হিজবুত তাওহীদের কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা

আলী হোসেন

আমরা বিশ্বাস করি একটি জনগোষ্ঠীকে সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করার মতো অতি মহান ও বিরাট কাজের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হবে মানুষকে বোঝানো। মানুষের মনের উপর জোর চলে না। তাকে এটা বোঝানো যে, স্রষ্টাহীন, আত্মাহীন জীবনব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করার কারণে মানবজাতি যে অশান্তির মধ্যে আছে তা থেকে মুক্তি পেতে হলে তাদেরকে অবশ্যই আল্লাহর দেওয়া চিরন্তন, শাশ্বত, ভারসাম্যপূর্ণ, চিরসত্য, সনাতন জীবনব্যবস্থায় তাদেরকে ফিরে যেতে হবে। এক কথায় তাদেরকে যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ বিষয়টি মুখে বলে, হ্যান্ডবিল দিয়ে, বই লিখে, পুস্তিকা আকারে, পথসভা, জনসভা, আলোচনা সভা, সেমিনার, মতবিনিময় সভা, গোলটেবিল বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন, ডকুমেন্টারি নির্মাণ ও প্রদর্শন, পত্রিকা প্রকাশ, ম্যাগাজিন প্রকাশ, বই মেলায় অংশগ্রহণ, নাটক, গান, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে, চিঠি লিখে, সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ওয়েব সাইটের মাধ্যমে- এক কথায় যতভাবে পারা যায় যুক্তি দিয়ে এই সত্যটি জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে জেহাদ। বাংলায় বলা যায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। আমরা এই পথগুলো অবলম্বন করে কাজ করে যাচ্ছি। বোমা মেরে, আতঙ্ক সৃষ্টি করে, শ্রেণি শত্রু বা বিরুদ্ধবাদীদের মেরে ফেলে, জোরপূর্বক, হিংসাত্মক, সহিংস পন্থায় একটি আদর্শ (Ideology, thought) জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে ওগুলো ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঠিক পন্থা নয়। আমরা বিশ্বাস করি যে তলোয়ার সারা জীবন ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই তলোয়ার এক দিন রসুলাল্লাহর পায়ে সোপর্দ হয়ে ইসলামের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে।
সংক্ষেপে আমাদের বক্তব্য:
মানবজাতির বর্তমান সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ স্রষ্টার বিধান। মুসলিম বলে পরিচিত এই জনসংখ্যাটিসহ সমস্ত মানবজাতি আজ তার সমষ্টিগত জীবন মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা দিয়ে পরিচালনা করছে। ফলে সমস্ত পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই, মানুষের জীবন সংঘর্ষ, রক্তপাত, অন্যায়, অবিচারে পূর্ণ হয়ে আছে। মানুষের তৈরি এই বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র এ সমস্যাগুলোর সমাধান করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। হিজবুত তাওহীদের বক্তব্য এই যে, শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ বর্তমান জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে স্রষ্টার, আল্লাহর দেওয়া জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং তা সমষ্টিগত জীবনে কার্যকর করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম নামে যে ধর্মটি চালু আছে সেটা আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম নয়। গত ১৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিকৃত ও বিপরীতমুখী হয়ে গেছে। আল্লাহ অতি দয়া করে তাঁর প্রকৃত ইসলাম যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীকে বুঝিয়েছেন। হিজবুত তাওহীদ সেই প্রকৃত ইসলামের ধারক।
ধর্ম এসেছে মানবতার কল্যাণে। ধর্মের কোন বিনিময় চলে না। বিনিময় নিলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। কাজেই ধর্মের কাজ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে করতে হবে এবং বিনিময় নিতে হবে কেবল আল্লাহর কাছ থেকে।
সহজ সরল সেরাতুল মোস্তাকীম দীনুল হক, ইসলামকে পণ্ডিত, আলেম, ফকীহ, মোফাস্সেরগণ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বহু মতের সৃষ্টি করেছে। ফলে একদা অখণ্ড উম্মতে মোহাম্মদী হাজারো ফেরকা, মাজহাব, দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে আছে। ভারসাম্যহীন সুফিরা জাতির সংগ্রামী চরিত্রকে উল্টিয়ে ঘরমুখী, অন্তর্মুখী করে নিস্তেজ, নি®প্রাণ করে দিয়েছে। ফলে একদা অর্ধ্ব-বিশ্বজয়ী দুর্বার গতিশীল যোদ্ধা জাতিটি আজ হাজার হাজার আধ্যাত্মিক তরিকায় বিভক্ত, স্থবির উপাসনাকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই উভয় শ্রেণির কাজের ফলে ইসলামের উদ্দেশ্যই পাল্টে গেছে। সংগ্রাম করে সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে ধর্মের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মার উন্নয়ন এবং জীবনের ব্যক্তিগত অঙ্গনের ছোট খাটো বিষয়ের মাসলা মাসায়েল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা। ফলে বর্তমানে যে যত বেশি মাসলা জানে ও চর্চা করে সে তত বড় মোমেন আর যে যত বেশি অন্তর্মূখী সাধক সে তত বড় বুজুর্গ।
আমাদের উদ্দেশ্য:
ধর্মের নামে চলা অধর্মসমূহকে চিহ্নিত করা এবং ধর্মব্যবসায়ীদের কায়েম করে রাখা সেই মিথ্যাগুলোকে কোর’আন, হাদিস, ইতিহাস, অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ, যুক্তি, তথ্য, উপাত্ত দ্বারা অপনোদনের চেষ্টা করা। এক কথায় মানবজাতিকে যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করে মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য।
কাঠামো:
আমাদের এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী, তিনি ছিলেন আন্দোলনের উদ্যোক্তা, আহ্বানকারী, প্রতিষ্ঠাতা এমাম। বিভিন্ন স্থানে তাঁর সঙ্গে যারা ঐকমত্য পোষণ করেছেন তাদের মধ্যে তিনি একজন দায়িত্বশীল বা আমীর নিয়োগ করেছেন। কয়েকজন আমীরকে পরিচালনা করার জন্য একজন আঞ্চলিক আমীর ছিলেন। এখনো সেই কাঠামোই বিদ্যমান আছে। এক কথায় আমাদের আনুগত্যের ধারাবাহিকতা হলো: এমাম-আমীর-সদস্য/সদস্যা (মোজাহেদ/মোজাজেদা)।
ঐকমত্য পোষণ করার প্রক্রিয়া:
আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কর্মসূচিকে বিবৃত করে একটি লিখিত ফর্ম আছে কেউ চাইলে সেটায় তার নাম ঠিকানা লিখে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। অথবা সমাবেশে হাত তুলে আমাদেরকে সমর্থন জানাতে পারেন। অথবা অন্তর থেকে আমাদেরকে সমর্থন দিতে পারেন। এক কথায় যারাই সত্যকে ধারণ করবেন, সত্যের পক্ষ অবলম্বন করবেন তারা সবাই আমাদের বন্ধু, ভাই, সদস্য, শুভাকাক্সক্ষী। তারা যে বর্ণের, যে গোত্রের, যে ধর্মের হোন না কেন।
আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নির্যাতন:
আন্দোলন যখন শুরু হয়েছিল তখন আমাদের এই সত্য প্রকাশে একটি শ্রেণি ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তারা হচ্ছে ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি। তাদের বড় ভীতির কারণ হচ্ছে ধর্মের কাজ করে টাকা নেওয়া যে হারাম এবং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা খ্রিষ্টানদের তৈরি তা মাননীয় এমামুযযামান প্রকাশ করে দিয়েছেন। তারা হিজবুত তাওহীদের কণ্ঠকে রুদ্ধ করার জন্য প্রচার করতে শুরু করল যে হিজবুত তাওহীদ খ্রিষ্টান, কাদিয়ানী হয়ে গেছে, এমামুযযামান নবী দাবি করেছেন ইত্যাদি। তারা হিজবুত তাওহীদের বিরুদ্ধে ওয়াজে, খোতবায় ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে তার ফলে সাধারণ মানুষ তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং হিজবুত তাওহীদের সদস্যদেরকে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। বহুস্থানে আমাদের সদস্যদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, গ্রাম থেকে উৎখাত করা হয়েছে, নির্মম প্রহারে আহত করা হয়েছে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে ফেলা হয়েছে।
এরই মধ্যে সারা পৃথিবীতে শুরু হয় ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড। তখন পশ্চিমা ভাবধারায় বিশ্বাসী ইসলামবিদ্বেষী গণমাধ্যমগুলো হিজবুত তাওহীদকেও সন্দেহবশত জঙ্গি দল বলে প্রচার করতে আরম্ভ করে। একটি মিডিয়ার প্রচারে অন্যান্য মিডিয়া প্রভাবিত হয়, সারা দেশবাসীও প্রভাবিত হয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রভাবিত হয়। কিন্তু কেউ একবার যাচাই করে না যে হিজবুত তাওহীদেরকাছে গিয়ে দেখি তো আসলে তারা কী বলে বা কী করতে চায়। তাদের অপপ্রচারের ফলে আমাদেরকে সীমাহীন প্রশাসনিক নির্যাতনের মুখোমুখী হতে হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে সন্দেহমূলকভাবে ৪৬৩ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যাতে আমাদের হাজার হাজার সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমগুলো একাট্টা হয়ে ফলাও করে ছবিসহ সংবাদ প্রচার করেছে। কিন্তু মামলা যখন আদালতে গেছে এবং তদন্ত করা হয়েছে তখন একটি মামলাতেও আমাদের একজন সদস্যেরও কোনো অপরাধ বা আইনভঙ্গ প্রমাণিত হয় নি। ফলে আমাদের সদস্য-সদস্যারা আদালতের সিদ্ধান্তে অভিযোগ থেকে বে-কসুর খালাস পেয়েছেন। বিগত বিশ বছরে আমাদের একজন সদস্যও আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয় নি। কিন্তু তাদের এই নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সংবাদ কেউ প্রচার করে নি। ফলে জনগণের কাছে হিজবুত তাওহীদ জঙ্গি দল হিসাবেই পরিচিত থেকে যায়। আমরা যতই প্রতিবাদ পাঠিয়েছি, পত্রিকাগুলো তা প্রকাশ করে নি এমন কি প্রতিবাদ দিতে গেলেও পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দিয়েছে।
হাজার হাজার মিথ্যার বিরুদ্ধে আমরা একটি সত্যের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমরা ভয়াবহ প্রতিকূলতার মধ্যেও পথ থেকে সরে যাই নি। যার সুফল আমরা এখন পাচ্ছি। পাহাড়সমান অপপ্রচারের নিচে যে সত্য ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, সেই সত্য এখন আল্লাহর দয়ায় মানুষের সামনে উপস্থাপন করার তওফিক আল্লাহ এখন দিয়েছেন। আমরা সারা দেশে গত তিন বছরে ৪০ হাজারেরও বেশি পথসভা, সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে মানুষের কাছে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি। লক্ষ লক্ষ হ্যান্ডবিল, বই, পুস্তিকা প্রকাশ করে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আমরা একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করছি যার নাম দৈনিক বজ্রশক্তি। এর আগে দৈনিক দেশেরপত্র ও দৈনিক নিউজে আমাদের বক্তব্য প্রকাশ করেছি।
হিজবুত তাওহীদ গত ২০ বছর যাবত এ দেশের মানুষকে যাবতীয় সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অপরাজনীতি, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে সচেতন করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টায় সকল এদেশের বিভিন্ন রাজনীতিক দলের নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সাংসদ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পি, সমাজকর্মীসহ আপামর জনগণ আমাদেরকে সমর্থন জানাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, অচিরেই মিথ্যার কালোমেঘ দূরীভূত হবে এবং সমগ্র পৃথিবীতে সত্যের আলো ছড়িয়ে পড়বে। আলো যখন আসে তখন অন্ধকারকে বিদায় নিতেই হয়।

লেখক: আমীর, হিজবুত তাওহীদ, ঢাকা মহানগর

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ