সকল বন্ধ দুয়ার ভাঙলেন শেষ রসুল (সা.)

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ – এর লেখা থেকে:
ধনের বৈষম্য, বর্ণের বৈষম্য যুগ-যুগান্তর হতে মানবসমাজের বিপুল অংশে বিভেদের অলঙ্ঘ্য প্রাচীর তুলে রেখেছিল; শক্তিময় মানুষ তার সহযোগী মানুষের সামনে স্বয়ং বিধাতার নামে গভীর মন্দ্রে ঘোষণা করে এসেছে, পা হতে তোদের জন্ম, আমাদের পায়ের সেবা করাতেই তোদের স্বার্থকতা। দুর্বল মানুষ তা বিশ্বাস করেছে, বংশানুক্রমে তারা বড়দের জুতা-জল আর জ্বালানি কাঠ বয়ে জীবন কাটিয়েছে। মহানবী এসে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন‌-নাই-নাই, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নাই। ধলা-কালা, ধনী-গরীব, এদেশী-ওদেশী মানুষ হিসাবে এরা সবাই এক। সকলেই আদিম পিতা আদমের বংশধর। এক বাপের ঘরে ছেলে-মেয়েরা যেমন সমান, আদিম পিতা আদমের বংশধরেরাও তেমনি সমান। এ মহাসাম্যের বাণী শুনে সেদিন দিকে দিকে দুনিয়ার মজলুম দল উল্লাসে মেতে উঠেছিল, তাদের মর্মে অনুচ্চারিত ভাষায় গুঞ্জন উঠেছিল:
‘এল ধরায় ধরা দিতে সেই সে নবী
ব্যথিত মানবের ধ্যানের ছবি।’
সে বার্তা শুনে মরুর বাতাস বুুঝি সেদিন উতলা হয়ে উঠেছিল, আরব সাগরের তরঙ্গ শিখরে শিখরে বুঝি সেদিন ঝলক দিয়েছিল আনন্দের বিজলী, খেজুর গাছেরা বুঝি সেদিন তাদের পাতার হাত দুলিয়ে মর্মর ভাষায় বলেছিল-
স্বাগতম!
ইয়া রহমতুললিল আলামিন,
স্বাগতম!
প্রকৃতির অত্যাচার, সংস্কারের অত্যাচার, অনুষ্ঠানের অত্যাচারের হাত থেকে ইসলাম ব্যথিত মানুষের মুক্তি ঘোষণা করেছে। চন্দ্র, সূর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, অরণ্য, মরুভ‚মি যুগে যুগে- মানুষের কাছে পূজা প্রণতি আদায় করেছে। মহানবী ঘোষণা করলেন, ওরা কেউই মানুষের কাছে পূজা পাওয়ার অধিকারী তো নয়ই, বরং মানুষের খেদমতের জন্যই ওদের জন্ম। আজ বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে দাঁড়িয়ে এ কথা শোনা আমাদের পক্ষে সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু তখনকার যুগে এ ছিল এক বিশ্ববিপ্লবের আগমন পথের ত‚র্যধ্বনি। এ যেন কোন মিশরের ফেরাউনের দরবারে দাড়িয়ে বলা যে, ‘হে প্রতাপান্বিত সম্রাট! তুমি আর পিরামিড পারের ঐ অর্ধনগ্ন পাথরবাহী কাফ্রী গোলাম মানুষের অধিকারে তোমরা সমান।’ মহানবীর আবির্ভাবের আগে দুনিয়াময় সংস্কারের অত্যাচার ছিল। মহানবী সে অবুঝ সংস্কারজাত অত্যাচারের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। তাঁর একমাত্র পুত্র ইব্রাহিমের যে-দিন মৃত্যু হয়, সেদিন আরবের আকাশে পূর্ণসূর্যগ্রহণ। দিন-দুপুরে আকাশে কয়েকটি তারাও দেখা দিল। আরবের সাধারণ মানুষেরা ভয় পেয়ে গেল। তাদের কয়েকজন দলবেঁধে মহানবীর কাছে গিয়ে বলল,“মুহাম্মদ, তুমি যে সত্য নবী আমরা আজ বুঝতে পেলাম, নইলে তোমার ছেলের মৃত্যুর জন্য এমন অদ্ভূত গ্রহণ হবে কেন?” তখন মহানবীর মস্তকের উপর দুশমনের হাজারো তলোয়ার আঘাতের জন্য উদ্যত, একটু বললেই উপস্থিত লোকগুলো ইসলামে ইমান এনে তাঁর ঝাণ্ডার তলে হুঙ্কার ছেড়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তাঁর হৃদয়-ফলকে কোন প্রলোভনের ছায়াপাত হলো না। তিনি প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন, “চাঁদ-সুরুজের গ্রহণ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যাপার। কোন মানুষের জন্ম-মৃত্যুর সঙ্গে ওর কোন সম্বন্ধ নাই। তোমরা নির্ভয়ে ঘরে ফিরে যাও।”
যুগে যুগে মানুষ ভেবেছে, এ জগতে আসাই পাপ। তাদের শিশুরা পাপের কলঙ্ক লেখা ললাটে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। মহানবী ঘোষণা করলেন, “দুনিয়ার সমস্ত শিশু নিষ্পাপ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, তাদের মধ্যে কতকে যে পরবর্তী সময়ে নষ্ট হয়, তা পারিপার্শ্বিক অবস্থায় দৌরাত্মে।” জ্ঞান মানব জীবনের শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। এ সম্পদের দুয়ার সর্বকালের সর্বসাধারণের জন্য মুক্ত রাখে নাই। তারা প্রভাবশালী কতিপয়ের মধ্যে জ্ঞানানুশীলন সীমাবদ্ধ রেখেছে। যাতে জনসাধারণ জ্ঞানানুশীলনের ধারে- কাছে না যেতে পারে, সেজন্যই বই-পুস্তক লিখিত হত দুর্বোধ্য হরফে ও সাধারণের অবোধ্য ভাষায়। তাঁরা বই লিখে গর্ব করে বলতেন-
কহে কবি কালিদাস হেঁয়ালীরই ছন্দ,
মূর্খ বুঝিবে কি পণ্ডিত লাগে ধন্দ।
মহানবী এসে যুগ যুগ বঞ্চিত জনগণের সামনে জ্ঞানের দুয়ার অবারিত খুলে দিলেন। নর-নারী সবার জন্য বিদ্যার্জন হল অপরিহার্য কর্তব্য। কেবল তাই নয়, জ্ঞান সংগ্রহের ব্যাপারে জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত সমস্ত বাধা-বিঘ্নে অলঙ্ঘ্য প্রাচীর তিনি ধূলিসাৎ করে দিয়ে ঘোষণা করলেন: জ্ঞান তোমাদের হারানো মানিক, যেখানে পাও সেখান থেকে কুড়িয়ে নাও। চীন আরবের প্রতিবেশী দেশ নয়। সে দেশের বাসিন্দাদের সঙ্গে আরবের লোকের ভাষায়, আহারে, ধর্মে , সমাজে সভ্যতার কোন দিক দিয়েই মিল ছিল না। তবু রছুলুল্লা বললেন জ্ঞানের সন্ধানে দরকার হলে অমন দেশেও যাও।
জ্ঞানের বিকাশ সাধনের জন্য গবেষণাকে তিনি যে বিপুল মর্যাদা দিয়েছেন দুনিয়ার আর কোন লোক তা দিয়েছেন বলে তো মনে পড়ে না। তিনি বলেছেন, ‘এজতেহাদ’ (গবেষণা) কর; এজতেহাদে যে ব্যক্তি সফলকাম হবে তাঁর দ্বিগুণ ছওয়াব, যে ব্যক্তি বিফল হবে সেও পাবে একগুণ ছওয়াব। অতীতকালে বহুক্ষেত্রে মানুষ জ্ঞান ও ধর্মের আলোচনাকে বিশেষ বিশেষ ভাষার দুর্ভেদ্য দুর্গে আবদ্ধ করে রাখত। গ্রীসের বাসিন্দারা ভাবত, তাদের মাতৃভাষা ছাড়া দুনিয়ার বাকি সমস্ত ভাষাই বর্বদের কলরব। হিন্দুরা ভাবত সংস্কৃত দেবভাষা, বাকি সব স্বভাবতই হচ্ছে স্বচ্ছ ভাষা। ইহুদীরা হিব্রু ভাষাকে ঐ চোখেই দেখত। মহানবী যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন আরবের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ ভাগে সুসংবদ্ধ শিক্ষিত ইহুদী ও খৃষ্টান সমাজ ছিল। তাদের সাংস্কৃতিক ভাষা ছিল হিব্রু। রছুলুল্লাহর শক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর কাছে প্রতিবেশী আমীর-ওমরাদের পত্র আসতে শুরু করে। এসব পত্র হিব্রু ভাষায় লিখিত থাকত। তাঁর সাহাবীদের মধ্যে হিব্রু জানা লোক বেশি না থাকায় তিনি জায়েদ-বিন-ছাবেতকে হিব্রু ভাষা শিখতে আদেশ দেন। তৎকালীন রীতি মোতাবেক ধর্মের নতুন কোন বাণী এলে তা হিব্রু ভাষায় আসবে এই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মহানবীর প্রচারিত ধর্মের বাণী এল আরবী ভাষায়। কেন সনাতন প্রথা ভঙ্গ করে নতুন ভাষায় বাণী এল, তার কারণ কোরান মাজীদে দর্শান হয়েছে, ‘ইন্না আনজালনাহু কোরআনান আরাবিয়্যাল্লায়াল্লাকুম তাকেলুন’ -আমরা আরবী ভাষায় কোরান নাজেল করেছি এই জন্য যাতে তোমরা বুঝতে পার (সূরা ইউছুফ দ্বিতীয় আয়াত)। এমনিভাবে সনাতন ভাষার দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর মহানবী ধূলিসাৎ করে দিলেন। অবোধ্য ভাষা হলেও শাস্ত্র কেবল আওড়ালেই নাজাত মিলে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর জয়লাভ করল এই নবনীতি; যে ভাষাতেই হোক শাস্ত্র বচন বুঝে চলাই শ্রেয়। এই মুক্ত উদার নীতিই ইরানী কবিবে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলতে:
ছোখন কাজ্ বহর এ হক গুয়ী চে এবরানী
চে ছুরিয়ানী,
মকান কাজ বহর-এ হক জুয়ী চে জাবল্কা
চে জাবলছা?
মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় স্মরণাতীতকাল থেকে যে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে, সে সংগ্রামের পরই সে সাধনা করে এসেছে ধর্মের জন্য। ধর্মকে সে মনে করেছে বুকের ধন, চোখের মণি, মাথার মুকুট। কিন্তু এ ধর্ম চর্চার ক্ষেত্রেও মানুষ চিরদিন সম-অধিকার ভোগ করে আসে নাই। সমাজের উপর যারা প্রভুত্ব করেছে, তারা অবনত জনগণের পক্ষে শাস্ত্রপাঠ নিষিদ্ধ করেছে, উপাসনা মন্দিরের দুয়ার তাদের সামনে রুদ্ধ করে দিয়েছে, বড়দের মারফত ছাড়া বিধাতার দরবারে যাওয়ার পথে অলঙ্ঘ্য তুলে রেখেছে। মহানবী এসে শাস্ত্র পাঠের দুয়ার, ধর্ম-মন্দিরের দুয়ার, আল্লার দরবারে দুয়ার ছোট-বড়, ধলা-কালা, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য নির্বিশেষে সকলের সামনে খুলে দিলেন। ধর্মানুশীলনে যুগ যুগ বঞ্চিত মানুষ অবশেষে তাদের ধ্যানের ছবি খুঁজে পেল। আজ মহানবীর স্মৃতির কথা আলোচনা করতে গিয়ে আপন অকর্মণ্যতার গ্লানিতে চিত্ততল বারংবার বিষাক্ত হয়ে উঠছে। একদিন যার প্রাণময়ী আদর্শ প্রেরণায় আরবের বালিরাশি আগুনের অগণ্য ফুলকির মত জ্বলে উঠেছিল, আজ আমাদের জীবনে সে আদর্শের আবেদন কোথায়? স্মরণাতীতকাল হতে মরুচর আরব বাবলা-খেজুরের ছায়াতলে নিস্পন্দ ঘুমিয়ে কাল কাটিয়ে দিচ্ছিল। মহানবীর বাণীর পরশে-তারা ঘুম ঝেড়ে জেগে উঠল। ঝাঁপিয়ে পড়ল সাধনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বৃত হল তারা জগৎগুরুর আসনে। শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতির ফুলে ফলে তৎকালীন জগত মর্ত্যরে নন্দনে পরিণত হল।
আমাদের জবানে আজও সে বাণী আছে; কিন্তু আমাদের জীবনে সে বাণীর প্রভাব কোথায়? সমস্ত ইন্দো-পাকিস্তানের এলাকায় গত দেড়শ বছরের মধ্যে আমরা কয়জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিদ্বানের জন্ম দিয়েছি? এই বাংলাদেশে প্রতিবেশী রাজ্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যের জন্য আমরা কি করছি? ভাগ্যিস, আমাদের শরম নাই। নইলে, ওর ভারে নত মাথা নিয়ে রাস্তায় বের হলে আমরা গরুর গাড়ীর চাকার তলে পড়ে মরতাম। এই যে মহানবী সনাতন ভাষার দেয়াল ভেঙ্গে দিয়ে আরবের মাতৃভাষায় ওহী নাযিলের পথ করে দিলেন, সে আদর্শের অনুসরণে আমরা এ দেশে কতদূর চলেছি? ইসলামের অভ্যুদয়ের অনেক শ’ বছর পর ইউরোপের বিভিন্ন জাতি তাদের নিজ নিজ ভাষায় বাইবেলের তরজমা ও তফছীর করে নিয়েছে। কিন্তু আমরা কি করেছি?
জুমা-ঈদের খোতবাগুলি পাকিস্তানীরা উর্দুতে করে নিয়েছে। সে খোতবার ভাষা তারা বোঝে, সে খোতবা থেকে প্রেরণা লাভ করে। আমরা আরবী উর্দু খোতবা শুনতে গিয়ে মসজিদে-ময়দানে ঝিমাই; মিলাদ মাহফিলে গিয়ে বিদেশী ভাষায় ওয়াজের আমেজে হাই তুলি, যুবকেরা সাধ্যপক্ষে সে মাহফিলের দিকে পা বাড়ায় না। যারা যায় তাদের অনেকে কিছুক্ষণ পর চুপি চুপি চলে যায়। আমরা সময়ে অসময়ে তরুণদের কারো কারো পানে চেয়ে মন্তব্য করি; হতভাগারা কমিউনিস্ট হতে চলেছে। কিন্তু তাদের ইসলামিস্ট হওয়ার পথ যদি রুদ্ধ হয়ে যায় তবে ‘ইস্ট’ তাদের হতেই হবে।
সুতরাং যে পথে মহানবী মানুষকে ডেকেছিলেন সেই জ্ঞানোজ্জ্বল সুন্দর পথেই এদের ডাকতে হবে। কিন্তু সে ডাক দেওয়ার ফুরসত আমাদের কোথায়? আর তার জন্য আমরা আদর্শগত অধিকারই-বা অর্জন করেছি কতখানি? যে পথে তাদের ডাকবো সে পথে আমরা নিজেরা বিচরণ করেছি কতদূর? ইকবালের একটি পুরানো বাণীর অনুধ্বনি করে আমাদের আত্ম-জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হয়:
‘তোম সৈয়দভী-হোঃ মীর্জাভী-হো, আফগানভী-হো,
তোম সবহি কুছহো-বাতায়ো, মুছলমানভী-হো?’
[সংগ্রহ ও সম্পাদনা: আবু ফাহাদ, সহযোগী সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ