হেযবুত তওহীদের বালাগের সারসংক্ষেপ

Untitled-8-300x136শাহারুল ইসলাম:
হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মাননীয় এমামুয্যামান এর পরিচালনার ক্ষেত্রে রসুলাল্লাহর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাই প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত হেযবুত তওহীদের প্রধান কাজই হলো বালাগ। আল্লাহ পাক তাঁর অশেষ করুণায় যে মহাসত্যগুলো মাননীয় এমামুয্যামানকে জানিয়েছেন তা বিভিন্ন উপায়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হেযবুত তওহীদের প্রধান কাজ। কে সেই মহাসত্য গ্রহণ করবে আর কে প্রত্যাখ্যান করবে তা বিবেচ্য বিষয় নয়, সেটা মহান আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।
সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের বালাগের বক্তব্য হলো এই যে-
ক) মানবজাতির যাবতীয় অশান্তির কারণ: আজ সমস্ত পৃথিবী অন্যায়, অবিচার আর অশান্তিতে পরিপূর্ণ। পৃথিবীর চারদিক থেকে আর্ত মানুষের হাহাকার উঠছে- শান্তি চাই, শান্তি চাই। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারে, দরিদ্রের উপর ধনীর বঞ্চনায়, শোষণে, শাসিতের উপর শাসকের অবিচারে, ন্যায়ের উপর অন্যায়ের বিজয়ে, সরলের উপর ধুর্তের বঞ্চনায়, পৃথিবী আজ মানুষের বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। নিরপরাধ ও শিশুর রক্তে আজ পৃথিবীর মাটি ভেজা। সমস্ত দিক দিয়ে মানুষ অপরাধের সীমা অতিক্রম করেছে, ফলে পৃথিবী অশান্তির অগ্নিগোলকে পরিণত হয়েছে। এই অশান্তি থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা কম হচ্ছে না। কিন্তু ক্রমেই মানুষের আর্তনাদ, হৃদয়বিদারী ক্রন্দনে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এই যাবতীয় অশান্তির মূল কারণ হলো পাশ্চাত্য ইহুদি-খ্রিষ্টান সভ্যতা(!) তথা দাজ্জালের তৈরি স্রষ্টাহীন, আত্মাহীন ভোগবাদী প্রচলিত এই সিস্টেম। মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটিসহ সমস্ত মানবজাতি আজ তার সমষ্টিগত জীবন দাজ্জালের তৈরি জীবনব্যবস্থা দিয়ে পরিচালনা করছে। হেযবুত তওহীদের বক্তব্য এই যে, শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ বর্তমান প্রচলিত জীবনব্যবস্থাগুলো (System) বাদ দিয়ে স্রষ্টার, আল্লাহর দেওয়া সত্যদীন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত (System) গ্রহণ করা এবং তা সমষ্টিগত জীবনে কার্যকর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তিক্ত ফলদায়ী বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা ছেটে, সেচ-সার দিয়ে, পরিচর্যা করে তা থেকে মিষ্ট ফল আশা করা নিতান্ত বোকামি। মিষ্ট ফল পেতে হলে ঐ বৃক্ষ উৎপাটন করে মিষ্ট ফলের বৃক্ষ রোপণ করা অপরিহার্য। ঠিক একইভাবে প্রচলিত সিস্টেমের উৎপাটন ছাড়া সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
খ) প্রচলিত ইসলাম ইসলাম নয়: বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম নামে যে ধর্মটি চালু আছে সেটা আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম নয়। গত ১৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিকৃত ও বিপরীতমুখী হয়ে গেছে। আর চূড়ান্ত বিকৃতি ঘটিয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকেরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ শাসকেরা মুসলিম নামক এই জনসংখ্যাকে চিরজীবন গোলাম বানিয়ে রাখার জন্য তওহীদহীন, সংগ্রামহীন, মানবতাহীন বিকৃত ও বিপরীতমুখী একটি ইসলাম তৈরি করে যা বাহ্যিকভাবে দেখতে প্রকৃত ইসলামের মতোই, ঠিক যেন যাত্রাদলের কাঠের বন্দুকের ন্যায়, দেখতে আসল বন্দুকের মতোই কিন্তু সেটি দিয়ে গুলি বের হয় না। প্রকৃত বন্দুকের সাথে যাত্রাদলের কাঠের বন্দুকের যতটুকু সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য প্রকৃত ইসলামের সাথে বর্তমান প্রচলিত বিকৃত ইসলামেরও ততটাই মিল, অমিল রয়েছে। সেই বিকৃত ইসলাম এই জাতির অস্থি-মজ্জায় ঢুকিয়ে জাতিকে নিবীর্য করার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা। এই কার্যে তারা পূর্ণ সফল হয় এবং পরবর্তীতে এই মাদ্রাসা-শিক্ষা সমগ্র উপমহাদেশ ছাড়াও এই উপমহাদেশের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারিত করে। এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী এই মাদ্রাসা থেকে ব্রিটিশদের তৈরি বিকৃত ইসলাম শিখে ওয়াজ-মাহফিল, মিলাদ, খুতবা ইত্যাদির মাধ্যমে তা সাধারণ মানুষকে শিখিয়েছে আর বিনিময়ে উপার্জন করেছে অঢেল অর্থ। মুসলিম নামক এই জনসংখ্যাটি প্রাণপণে যে ইসলামটি মানার চেষ্টা করছে তা আসলে ব্রিটিশদের তৈরি সেই বিকৃত ইসলাম। আল্লাহ অতি দয়া করে তাঁর প্রকৃত ইসলাম যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীকে বুঝিয়েছেন। হেযবুত তওহীদ সেই প্রকৃত ইসলামের দিকেই মানুষকে আহ্বান করে যাচ্ছে।
গ) দাজ্জাল প্রতিরোধ: আল্লাহর শেষ রসুল আখেরি যামানায় যে এক চক্ষুবিশিষ্ট দানব দাজ্জালের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যাকে ঈসা (আ.) এন্টি ক্রাইস্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন, মাননীয় এমামুয্যামান সেই দাজ্জালকে হাদিস, বাইবেল, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী সভ্যতাই হচ্ছে সেই দাজ্জাল। বর্তমানে সমগ্র মানবজাতি সেই দাজ্জালের তৈরি জীবনবিধান মেনে নিয়ে তার পায়ে সেজদায় পড়ে আছে। পরিণামে তারা একদিকে যান্ত্রিক প্রগতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও মানুষ হিসাবে তারা পশুর পর্যায়ে নেমে গেছে। সমগ্র মানবজাতি ঘোর অশান্তি, অন্যায়, অবিচারের মধ্যে ডুবে আছে। দাজ্জালের হাত থেকে পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। আল্লাহর রসুল বলেছেন যে, যারা দাজ্জালকে প্রতিরোধ করবে তারা বদর ও ওহুদ দুই যুদ্ধের শহীদের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে (আবু হোরায়রা রা. থেকে বোখারী মুসলিম)। হেযবুত তওহীদের যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে তাদেরকেও আল্লাহ দুই শহীদ হিসাবে কবুল করে নিয়েছেন। যার প্রমাণস্বরূপ তিনি একটি বিরাট মো’জেজা হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। তা হলো- এই দাজ্জাল প্রতিরোধকারীরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের দেহ শক্ত (রাইগরমর্টিস) ও শীতল হয়ে যায় না। জীবিত মানুষের ন্যায় নরম ও স্বাভাবিক থাকে।
ঘ) ধর্মের কোনো বিনিময় নেয়া বৈধ নয়: ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। ধর্মের কোনো বিনিময় চলে না। বিনিময় নিলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। কাজেই ধর্মের কাজ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে করতে হবে এবং বিনিময় নিতে হবে কেবল আল্লাহর কাছ থেকে। কিন্তু আমাদের সমাজে বহু পন্থায় ধর্মকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করা হয়। নামাজ পড়িয়ে, কোর’আন খতম দিয়ে, মিলাদ পড়িয়ে, জানাজা পড়িয়ে, খোতবা-ওয়াজ করে, পরকালে মুক্তিদানের জন্য জান্নাতের ওসিলা সেজে অর্থাৎ ইসলামের যে কোনো কাজকে জীবিকার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করাই হলো ধর্মব্যবসা। ইসলামে ধর্মব্যবসার কোনো সুযোগ নেই, আল্লাহ একে সম্পূর্ণরূপে হারাম করেছেন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেন-
“আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছমূল্য গ্রহণ করে তারা (১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না, (২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, (৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা, গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে (৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। (সুরা আল বাকারা: ১৭৫-১৭৬)
মুসলিম নামক এই জনসংখ্যাটির মধ্যে যে শ্রেণিটি বিভিন্নভাবে ধর্মকে রোজগারের পথ হিসাবে ব্যবহার করছে এবং যারা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যও ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে তারা আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী নিকৃষ্টতম জাহান্নামী। তাদের অনুসরণ করতে আল্লাহ সরাসরি নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা তাদের আনুগত্য করো, যারা তোমাদের কাছে বিনিময় চায় না এবং যারা সঠিক পথে আছে।” অর্থাৎ যারা ইসলামের কাজ করে কোনো বিনিময় আশা করে তাদের অনুসরণ করা আল্লাহর হুকুম-পরিপন্থী। (সুরা ইয়াসীন- ২১)
ঙ) ধর্মের উদ্দেশ্য আজ পাল্টে গেছে: সহজ সরল সেরাতুল মোস্তাকীম দীনুল হক, ইসলামকে পণ্ডিত, আলেম, ফকীহ, মোফাস্সেরগণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বহু মতের সৃষ্টি করেছে। ফলে একদা অখণ্ড উম্মতে মোহাম্মদী হাজারো ফেরকা, মাযহাব, দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে আছে। অন্যদিকে ভারসাম্যহীন সুফিরা জাতির সংগ্রামী চরিত্রকে উল্টিয়ে ঘরমুখী, অন্তর্মুখী করে নিস্তেজ, নিপ্রাণ করে দিয়েছে। ফলে একদা অর্ধ-বিশ্বজয়ী দুর্বার গতিশীল যোদ্ধা জাতিটি আজ হাজার হাজার আধ্যাত্মিক তরিকায় বিভক্ত, স্থবির উপাসনাকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই উভয় শ্রেণির কাজের ফলে ইসলামের উদ্দেশ্যই পাল্টে গেছে। সংগ্রাম করে সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে ধর্মের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মার উন্নয়ন এবং জীবনের ব্যক্তিগত অঙ্গনের ছোট খাটো বিষয়ের মাসলা মাসায়েল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা।
চ) ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের পূর্ব শর্ত হচ্ছে জাতির ঐক্য। যে জাতি যত বেশি ঐক্যবদ্ধ সে জাতি তত বেশি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা জাতীয় ঐক্য হারিয়ে শান্তি, উন্নতি ও প্রগতি থেকে বহু দূরে অবস্থান করছি। আমাদের এই জাতীয় ঐক্যভঙ্গের কারণ প্রধানত দু’টি।
প্রথমত, ধর্মজীবীদের দ্বারা সৃষ্ট বিভক্তি। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের দেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র না মানলেও ঐসব বিভক্তি সৃষ্টিকারী মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে আমাদেরকে রাজনৈতিকভাবে শত শত দলে বিভক্ত করে দিয়েছে এবং এই অনৈক্যের সুযোগে আমাদেরকে শাসন ও শোষণ করে চলছে। এই সব রাজনৈতিক দল ও মতবাদের অনুসারীরা নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সন্ত্রাস, সহিংসতা, মানুষ হত্যা, হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও করে দেশের মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিসহ করে তুলে বার বার। আমরা মনে করি এ থেকে বাঁচার একটাই পথ – ১৬ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদেরকে (১) অপরাজনীতির বিরুদ্ধে, (২) সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, (৩) রাজনৈতিক দলাদলি, হানা-হানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা মানবতাবিনাশী সমস্ত দল-মত পরিত্যাগ করে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক জাতি, এক পরিবারে পরিণত হবো। আমরা রাজনীতির নামে সহিংসতা, ধর্মের নামে অরাজকতা আর দেখতে চাই না, আমরা চাই শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তি। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন সেটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আমাদেরকে কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও ন্যায়ের পক্ষে যদি আমরা ইস্পাতের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে যোগ্য নেতৃত্বের অধীনে পিঁপড়ার মতো সুশৃঙ্খল ও মালায়েকের মতো আনুগত্যশীল হতে পারি তবে এই ষোল কোটি মানুষ এমন এক বজ্রশক্তিধর জাতিতে পরিণত হবো যারা সর্বদিক দিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতির আসন অধিকার করবে। সমগ্র পৃথিবী তখন এ জাতির পায়ে লুটিয়ে পড়বে ইনশা’আল্লাহ।
ছ) ধর্ম ও এবাদতের সঠিক আকিদা: ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। কোনো বস্তু বা প্রাণি যে বৈশিষ্ট্য বা গুণ ধারণ করে সেটাই হচ্ছে তার ধর্ম। আগুনের ধর্ম পোড়ানো। পোড়ানোর ক্ষমতা হারালে সে তার ধর্ম হারালো। মানুষের ধর্ম কী? মানুষের ধর্ম হচ্ছে মানবতা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্যের দুঃখ-কষ্ট হৃদয়ে অনুভব করে এবং সেটা দূর করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায় সে-ই ধার্মিক। অথচ প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট লেবাস ধারণ করে সুরা কালাম, শাস্ত্র মুখস্থ বলতে পারে, নামায-রোযা, পূজা, প্রার্থনা করে সে-ই ধার্মিক।
এবাদত কী? আল্লাহর এবাদত করার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা যারিয়াত ৫৬)। এবাদত হচ্ছে যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেই কাজটি করা। গাড়ি তৈরি হয়েছে পরিবহনের কাজে ব্যবহারের জন্য, এটা করাই গাড়ির এবাদত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিনিধি (Representative) হিসাবে (সুরা বাকারা-৩০)। অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহ যেভাবে সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ রেখেছেন ঠিক সেভাবে এ পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখাই মানুষের এবাদত। ধরুন আপনি গভীর রাত্রে প্রার্থনায় মগ্ন। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে ‘আগুন আগুন’ বলে আর্তচিৎকার ভেসে এল। আপনি কী করবেন? দৌড়ে যাবেন সাহায্য করতে নাকি চোখ-কান বন্ধ করে প্রার্থনা চালিয়ে যাবেন। যদি আগুন নেভাতে যান সেটাই হবে আপনার এবাদত। আর যদি ভাবেন- বিপন্ন ব্যক্তি অন্য ধর্মের লোক, তাহলে আপনার মধ্যে মানুষের ধর্ম নেই, আপনার নামায-রোযা, প্রার্থনা সবই পণ্ডশ্রম।
জ) ধর্মবিশ্বাসের সঠিক ব্যবহার: আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী। তাদের এই ধর্মবিশ্বাস এক বিরাট শক্তি। বর্তমানে এ জাতির ঈমান, আমল সবই পরকালের সুন্দর জীবনের আশায় অথচ তাদের দুনিয়ার জীবন দুর্দশায় পূর্ণ অর্থাৎ অসুন্দর। কারণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা মানবজাতির অকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, যে ঈমান দুনিয়াতে নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ও শান্তির কাজে লাগে না সে ঈমান আখেরাতেও জান্নাত দিতে পারবে না। এজন্যই আল্লাহ আমাদেরকে দোয়া করতে শিখিয়েছেন, “হে আমাদের প্রভু! আমাদের দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর, মঙ্গলময় করো এবং আমাদের আখেরাতের জীবনকেও সুন্দর, মঙ্গলময় করো এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করো (সুরা বাকারা ২০১)।” সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে কেউ বিরাট অর্থ-সম্পত্তির মালিক হচ্ছে আবার কেউ ভোটের বাক্স পূর্ণ করছে। জঙ্গিবাদীরা তাদের কার্যক্রমের বিস্তার ঘটাচ্ছে এই ধর্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই। এখন মানুষের ধর্মবিশ্বাস তথা ঈমানকে সঠিক পথে (To right track) পরিচালিত করা গেলে তা জাতির উন্নতি-প্রগতি-সমৃদ্ধির কাজে লাগবে। মানুষকে যদি ধর্ম, এবাদত, মানবজনমের স্বার্থকতা, ঈমান ইত্যাদি বিষয়গুলোর সঠিক আকিদা বোঝানো যায় তবেই তা সম্ভব হবে।
ঝ) ইলাহ ও মাবুদের পার্থক্য: আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত এ কলেমায় কখনোই “ইলাহ” শব্দটি ছাড়া অন্য কোনো শব্দ ব্যবহৃত হয় নি। নিঃসন্দেহে আল্লাহই আমাদের একমাত্র উপাস্য মা’বুদ, স্রষ্টা, পালনকর্তা, তবে এগুলো স্বীকার করে নেওয়া এই দীনের ভিত্তি নয়, কলেমা নয়। বরং কলেমা হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আল্লাহকে ইলাহ হিসাবে না মেনে কেউ মো’মেন হতে পারবে না।
কলেমায় ব্যবহৃত ‘ইলাহ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ, ‘যাঁর হুকুম মানতে হবে’ (He who is to be obeyed)। শতাব্দীর পর শতাব্দীর কাল পরিক্রমায় যেভাবেই হোক এই শব্দটির অর্থ ‘হুকুম মানা বা আনুগত্য’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘উপাসনা, বন্দনা, ভক্তি বা পূজা করা (He who is to be worshiped) হয়ে গেছে। বর্তমানে সারা দুনিয়ায় খ্রিষ্টানদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোতে কলেমার অর্থই শেখানো হয় – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মানে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। কোর’আনের ইংরেজি অনুবাদগুলোতেও কলেমার এই অর্থই করা হয় (There is none to be worshiped other than Allah) অসঙ্গতিটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ‘উপাস্য’ কথাটির আরবি হচ্ছে ‘মা’বুদ’, তাই “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই” এই বাক্যটিকে আরবি করলে দাঁড়ায় “লা মা’বুদ ইল্লাল্লাহ’, যা ইসলামের কলেমা নয়। কোনো অমুসলিম এই সাক্ষ্য দিয়ে মুসলিম হতে পারবে না। কলেমার ‘ইলাহ’ শব্দটির অর্থ ভুল বোঝার ভয়াবহ পরিণতি এই হয়েছে যে সম্পূর্ণ মুসলিম জনসংখ্যাটি এই দীনের ভিত্তি থেকেই বিচ্যুত হয়ে কাফের-মোশরেক হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ পাল্টে যাওয়ায় এই মুসলিম জনসংখ্যার কলেমা সংক্রান্ত ধারণাই পাল্টে গেছে। বর্তমানে এই জাতির আকিদায় আল্লাহর হুকুম মানার কোনো গুরুত্ব নেই, তাঁর উপাসনাকেই যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ