সভ্য হওয়া মানে ‘পাশ্চাত্যকরণ’ করা নয়

জাকারিয়া হাবিব

যে সকল উপাদান সভ্যতা গঠনে ভূমিকা রাখে, তার মধ্যে ধর্ম হলো সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিশ্বের প্রধান সভ্যতাগুলোর সাথে কোনো না কোনো বৃহৎ ধর্মের সংযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মানুষের আত্মপরিচয়ের বেলায় নৃগোষ্ঠীগত ও ভাষাগত ঐক্য থাকলেও ধর্মের অনৈক্য তাদের পরস্পরের মধ্যে বিভেদরেখা টেনে দেয়। এরকম ঘটনা লেবানন, পূর্বতন যুগোশ্লাভিয়া প্রভৃতি স্থানে ঘটতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ বিবেচনা করলে হান্টিংটনের কথা একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমান পৃথিবীতে আমরা উল্লেখযোগ্য সাতটি সভ্যতার অস্তিত্ব দেখতে পাচ্ছি, যথা: সিনিক, জাপানি, হিন্দু, ইসলামী, পাশ্চাত্য সভ্যতা, ল্যাটিন ও আফ্রিকান সভ্যতা। অনেক সমাজবিজ্ঞানী বিশেষ করে প্রফেসর হান্টিংটন ইসলাম ও সিনিক সভ্যতাকে পাশ্চাত্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে এ দুই সভ্যতা ছাড়া অন্যগুলো পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সিনিক সভ্যতা বলতে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (কোরিয়া, ভিয়েতনাম) জনগণের সভ্যতা বা সাধারণ সংস্কৃতি বোঝায়।
যে কোনো সভ্যতাই নিজেদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করে। প্রত্যেক সভ্যতাই নিজেকে পৃথিবীর ‘সভ্যতার কেন্দ্র’ বলে মনে করে থাকে এবং তারা সেভাবেই তাদের সভ্যতার ইতিহাস লিখে থাকে। তবে এই ধ্যান ধারণাটি সম্ভবত অন্যান্য সভ্যতার চেয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারক-বাহকদের মধ্যে তীব্রতম। এই শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি জাতির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রশ্ন হলো, মানবজাতির আধুনিকীকরণের জন্য কি পাশ্চাত্যকরণ অপরিহার্য?
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক মনে করতেন আধুনিকীকরণ ও পাশ্চাত্যকরণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে সত্য হলো আধুনিকীকরণ সম্ভব এবং কাংখিতও বটে, তবে এজন্যে পাশ্চাত্যকরণের প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গে বার্নাড লুইসের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “প্রায় এক হাজার বৎসরকাল অর্থাৎ মুসলিমদের পদার্পণ থেকে তুর্কিদের দ্বারা ভিয়েনা জয় পর্যন্ত ইউরোপ সর্বক্ষণের জন্য মুসলিমদের ভয়ে ভীত থাকত। ইসলাম হলো একমাত্র সভ্যতা যা পাশ্চাত্যের টিকে থাকাকে অন্তত দু’বার সন্দেহের আবর্তে নিক্ষেপ করেছিলো। এ দ্বন্দ্বের কারণ আর কিছুই নয়, অন্যান্য ধর্মগুলির সঙ্গে ইসলামের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের প্রভেদ।” ইসলাম হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ধর্ম ও রাজনীতির কোনো বিভাজন রেখা ইসলাম স্বীকার করে না। অন্যদিকে পশ্চিমা খ্রিষ্টধর্মের ধারণা হচ্ছে “ঈশ্বর” এবং “সীজারের” প্রাপ্য আলাদাভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থা আলাদা। এটাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ভিত্তি।
লেনিনের মতেও রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হলো ইসলামের সঙ্গে পাশ্চাত্যের প্রতিযোগিতা। লেনিন আরো বলেন, দু’টি সভ্যতার মধ্যে কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা সে প্রশ্ন উত্থাপন করা নিরর্থক। যতদিন পর্যন্ত ইসলাম ‘ইসলাম’ হিসেবে টিকে থাকবে এবং পশ্চিমাবিশ্ব ‘পশ্চিমা হয়ে টিকে থাকবে, ততদিন এ দু’টি বৃহৎ সভ্যতার মধ্যে স¤পর্ক বিগত ১৪শত বছর যেভাবে চলে এসেছে সেভাবেই বজায় থাকবে।” লেনিনই যে প্রথম এই সত্য কথাটি উপলব্ধি করেছিলেন তা নয়। এজন্য ইসলাম যেন ‘ইসলাম’ না থাকে তার পূর্ণ ব্যবস্থা পশ্চিমারা গ্রহণ করেছে তাদের উপনিবেশগুলোতে। এখন সারা দুনিয়াতেই পশ্চিমাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থায় যে বিকৃত ইসলাম শেখানো হয়েছে সেটাই অনুসৃত হচ্ছে। এর প্রধান বিকৃতি হচ্ছে “ঈশ্বর” এবং “সীজারের” পৃথকীকরণের মতো “ধর্ম” ও “জীবনব্যবস্থার” মধ্যে বিভাজক রেখা অঙ্কন এবং জাতিকে সংগ্রাম-বিমুখ করে নিবীর্যকরণ। তাদের এই শত-শতবর্ষীয় পরিকল্পনা বাস্তবরূপ লাভ করেছে। তবু নিশ্চিন্তে নেই পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের ভয়, যদি সত্যি কোনদিন মুসলিম জাতি তাদের প্রকৃত শিক্ষা ফিরে পায় তবে ধসে পড়বে তাদের তাসের ঘর। সে সময় এনশা’আল্লাহ অত্যাসন্ন।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ