হেযবুত তওহীদ

মানবতার কল্যাণে নিবেদিত

নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশীর বোমা হামলা ও আমাদের নিরাপত্তা

মো. মোস্তাফিজুর রহমান শিহাব:
একের পর এক সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ও তার জের হিসাবে সংঘটিত যুদ্ধগুলো নিয়ে গোটা বিশ্ব বিগত কয়েক যুগ ধরে তটস্থ হয়ে আছে। বিশ্বে এই মুহূর্তে বহু জায়গায় স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে যেখানে বহু সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটছে। মধ্যপ্রাচ্যে, ফিলিপাইনে, মায়ানমারে, আফ্রিকায়, ফিলিস্তিনে মুসলমানদের সঙ্গে যে ভয়াবহ অবিচার করা হচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠছে যারা ইসলাম ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মরিয়া হয়ে প্রায়শই নতুন নতুন সন্ত্রাসবাদী ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। রাশিয়া যখন সত্তরের দশকের  শেষার্ধে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালালো তখন রাশিয়ার হাত থেকে আফাগানিস্তানকে রক্ষার জন্য বহু দল গড়ে উঠেছিল যারা এই যুদ্ধটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে কুফরের যুদ্ধ বলে আখ্যা দিয়েছিল। সেই স্বাধীনতাকামী দলগুলোই পরবর্তীতে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে সন্ত্রাসবাদী দল হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। এটা সহজাত বিষয় যে, যখন অবিচার অনাচার চলে তখন সেখানে সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। আমেরিকা রাশিয়া ইউরোপের পরাশক্তিধর দেশগুলোর সিরিয়া ও ইরাক নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের প্রসার ঘটেছে যা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বীজ রোপণ করেছে।
সন্ত্রাসবাদ এমন একটি বিষয় যা কখনোই নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না, তা স্বভাবতই প্রসারমান। আর এই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যখন ধর্মীয়চেতনা যুক্ত হয়ে যায় তখন এটি হয়ে যায় দাবানল। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে গত কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ঘটে আসছে। এর উৎপত্তি কয়েক শতাব্দী আগেই যখন ইউরোপের লোকেরা আমেরিকায় গিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের হত্যা করে সেখানে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে। সাদা-কালোর যে অমোচনীয় ব্যবধান যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ইতিহাসে আমরা দেখি সেটা আজকের নয়। সেই বর্ণবাদী ঘৃণার প্রকাশ তাদের রাজনীতিতেও বার বার নগ্নভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং এ নিয়ে রক্তপাত আজও অব্যাহত আছে।
সন্ত্রাসবাদী হামলার মাত্রা (Dimension) বহু রকমের হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ এমন একটি সমাজ যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ গিয়ে দেশটিকে সমৃদ্ধ করেছে, তাদের শিল্প, কৃষি, সংস্কৃতি, সাহিত্য সকল দিকের উন্নতি সাধন করেছে যারা অধিকাংশই অভিবাসী। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের যারা পত্তন ঘটিয়েছে তারাও সেই ভূমির সন্তান নয়, তারাও ছিল ইউরোপিয়ান। পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জনগণ সেখানে ভাগ্যের সন্ধানে গিয়েছে। বিশ্বের একক পরাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত যুক্তরাষ্ট্র ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনের অংশ হিসাবে ইসলামের বিরুদ্ধে যে প্রপাগান্ডা ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে হামলা চালাচ্ছে তার প্রতিক্রিয়ায় যে সন্ত্রাসবাদী ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে তার জন্য ঐ পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসী নীতিই প্রধানত দায়ী। নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি লন্ডনেও বিরাট ঘটনা ঘটে গেল। এসবের কারণ হিসেবে অনেক বিশ্লেষক বলেছেন যে রাজনৈতিক হাওয়া পরিবর্তনের জন্য এরূপ ঘটেছে। ফ্রান্স ও জার্মানীতেও একইরকম ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অনেকে মনে করেন এ সকল ঘটনার পিছনে ইহুদিদের হাত রয়েছে। ইহুদিরা এই মুহূর্তে বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক এক কথা সচেতন মানুষমাত্রই জানেন। তারাই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর জন্ম দেয় এবং নিজেদের অবস্থানকে আরো দৃঢ় করার জন্য এসবের সঙ্গে মুসলমানদেরকে এর সঙ্গে জড়িত করে যাতে করে মুসলিম বিরোধী লড়াইটা আরো পেকে ওঠে। বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে আদর্শশূন্যতা, অনৈক্য, নেতৃত্বহীনতা, নির্যাতনের শিকার হওয়া, তাদের মধ্যে জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটা, কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের ঘানি টেনে হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি বহুবিধ জটিলতা কাজ করছে। হাজার হাজার মুসলিম যুবকদের ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান, অপরাজনীতি, জঙ্গিবাদ ইত্যাদির জালে জড়িয়ে ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এখানে তাদের ঈমানী চেতনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা সন্ত্রাস করছে কিন্তু ভাবছে এটা তাদের ধর্মের জন্য জেহাদ। যখন তালেবানের উত্থান হল তখন হাজার হাজার যুবক জেহাদের অভিপ্রায় নিয়ে তালেবানে গিয়ে যোগ দিল। আবার যখন আই.এস এর উত্থান হল তখন বহুসংখ্যক যুবক সেখানে যোগ দিল। এভাবেই বোকো হারাম, আল-কায়দা, আল শাবাব ইত্যাদি বহু দল বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব চালাচ্ছে। আই.এস খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি করে তাদের নেতাকে মুসলিম জাহানের খলিফা বলে ঘোষণা করে তার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য গোটা বিশ্বের মুসলিমদেরকে আহ্বান করছে এবং বিভিন্ন হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে মানুষের ঈমানকে ভুল খাতে প্রবাহিত করছে। কিন্তু তারা তাদের অধিকৃত অধিকাংশ ভূমি থেকেই এখন উৎখাত হয়ে গেছে, ফলে যারা আইএস-কে নিয়ে ইসলামের উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল তাদের আশার গুড়ে বালি পড়েছে। তারা আবারও প্রতারিত হয়েছে যেমন প্রতারিত হয়েছিল তালেবান, আল কায়েদার দ্বারা।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের পাতাল পথে বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন বাংলাদেশের নাগরিক আকায়েদ উল্লাহ (২৭)। তার এই ঘটনার জের কতদূর যাবে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যেই সেখানকার বাংলাদেশী কম্যুনিটিকে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে, তোপের মুখে পড়তে হতে পারে বাংলাদশেকেও। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন যে, প্রবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তার একটি প্রমাণ এই ঘটনাটি। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘটনা তাদের ওখানে হওয়া হাজার হাজার বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদী ঘটনারই একটি। এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করেই, ইস্যু করেই পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামবিদ্বেষী অপপ্রচার করার সুযোগ পায়, এমন কি বিভিন্ন দেশকে আক্রমণ করে দখল করে নেওয়ার সুযোগ তালাশ করে। কয়েকদিন আগেও আমেরিকায় একটি গানের অনুষ্ঠানে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আকায়েদের এই ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন আছে। গতকাল বিবিসিতে তার শ্বাশুড়ি স্পষ্টভাষায় বলেছেন তাদের মেয়ের জামাই ষড়যন্ত্রের শিকার। তার অতীত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এত বড় ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। সে বরাবরই শান্তশিষ্ট নিরীহ প্রকৃতির লোক ছিল। আর বাংলাদেশের পুলিশ দাবি করছে আকায়েদ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই হয়তো এ জাতীয় সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শে অনুপ্রাণীত হয়েছে। সে যাই হোক, যদি সে সত্যিই অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে তার যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, কিন্তু এই ঘটনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে কূটনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে তার জন্য গোটা বাংলাদেশী বা মুসলিম সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করা হবে একের অপরাধে অন্যকে দণ্ড প্রদান। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Email
Facebook
Twitter
Skype
WhatsApp
সার্চ করুন

যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক পেজের সাথে...