মকাণ্ড নেই, এটা আমাদের নীতি। কারণ গোপনীয়তাই সন্দেহের জন্ম দেয়। যারা কোনো বে-আইনি কাজ করে না, বে-আইনি কথা বলে না, বিনা তথ্যে তাদেরকে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। তারপরও সন্দেহবাতিক একটি মানসিক ব্যাধি। এটা যদি কারো থাকে তবে তিনি আমরা তার সন্দেহ দূর করতে পারব না, তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন।

আল্লাহ রসুলরে সময় র্বতমানের মতো কোনো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ছলি না। সুতরাং মাদ্রাসায় না পড়লইে যে ইসলাম সর্ম্পকে কথা বলতে পারবে না, এমন ধারণা অযৌক্তকি। র্বতমানে মুসলমি বিশ্বে যে মাদ্রাসাগুলো আপনারা দেখতে পাচ্ছেন সেগুলো আল্লাহর নাজেল করা প্রকৃত ইসলাম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়। এটা হলো একটি বিকৃত ব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে রাজনীতিক ও র্ধমীয় নানা মতে পথে বিভক্ত করে পদানত করে রাখার একটি ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র। ব্রিটিশরা যখন আমাদেরকে পদানত করেছিল তখন তারা আমাদেরকে একটি বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দায়েরের জন্য এই মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠা করছেলি, তারাই এর সিলেবাস কারিকুলাম সব তৈরি করছিল।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা যেন আর কোনোদিন ইসলামের সেই নীতি আদর্শের দিকে ফিরে না যাই, শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করতে না পারি। ব্রিটিশদের তৈরি বিকৃত ইসলাম শিখেই মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি, বিকৃত ইসলামের আলেমরা। যারা ফতোয়াবাজী, মাসলা-মাসায়েল, ফেরকা-মাযহাব ইত্যাদি নিয়ে নিজেরা দ্বন্দ্ব, বাহাসে, দলাদলিতে লিপ্ত থাকে। দেশ জাতি ধ্বংস হয়ে গেলেও সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। তারা কোনোদিন মানবতার কল্যাণে এতটুকু ভুমিকা রাখতে পারে নি। হয়তো দু একজন ব্যতিক্রম থাকতে পারেন যারা মানবতার মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন তবে সেটা অন্য কোনো মহান ব্যক্তির দ্বারা দীক্ষিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে, মাদ্রাসার শিক্ষার প্রভাবে নয়। ধর্মব্যবসা করেই তাদের জীবন চলে। সুতরাং এসব মাদ্রাসায় যে আমরা পড়ি নাই এ জন্য আল্লাহর শোকর। আমাদের এমামুয্যামান ও মাননীয় এমামের যোগ্যতা হলো- তাদেরকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সত্য মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান দান করেছেন এবং সত্য পথে সংগ্রাম করার তওফিক দান করেছেন। এ থেকে বড় যোগ্যতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর নাই।

পন্নী পরিবারের শাসনকার্যে সম্পৃক্ত থাকার ইতিহাস শত শত বছরের। তারা একাধারে যেমন ধার্মিক ছিলেন আবার খুব প্রজাহিতৈষী ছিলেন। এটা আমাদের কথা নয়, যারা তাদেরকে চেনেন তারা জানেন, আপনারা ইতিহাস পড়ে দেখতে পারেন, স্থানীয় জনগণকে জিজ্ঞেস করেও দেখতে পারেন। আমি মাওলানা ভাসানীর একটি উক্তি বলছি। ১৯৫৪ সালে যখন জমিদার প্রথা বিলুপ্ত করা হয় তখন তিনি বলেছিলেন, সব জমিদারেরা যদি পন্নী জমিদারদের মতো হতো তবে এ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য বিল প্রস্তাব করার দরকার হতো না। তবে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি মাননীয় এমামুয্যামান কর্তৃক কোনো অত্যাচার, অবিচার করার প্রশ্ন আসে না, বরং তিনি মানুষের কল্যাণে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন।

আল্লাহ তাঁর শেষ নবীর উপর যে জীবনব্যবস্থাটি দান করেছেন সেটি তিনি কোনো গোত্রের জন্য দেন নি, দিয়েছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য। তিনি চান মানবজাতি ঐক্যবদ্ধ হোক, তারা এক জাতিভুক্ত হয়ে এক পরিবারের মত বসবাস করুক। মানবজাতিকে তার কাক্ষিত শান্তির সন্ধান দিতে আল্লাহর রসুল উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটিকে সৃষ্টি করেছিলেন। উম্মতে মোহাম্মদীর কাজই হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায় মোতাবেক সমগ্র মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মহাজাতি তৈরি করা। ইসলামের কনসেপ্ট হচ্ছে, পুরো মানবজাতি একটা জাতি হবে, তারা ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়, অবিচার, অসত্য ও আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে থাকবে। তাদের নেতা থাকবে একজন। যে কোনো ঐক্য রক্ষা করতে হলে একজন নেতা থাকতে হয়- এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। সেভাবেই এ জাতিটা তৈরি হয়েছিল। রসুলাল্লাহর এন্তেকালের পর আবু বকর (রা.) হয়েছিলেন সেই জাতির নেতা বা এমাম। আবু বকর (রা.) চলে যাওয়ার পর ওমর (রা.), ওমর (রা.) চলে যাওয়ার পরে ওসমান (রা.)। তারপর থেকেই ইসলামের ইতিহাসে কয়েকটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটলো, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জাতির ভিতরে ঐক্য নষ্ট করে দিল, ক্রমান্বয়ে সিয়া সুন্নি ফেরকা সৃষ্টি হলো। এ জাতির মধ্যে কখনো এই দুঃখজনক বিভক্তি সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল না। যাই হোক জাতিটা ভাঙতে ভাঙতে আজকে যে অবস্থায় এসেছে যে মুসলিম এখন আর কোনো জাতিসত্তা নয়। যাঁকে কেন্দ্র করে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব এমন কোনো নেতাও এ জাতির নেই, যে নেতা আমাদের জাতীয় ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক সবকিছু ব্যবহারে নেতৃত্ব দেবেন এমন কেউ নেই। অথচ এটা ছাড়া জাতির অস্তিত্ব টেকে না। আপনারা আরো জানেন যে সুরা ‘ইসরাইলের’ ৭১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন যে, “সেই দিন প্রত্যেক জাতিকে তাদের ইমামের অর্থাৎ নেতার সাথে ডাকা হবে।” আল্লাহ এই শৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন, তিনি সে মোতাবেকই হাশরের দিনে প্রত্যেক জাতিকে তাদের নেতার নেতৃত্বে আহ্বান করবেন। আমরা যাঁর মাধ্যমে সত্য পেয়েছি, যিনি আমাদেরকে ইহ ও পারলোকিক জীবনে শান্তিলাভের সঠিক পথ দেখিয়েছেন, অর্থাৎ আমাদের এমামুয্যামান, আমরা চাই আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সঙ্গে ডাকুন, আমরা তাঁকে আমাদের এ যামানার এমাম, এ সময়ের নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছি।

আমরা জানি শেষ যামানায় এমাম মাহদী (আ.) এর আসার কথা। আল্লাহ রসুল বলেছেন যে একজন মানুষ আসবেন তাঁর নাম অন্য থাকবে, কিন্তু তাঁর উপাধি হবে হেদায়াত প্রাপ্তদের নেতা বা এমাম মাহদী। কাজেই ইসলামে যেহেতু এ ধারণাটা আছে, সেটা আমরা অস্বীকার করার প্রশ্নই আসেনা। তিনি যখন আসবেন, তখন তাঁকে যারা অনুসরণ করবেন তারা পথ পাবেন। কিন্তু এই সময়ে আমরা যারা আছি তারা কি নেতৃত্বহীন অবস্থায় থাকব? না। আল্লাহ আমাদেরকে এ যুগের নেতা দান করেছেন, তিনি হচ্ছেন এমামুয্যামান। মাহদী (আ.) নিয়ে অনেকে স্বয়ং এমামুয্যামানকেও প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু তিনি সব সময় বলতেন, খবরদার, আমাকে তোমারা মাহদী (আ.) বলবে না। আমি একজন অতি গোনাহগার মানুষ, আমি রসুলাল্লাহর একজন সাধারণ উম্মত। তবে আমি তোমাদের সামনে যে ইসলাম উপস্থাপন করেছি, সেটা সত্য ইসলাম।’ এজন্য আমরা কোথাও এমামুযযামানকে এমাম মাহদী লিখি নাই এবং বলিও না।

প্রশ্নই আসে না। এমামুযযামান বলতেন আমি আল্লাহর এক গুনাহগার বান্দা, আল্লাহ রসুলের গুনাহগার উম্মত। তিনি আল্লাহ রসুলকে যেভাবে সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন আমাদের চর্মচক্ষুতে কখনও দেখি নি কেউ আল্লাহ রসুলকে এভাবে সম্মান করে। আমরা দেখেছি এমামুযযামান কখনও পশ্চিম দিকে ফিরিয়ে জুতা রাখতেন না, কখনও তিনি পশ্চিম দিকে পিঠ দিয়ে বসতেন না। রসুলের সম্মানে তিনি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে যেতেন। তাঁর নবী হওয়ার বা নবী দাবি করার প্রশ্নই আসে না, মানুষ যেন আমাদের কথা না শোনে, আমরা যেন সর্বত্র হয়রানির শিকার হই এজন্য এরকম কথাবার্তা ধর্মব্যবসায়ীরা অপপ্রচার চালিয়েছে। তাঁর ‘এ ইসলাম ইসলামই নয়’ বই-তে তিনি হাজার হাজার বার শেষ নবী, আখেরি নবী রসুল (দ.) বলেছেন। আমাদের সব লেখায় আমরা মোহাম্মদ (দ.) কে আখেরি নবী, শেষ নবী বলেছি সুতরাং এমামুয্যামানের নবী দাবি করার অভিযোগ অবান্তর। আমরা বিশ্বাস করি তিনি ইসলাম সম্পর্কে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন সেগুলো শতভাগ সত্য। তাঁর একটি বক্তব্যকেও আজ পর্যন্ত কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে নি। তাই তাঁকে আমরা এই যুগের নেতা বলে বিশ্বাস করি।

পন্নী পরিবারের দুটি ভাগ। তাঁদের বংশের অনেকেই ওলি আল্লাহ ছিলেন, আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। আবার অনেকে উপমহাদেশের পরিচিত রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ভারতের বিখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ খাজা মোহাম্মদ হোসাইনী গেসুদারাজ বন্দে নেওয়াজ (র.) (১৩২১-১৪২২), টাঙ্গাইলের হযরত মুঈন খান পন্নী (র.) ছিলেন এমামুয্যামানের পূর্বপুরুষ। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাধক হায়দার আলী খান পন্নী (রহ.) ছিলেন এমামুযযামানের দাদাজান। তাঁরা চিরকালই মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। প্রখ্যাত দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চান মিয়া ছিলেন এমামুয্যামানের দাদার বড় ভাই। পন্নী পরিবার অনেক বড়। একটা বড় পরিবারে বিভিন্ন মতের বিভিন্ন চরিত্রের মানুষ থাকে। এখানে অনেকেই আছেন যাদের মধ্যে কে বিএনপি করেন, কে আওয়ামী লীগ করেন, কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন এগুলো তো এমামুয্যামানের উপর বর্তানোর কোনো মানে হয় না। এটা ইতিহাস যে, তৎকালীন আরবের কোরাইশ বংশে আল্লাহর রসুল এসেছেন। মক্কার সবচাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার কোরাইশ আপনারা জানেন। তারা কাবা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই কোরাইশ বংশের আবু লাহাব, আবু জাহেল, ওতবা, শায়েবা এমন এমন জঘন্য কাজ করেছেন যে তারা ঐতিহাসিকভাবে ঘৃণিত হচ্ছেন। তারা কাবাকে অপবিত্র করেছেন। তাদের কেউ কেউ রসুলাল্লাহর আপন চাচা। কিন্তু তাদের দুষ্কর্ম কি আল্লাহর রসুলের উপর বর্তাবে? রসুলাল্লাহ ছিলেন মক্কার সেই কোরাইশদের থেকে আলাদা। সেই কোরাইশরা আল্লাহ রসুলকে বলতো আল-আমিন, আস-সাদেক, সত্যবাদী। তিনি কখনও মিথ্যা বলতে পারেন না, ওয়াদা নষ্ট করেন না, কারও হক নষ্ট করেন না, তিনি ন্যায় নীতিবান। মানুষের কল্যাণের চিন্তাই তিনি সবসময় করেন। আমাদের এমামুয্যামানও তাঁর পরিবারের মধ্যে সত্যবাদী, আল্লাহর পছন্দনীয় চরিত্রবান ও সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্নী পরিবারের শাসনকার্য পরিচালনা, আধ্যাত্মিক ও রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস হাজার বছরের। এমন একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এমামুয্যামান বংশের অন্য অনেকের থেকে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন, এ কথা তাঁর পরিবার ও পরিচিত মহলের সকলেই জানেন।

কার মধ্যে মাহদী বা ঈসা বিরাজ করছেন সেটাতো বলা যায় না, সে জন্য সত্যসন্ধানীরা অনুসন্ধান বা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে পারেন। তবে আমরা মনে করি তাঁরা কবে আসবেন সে আশায় নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকাকে ইসলাম সমর্থন করে না। পৃথিবীতে চলমান সঙ্কট থেকে মানুষকে উদ্ধারের জন্য সব সময় প্রচেষ্টা থাকা উচিত। কবে এমাম মাহদী (আ.) আসবেন আর এলান করবেন, তখন দলে দলে মানুষ তার দলে যোগদান করে পৃথিবীকে পরিবর্তন করে ফেলবেন, সে সময় কবে আসবে তা আমরা জানি না। আমাদের কাছে মাননীয় এমামুয্যামান যে পন্থা তুলে ধরেছেন তা মহাসত্য, তা দিয়ে মানবজাতির সঙ্কট নিরসন করা সম্ভব হবে। তাই আমরা সে চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছি।

অমর্ত্য সেন বই লিখেছেন- তর্কপ্রিয় ভারতীয়। মানুষ তর্ক ভালোবাসে। অপ্রিয় লোকের ভালো কিছুই তার চোখে পড়ে না। পৃথিবীর কোন বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক হয় নি? সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে আল্লাহকে নিয়ে, তারপর নবী-রসুল ও অন্যান্য মহামানবদের নিয়ে। গত ৪৪ বছর ধরে জাতির জনক আর স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে এদেশের জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক চলছে। আমাদের বানান নিয়েও বহু বিতর্ক হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা একটি নির্দিষ্ট বানানরীতি অনুসরণ করি। এর ব্যাখ্যা আমরা পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ করেছি, হ্যান্ডবিল বিতরণ করে জানিয়েছি, বইয়ের সঙ্গে যোগ করে দিয়েছি, আপনারা সেখানে ভুল থাকলে আমাদের দেখান, আমরা শুধরে নেব। আজ পর্যন্ত কেউ ভুল দেখাতে পারে নি। আল্লাহর রহমে আমরা ভুল লিখছি না। এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, ধরুণ টিভিতে বিজ্ঞাপন দিল- একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন। আপনার সঙ্গে রক্তের গ্রুপ মিলল। কিন্তু আপনি রক্ত দিতে গেলেন না, অজুহাত দেখালেন বিজ্ঞাপনে মুমূর্ষু বানানটি ভুল লেখা হয়েছিল। এটা কি উচিত হবে? আমরা বলছি, আপনারা বানান না দেখে আমাদের বক্তব্য দেখুন, মুমূর্ষু জাতি বাঁচবে। তা না করে বানান নিয়ে বিতর্ককে আমরা যৌক্তিক মনে করি না।

হেযবুত তওহীদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ২০০৮ সনের ২ ফেব্রুয়ারি। আল্লাহ হেযবুত তওহীদকে সত্যায়ন করার জন্য বিরাট এক মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনা সংঘটন করেন। মোবাইল ফোন যোগে মাননীয় এমামুয্যামান যাত্রবাড়িতে একটি বাড়ির ছাদে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে দশ মিনিট নয় সেকেন্ডের একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে আল্লাহ সেখানে ন্যূনতম নয়টি অলৌকিক ঘটনা সংঘটন করেন। ৩১৮ জন মানুষ সেগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী। বিস্তারিতভাবে সেগুলো এখানে বলার সময় হবে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রমাণসহ একটি বই আমরা প্রকাশ করেছি যার নাম ‘আল্লাহর মোজেজা: হেযবুত তওহীদের বিজয়-ঘোষণা’ এ দিন আল্লাহ জানিয়ে দেন যে, হেযবুত তওহীদ দিয়েই সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর চিরন্তন, সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

ধর্মব্যবসায়ী মোল্লারা বাস্তবেই মেয়েদেরকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্য বন্দী করে রাখতে চায়, হেযবুত তওহীদের বেলায় এ কথাটি বহুবার বহুভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মোল্লারা যখন ফতোয়া দেয়, তাদের কথাগুলি মানুষ আল্লাহ-রসুলের কথা বলেই বিশ্বাস করে। শিক্ষিত শ্রেণির এ এক অন্ধত্ব। তারা যাচাই করে না যে সেগুলি ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা এটা বিবেচনা না করেই মানুষ ইসলামকে বর্বর, পশ্চাৎমুখী বলে অপবাদ দেওয়া হয়। অথচ পর্দা প্রথার নামে যে জগদ্দল পাথর মোল্লারা মেয়েদের উপরে চাপিয়ে রেখেছে সেটা ইসলাম সম্মত নয়। আমাদের নারী কর্মীরা যখন সত্য প্রচারে বা পত্রিকা বিক্রি করতে বের হয়, তাদেরকে অনেকেই প্রশ্ন করে, ‘তোমরা ঘর থেকে বের হলে কেন? মেয়েদেরকে রাস্তায় বের করে দিয়ে হেযবুত তওহীদ তো ইসলামটা ধ্বংস করে দিচ্ছে।’আবার কেউ বলে, রাস্তার মধ্যে ইসলামের কথা বলে, এটা আবার কোন ইসলাম? হকারি করে মেয়েরা, পত্রিকা বিক্রি করে মেয়েরা, এটা তো কোন দিন দেখি নি। অনেকে সময় তারা সন্দেহ করে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ অফিসারও একই মন্তব্য করেন, মেয়ে মানুষ পত্রিকা বিক্রি করে এমন কখনও দেখি নি।’

এইসব অদ্ভুদ ও যুক্তিহীন প্রশ্নের একটাই অর্থ দাঁড়ায়- মেয়েরা ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনা পর্যন্ত সবই কোরতে পারবে, কিন্তু ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তারা ঘর থেকেও বের হতে পারবে না। জাতির এই মানসিক পক্ষাঘাত কবে ঘুঁচবে? ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাই এ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। আল্লাহর রসুলের সময় মেয়েরা রসুলের সঙ্গে যুদ্ধে পর্যন্ত গেছেন। তারা সামাজিক সকল কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন, মসজিদে পুরুষদের সঙ্গেই সালাতে অংশ নিয়েছেন, পরামর্শ সভায় পরামর্শ দিয়েছেন, হাসপাতালের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেছেন। রসুলের সময় সবকাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল অবারিত। অথচ আজ মেয়েদের কেবলই ঘরের কাজে আটকে রাখতে চায় ধর্মব্যবসায়ীরা। জাতির অর্ধেক শক্তিকে এভাবে অপচয় করে তারা জাতির ধ্বংস ডেকে এনেছেন এটা বোঝার শক্তিও তাদের নেই। আমাদের মেয়েরা পত্রিকা বিক্রি করেন এটা তাদের পেশা নয়, সংগ্রাম। এটি নারীমুক্তির একটি সোপান।

এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলার আগে দুটি পূর্বসিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানতে হবে –

(১) পারিবারিক জীবনের বিধান রাষ্ট্রে চলে না, উভয় অঙ্গনে আলাদা বিধান লাগবে।

(২) আল্লাহ বিধানের ভারসাম্য এর অপূর্ব বৈশিষ্ট্য। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ধর্ম অধর্মে পরিণত হয়।

মানবসমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে ইবলিস প্ররোচনা দিয়ে এই দীনের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে। ফলে মানুষ ভুলে গেছে কার কি কর্তব্য ও স্রষ্টা নির্ধারিত দায়িত্ব। দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট না থাকলে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা হতে বাধ্য, অন্যায় অবিচারে মানবজাতি ডুবে গেলে আল্লাহ কোন নবী রসুল পাঠিয়ে সেই ভারসাম্যকে ফিরিয়ে এনেছেন। বর্তমানের ইহুদি-খ্রিস্টান বস্তুবাদী সভ্যতা (দাজ্জাল) মানুষের জীবন থেকে সর্বপ্রকার নৈতিকতার শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে এবং স্রষ্টা ও আখেরাতের ধারণাকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে সমাজে নারী ও পুরুষের কার কী অবস্থান, কার কী দায়িত্ব ও কর্তব্য তা মানুষ একেবারেই ভুলে গেছে। সকল ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে এ বিষয়ে স্রষ্টার দেওয়া মানদণ্ডও দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে। প্রচলিত বিকৃত ইসলামে নারী পুরুষের সঠিক অবস্থান নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে সকল আলেমই “সুরা নেসার ৩৪ নং আয়াত”কে ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করেন।

“আর রেজালু কাওয়্যামুনা আলান্নেসায়ী” – এ আয়াতটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এ আয়াতটির অনুবাদ করা হয়, “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে।” (সুরা নিসা: ৩৪)

দেখুন, আমরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে যে কাজের দায়িত্ব দেই, একজন শিশুকে তা দেই না। কারণ তাদের শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা ও সক্ষমতার তারতম্য। তারা উভয়েই একই পরিবারে থাকে কিন্তু উভয়ের কাজের ক্ষেত্র আলাদা। পরিবার হচ্ছে মানবসমাজের ক্ষুদ্রতম সংগঠন। এই আয়াতে ইসলামে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত পরিবারে কার কী অবস্থান, অধিকার ও কর্তব্য সে সম্পর্কে একটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ পুরুষের ক্ষেত্রে বিশেষণ ব্যবহার করেছেন ‘কাওয়্যামুনা’। শাসক, কর্তৃত্বের অধিকারী, আদেশদাতা, ক্ষমতাশালী, নেতৃত্বের অধিকারী, ইত্যাদি বোঝাতে আরবিতে আমীর, সাইয়্যেদ, এমাম, সুলতান, হাকীম, মালিক ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ কোন যুক্তিতে এবং কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে নারীর উপরে কর্তৃত্বশীল করেছেন তা এই ‘কাউয়ামুনা’ শব্দের মধ্যেই নিহিত রোয়েছে। কাউয়ামুনা শব্দের অর্থ হচ্ছে সুঠাম ও সুডৌল দেহবিশিষ্ট, মানুষের গঠন কাঠামো, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক, শাসক, নেতা (আরবি-বাংলা অভিধান ২য় খণ্ড, পৃ ৫৩১- ই.ফা.বা.)। সুতরাং এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, পুরুষ শারীরিক দিক থেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী, তার পেশী, বাহু, হাড়ের গঠন, মেরুদণ্ড এক কথায় তার দেহকাঠামো নারীর তুলনায় অধিক পরিশ্রমের উপযোগী, আল্লাহই তাকে রুক্ষ পরিবেশে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য বেশি দান করেছেন, তাই পুরুষের দায়িত্ব হলো সে পুরুষ শক্তি সামর্থ্য প্রয়োগ করে, কঠোর পরিশ্রম করে রোজগার করবে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভূমি কর্ষণ করে ফসল ফলিয়ে, শিল্পকারখানায় কাজ করে উপার্জন করবে এবং পরিবারের ভরণপোষণ করবে। এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই পুরুষকে আল্লাহ নারীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়েছেন, নারীর অভিভাবক করেছেন। এটা মানব সমাজে বিশেষ করে পরিবারে পুরুষের বুনিয়াদি দায়িত্ব। অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ সন্তান ধারণের উপযোগী শরীর দান করেছেন, সন্তানবাৎসল্য ও সেবাপরায়নতা দান করেছেন। তাই প্রকৃতিগতভাবেই তাদের মূল কাজ হচ্ছে সন্তানধারণ করা, তাদের লালন-পালন করা, রান্না-বান্না করা এক কথায় গৃহকর্ম করা। সংসদ বাঙ্গালা অভিধানে স্বামী শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে পতি, ভর্তা, প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। আল্লাহর একটি সিফত হচ্ছে রাব্বুল আলামীন বা বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আল্লাহ যেমন কোন প্রাণী সৃষ্টি করার আগেই তার রেজেকের বন্দোবস্ত করে রাখেন, কেবল আহার্য নয় জীবনোপকরণ হিসাবে তার যখন যা দরকার তাই তিনি নিরন্তর সরবরাহ করে যান। বিশ্বজগতে প্রতিপালক হিসাবে আল্লাহর যে ভূমিকা, একটি পরিবারে আল্লাহরই প্রতিভূ (খলিফা) হিসাবে পুরুষেরও অনেকটা সেই ভূমিকা, কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরে।

সালাহ বা নামাজ হচ্ছে উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটির মডেল। এখানে প্রথম সারিতে পুরুষ এবং দ্বিতীয় সারিতে নারী। বাস্তব জীবনেও এই মডেলের রূপায়ণ ঘটা ইসলামের কাম্য। উপার্জন করা পুরুষের কাজ, তাই বলা যায় জীবিকার যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েরা দ্বিতীয় সারির সৈনিক। কখনও কখনও যদি অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে গিয়ে জীবিকার লড়াইতে অবতীর্ণ হতে হয় সেটার সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। শোয়াইব (আ.) বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং তাঁর পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর দুই তরুণী কন্যা তাঁদের পশুপালের দেখাশোনা করতেন (সুরা কাসাস ২৩)। এছাড়া ইসলামের বিধান হলো স্বামীর উপার্জনের উপর স্ত্রীর অধিকার রয়েছে কিন্তু স্ত্রীর উপার্জনের উপর স্বামীর কোন অধিকার নেই। এখানেও নারীর উপার্জন করার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে নেওয়া হলো। রসুলাল্লাহর অনেক নারী আসহাব পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় বা পুরুষ সদস্যরা জেহাদে অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ করে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন। রসুলাল্লাহর আহ্বানে সর্বপ্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন তিনি একজন নারী, আম্মা খাদিজা (রা.)। তিনি তাঁর সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায়, মানবতার কল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ত্যাগের পরিচয় তিনি দিয়ে গেছেন। আবার ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম যিনি জীবন দিলেন, শহীদ হলেন তিনি একজন নারী, সুমাইয়া (রা.)।

যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রথম সারিতে থেকে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব পুরুষদের। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও সকল সামরিক বাহিনীতে এটাই হয়ে থাকে। এখানেও কারণ পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শক্তি, সামর্থ্য, কষ্টসহিষ্ণুতা ইত্যাদি। সেখানে নারীর স্বাভাবিক অবস্থান দ্বিতীয় সারিতে। তাদের কাজের মধ্যে প্রধান কাজ হচ্ছে রসদ সরবরাহ। যুদ্ধের বেলাতে রসদ সরবরাহকে যুদ্ধের অর্ধেক বলে ধরা হয়। সৈনিকদের খাদ্য, পানি, যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধের আনুষঙ্গিক উপাদান সরবরাহ, আহতদেরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া, নিহতদেরকে দাফন করা ইত্যাদি সবই দ্বিতীয় সারির কাজ। রসুলাল্লাহর সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই প্রথমে এই দ্বিতীয় সারির দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। তাছাড়া মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী রুফায়দাহ (রা.)। যোদ্ধাদেরকে যদি রসদ ও এই সেবাগুলি দিয়ে সাহায্য না করা হয় তবে তারা কখনোই যুদ্ধ করতে পারবে না।

তবে যুদ্ধে এমন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন মেয়েদেরকেও অস্ত্র হাতে নিতে হয়। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, বহু সাহাবি শহীদ হয়ে যান, স্বয়ং রসুলাল্লাহ মারাত্মকভাবে আহত হন, কাফেররা প্রচার করে দেয় যে, রসুলাল্লাহও শহীদ হয়ে গেছেন এমনই বিপজ্জনক মুহূর্তে মেয়েরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবি উম্মে আম্মারার (রা.) অবিশ্বাস্য বীরত্ব সম্পর্কে রসুলাল্লাহ বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাকেই লড়াই করতে দেখেছি।’

এর অনেক পরে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বীর যোদ্ধা দেরার বিন আজওয়ার যখন শত্রুর হাতে আটকা পড়েন তখন তারই বোন খাওলা ঘোড়ায় চড়ে এমন লড়াই শুরু করে ভাইকে উদ্ধার করেন যে স্বয়ং খালিদ (রা.) বিস্ময়প্রকাশ করেন। অর্থাৎ রসুলাল্লাহর সময়ে নারীরা ঠিকই প্রয়োজনবোধ প্রথম সারির ভূমিকাও পালন করেছেন, মাসলা মাসায়েলের জটিল জাল বিস্তার করে কোনো কাজেই তাদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হয় নি, আজ যেমনটা করা হচ্ছে। নারীর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতাকে ইসলাম মোটেও অস্বীকার করে না। উটের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন উম্মুল মো’মেনীন আয়েশা (রা.), বহু সাহাবি তাঁর অধীনে থেকে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ঐতিহাসিকরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশেষণ করেছেন, সমালোচনা করেছেন কিন্তু “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম” বলে তখন তাঁর পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধরত কোন সাহাবি ফতোয়া দিয়েছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

আল্লাহর বিধানমতে কেবল একটি মাত্র পদ নারীকে দেওয়া বৈধ নয়, সেটি হলো- সমস্ত পৃথিবীময় উম্মতে মোহাম্মদী নামক যে মহাজাতি সৃষ্টি হবে সে জাতির এমামের পদ। আল্লাহ স্রষ্টা হিসাবে জানেন যে নারীর শারীরিক গঠন যেমন পুরুষের তুলনায় কোমল, তার হৃদয়ও পুরুষের তুলনায় কোমল, আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল। সহজেই তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে, তার ধৈর্য্য, দূরদর্শীতা পুরুষের চেয়ে কম, তাকে প্রভাবিত করা সহজতর। ইবলিস নারীকেই প্রথম আল্লাহর হুকুম থেকে বিচলিত করেছিল। এ কারণেই আল্লাহর অগণ্য নবী-রসুলের মধ্যে একজনও নারী নেই। পারস্যের সঙ্গে রোমের যুদ্ধের সময় রসুলাল্লাহ একটি পূর্বাভাষে বলেছিলেন, নারীর হাতে যে জাতি তার শাসনভার অর্পণ করেছে যে কখনো সফল হতে পারে না (তিরমিজি)। তবে স্বীয় যোগ্যতাবলে উম্মতে মোহাম্মদীর এমামের পদ ছাড়া অন্যান্য যে কোন পর্যায়ের আমীর বা নেতা সে হতে পারবে। এমন কি একজন নারী কোন এলাকার রাজনৈতিক প্রশাসকও হতে পারেন। শুধু নারী হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্বলাভের যোগ্যতা অযোগ্যতার মাপকাঠি নয়।

পুরুষ যেহেতু পরিবারের সবাইকে ভরন-পোষণ করাচ্ছে, লালন-পালন করছে কাজেই তার কথা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে শুনতে হবে, এটা একটি পারিবারিক শৃঙ্খলা। কিন্তু পারিবারিক জীবনের শৃঙ্খলা সম্পর্কিত এই আয়াতটিকে সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন একশ্রেণির আলেম। তাদের এই অপচেষ্টার ফলে নারী সমাজের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হচ্ছে না, তারা তাদের যোগ্যতার প্রমাণও দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আজকের বিকৃত ইসলামের কূপমণ্ডূক ধর্মজীবী আলেম-মোল্লারা এটা বুঝতে সক্ষম নন যে, একটি পরিবার পরিচালনার শৃঙ্খলা দিয়ে রাষ্ট্র চলতে পারে না, বা জীবনের অন্যান্য অঙ্গনগুলি চলতে পারে না। তাই জীবনের অন্যান্য অঙ্গনে যার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা বেশি সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে।

দাজ্জাল সম্পর্কে হাদিসে যে অতিকায় দানবের কথা বলা আছে সেটা বর্তমানের পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপক বর্ণনা, মাননীয় এমামুয্যামান তাঁর দাজ্জাল বইয়ে এটা প্রমাণ করেছেন। তাঁর যুক্তিগুলো কেউ খণ্ডাতে পারেন নি, পারবেও না। সংক্ষেপে মূল কথা হচ্ছে, ইউরোপের মধ্যযুগে যখন চার্চ ও রাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তখন রাজা অষ্টম হেনরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চার্চের ক্ষমতাকে খর্ব করেন এবং রাজাকে চার্চের প্রধান বলে ঘোষণা করেন। সেই থেকে জাতীয় জীবনে ধর্মের আর কোনো গুরুত্ব রইল না, ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হলো। এর পূর্বে মানুষের ইতিহাস যতদূর জানা যায়, ধর্মের দ্বারাই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, সেই ধর্ম সঠিক হোক আর বিকৃতই হোক। ১৫৩৭ এর পরের রেনেসাঁ যুগের দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রনীতির কারণে ধর্মহীন একটি জীবনব্যবস্থা সৃষ্টি হলো যাকে কেতাবি ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা বলা হচ্ছে। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে প্রায় সমগ্র বিশ্বে এটি চালু করা হয়। এর কু-প্রভাবে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে গেল যে কোনো উপায়েই হোক অধিক উপার্জন, ভোগবিলাস, বস্তুগত স্বার্থোদ্ধার। একেই বলা হচ্ছে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। অথচ মানুষ দেহসর্বস্ব নয়, তার আত্মাও আছে। তার আত্মিক পরিশুদ্ধির ও চারিত্রিক উৎকর্ষের জন্য ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ধর্মহীন জীবন ব্যবস্থার প্রভাবে ব্যক্তিজীবন থেকেও ধর্ম লুপ্ত হয়ে মানবসমাজে চরম নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হলো। সর্বত্র বিরাজমান স্রষ্টার ভয়ে ধর্মবিশ্বাসী মানুষ অপরাধ করে না, কিন্তু স্রষ্টাহীন জীবনব্যবস্থায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেই অপরাধ সংঘটন করে। এভাবে সর্বপ্রকার অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। এই যে একদিকে প্রযুক্তির উন্নয়ন, অপরদিকে মনুষ্যত্বের চরম অধঃপতন পৃথিবীতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অবশ্যই মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ ও স্রষ্টার নেয়ামত, কিন্তু আজ এগুলো যতটা না মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে তার বহুগুণ ব্যবহৃত হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে। সংবাদপত্রগুলো দুঃসংবাদে ভরা, রাজনীতি আর মিথ্যা সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে, নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ সম্মানিত হচ্ছে। ধর্মকে জাতীয় জীবন থেকে নির্বাসন দেওয়ার পরিণামেই এই ভয়ঙ্কর বস্তুবাদী সভ্যতার জন্ম হয়েছে। তাই একে আল্লাহর রসুল দানবের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের শক্তিবলে সারা পৃথিবীতে একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, যে সভ্যতাটা স্রষ্টাহীন, আত্মাহীন, ঈশ্বরহীন একটা বস্তুবাদী সভ্যতা। এতে ধর্মের কোনো জায়গা নেই, ভূমিকা নেই, ধর্মকে করা হয়েছে ব্যক্তিজীবনের ঐচ্ছিক বিষয় যা কোনোভাবেই সামাজিক কাঠামোর উপর প্রভাব বিস্তারের অধিকার রাখে না। মানুষের মনে স্রষ্টার প্রতি জবাবদিহিতা বা পরকালের ভয় বিলীন হয়ে যাওয়ায় সমস্ত অপরাধ লাগামহীনভাবে বাড়ছে, মিথ্যা, প্রতারণা, ব্যভিচার যুগের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো দুনিয়াটা হয়ে গেছে অশান্তির নরককুণ্ড। এই সভ্যতাটাকে সৃষ্টি করেছে পশ্চিমারা। বিশ্বটা যখন তাদের অধীনে চলে গেল তখন তাদের থেকে এই জীবনদর্শন সব জায়গায় ঢুকেছে। আমরা এটার জন্যই পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে কথা বলি, পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে নয়।

ভারতে কিন্তু কখনো এমন জীবন দর্শন ছিল না। ভারতে হাজার হাজার বছর গেছে শাস্ত্রের বিধানে, এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতিবোধ মানুষের রক্তে, অস্থিমজ্জায় মিশে ছিল। সেখানে পরিবার, গ্রাম, সমাজ ইত্যাদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানরূপে কাজ করত। এগুলো মানুষের আচরণ ও শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করত। সে ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করে দিয়েছে এই পশ্চিমা জীবনব্যবস্থার বিষাক্ত দর্শন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আগে শাস্ত্র থেকে জ্ঞান লাভ করে ব্যক্তিজীবনে এতই সৎ ছিলেন দুধে পানি মেশানোর কথা কল্পনাও করত না, অথচ আজ সব খাদ্যেই বিষ, সবকিছুতেই ভেজাল, এ বিষয়ে সনাতন-মুসলিমের কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ সবাই সবাইকে বিশ্বাস করত, চিন্তাও করত না মানুষ মিথ্যা কথা বলতে পারে, কিন্তু ব্রিটিশরা মামলা মকদ্দমার সিস্টেম চালু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে মিথ্যাবাদী হতে বাধ্য করেছে। সনাতন কি মুসলিম, মানুষের ওয়াদা ছিল পাহাড়ের মত অনড়, সেখানে পশ্চিমাদের শেখানো রাজনীতির দ্বারা মানুষের ওয়াদা মূল্যহীন হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ব্যাপারে কথা বলি না কেন প্রশ্ন করা হয়, আগে বলুন- ৪৭ সালের আগে কি ভারত আলাদা ছিল? কারা একে আলাদা করল? যারা হাজার হাজার বছর ধরে একই ভূখণ্ডে, একই জলবায়ুতে লালিত হয়েছে, আজ তারা একে অপরের শত্রু, পাকিস্তান বাংলাদেশ শত্রু, ভারত পাকিস্তান শত্রু। একে অপরকে শোষণ-শাসন করার চেষ্টা করছে, সীমান্তে হানাহানি করছে। এরা কবে থেকে পরস্পরের শত্রু হলো সে ইতিহাস দেখবেন না? আজ এই মানুষগুলি সম্পূর্ণ শত্রুভাবাপন্ন হয়ে গেছে কারণ তারা নিজস্ব সভ্যতাকে পরিত্যাগ করে পশ্চিমাদের স্বার্থপর সভ্যতাকে গ্রহণ করে নিয়েছে; ফলে ব্যক্তিজীবনে তারা অসৎ হয়েছে, জাতীয় জীবনে হয়েছে দাঙ্গাপ্রিয়।

ভারতকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার রাষ্ট্র বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বিজেপির কাছে ১২৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস যেভাবে পরাজিত হলো তাতে আমরা এটুকু বলতে পারি যে, বর্তমানে ধর্মীয় অনুভূতিই সেখানে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি বা ফ্যাক্টর। গোটা উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীই, সনাতন কি মুসলিম, তারা অধিকাংশই ধর্মবিশ্বাসী। তাদের এ বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করে রাজনীতিকরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা। আমরা মনে করি, আমাদের দেশেও ধর্মকে নিয়ে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে মানুষকে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার, যাতে ধর্মবিশ্বাস দেশ ও জাতির অকল্যাণে নয় কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে যে ইসলাম চলছে এটা ইসলামই না। যারা এই রাজনীতি করছেন তারা এই বিকৃতটাকেই প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তারা যদি সেটা কায়েম করতে পারেন তবে তা প্রকৃত ইসলাম হবে না, হবে তালেবানি রাষ্ট্র বা একটা জগাখিচুড়ি। মূল কথা সেটা তারা কোনোদিনও জাতিকে শান্তি দিতে পারবে না। আর রাজনীতির বিষয়ে কথা হচ্ছে, আল্লাহ রসুল কি এই সিস্টেমে রাজনীতি করেছেন? তিনি কি মার্কা নিয়ে মিছিল করেছেন? নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য দলের নেতৃত্বে মন্ত্রিত্ব করেছেন? করেন নি। তিনি ও তাঁর সাহাবিরা আগে সত্যটা আগে মানুষের সামনে বুঝিয়েছেন, তওহীদের বালাগ করেছেন। তারপরে মানুষ যখন সত্যটা গ্রহণ করে নিয়েছে তারপর ধীরৈ ধীরে তারা এ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, যেভাবে প্রাকৃতিক নিয়মে ষড়ঋতুর পরিবর্তন হয়, তেমনি প্রাকৃতিকভাবে ধীরে ধীরে জঘন্যতম আরব জাতি মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল।

বাংলাদেশে গত কুড়ি বছর থেকে সংবিধান মেনেই আমরা কাজ করছি এবং আমরাই বলতে পারি যদি কেউ এদেশে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংবিধানের নিয়মগুলো রক্ষা করে চলে তবে সেটা এই হেযবুত তওহীদ। কারণ গত কুড়ি বছর ধরে সংবিধান পরিপন্থী কোনো কাজ করেছি বলে কোনো নজির কেউ দেখাতে পারবে না। বরং সংবিধানপ্রদত্ত যে নাগরিক অধিকার, মৌলিক অধিকার তা আমাদের বেলায় অন্যদের দ্বারা বার বার লংঙ্ঘিত হয়েছে। আমাদের কথা বলতে দেয়া হয় নাই, আমাদের মিটিং করতে দেয়া হয় নাই, আমাদের অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে মর্যাদাহানি করা হয়েছে, অনর্থক সন্দেহ করে প্রশাসনিক ও সামাজিক হয়রানি করা হয়েছে, ৪৬০ এরও অধিক বার মিথ্যা অভিযোগে জেলে দেয়া হয়েছে যে মিথ্যা আদালতে আর প্রশাসনের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা করা হয়েছে, আমাদের লেখা সম্পূর্ণ বৈধ হ্যান্ডবিল ও বই প্রচার করতে দেওয়া হয় নি। এগুলো গত কুড়ি বছরে হাজার হাজার বার হয়েছে, যার ডকুমেন্ট আমরা সংরক্ষণ করেছি, কেউ দেখতে চাইলে দেখবেন। অথচ আমাদের বইপত্র ও সিডি সব প্রকাশনা সামগ্রীই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়মকানুন অনুসরণ করেই ছাপানো হয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, সংবিধানের নীতি পরিপন্থী কাজ আমাদের সঙ্গে করা হয়েছে, কিন্তু আমরা করি নাই। আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও আমরা আইন ভঙ্গ করি নাই, আইনকে নিজের হাতে তুলে নেই নাই।

প্রথমত, আমরা গণতন্ত্র মানি কি না। আসলে এক কথায় এর উত্তর হয় না। কারণ কেতাবে যাই লেখা থাক বাস্তবে গণতন্ত্রের যে করাল রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি দুনিয়াময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে দেশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করা হয়, গণতন্ত্রের নামে অন্যের অধিকার হরণ করা হয়, কথায় কথায় হরতাল ডাকা হয়, নাস্তানাবুদ করা হয়. সহিংস কর্মাকাণ্ড চালানো হয়, কারখানায় লক আউট করা হয়, এভাবে গণতন্ত্রের নামে সমস্ত অপকর্মগুলো যে চলে। যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো মাপকাঠি নেই, জনতার নামে সব চালিয়ে দেওয়া হয় আমরা এ গণতন্ত্র মানি না। শুধু তা-ই না, আমরা মনে করি, কোনো সভ্য মানুষ এই জাতীয় গণতন্ত্র মানতে পারে না এবং এ জাতীয় গণতন্ত্র দিয়ে কোনো দেশ সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নতি করতে পারে না। যে গণতন্ত্রের কারণে গত ৪৪ বছরে জাতিটি একদিনের জন্যও স্বস্তি পায় নি, যার দ্বারা জাতির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, হানাহানি হয়, একটা জাতি টুকরো টুকরো হয়ে যায়, নিজের দলের লোকেরা পদের জন্য নিজেদের হত্যা করে, আমরা এমন সর্বনাশা গণতন্ত্রকে ঘৃণা করি, প্রত্যাখ্যান করি। এ জাতীয় গণতন্ত্র দিয়ে পুরো দেশ, জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, এটা হচ্ছে পশ্চিমাদের চাপিয়ে যাওয়া ষড়যন্ত্রমূলক ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি। আশা করি এ সহিংসতা জাতিবিনাশী গণতন্ত্রের কথা আমাদের সংবিধানে লেখা নেই। সেখানে যে গণতন্ত্রের কথা লেখা আছে তা হলো, ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সকলের বাক স্বাধীনতা, গবেষণার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের নিশ্চয়তা, অবাধে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন দিয়ে সরকার গঠনের স্বাধীনতা, সরকারকে পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন নাগরিক হিসাবে আমার মতামত প্রদানের স্বাধীনতা ইত্যাদি। এই যদি গণতন্ত্র হয়ে থাকে তবে আমি এই সব নীতেকে স্যালুট করি, আমি এই সকল অধিকার চাই, এর জন্য লড়াই করি। আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলামও মানুষের এ অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেয় এবং তা প্রাপ্তির সঠিক পথ দেখায়।

এরপরে ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার মানে যে যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন, যার যার ধর্ম সে সম্মানের সঙ্গে পালন করবে, তার বিশ্বাসে কেউ আঘাত করবে না, তার উপাসনালয়ে কেউ হামলা করবে না, অর্থাৎ ধর্ম পালনে স্বাধীনতা, ধর্মীয় আনন্দ-অনুষ্ঠান করার স্বাধীনতা। এটা ধর্মনিরপেক্ষতা যদি হয়ে থাকে তবে এই ধর্মনিরপেক্ষতাকে আমরা সম্মান করি, এর জন্যই আমরা লড়াই করছি। ইসলাম যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখন সব ধর্মের লোকেরাই সেই ভূখণ্ডে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করেছিল। আমরা প্রকৃত ইসলামের যুগ বলতে রসুলাল্লাহর পর থেকে ৬০/৭০ বছর পর্যন্ত সময়কালকে বুঝি। এর পরে ইসলাম শাসক ও ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। সেটার উদ্দেশ্য হয়ে গিয়েছিল ভোগবিলাস ও সাম্রাজ্যবাদ। তারপর থেকে ইসলামের নামে যা কিছু করা হয়েছে তার সঙ্গে আল্লাহ-রসুলের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এর জন্য উম্মতে মোহাম্মদীকে দোষারোপ করা অযৌক্তিক।

পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম কীভাবে সেটাও স্মরণে রাখা প্রয়োজন। বাইবেলে রাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থা নেই, তাই রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তির পথনির্দেশ করতে খ্রিষ্টধর্ম ব্যর্থ হয়। এজন্য ইউরোপে ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে মানুষের তৈরি বিধান দিয়েই রাষ্ট্র চালানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ইউরোপ রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা একটা বস্তুবাদী সভ্যতার জন্ম দিয়ে ক্রমান্বয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়ার মাধ্যমে অপ-প্রচার চালিয়ে সেই ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকেও ধর্মকে উৎখাত করে দিতে চেষ্টা করে। ধর্মনিরপেক্ষতার নাম নিয়ে প্রকারান্তরে ধর্মহীনতার চর্চা শুরু হয়, এটাকে যদি ধর্মনিরপেক্ষতা বলেন তবে সেই ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সেই ধর্মহীনতা আমরা মানি না। কারণ এতে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মনিরপেক্ষতা যিগির তুলে আল্লাহর দেওয়া বিধানের প্রাকৃতিক ও মহাসত্য বিষয়গুলোকেও ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে জীবনকে অপ্রাকৃতিক করে তোলা হয়। মানুষের ঈমানকে বনসাই বানিয়ে রাখার এ প্রচেষ্টার ফলেই মানুষ ক্ষুব্ধ হয় আর ধর্ম ব্যবসায়ীরা তাকে ভিন্নখানে প্রবাহিত করে ধর্মকে ধ্বংসাত্মক কাজে লাগায়। ধর্মকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার প্রেরণা থেকেই জন্ম নিয়েছে ধর্মভিত্তিক অপরাজনীতি ও জঙ্গিবাদ। এগুলোর দ্বারা মানুষ ইহজীবনও হারিয়েছে, পরকালও হারিয়েছে। ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ বা ধর্মপ্রাণ মানুষের চিন্তা চেতনাকে হেয় করার ফলে মানবতা, জাতি, রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষ নৈতিকতা হারিয়ে অপরাধী হয়েছে। কাজেই ধর্মনিরপেক্ষতা যদি ধর্মহীনতা হয়, তবে আমরা এই ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে নই। আমাদের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ যার যার ধর্ম প্রালন ও প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করা, আমরা দৃঢ়ভাবেই এর সমর্থন করি।

এরপরে জাতীয়তাবাদ। এমামুয্যামান বলেছেন, জাতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি জাতির এককমাত্র, কিন্তু জাতির বাইরে ব্যক্তির কোনো মূল্য নেই। ইসলাম অর্থ শান্তি, আর শান্তি একটি সমষ্টিক বিষয়। এককভাবে একজনের জীবনকে শান্তিময় করা সম্ভব নয়, যদি আরেকজন অশান্তি সৃষ্টি করে। ইসলামের সবকিছুই হলো জাতি ভিত্তিক। আমি প্রথমে বলব মানবজাতি এক জাতি। বাবা আদম (আ.), মা হাওয়ার সন্তান সবাই আমরা একজাতি মানবজাতি। সে হিসাবে আমরা বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষও একজাতি। অন্যদিকে আমরা বাঙালি জাতি। কিন্তু নামে একজাতি হলেই হবে না, প্রত্যেকের অনুভূতি, জাত্যবোধ, চিন্তা চেতনা এক হতে হবে। আমরা একে অন্যের সমস্যাগুলো ভাগাভাগি করে নেব, প্রত্যেকের বিপদে এগিয়ে যাব। একজন বিপদগ্রস্তকে দেখে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাব না, তাকে রক্ষার চেষ্টা করব। এটা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। তা না করে কেবল রাজনীতির মঞ্চে গলার রগ ফুলিয়ে আমি বাঙালি, আমি মুসলমান ইত্যাদি বলে চিৎকার করে লাভ নেই। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমরা ষোল কোটি যদি সত্যিই এক জাতিভুক্ত হয়ে থাকি তাহলে আমাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি থাকবে না। আমাদের ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে যদি সমাজের স্বার্থকে স্থান না দেই, তবে আমাদের দিয়ে কোনোদিন জাতিগঠন হবে না। জাতীয় উন্নতির স্বার্থে আমরা সর্বদা একমত থাকব, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব সমস্ত ধর্মব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে। এই অর্থে আমরা জাতীয়তাবাদের পক্ষে। পাশ্চাত্য জাতিগুলিও তাদের ভৌগোলিক জাতীয়তায় বিশ্বাসী, এবং ঐ ভৌগোলিক রাষ্ট্রের স্বার্থকে তাদের অধিকাংশ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর স্থান দেয়। আমার লাভ হবে কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে এমন কাজ তাদের অধিকাংশ লোকেই করবে না। তাদের বিদ্যালয়, স্কুল-কলেজে, ছোট বেলা থেকেই কতকগুলি বুনিয়াদী শিক্ষা এমনভাবে তাদের চরিত্রের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তা থেকে কিছু সংখ্যক অপরাধী চরিত্রের লোক ছাড়া কেউ মুক্ত হতে পারে না। ফলে দেখা যায় যে ওসব দেশের মদখোর, মাতাল, ব্যভিচারীকে দিয়েও তার দেশের, জাতির ক্ষতি হবে এমন কাজ করানো যায় না, খাওয়ার জিনিসে ভেজাল দেওয়ানো যায় না, মানুষের ক্ষতি হতে পারে এমন জিনিষ বিক্রি করানো যায় না ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদের শে­াগান আছে কিন্তু সেই শে­াগান দিয়ে জাতির সম্পদই ধ্বংস করা হচ্ছে। ষোল কোটি বাঙালিকে নিয়ে একটি শক্তিশালী জাতি সত্তা গড়ার কাজ আমরা করে যাচ্ছি। গত ৪৪ বছরে এই কাজ কেউ করে নাই, সবাই ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে। একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করাকেই রাজনীতি মনে করা হচ্ছে। এটা কি জাতীয়তাবাদ হলো? প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে দেয়াল দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, রাজনীতিক মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে রাজনীতিক দল সৃষ্টি করে হানাহানির ইতিহাস দেখেছি আমরা গত ৪৪ বছরে। আমাদের সংবিধানে শক্তিশালী জাতিসত্তার যে ধারণা আছে আমরা মনে করি সেটা পূরণ করতে পারছে হেযবুত তওহীদ। আমরা বিগত ২০ বছরে বহু নির্যাতিত হয়েছি, কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছি। ভাঙচুরের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না, ওপথে কোনোদিন মানুষের শান্তি আসতে পারে না।

তবে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ধারণায় আমরা বিশ্বাসী নই, কারণ এটাও এক প্রকার অন্ধ অমানবিকতার জন্ম দেয়। আমি বাঙালি জাতি নিয়ে খুব সুখ সমৃদ্ধির মধ্যে আছি, অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে একটি জনগোষ্ঠী না খেয়ে মরছে আমি তার দিকে চেয়ে দেখব না এটা ঠিক নয়। আমাদের দেশেই ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বর্তমানে চরম দুর্ভোগের মধ্যে বাস করছে, প্রতিনিয়ত সেখানে মানবতা পদদলিত হচ্ছে সেটা আমারও কষ্টের কারণ হতে হবে। এটা যদি না হয় তবে তা মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো না, কাল আমাকেও হয়তো বিপদে পড়তে হবে, তখন আমার পাশেও কেউ দাঁড়াবে না। কাজেই ন্যায়-নীতিভিত্তিক, শক্তিশালী জাতিসত্তা গঠনে আমরা অগ্রগামী থাকতে চাই।

আমরা না পশ্চিমাদের পক্ষে বলছি, না আমরা আরবীয় ইসলামের কথা বলছি। আসলে আমরা মুসলমান জনগোষ্ঠীর ঈমানকে সঠিক পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছি। তাদের ঈমান আমরা কী নষ্ট করব, তাদের ঈমান তো বহু আগেই নষ্ট করে দিয়েছে এই জাতির ধর্মব্যবসায়ী, আলেম-মোল্লা শ্রেণি আর পশ্চিমা ষড়যন্ত্রমূলক দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। ধর্মব্যবসায়ীরা তাদের ঈমানকে ছিনতাই করে নিয়ে নিজেরা টাকা কামাচ্ছে, কেউ রাজনীতির মাঠে ছক্কা মারতে চাইছে, কেউ জঙ্গি বানিয়ে আত্মঘাতি হতে উদ্বুদ্ধ করছে। সেখান থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমানকে উদ্ধার করতে চাইছি আমরা। এবং সেটাকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে চাইছি যেন সে দুনিয়াতেও লাভবান হয়, আখেরাতেও লাভবান হয়। ধর্ম যাদের প্রাণের মধ্যে তারাই ধর্মপ্রাণ। আজ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে ধর্ম বলতে নামাজ, রোজা, পূজা, ঈদ, মিলাদ, ওয়াজ, ধ্যান, যিকির-আজকার ইত্যাদি। ধর্ম কি এগুলো? না। মানুষের প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মানবতা, মনুষ্যত্ব। এটি যার নেই সে ধার্মিক নয়, নামাজ রোযা যতই করুক না কেন। প্রতিটি ধর্মের এ উদ্দেশ্য, মানুষের দুঃখ দুর্দশা, অন্যায়-অবিচার, শ্রেণি-বৈষম্য দূর করে একটি শান্তিময় সমাজ নির্মাণের পথনির্দেশ দান করা। মানবতা বাদ দিয়ে ধর্ম নেই, এটাই ধর্মের আত্মা, এই আত্মাকে বাদ দিলে ধর্ম মৃত। আজ আমরা পৃথিবীতে যে ধর্মগুলো দেখছি সব মৃত, উপাসনা সর্বস্ব। আমরা ধর্মের এই সঠিক রূপ আবার তুলে ধরছি। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় আমরা মানুষের ঈমান নষ্ট করছি।

কারণ আমাদের কথাগুলো ধর্ম সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ভুল ধারণাগুলোকে চুরমার করে দেয়। এটাকেই বলা হচ্ছে- ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া। এটা তো সবযুগেই হয়েছে। সকল নবী-রসুলই তাঁর সমসাময়িক বিকৃত ধর্মের ধারক বাহকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন এবং তাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন, বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। ঈমান নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ স্বয়ং আমাদের নবী মোহাম্মদ (দ.) এর বিরুদ্ধেও উঠেছিল। আল্লাহর অশেষ শোকর, এ অভিযোগটি আমাদের বিরুদ্ধেও করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু করা হলে তার সমালোচনা হবে এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্রষ্টার দেওয়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু বললে বা আচার-আচরণ করলে, সেটারও সমালোচনা করা স্বাভাবিক এবং করা কর্তব্য। আমরা শত শত বিষয়ে প্রমাণ দিচ্ছি যে ধর্মব্যবসায়ীরা যা বলছেন ও করছেন তা আল্লাহর সংবিধান তথা কোরআন হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারাই ঈমানদার মানুষকে দিয়ে অবৈধ কাজ করাচ্ছে, তাদেরকে জাহান্নামের দিকে চালিত করছে। তাদের কাজের ফলে মানুষ ধর্ম থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, আল্লাহ-রসুলকে গালাগালি করছে। সুতরাং আমরা ধর্মের অবমাননা করছি না, অবমাননা থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে চাইছি। ধর্মবিশ্বাস বা ঈমানকে জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতিতে কাজে লাগাতে চাইছি।

আমরা ষোলো কোটি মানুষকে ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই এ কাজটা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা একটা জাতির কাজ, জাতিগত কাজ। জাতির কর্ণধার হিসাবে আমরা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে আমাদের মিটিংগুলোতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যেন তারা এই কাজের গুরুত্ব বুঝে সেটাকে বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ না হয়ে যে কোনো সরকার থাকলেও এটাই করতাম। আমরা তাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে, চিঠি দিয়ে, আলোচনা করে সর্ব উপায়ে বোঝাতে চেয়েছি যে, দেশের ষোলো কোটি মানুষ যদি দাঙ্গা হাঙ্গামার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তারা যদি সর্বপ্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করে তাহলে ধর্মব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম আর থাকবে না, ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হবে, মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারবে, আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার হবে, মানুষের উন্নতি অগ্রগতি হবে। আবার সরকারি দল হিসাবে আওয়ামী লীগকেও বলছি যে, আপনারা ৬৫ বছরের পুরানো একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিক দল। ১৯৭১ সালের মত একটা যুদ্ধ পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা আপনাদের রয়েছে। ৭০ সালের নির্বাচনে দেশের আপামর জনসাধারণ আপনাদেরকে একটা শান্তিপূর্ণ দেশ গঠনের জন্য সমর্থন দিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনারা আন্দোলন করেছেন, যুদ্ধ করেছেন। এখনও আপনারা ক্ষমতায় আছেন। কাজেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব ও কর্তব্য কিন্তু আপনাদের উপর বর্তায়। আপনাদেরকেও কিন্তু প্রচুর নাস্তিক্যবাদের অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, যেজন্য আপানাদের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বিনষ্ট হয়েছে। কাজেই আপনারা যদি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাটা মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন তখন আপনারা সবদিক দিয়েই লাভবান হবেন, জাতিও লাভবান হবে। এর বিনিময়ে আমরা আওয়ামী লীগের থেকে একটি পয়সাও আসা করি না, দিলেও নেব না। কোনো রাজনীতিক স্বার্থও আমাদের নেই, তাদের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ারও শখ আমাদের নেই। এই দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে, সেই দায়বদ্ধতা থেকে আমরা দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে এসেছি, কারণ দেশের সঙ্কট সমাধান করার উপায় আমাদের কাছে আছে। আমাদের এ অনুভূতিটা অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ভালো দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং আমাদের কাজে সহযোগিতা করেছেন। এখন যুগটাই এমন যে, কেউ যে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের ভালোর জন্য কোনো কাজ করবে সে কল্পনাই কেউ করতে পারে না। করতে গেলে তাকে সন্দেহ করা হয় যে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো মতলব আছে। আমরাও এমনই সন্দেহের শিকার। এমনিভাবেই সন্দেহ করা হচ্ছে যে, আজ আমরা আওয়ামী লীগ সরাকারের সঙ্গে আছি, কাল তারা তারা ক্ষমতায় না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে চলে যাব। এটা বলতে পারতেন যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো স্বার্থের সম্পর্ক থাকত। সেটা যখন নেই, তখন আমরা এটুকু বলতে পারি, আমরা যে সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছি যারা এর সাহায্যকারী হয়েছে এবং সাহায্যকারী থাকবে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল এ জগতেই নয়, পরজগতেও বজায় থাকবে এনশাআল্লাহ। এখানে দল কোনো ফ্যাক্টর নয়, আদর্শটা ফ্যাক্টর।

হেযবুত তওহীদ গত কুড়ি বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এই কুড়ি বছরে সরকার কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে কয়েকটা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এসেছে, সামরিক সরকারও এসেছে, দুইদলও ক্ষমতায় ক্ষমতায় এসেছে, আমরা সকলের সঙ্গেই কাজ করেছি। জঙ্গিবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাবনা যখন এমামুয্যামান দিয়েছিলেন তখন ২০০৮ সন। তখন কি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল? ছিল না। আরেকটা কথা হলো, বিভিন্ন মহল থেকে সরকারকে আমাদের বিষয়ে ভুল বুঝানো হয়, যার জন্য আমাদের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক আমরা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকতে চাই যেন কেউ তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে আমাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে।

যারা ধর্মের বিনিময় নেয় তারা সবাই ধর্মব্যবসায়ী । ধর্মের নামে কোনো বিনিময় চলে না। এটা একেবারে সুত্রের মতো মনে রাখতে হবে। আল্লাহ বলছেন শুয়োর খাওয়া হারাম, মৃত জন্তু খাওয়া হারাম, তারপর বলছেন নিরুপায় হলে তাও খেতে পারো। কিন্তু ধর্মের বিনিময় নেয়া একেবারে নিষেধ। এটা কোনোভাবে ক্ষমা করবেন না আল্লাহ এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না আল্লাহ। সুরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা (১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না, (২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, (৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে (৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। সুতরাং ধর্মকে স্বার্থহাসিলের উপায় বানানোর ব্যাপারে ইসলামে কোনো শিথিলতা নেই। কারণ এটা করলে ধর্মই বিকৃত হয়ে যাবে, মানুষ আর সঠিক পথ পাবে না, মুক্তির পথ পাবে না। ভুল পথে চলতে বাধ্য হবে, সে দুনিয়াও হারাবে আখেরাতও হারাবে। তাই ধর্মের কাজ হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। এ ধর্মের কাজ করে একেবারে শুরুতে নামাজ পড়িয়ে, ওয়াজ করিয়ে, মুর্দা দাফন করিয়ে, এখান থেকে শুরু করে একেবারে রাজনীতি পর্যন্ত যে অঙ্গনেই হোক ধর্মের কাজ করে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করবে সেই ধর্মব্যবসায়ী।

হুজুর বলতে আজ যাদেরকে বোঝানো হয় তারা আসলে ইসলামের কেউ নয়। আজকে সমাজে এই পুরোহিত শ্রেণিটি ব্রিটিশদের দেয়া আল্লামা, মুফতি, মাওলানা, ইত্যাদি টাইটেল নিজেদের নামের আগে পিছে যোগ দিচ্ছেন এগুলো কতটুকু বৈধ, কতটুকু অবৈধ সেটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহর রসুলের সাহাবিরা কি এদের চেয়ে ইসলাম কম জানতেন? তাদের নামের সঙ্গে তো কোনো মাওলানা, গাউস কুতুব, আল্লামা জাতীয় খেতাব দেখি না? মাওলানা শব্দের অর্থ কী? মাওলা মানে প্রভু, আর মাওলানা মানে আমাদের প্রভু। ওরা কি আমাদের প্রভু? এই সত্য কথাগুলো বলি দেখে বলা হয়, আমরা হুজুরদের পেছনে লেগেছি। এ অভিযোগ সত্য নয়। আমরা বলছি ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য, এটা বিক্রি করে খাওয়ার জন্য নয়। এটা করলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়, সেটা থেকে মানুষ আর কল্যাণ পায় না, অকল্যাণ পায়। এজন্য আল্লাহ ধর্মব্যবসাকে হারাম করেছেন। এই সত্যটি আমরা মানবজাতির সামনে তুলে ধরেছি। এতে যাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত লেগেছে তারাই আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছে, আমরা কারো পিছনে লাগি নি। আমরা হুজুর বলতে বুঝি কেবল একজনকেই, তিনি মহানবী (দ.)। সমাজে যারা আজ হুজুর হিসাবে পরিচিত আমরা তাদেরকে ছোট করছিনা। তারা আগেই ছোট হয়ে আছেন। সবাই তাদেরকে বলে দুই টাকার মোল্লা, দুই টাকা দিয়ে কেনা যায়। মসজিদ কমিটির সুদখোর সেক্রেটারির হাতে তার চাকরি বাঁধা, সেই কমিটির লোকদের জুতার তলা মুছতে মুছতে তাদের দফারফা, তাদের পেছনে আমরা লেগে কী করব? এত নিকৃষ্ট অবস্থা হয়েছে মসজিদের এমামদের, মুয়াজ্জিনদের। ধর্মব্যবসা করে, হারাম খেয়ে তারা নিজেদেরকে অনেক ছোট করে ফেলেছে। মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখার জন্য তাদের কোনো আত্মিক শক্তি বা নৈতিক মনোবল কিছুই নেই। ছোট হতে হতে এত ছোট হয়েছেন যে সমাজে তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না, গোনা যায় না। এখন তারা কয়দিন পর পর কুয়ার ব্যাঙ এর মতো কুয়ার থেকে বেরিয়ে এসে একটা তাণ্ডব সৃষ্টি করে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করে আবার ইঁদুরের মতো পাগড়ির লেজ হাওয়ায় উড়িয়ে গর্তে লুকায়। এরা না পারছে মানবতার কল্যাণ করতে, না পারছে নিজেদের কল্যাণ করতে। কাজেই এরা নিজেরা নিজেদেরকে ছোট করেছে। আমরা বরং তাদেরকে ডেকে ডেকে এনে বড় করার চেষ্টা করছি। আমরা বলছি, আপনারা ধর্মব্যবসা থেকে হালাল উপার্জন করেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করে, তাহলে আপনারা আল্লাহর কাছে বড় হবেন, মানুষের কাছে বড় হবেন। কিন্তু তারা এ ক্ষুদ্র স্বার্থে ধর্মব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক ক্ষুদ্র হয়ে গেছেন। আজকে মুর্দা দাফন করলে তাদেরকে প্রয়োজন, বাচ্চার নাম রাখার জন্য তাদের ডেকে আনে, তাদেরকে আর কোনো কাজে সমাজের প্রয়োজন নাই। একজন অপরাধীকে অপরাধীকে হিসেবে চিহ্নিত করা কি তাকে ছোট করা হয়? মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী এই ধর্মব্যবসায়ীরা।

আমাদের কর্মকাণ্ডে মসজিদকে গুরুত্বহীন করা হয় না। পত্রিকাতে আমরা বলেছি, মসজিদের উদ্দেশ্য কী এবং আজানের উদ্দেশ্য কী। উদ্দেশ্যহীন সবকিছুই নিষ্ফল, ব্যর্থ।

প্রথম কথা হলো, মসজিদ নিয়ে হেযবুত তওহীদের কোনো নেতিবাচক বক্তব্য নেই। কিন্তু মসজিদ কেমন হওয়া উচিত ছিল সেটা আমরা তুলে ধরছি। মসজিদ হলো মুসলিম জাতির সমস্ত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশাসনিক, শাসনব্যবস্থা, আইন-কানুন থেকে সালাহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু মসজিদ। কিন্তু সেই মসজিদ হয়ে গেছে আজকে নিষ্প্রাণ। শুধু নির্দিষ্ট কয়েক মিনিট নামায পড়ানো হয়, অধিকাংশ সময় তালা মারা থাকে। ওইখানে যারা নামায পড়াচ্ছেন, তারা ধর্মের বিনিময়ে টাকা নিচ্ছেন, টাকার বিনিময় নামায পড়াচ্ছেন, আমরা তাদের পেছনে নামায পড়ি না। এজন্যই প্রশ্নটি উঠেছে যে, আমরা মসজিদকে গুরুত্বহীন মনে করি কিনা। কাবাঘর আল্লাহর ঘর, কিন্তু মক্কার কাফের মোশরেকরা এই পবিত্র ঘরে তিনশ ষাটটি প্রতিমা স্থাপন করে এই গৃহকে অসম্মান ও অপবিত্র করেছিল। তারা কাবাগৃহকে নিজেদের ব্যবসার মাধ্যমে পরিণত করেছিল। কোরায়েশ নেতৃবৃন্দ রসুলাল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেননি এর প্রধান কারণ ছিল তাদের কাবাকেন্দ্রিক ধর্মব্যবসা তাতে বন্ধ হয়ে যাবে। রসুলাল্লাহ সেই মূর্তি অপসারণ করে ধর্মব্যবসায়ীদের হাত থেকে, শেরকের হাত থেকে কাবাকে পুনরুদ্ধার করেন। একইভাবে মসজিদ আজ ধর্মব্যবসায়ীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এই ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। এইজন্য ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে থাকেন। কিন্তু আমরা যে একেবারে মসজিদে যাই না তা নয়, ব্যক্তিগতভাবে সালাহ করার জন্য আমরা প্রয়োজনে মসজিদে যাই, কিন্তু ধর্মব্যবসায়ীরেদ পেছনে নামায পড়ি না। তবে যে মসজিদের এমাম সাহেব অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আল্লাহর নাজেল করা সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, হকের পক্ষে অবস্থান নেবেন এবং যিনি ধর্মব্যবসা করবেন না, ধর্মের বিনিময় নিবেন না, টাকা ছাড়া নামায পড়াবেন, এমন এমাম হলে তার পেছনে নামায পড়তে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা আরও খুশি, আনন্দিত হবো। আমরা ঐটাই চাই। সুতরাং আমরা মসজিদ অপছন্দ করি না, কিন্তু দুইটি কারণে আমরা মসজিদকেন্দ্রিক নই। প্রথমত, ইসলামের ধারণা মোতাবেক মসজিদ হবে জাতির সমস্ত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু, যেটা বর্তমানে নেই। সুতরাং এই মসজিদ ইসলামের প্রকৃত মসজিদ নয়। দ্বিতীয়ত, মসজিদ আজ যাদের দখলে, সেই পেশাদার ধর্মীয় নেতারা মুমিন না। মুমিন হতে হয় জান-মাল দিয়ে, যে নেবে সে মোমেন হতে পারবে না। যদি তারা আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞা মোতাবেক মুমিন হন তবে তাদের পেছনে নামায পড়বো, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে, কোনো ইট-পাথরের ঘর-বাড়িকে নিয়ে কোনো কথা নাই, সেটা দিয়ে কী হচ্ছে? এইটা আসল কথা।

আমাদের দেশের অনেক আলেম ও মুফতির দৃষ্টিতে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি উদ্যাপন করা প্রকৃতপক্ষে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, শেরক ও বেদাত। তাদের জ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, এ বিষয়ে আমাদের কিঞ্চিৎ দ্বিমত রয়েছে। দু’টি দিক থেকে বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি,

(ক) ইসলামের আকীদা।

(খ) শরিয়াহ।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা সমগ্র মানবজাতির উপযোগী করে আল্লাহ রচনা করেছেন। এতে যে বিধানগুলো স্থান পেয়েছে সেগুলো কোনোটাই কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি জনপদের মানুষের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে যা তাদের ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিশীল, যা গড়ে ওঠে হাজার হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে। ইসলাম কোনো বিশেষ অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের উপর চাপিয়ে দেয় নি, তেমনি কোনো আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধও করে নি। ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে কেবল অশ্লীলতা, অন্যায় ও আল্লাহর নাফরমানিকে। সে বিচারে আমাদের দেশে আবহমান কাল থেকে চলে আসা নবান্ন উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি কোনো উৎসবই শরিয়ত পরিপন্থী হতে পারে না। তবে উৎসবের নামে যদি অশ্লীলতা, অপচয় ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটানো হয়, সেটা অবশ্যই নিষিদ্ধ। কেননা, তার দ্বারা মানবসমাজে অশান্তি সাধিত হবে এবং যা কিছুই অশান্তির কারণ তা-ই যে কোনো জীবনব্যবস্থায় নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে। একজন বাংলাদেশি নেতা বাংলায় কথা বলবেন, বাঙালি পোষাক পরবেন এটাই স্বাভাবিক। তেমনি আল্লাহর শেষ রসুল আরবে এসেছেন, তাঁর আসহাবগণও আরবের মানুষ হিসাবে স্বভাবতই আরবীয় সংস্কৃতির পোষাক, ভাষা, আচার-আচরণ, রুচি-অভিরুচি, খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতেন। কিন্তু এর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ আমাদের সমাজে ইসলামী সংস্কৃতির নামে আরবীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন: ইসলামের অধিকাংশ আলেমদের সিদ্ধান্তমতে পুরুষের ছতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকতে হবে। এখন কেউ যদি ধুতি পরিধান করে তাহলেও কিন্তু তার ছতর আবৃত হয়। কিন্তু ধুতি পরাকে কি আলেমরা ইসলামী সংস্কৃতি বলে মেনে নেবেন? না। তারা চান মানুষকে তেমন জোব্বা পরাতে যেটা আরবের লোকেরা পরে থাকেন।

বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে কৃষি সংস্কৃতিই বোঝায়। বাংলার কৃষক ধর্মে হিন্দু বা মুসলিম যেটাই হোক, তার জীবনের আনন্দ, বেদনা, উৎসব, আশা-নিরাশার সঙ্গে ফসল ও ফসলী বছরের নিবিড় বন্ধন থাকবে এ কথা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। তাই চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি কৃষিনির্ভর বাঙালির জীবনমানের মানদণ্ড।

এই উৎসবগুলো কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ না অবৈধ? শরিয়তের মানদণ্ড হচ্ছে, আল্লাহ নির্দিষ্টভাবে যে বিষয় বা বস্তুগুলোকে হারাম করেছেন তার বাইরে সবই হালাল বা বৈধ। এছাড়া কোনো বিষয় (যেমন একটি উৎসব) হালাল না হারাম তা নির্ভর করে তার উদ্দেশ্য ও ফলাফলের উপর। কোনো কাজের উদ্দেশ্য বা পরিণতি যদি মানুষের অনিষ্টের কারণ হয় তাহলে সেটা কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষের কল্যাণ তাহলে একে হারাম ফতোয়া দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। আমরা পবিত্র কোর’আনে কৃষি-সংস্কৃতির দিবস উদযাপন প্রসঙ্গে আল্লাহর নীতিমালা জানতে পারি। আল্লাহ বলছেন, তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জলপাই ও ডালিম জাতীয় ফলও সৃষ্ট করেছেন। এইগুলো একে অন্যের সদৃশ এবং সাদৃশ্যহীন। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল তোলার দিনে (ইয়াওমুল হাসাদ) এগুলোর হক প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না (সুরা আন’আম: ১৪১)।

এ আয়াতে তিনটি শব্দ লক্ষণীয়, (ক) ফসল তোলার দিন, (খ) হক আদায় করা, (গ) অপচয় না করা। কোরআনের প্রসিদ্ধ ইংরেজি অনুবাদগুলোতে (যেমন আল্লামা ইউসুফ আলী, মারমাডিউক পিকথল) ফসল তোলার দিনের অনুবাদ করা হয়েছে। আয়াতটিতে আমরা কয়েকটি বিষয় পাচ্ছি:

১. ফল বা ফসল তোলার দিন এর হক আদায় করতে হবে। সেই হক হচ্ছে- এর একটি নির্দিষ্ট অংশ হিসাব করে গরিব মানুষকে বিলিয়ে দিতে হবে। ফসলের এই বাধ্যতামূলক যাকাতকে বলা হয় ওশর।

২. যেদিন নতুন ফসল কৃষকের ঘরে উঠবে সেদিন স্বভাবতই কৃষকের আনন্দ হবে। যে কোনো আনন্দই পূর্ণতা পায় অপরের মধ্যে তা সঞ্চারিত করার মাধ্যমে। নতুন ফসল তোলার আনন্দের ভাগিদার যেন গরিবরাও হতে পারে সেজন্য তাদের অধিকার প্রদান করে তাদের মুখেও হাসি এনে দিতে হবে। কিন্তু আল্লাহ সাবধান করে দিলেন এই আনন্দের আতিশয্যে যেন কেউ অপচয় না করে।

আমাদের দেশে ফসল কাটার দিনে আনন্দ করা হয়, বিভিন্ন ফসলের জন্য বিভিন্ন পার্বণ পালন করা হয়। এ আয়াতের প্রেক্ষিতে দেখা গেল এই দিবসগুলোতে উল্লিখিত কাজগুলো করা ফরদ। কেবল ইসলামের শেষ সংস্করণ নয়, মুসা (আ.) এর উপর যে শরিয়ত নাজেল হয়েছিল সেখানেও আল্লাহ বলেন, “তুমি ফসল কাটার উৎসব অর্থাৎ ক্ষেতে যা কিছু বুনেছ তার প্রথম ফসলের উৎসব পালন করবে। বছর শেষে ক্ষেত থেকে ফসল সংগ্রহ করার সময় ফলসঞ্চয় উৎসব পালন করবে” (তওরাত: এক্সোডাস ২৩:১৬)। সুতরাং আল্লাহর হুকুম মোতাবেকই বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন আঞ্চলিক উৎসব প্রচলিত হয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে যেভাবে দিবসগুলো পালিত হচ্ছে সেটাও সঠিক নয়। ক্রিসমাস, ঈদ, পূজা ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসব হলেও বাস্তবে এগুলোর আসল উদ্দেশ্য ধর্মানুরাগ নয়, গরিবের মুখে হাসি ফোটানোও নয়। এগুলোর নিরেট উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক স্বার্থ। পহেলা বৈশাখও তাই। এদিন একটি ৫০০ টাকার ইলিশের দাম হয়ে যায় ১০,০০০ টাকা, যা সেই দরিদ্র কৃষকের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। অপরপক্ষে যারা সারা বছর বার্গার, পিজা খায় তারা এই একদিন মাটির বাসনে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার জন্য হা-পিত্তেশ করেন; যেন একদিনের মাতৃভক্তি, দিন শেষ ভক্তি শেষ। ব্যবসায়ী শ্রেণি ও মিডিয়ার প্রচারণায় ভুলে আমাদের তারুণ্যও উন্মাদনা আর অপচয়ে মত্ত হয়ে যাচ্ছে। বহিঃর্বিশ্বেও এমনই হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার শিনচিলা শহরে প্রতিবছর উদযাপিত তরমুজ উৎসবে হাজার হাজার তরমুজের রস দিয়ে পিচ্ছিল পথ তৈরি করে তাতে স্কি করা হয়। বিভিন্ন দেশে আঙ্গুর, টমাটো ইত্যাদি নিয়েও অপচয়ের মহোৎসব হয়। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, “খাও, পান কর, কিন্তু অপচয় করো না।… হে রসুল! আপনি বলে দিন, কে হারাম করেছে সাজসজ্জা গ্রহণ করাকে–যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন?” (সুরা আরাফ ৩১-৩২)। অর্থাৎ আনন্দ ফুর্তি, সাজগোজ করতে আল্লাহ নিষেধ করেন নি। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ আছে যারা দুর্ভিক্ষপীড়িত, আমাদের দেশেও অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। এই মানুষগুলোর হক আছে আল্লাহ প্রদত্ত সকল ফল ও ফসলে, এই নবান্নে, পহেলা বৈশাখে, চৈত্রসংক্রান্তির পার্বণে। তাদের সেই হক আদায় করা হলেই এই উৎসব হবে পবিত্র দিন। উৎসব আর ঈদ আসলে একই কথা। উৎসবের নামে আজ অর্থের যে নিদারুণ অপচয় হচ্ছে, বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে তা না করে যদি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক গরিব-দুখী মানুষকে তাদের অধিকার প্রদান করা হতো, তাহলে এ আনন্দ পূর্ণতা পেত, আর এই উৎসবগুলো এবাদতে পরিণত হতো।

আমাদের সমাজে শিল্প ও সংস্কৃতির পথেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মের অপব্যাখ্যা। আমাদের সমাজে যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন তাদের অনেকের মধ্যেই একটা দ্বিধা ও অপরাধবোধ আজীবন কাজ করে। কেননা তারা মনে করেন যে, তারা খুব গোনাহের কাজ করছেন। ফলে প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হচ্ছে না।

আবার অনেক সংস্কৃতিমনা মানুষ ধর্মের নামে চলা কূপমণ্ডূকতাকে মেনে নিতে না পেরে ধর্ম বিদ্বেষী হয়ে গেছেন। তারা দেখছেন ধর্মান্ধরা কীভাবে বোমা মেরে সুপ্রাচীন নান্দনিক ভাস্কর্যগুলো গুড়িয়ে দিচ্ছে, সঙ্গীতানুষ্ঠানে, সিনেমা হলে বোমা হামলা করছে। এসব দেখে ধর্মবিদ্বেষীরা ধর্মকেই গালাগালি করছেন পত্রিকায়, চলচ্চিত্রে, যা ধর্মপ্রাণ মানুষকে আহত করছে, ধর্মব্যবসায়ীরাও পেয়ে যাচ্ছে দাঙ্গা সৃষ্টি করার সুযোগ। তারা খোদ চলচ্চিত্র, ব্লগ ও শিল্পমাধ্যমকেই প্রতিপক্ষে পরিণত করছে।

এ বিষয়ে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য হচ্ছে, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি বা শিল্প যে কোনো কিছুরই ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার ব্যবহারের উপর। শিল্পের নামে অশ্লীলতা, মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রসার শুধু ধর্মে নয় বিশ্বের সমস্ত আইনেও নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে, কিন্তু সুস্থধারার শিল্পচর্চা নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আল্লাহর রসুল কি সঙ্গীত, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি বিরূপ ছিলেন? না, ইতিহাসের এই ব্যস্ততম মহামানব যাঁর নবী জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে, তাঁর পক্ষে শিল্পচর্চায় মেতে থাকা সম্ভব ছিল না। তথাপি এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি গান শুনেছেন। আরবের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিবসে, বিবাহে, যুদ্ধে সর্বত্র গানের চর্চা ছিল, রসুলাল্লাহ সেগুলোকে উৎসাহিত করেছেন। মিনার এক উৎসবের দিন আবু বকর (রা.) আম্মা আয়েশার (রা.) ঘরে এসে দেখেন দু’টি মেয়ে দফ বা তাম্বুরা সহযোগে গান গাইছে। নবীগৃহে গান-বাজনা দেখে আবু বকর (রা.) কন্যা আয়েশাকে তিরস্কার করতে আরম্ভ করলেন। তখন মহানবী বললেন, ‘আবু বকর! ওদেরকে বিরক্ত করো না, আজ ওদের উৎসবের দিন (বোখারি, মুসলিম)। এমন কি আল্লাহর রসুল নিজে একজন আনসার সাহাবির বিয়ের আসরে গায়ক রাখার হুকুম দিয়েছেন, কেননা আনসারেরা ছিলেন গোত্রীয়ভাবে সঙ্গীতপ্রিয়। অথচ বর্তমানে কেবল হামদ-নাত জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াকেই আলেমগণ বৈধ বলে মনে করে থাকেন। তাদের কাছে স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখের গান দূরে থাক, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

কোন ধর্মই শিল্পকলাকে নাজায়েজ করতে পারে না। কেননা স্বয়ং স্রষ্টাই সুর ও নৃত্যকলা সৃষ্টি করেছেন। প্রজাপতির ডানায় তিনি এঁকেছেন মনোমুগ্ধকর আল্পনা। শেষ প্রেরিত গ্রন্থ আল-কোরআনকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন ছন্দবদ্ধ করে। কেবল কোরআন নয়, যবুর, গীতা, পুরান, ত্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থও আল্লাহ পাঠিয়েছেন কাব্যময় কোরে। গীতা শব্দের অর্থই তো গান। অনেক আলেম মনে করেন, ইসলামী গান করা বৈধ হলেও সেটা বাদ্য বাজিয়ে গাওয়া যাবে না। কিন্তু ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী তাঁর ‘এহইয়াও উলুমদ্দিন’নামক গ্রন্থে লিখেছেন, “কোকিলের সুর শোনা যেমন হারাম নয়, তেমনি মানুষের ইচ্ছা মোতাবেক কণ্ঠ নিঃসৃত সুর শ্রবণ করাও হারাম নয়। প্রাণহীন যন্ত্রের সুর এবং প্রাণীর স্বর পৃথক নয়। মানুষের কণ্ঠ নিঃসৃত সুর, বিভিন্ন তারযন্ত্রের ওপর আঘাত বা ঘর্ষণজনিত আওয়াজ, দফ, তবলা বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজও হারাম নয়”।

আমাদের কথা হচ্ছে, একজন লেখকের কলমের কালী যদি শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র হতে পারে তবে একজন গায়কের গান যদি মানুষকে মানবকল্যাণে আত্মদান করতে উদ্বুদ্ধ করে, তখন সে গান কেন ইবাদত বলে গণ্য হবে না? তাই আল্লাহ যাদেরকে শিল্পপ্রতিভা দান করেছেন তাদেরকে এর হক আদায় করতে হলে এই গুণকে স্বার্থহাসিলের জন্য ব্যবহার না করে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে।

প্রথমেই একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলাম হলো একটি সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের ফলে আর্থ-সামাজিকভাবে দৃশ্যমান শান্তিময় অবস্থা। যেই দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের ফলে শান্তি আসবে সেটাই ইসলাম, আর যেটা অশান্তি সৃষ্টি করবে তা ইসলাম নয় অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত নয়। আল্লাহ তাঁর দীন মানবজাতির প্রতি নাযেল করেছেন একটি মাত্র কারণে, আর তা হলো- মানবজাতি যেন অন্যায় অবিচার থেকে বেঁচে একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল সমাজে জীবনযাপন করতে পারে। তাই এই দীনের প্রতিটি আদেশ মানুষের সুখের জন্য এবং প্রতিটি নিষেধ মানুষকে ক্ষতি থেকে, অশান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য। এমন কোন আদেশ বা নিষেধ ইসলামে থাকা সম্ভব নয় যেটার সঙ্গে মানুষের ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই। যে জিনিস বা যে কাজ মানুষের জন্য অপকারী তা-ই আল্লাহ নিষেধ করেছেন। এই আলোকে আমাদের জানা দরকার, ভাস্কর্য নির্মাণ বা চিত্রাঙ্কন আমাদের জন্য ক্ষতিকর কিনা। এখানে আমাদেরকে একটি বিষয় আরও পরিষ্কার হতে হবে যে, প্রতিমা আর ভাস্কর্য কিন্তু এক নয়। প্রতিমাকে পূজা করা হয়, তার কাছে প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া প্রতিমাকে ভাগ্যবিধাতা, রিজিকদাতা, শক্তিদাতা এমনকি ইলাহ বা হুকুমদাতার আসনেও বসানো হয়, যা স্পষ্ট শিরক। প্রতিমা নির্মাণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অতীতে যে সমাজেই মূর্তিকে বিধাতার আসনে বসানো হয়েছে সে সমাজ পরিচালিত হয়েছে মূর্তিগুলোর পুরোহিতদের সিন্ধান্ত বা ফতোয়া দ্বারা। পুরোহিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধর্মের বিধান বলে স্বীকৃত হয়েছে। বিভিন্ন পুরোহিত বিভিন্ন বিধান, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি রচনা করেছে এবং প্রয়োগ করেছে, যাকে কেন্দ্র করে বিবিধ অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম হয়েছে। এ কারণে প্রতিমাপূজা ইসলামে নিষিদ্ধ। অপরদিকে ভাস্কর্য একটি প্রাচীনতম শিল্পকলা। একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পকলা, রুচিবোধের নিদর্শন হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়, যার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। বরং এই ভাস্কর্য শিল্পের দরুন হাজার হাজার বছর পূর্বের বিভিন্ন সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া আজ সহজ হচ্ছে। সুতরাং ইসলামে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ হবার কোনো কারণ নেই। এক কথায়- মানবতার জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় কাঠ-পাথরের প্রতিমা ইসলামে নিষিদ্ধ, কিন্তু ক্ষতিকর না হওয়ায় কাঠ-পাথরের ভাস্কর্য নিষিদ্ধ নয়। কোনটা নিষিদ্ধ কোনটা বৈধ তার মানদণ্ড হচ্ছে মানবতার কল্যাণ অথবা অকল্যাণ।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা দরকার- ইসলামে প্রতিমা নির্মাণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বটে, তবে তার মানে এই নয় যে, ইসলাম শক্তির জোরে প্রতিমাধ্বংসকে জায়েজ করছে। এমন ধারণা করা ভুল হবে। ইসলামের নীতি হলো ধর্মবিশ্বাসের উপর জোর-জবরদস্তি করা চলবে না। ব্যক্তিগতভাবে মুশরিকরা প্রতিমাপূজা করতে পারে তাতে কারও বাধা দেবার অধিকার নেই। প্রশ্ন করতে পারেন- তাহলে রসুলাল্লাহ ক্বাবাঘরের মূর্তি ভেঙেছিলেন কেন? রসুলাল্লাহ মক্কা বিজয়ের দিন কাবাঘরে অবস্থিত মূর্তি ভেঙেছিলেন। এর কারণ প্রথমত, সেগুলি ছিলো লাত, মানাত, উজ্জা, হোবল ইত্যাদির মূর্তি। আরবের গোত্রগুলি পরিচালিত হতো এই মূর্তিগুলির পুরোহিতদের সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া দ্বারা। পুরোহিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধর্মের বিধান বলে স্বীকৃত হতো। এই মূর্তিগুলিকে কেন্দ্র করে তাদের নিজস্ব আইন কনুন, দণ্ডবিধি ইত্যাদি প্রয়োগ করত। অর্থাৎ এক কথায় ঐ মূর্তিগুলিকে তারা বিধাতার আসনে এবং সমাজ পরিচালক বা ইলাহের আসনে বসিয়েছিল, যাকে কেন্দ্র করে বিবিধ অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম হতো। কাজেই মহানবী (দ.) এ সমস্ত গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ক্বাবাঘর হচ্ছে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার জন্য পবিত্রতম স্থান, যা আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এমন স্থানে সত্য বিরোধীদের কোনো অবৈধ কার্যক্রম চলতে পারে না। কাজেই এই গৃহের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষাও মূর্তিধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল। কিন্তু আমরা যদি তার পরের ইতিহাস দেখি অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম যখন সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য দুনিয়ার বুকে বেরিয়ে পড়েছেন তখন যে সমস্ত এলাকা বিজীত হয়েছিল, ঐ সমস্ত স্থানে অন্যধর্মের লোকদের উপাস্য মূর্তি, ধর্ম উপাসনালয় ধ্বংস করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যদি বিধর্মীদের কোন মূর্তির অঙ্গহানীও হয়ে থাকে, সাহাবীরা সেগুলিও মেরামত করে দিয়েছেন। ঐ সমস্ত এলাকার মূর্তিগুলি আর জাতীয় পর্যায়ে বিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলো না কাজেই ঐগুলি ভাঙ্গার প্রয়োজন পড়ে নি। অর্থাৎ ইসলামের নীতি হলো জাতীয়ভাবে চলবে আল্লাহর হুকুম ব্যক্তিগতভাবে যে যার বিশ্বাস স্থাপন করুক তাতে কোনো আপত্তি নেই। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তনে কোনরূপ জোরাজুরি চলবে না। এক কথায় ইসলামের নীতি হলো- রাষ্ট্র চলবে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে, কিন্তু ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার উপর (ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে) ছেড়ে দিতে হবে। সুতরাং বর্তমানে যারা ইসলামের ধুয়া তুলে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের মূর্তি ধ্বংস করছে, এমনকি চূড়ান্ত অজ্ঞতা ও মূর্খতার পরিচয় দিয়ে বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিচ্ছে তারা সম্পূর্ণ ইসলামপরিপন্থী কাজ করছে সন্দেহ নেই। এর জন্য তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

অন্য ধর্মের নবী রাসুল অবতার বা ধর্মগ্রন্থগুলিকে নিয়ে যারা ব্যঙ্গচিত্র আঁকে বা চলচ্চিত্র বানায়, এই কাজগুলো যারা সুস্থ মানুষ না। তারা সমাজের শত্রু মানবতার শত্রু। যে কারও বাবা-মাকে নিয়ে অশোভন উক্তি করলে মানুষ তাতে ক্ষুব্ধ হবে এটা যেমন যুক্তিযুক্ত তেমনি প্রাণাধিক প্রিয় নবীকে নিয়ে কটূক্তি করলেও যারা তাঁর অনুসারী তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে, এটাও যুক্তিযুক্ত। তবুও যারা এটা করে তারা মূলত একটি দাঙ্গাময় পরিস্থিতি সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যে কাজটি করে। পরে যখন কেউ সহিংসতা ঘটিয়ে ফেলে তখন পুরো মুসলিম জাতির উপর সন্ত্রাসের লেবেল এঁটে দেওয়া হয়। একটি ঘটনা যখন ঘটে তখন সেটা চলে যায় রাজনৈতিক ধান্ধাবাজদের নিয়ন্ত্রণে, তারা এর থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। শার্লি হেবদো পত্রিকাটি ছিল পেছনের সারির একটি অখ্যাত সাপ্তাহিক, সেটার নাম এখন বিশ্বের সবাই জানে, ৬০ লক্ষ কপি ছাপা হয়। এটাই হল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার। আমরা এসব কাজের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।

পক্ষান্তরে, যারা রসুলাল্লাহকে অপমান করলেই ফুঁসে উঠে হামলা চালিয়ে বসেন তাদেরকে আমরা রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শ স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। রসুলাল্লাহর আড়ালে নয় একেবারে সামনে গালাগালি করা হয়েছে শত শতবার, তাঁর গায়ে থুথু ছেটানো হয়েছে, তাঁর পিঠে উটের নাড়ি-ভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁকে মুরতাদ, কাফের, পাগল, জাদুকর, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি বলে অপবাদ প্রচার করা হয়েছে। আল্লাহর রসুল কি পারতেন না তাঁর আসহাবদেরকে নির্দেশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে আবু জেহেল, আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে, বা তাদেরকে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে হত্যা করে ফেলতে? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর অত্যাচারিত, নির্যাতিত হয়েও যুক্তি দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে গেছেন যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারও হুকুমে শান্তি আসবে না। এক সময় সত্যিই তাঁর আহ্বান মানুষ মেনে নিল, একদিন যারা তাঁর বিরোধিতা করেছে তারাই নবীর ডান হাত বাঁ হাতে পরিণত হলো। জোর করে রাষ্ট্রশক্তি দখল করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, সেখানে শান্তি আসে না।

এই সত্যটি এসব জঙ্গিবাদীদেরকে বুঝতে হবে যে তারা রসুলাল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে যা করছেন তাতে না ইসলামের কোনো উপকার হচ্ছে, না উম্মাহর কোনো উপকার হচ্ছে। উল্টো বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে দেশে দেশে মুসলমানরা নিজেদের বাসে ট্রেনে আগুন দিয়ে নিজেদের সম্পদই ধ্বংস করে ফেলছে, নিজের পায়ে কুড়াল মারা আর কাকে বলে? এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কী হতে পারে। সুতরাং এটা সঠিক পন্থা নয়। আগে তাদের নিজেদেরকে সত্যের পক্ষে, হকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। তারপর প্রতিপক্ষের এ মন্তব্যগুলিকে যুক্তি দিয়ে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিহত করা, মিথ্যা অভিযোগ খণ্ডন করা। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া যেহেতু প্রচলিত আইনেও বৈধ নয়, যারা এমন কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয়ও নেয়া যেতে পারে।

অনেকে অভিযোগ করেন, আমরা হেযবুত তওহীদ কেন কোনো প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করি না? করি না, কারণ আমাদের দৃষ্টি এগুলো অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন। ১০০ বছর আগেও রসুলাল্লাহর নামে বহু অপপ্রচার করা হয়েছে, তখনো অনেক বিক্ষোভ হয়েছে। এখনো হয়। এসব করে কি অপপ্রচার কমেছে? না। বরং আরো বেড়েছে। তাই এ পথে আরো হাজার বছর চেষ্টা চালিয়ে লাভ হবে না, উল্টো ক্ষতি হবে। আমরা মনে করি, সত্যটা তুলে ধরা, সত্যের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই আমাদের মুখ্য কর্তব্য। আর যারা ধর্মব্যবসা করেন তাদের তো রসুলাল্লাহর পবিত্র নামই মুখে আনা উচিত নয়। যে কাজ আল্লাহ হারাম করেছেন তারা সেটাকেই ধর্ম বানিয়ে নিয়েছেন। তারা যখন রসুলাল্লাহকে অবমাননা করার প্রতিবাদ করে সেটাকে বক ধার্মিকতা আর নিজেদের জাহির করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই আমরা মনে করি না।

প্রথমত, লতিফ সিদ্দিকীর যে প্রসঙ্গটা এসেছে সে সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়- লতিফ সিদ্দিকী সম্পর্কে মিডিয়াতে যতটুকু এসেছে আমরা শুধুমাত্র ততটুকুই জেনেছি। এ বিষয়ে আমরা মিডিয়ার একপাক্ষিক কথাই শুনেছি। তার সাথে কথা বললে আমরা স্পষ্ট হতে পারতাম যে, তিনি কোন প্রেক্ষিতে কী বোঝাতে ওই কথাগুলো বলেছেন। যেহেতু উভয়পক্ষের কথা আমরা শুনি নি, তাই তার সম্পর্কে এখনো আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করতে পারছি না। এটুকু বলতে পারি, ধর্ম, আল্লাহ ও রসুলের প্রতি যার শ্রদ্ধাবোধ থাকবে সে এমন মন্তব্য সজ্ঞানে করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, যারা মু’মিন, যারা আল্লাহ ও রসুলকে ভালোবাসে, তারাও ভুল করতে পারে। আল্লাহ বলেছেন, সত্তর হাজার বার গুনাহ করলেও যদি বান্দা ক্ষমা চায়, আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। কাজেই ভুল করে ফেললে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে বান্দার জন্য দোষের কিছু নেই, লজ্জার কিছু নেই। প্রকৃত মুমিন যদি মুখ ফসকে কোনো কথা বলে ফেলে, ভুল করে ফেলে তাহলে অকপট হৃদয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন, সে আল্লাহর সঙ্গে ঔদ্ধত্ব করবে না। কিন্তু লতিফ সিদ্দিকী সাহেব এখন পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন বলে মিডিয়াতে আসে নি। 

তৃতীয়ত, আমাদের দেশে ধর্ম সম্পর্কে কারো বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যকে নিয়ে রাজনীতি করা হয়, ধর্ম ব্যবসায়ীরা একে ইস্যু হিসাবে নিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রয়াস পান। কিন্তু আমরা মনে করি, ইসলাম ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এমন বিরূপ মন্তব্য ১৪০০ বছরে অনেক হয়েছে, রসুলের সামনেও হয়েছে। কিন্তু এজন্য প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করার কোনো নজির রসুলাল্লাহর জীবনে নেই। বরং উপযুক্ত যুক্তি, প্রমাণ দিয়ে এর জবাব দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করা কোনো সমাধান নয়, দেশে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, আইন আছে। সুতরাং ওই ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ করা যেতে পারে, তারপর আইন মোতাবেক যা হয় হবে। কিন্তু এগুলোকে ইস্যু বানিয়ে মানুষের অধিকার ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করা, আতঙ্ক সৃষ্টি করা, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা, ভাঙচুর করা এগুলো কখনোই ইসলামসম্মত নয়। যাই হোক, তিনি এখনও জেলখানায় আছেন, বিচারাধীন আছেন, কাজেই এ ব্যাপারে আমরা এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

মানুষকে আল্লাহ কণ্ঠ দিয়েছেন বলার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ কথা বলবে। মানুষকে আল্লাহ লেখার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ লিখবে। মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাই মানুষ যে কোনো বিষয়ে চিন্তা করবে। এসব স্বাধীনতা আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতা, এতে কারোর হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। বাক-স্বাধীনতার সংজ্ঞায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, সমগ্র জাতির মতের বিরুদ্ধেও যদি আমার কিছু বলার থাকে সেটা আমি নির্ভয়ে বলতে পারব, এজন্য আমার কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না। এই বাক-স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাস করি, এবং একমাত্র সত্য ইসলাম এই স্বাধীনতা দিতে পারে। আর কেউ দিতে পারবে না, যদিও সবাই দাবি করে থাকে। যাই হোক, এই স্বাধীনতার মানে কিন্তু এটা নয় যে, আমি মিথ্যা কথা বলব। মিথ্যা কথা বলার অধিকার অবশ্যই বাক-স্বাধীনতা নয়। আপনি যদি কারো প্রতি অপবাদ আরোপ করেন এবং সেটা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই আপনাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। এখন আমরা প্রায়ই দেখি, মিডিয়ায় তিলকে তাল বানানো হয়, মানুষের কথাকে টুইস্ট করে বা অফ দ্যা রেকর্ড কথা প্রকাশ করা হয়, গোপনীয় বিষয় খুঁজে বের করা হয়, এভাবে মানুষের সারাজীবনের অর্জিত মান-সম্মান ধূলায় মিশে যায়। এটাও স্বাধীনতা নয়। এভাবে অন্যের মানহানি করা, জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, এসবের অনুমতি কোনো জীবনবব্যস্থাই দেয় না। হ্যাঁ, কেউ যদি ইসলামের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত, সত্য ইতিহাসভিত্তিক, তথ্যবহুল কিছু লিখেন সেটার স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কেউ তার কলমকে বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু কেউ যদি কোনো ধর্মের নবী-রসুল বা অবতারকে নিয়ে অমর্যাদাসূচক মিথ্যাচার করে, যা সমাজের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে সেটা নিশ্চয়ই বাক-স্বাধীনতা নয়, সেটা তথ্য-সন্ত্রাস। স্বাধীনতা তো সেটাই যেটা অন্যের স্বাধীনতাকেও সমুন্নত রাখে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হেযবুত তওহীদ কাজ করছে এখানে ৯০% মুসলমান এবং রাজনীতির প্রধান ট্রাম্পকার্ড ইসলাম ধর্ম। পাশের দেশ ভারতে হিন্দু ইস্যু প্রধান, যেটা কাজে লাগিয়ে আজ বিজেপি ক্ষমতায়। আমাদের দেশেও ধর্মকে রাজনীতিক স্বার্থে কাজে লাগানো হয়। তাছাড়া সারা বিশ্বে গত একযুগে ইসলামি জঙ্গিবাদটিই প্রায় বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে দিয়েছে, বিশ্ববাসীর জন্য থ্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যান্যগুলো অতটা না। আর পশ্চিমা সভ্যতা বিগত কয়েকদশক থেকে কিন্তু ইসলামকেই টার্গেট করেছে যা আপনারা ভালো করেই জানেন। প্রফেসর হান্টিংটন যাকে বলেছেন ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন। তথাপি সকল ধর্মের উগ্রপন্থার বিরুদ্ধেই আমরা “সকল ধর্মের মর্মকথা-সবার ঊর্ধ্বে মানবতা” শীর্ষক ডকুমেন্টারিতে কথা বলেছি।

হেযবুত তওহিদ ২০ বছর ধরে এ দেশে কাজ করছে। এ ধরণের কথাবার্তা হেযবুত তওহীদের ব্যাপারে বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অন্যায়। আমাদের সম্পর্কে এ ধারণা করার মূল কারণ আমাদের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার হয়েছে। জঙ্গি দলগুলো হঠাৎ করে এ দেশে সৃষ্টি হয়েছিল আর হঠাৎ করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছিল। মানুষ তাদের সম্পর্কে জেনেছেই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দ্বারা।

বাংলা ভাইকে আজ এত গালাগালি করা হয়, মন্দ বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যারা গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি করছেন তারা কি নৃশংসতা, সন্ত্রাস, সহিংসতার দিক থেকে বাংলা ভাইকে ছাড়িয়ে যান নি? ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও পর ডান বলেন, বাম বলেন, সেকুলার বলেন এ পর্যন্ত যারা এদেশে রাজনীতি করেছেন তারা বাংলা ভাইকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। বাংলা ভাই কয়টা লোক মেরেছেন, কয় জায়গায় বোম মেরেছেন, কয়জন ছাত্র হত্যা করেছেন, কয়জন মানুষ গুম করেছেন? তার তুলনায় গত ৪৪ বছরে এই রাজনীতিকরা কী করেছেন? কাজেই বলব, নিজের দিকে একটু তাকান, তারপর অন্যদের দিকে তাকাবেন। হেযবুত তওহীদকে এসব বাংলা ভাইদের সঙ্গে মিলিয়ে লাভ নেই। বাংলা ভাইদের উত্থানের বহু আগে থেকে এদেশে হেযবুত তওহীদ আছে। তাদের উত্থানের পর যখন গণমাধ্যমগুলো তাদের বিরুদ্ধে একচেটিয়া লিখতে লাগলো তারা হয়ে গেল ভিলেন। তাদের সম্পর্কে মানুষের মনে ঘৃণা বিদ্বেষ সৃষ্টি হলো। এরপর থেকে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা যেখানেই কাজ করতে যেত, বহু স্থানে তাদেরকেও জে.এম.বি. সন্দেহ করে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে অন্তত চার শতাধিক মামলা হয়েছে যেখানে হেযবুত তওহীদকে জঙ্গি সন্দেহে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে, সেগুলোতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদকে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পত্রিকায় হাজার হাজার সংবাদ ছাপা হয়েছে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে যেখানে বিভিন্ন নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদকে সুকৌশলে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু লাভ হয় নি। তদন্তে প্রতিবারই হেযবুত তওহীদ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। যে আন্দোলনটা ২০ বছর যাবত কোনো আইন ভঙ্গ করে নি, কোনো অন্যায় করে নি, জীবন সম্পদ দিয়ে মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে কতবড় নির্লজ্জ হলে তারা বাংলা ভাইদের সাথে হেযবুত তওহীদকে মেলায়?  যারা এ প্রশ্নগুলো করে তাদের চরিত্র কী এ ৪৪ বছরে? এদেশে বামদের ইতিহাস আমরা জানি, নকশালপন্থী সর্বহারাদের ইতিহাস আমরা জানি, এদেশে যারা গণতন্ত্র করে তাদের ইতিহাস আমরা জানি। ২০১৩ সালে এই গণতান্ত্রিকরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে যে তাণ্ডব করেছে ১০০ বাংলা ভাইও একাজ করতে পারবে না। সত্য কথা তিতা হলেও বলতে হবে, না হলে মিথ্যা কখনও দূরীভূত হবে না।

সার্চ করুন

যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক পেজের সাথে...

সাম্প্রতিক