হেযবুত তওহীদ

মানবতার কল্যাণে নিবেদিত

ধর্মজীবী আলেম পুরোহিত শ্রেণির জন্মরহস্য

মোহাম্মদ রাকীব আল হাসান:

মানুষের ইতিহাস সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের চিরন্তন দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এই দ্বন্দ্বে কখনও কখনও সত্য জয়ী হোয়েছে আবার কখনোও হয়েছে বিপর্যস্থ। সকল সত্যের উৎস হোচ্ছেন মহান আল্লাহ, তাঁর পক্ষ থেকেই মানুষ যুগে যুগে সত্য লাভ কোরেছে। আদম (আ:) থেকে শুরু কোরে আখেরী নবী মোহাম্মদ (দ:) পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি সমাজে আল্লাহ সত্যদীনসহ তাঁর নবী, রসুল, অবতার প্রেরণ কোরেছেন। তাদের মাধ্যমেই সত্য এসেছে, সত্য জয়ী হোয়েছে। সত্যের রূপ হোচ্ছে শান্তি, ন্যায়, সুবিচার, আর মিথ্যার রূপ হোচ্ছে ঠিক তার বিপরীত, অশান্তি, অন্যায়, অবিচার। তাই সত্যের অবর্তমানেই অশান্তির বিস্তার ঘটে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সত্যের ধারক নবীদের অন্তর্ধানের পর তাঁদের জাতির মধ্যে জন্ম নেয় একটি স্বার্থান্বেষী পুরোহিত শ্রেণি। তাদের হাতে পড়ে ধর্ম হোয়েছে বিকৃত, এতে প্রবেশ কোরেছে অসত্য। ধর্মকে পুঁজি কোরে ব্যবসায় অবতীর্ণ হোয়েছে তারা, এটা সর্বযুগের ইতিহাস।
সত্য-মিথ্যার এই পর্যায়ক্রমিক পালাবদলে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে পৃথিবী অন্যায়-অত্যাচার, খুন খারাবি, রক্তপাত, জুলুম নির্যাতন, চুরি ডাকাতি, অভাব দারিদ্র্য ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। পৃথিবীর সেই ক্রান্তিলগ্নে মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ আবির্ভূত হোলেন বিশ্বনবী রহমাতাল্লিল আলামিন। তিনি এসে মানবজাতিকে সেই সত্য জীবনব্যবস্থার সন্ধান দিলেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম কোরে, কঠোর সংগ্রাম কোরে পরস্পর দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, চরম দরিদ্র আরবজাতিকে এমন একটি জীবনব্যবস্থার মধ্যে আনলেন যে জীবনব্যবস্থা সমাজটিকে অভাবনীয় শান্তি আর সুবিচারে পূর্ণ কোরে দিল। প্রত্যেকটি মানুষ যেন, হোয়ে গেল এক পরিবার।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই উম্মতে মোহাম্মদী কিভাবে সেই রাস্তা থেকে বিচ্যুত হোল?
রসুলাল্লাহ তাঁর উম্মাহর উপর দিয়ে গেলেন বাকি পৃথিবীতে সত্যদীন প্রতিষ্ঠার ভার। তাঁর উম্মাহও নিজেদেরকে উৎসর্গ কোরলেন মানবতার কল্যাণে। তারা পার্থিব কোন বিনিময়ের আশা না কোরে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াময় ছড়িয়ে পড়লেন। সংগ্রাম কোরে, অক্লান্ত পরিশ্রম কোরে, স্ত্রী-পুত্র, বাড়ি-ঘর সহায় সম্পত্তি সবকিছু কোরবান কোরে তারা অর্ধ পৃথিবীতে সেই শান্তি সুবিচার প্রতিষ্ঠা কোরলেন। এরপর ঘোটল এক মহা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। জাতি ভুলে গেল কেন তাদেরকে সৃষ্টি করা হোয়েছে। অর্ধেক পৃথিবীর সম্পদ হাতে পেয়ে এ জাতির নেতারা ভোগবাদী রাজা-বাদশাহদের মতই পার্থিব ভোগবিলাসে লিপ্ত হোয়ে পোড়ল এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ কোরল। এবারও ব্যতিক্রমহীনভাবে আবির্ভূত হোল একদল সুবিধাবাদী আলেম শ্রেণি। দীনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাসলা মাসায়েলের চুলচেরা বিশ্লেষণ কোরে জাতিকে তারা হাজারো মাজহাব, ফেরকায় বিভক্ত কোরে ছিন্নভিন্ন কোরে ফেললো। ঐক্য না থাকলে সংগ্রাম করাও সম্ভব নয়। সুতরাং জাতি দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাদ দিয়ে নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার কাড়াকাড়ি নিয়ে ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ ও রক্তপাতে লিপ্ত হোয়ে গেল।
জাতির নেতৃত্ব যখন সংগ্রাম ত্যাগ কোরল তখন আব্বাসীয়, উমাইয়া, ফাতেমীয় ইত্যাদি নামের শাসকরা নিজেদের এই অন্যায় কাজের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য ইসলামের বিধি বিধান সম্পর্কে সেই জ্ঞানী লোকদেরকে ঠিক কোরল। এই জ্ঞানীদের নতুন কাজ হোল শাসকের সকল অন্যায় কাজের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দাঁড় কোরিয়ে সেগুলিকে জায়েজ করা, তাদের পক্ষে ওয়াজ, খোতবা দিয়ে জনসমর্থন যুগিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে রসুলাল্লাহর নামে জাল হাদিস তৈরি করা। বিনিময়ে শাসকদের পক্ষ থেকে তারা লাভ কোরতে লাগল ক্ষমতার ভাগ, বিপুল সম্মান, ভোগবিলাসের যাবতীয় উপকরণ এবং নিরাপদ নিশ্চিত জীবন।
এই জ্ঞানীরাই হোল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ধর্মজীবী আলেম। এভাবেই ধীরে ধীরে জাতির মধ্যে জন্ম নিলো পৃথক একটি আলেম শ্রেণি যাদের কাছে বাঁধা পোড়ল দীনের সকল কর্মকাণ্ড। তাদের হাতে পড়ে দীন বিকৃত হোতে শুরু কোরল। একটি শব্দের বহু রকমের মানে করে ইসলামের মূল প্রেরণা থেকে তারা জাতিকে দূরে নিয়ে গেলো।
পূর্ববর্তী দীনগুলিতেও ঠিক এভাবেই এই পুরোহিত শ্রেণির উদ্ভব হোয়েছিল, যারা পার্থিব স্বার্থে দীনকে বিকৃত কোরে ফেলেছিল। তাই কোন কালেই, কোন ধর্মেই , ধর্মীয় কাজকে জীবিকার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা তথা ধর্মব্যবসা বৈধ ছিলো না। এবার দেখা যাক কোর’আন ছাড়া অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে পুরোহিত শ্রেণির ব্যাপারে কি বলা আছে?
সনাতন ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে:
ন যজ্ঞার্থং ধনং শূদ্রাদ্ বিপ্রো ভিক্ষেত কর্হিচিৎ।
যজমানো হি ভিক্ষিত্বা চাণ্ডালং প্রেত্য জায়তে।।২৪।।
অনুবাদ: যজ্ঞের জন্য শূদ্রের নিকট ধন ভিক্ষা করা ব্রাহ্মণের কখনও কর্তব্য নয়। কারণ যজ্ঞ করতে মৃত্যুর পর প্রবৃত্ত হ’য়ে ঐভাবে অর্থ ভিক্ষা করলে চণ্ডাল হ’য়ে জন্মাতে হয়।
যজ্ঞার্থমথং ভিক্ষিত্বা যো ন সর্বং প্রয”্ছতি।
স যাতি ভাসতাং বিপ্রঃ কাকতাং বা শতং সমাঃ।।২৫।।
অনুবাদ: যে ব্রাহ্মণ যজ্ঞের জন্য অর্থ ভিক্ষা করে তার সমস্তটা ঐ কাজে ব্যয় করে না, সে শত বৎসর শকুনি অথবা কাক হ’য়ে থাকে।
বর্তমানে খ্রিস্টানদের চার্চে যেমন ফাদার বা প্যাস্টর খেতাবধারী পুরোহিত থাকে যারা মানুষের পাপমুক্তির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কোরে দেয়, এই মধ্যস্থতাকারী শ্রেণির কোন উল্লেখই বাইবেলে নেই। বরং ঈসা (আ:) ইহুদি রাব্বাই সাদ্দুসাই ফরিশিদের ধর্মবাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। তিনি ইহুদি আলেমদের উদ্দেশ্যে বোলেছিলেন,

“Woe to you, teachers of the law and Pharisees, you hypocrites! You are like whitewashed tombs, which look beautiful on the outside but on the inside are full of the bones of the dead and everything unclean. 28 In the same way, on the outside you appear to people as righteous but on the inside you are full of hypocrisy and wickedness. (Matt 23:27-28)

“হে রাব্বাই ও ফারিশিগণ! হে মোনাফেকরা! আফসোস তোমাদের জন্য! কারণ তোমরা চুনকাম করা কবরের মতো; বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর বটে, কিন্তু ভিতরে মরা মানুষের হাড় ও সর্বপ্রকার নাপাকি ভরা। তদ্রƒপ তোমরাও বাইরে লোকদের কাছে নিজেদেরকে ধর্মপ্রাণ বোলে দেখিয়ে থাকো, কিন্তু ভিতরে তোমরা অধর্ম আর মোনাফেকিতে পরিপূর্ণ”। (ম্যাথু ২৩: ২৭-২৮)
এছাড়াও
১। নূহ (আ:) এর ঘোষণা: হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট ধন সম্পদ চাই না। আমার পারিশ্রমিক আল্লাহর নিকট। [সুরা হুদ-২৯, সুরা শুআরা – ১০৯, সুরা ইউনুস – ৭২]
২। হুদের (আ:) ঘোষণা: হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর পরিবর্তে তোমাদের নিকট কোনো মজুরি চাই না। আমার পারিশ্রমিক তাঁরই নিকট যিনি আমাকে সৃষ্টি কোরেছেন। তোমরা কি তবুও বুঝতে চেষ্টা কোরবে না? [হুদ-৫১, সুরা শুআরা – ১২৭]
৩। সালেহ (আ:) এর ঘোষণা: আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রোয়েছে। [শুয়ারা-১৪৫]
৪। লুতের (আ:) ঘোষণা: এর জন্য আমি কোনো মজুরি চাইনা। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রোয়েছে। [শুয়ারা-১৬৪]
৫। শোয়েবের (আ:) ঘোষণা: আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোনো মূল্য চাই না। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে। [শুয়ারা-১৮০]
৬। মোহাম্মদ (দ:) এর প্রতি আল্লাহর হুকুম:
ক. এবং তুমি তাদের নিকট কোনো মজুরি দাবি কোর না। এই বাণী তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ মাত্র। [ইউসুফ – ১০৪]
খ. বল! আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এবং যারা মিথ্যা দাবি করে আমি তাদের দলভুক্ত নই। [সাদ – ৮৬]
গ. তাদেরকেই (নবীদেরকেই) আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত কোরেছেন। সুতরাং তুমি তাদের পথ অনুসরণ করো; বলো! এর জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। [আনআম – ৯০]
ঘ. বলো! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে প্রেম-ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার ব্যতীত অন্য কোনো মজুরি চাই না। [শুরা – ২৩]
এমন আরও বহু আয়াত এবং রসুলাল্লাহর হাদিস উল্লেখ করা যায় যা থেকে প্রমাণিত হয়, দীনের কোনো কাজ কোরে নবী-রসুলগণ যেমন পারিশ্রমিক গ্রহণ কোরতেন না, তেমনি তাঁদের উম্মাহর জন্যেও পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়।

সার্চ করুন

যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক পেজের সাথে...