সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সামাজিক অবক্ষয়

মোখলেছুর রহমান

ইংরেজদের শাসন প্রতিষ্ঠার আগে উপমহাদেশ শাসন করতেন মুসলিম বাদশাহ, সুলতান ও নবাবরা। তার আগে ছিল হিন্দু রাজাদের শাসন। তারও আগে এদেশে বৌদ্ধদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল বলে জানা যায়। ইংরেজদের আগ পর্যন্ত যারাই উপমহাদেশ শাসন করেছেন মূলত ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশাসনের উপর ভিত্তি করেই তা করেছেন। ইংরেজদের আগমনের পরে রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের নিজেদের আইনে পরিচালিত হলেও সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থা পরিচালিত হত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন দিয়েই। বহু বছরের শাসনে তারা তাদের তৈরি শাসনব্যবস্থা, আইন ও দণ্ডবিধি, অর্থনীতি ইত্যাদি আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেও এদেশীয় সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তখনো বিদ্যমান ছিল। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনটা ঘটেছে একেবারে ইদানীংকালে। ৩০০ বছরের শাসনে যে কাজটি তারা করতে পারেনি, তাই ঘটেছে বিগত কয়েক দশকে, স্বাধীনতার পর। আর তারা এই কাজটি করেছে মূলত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পশ্চিমাদের প্রাচীন অসভ্য সংস্কৃতি তথা নগ্নতা, অশ্লীলতা, ও বেহায়াপনা। এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তা চেতনাকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে যে আজ এই অশ্লীলতাই সবার কাছে আধুনিকতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা পাশ্চাত্যের সুদূরপ্রসারী এক ষড়যন্ত্র।
কোনো জাতির উপর কর্তৃত্ব করার একটি অন্যতম উপায় হল তার উপর নিজেদের সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়া বা গ্রহণযোগ্য করে তোলা। উপমহাদেশসহ সারা পৃথিবীতে পশ্চিমা বিশ্ব এই কাজটি করেছে অত্যন্ত সুচতুরভাবে। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট ও অন্যান্য তথ্য ও বিনোদন মাধ্যম দিয়ে তারা এই দেশের যুব সমাজকে প্রভাবিত করেছে। আর আমাদের অসতর্কতা, উদাসীনতা ও অনেকক্ষেত্রে আগ্রহী মনোভাব ধীরে ধীরে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আমাদের চলচ্চিত্রে নগ্নতা ঢুকেছে বহু বছর আগেই। ইদানিং বিজ্ঞাপনচিত্রগুলো বিশেষ করে মোবাইল অপারেটর বা প্রসাধনী কোম্পানিসহ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনচিত্রেও খুবই সতর্কভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই অশ্লীলতা। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি কার্টুনগুলোতে যেসব নারী চরিত্র সৃষ্টি করা হয় তাও এই ষড়যন্ত্রের বাইরে নয়, যা শিশুদের মাঝে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগে তরুণ-তরুণীদের কাছে এই অপসংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই। পশ্চিমাদের এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তপ্রায়। এর ফলও আমরা পাচ্ছি হাতেনাতে। বাংলাদেশ, ভারতসহ এই অঞ্চলে যেখানে এক সময় মানুষের জীবন পরিচালিত হত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের উপর ভিত্তি করে, আজ সেখানে স্থান করে নিয়েছে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মত সাংঘাতিক ঘটনাগুলো। এটা বর্তমানে এতটা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে যে বিভিন্ন সময়ে সুশীল, মুক্তচিন্তার অধিকারী বলে পরিচিত যে ব্যক্তিরা পশ্চিমা সংস্কৃতির আগমনকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, তারাও এখন আতংকিত হয়ে উঠেছেন।
একটা বিষয় আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণের মত সামাজিক অপরাধসমূহের মূল কারণ আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের অবক্ষয় এতটা মারাত্মক রূপ লাভ করেছে যে তা আইন জারি করে বা শাস্তি দিয়ে দূর করা যাবে না। কারণ এই সমস্যাটি যতটা না শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক। এই ব্যাধি দূর করতে হলে অবশ্যই আমাদের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এই অবাধ আগ্রাসন রোধ করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের ঐতিহ্যময় ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধ। তবে এক্ষেত্রে সরকারই পারে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে। কারণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা কেবল রাষ্ট্রশক্তির পক্ষেই সম্ভব।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ