সওম নিয়ে বাড়াবাড়ি!

রসুলাল্লাহর জীবনী ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কাউকে দ্বীনের কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেখলে তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছেন। কারণ দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করার পরিণতি জাতির মধ্যে মতভেদ-অনৈক্য সৃষ্টি হওয়া এবং যে উদ্দেশ্যে জাতি গঠিত হয়েছে সেই উদ্দেশ্য অর্জন হওয়ার পূর্বেই জাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়া- এ কথা আল্লাহর রসুল ভালোভাবেই জানতেন। তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যদ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যে অপরাজেয় জাতি তথা উম্মতে মোহাম্মদী সৃষ্টি করলেন তিনি, সেই জাতি বিনাশী কর্মকা- তাঁর সামনে যখনই ঘটেছে তিনি যৌক্তিক কারণেই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়েছেন।
একদিন আল্লাহর রসুলকে (সা.) জানানো হলো যে কিছু আরব সওম রাখা অবস্থায় স্ত্রীদের চুম্বন করেন না এবং রমজান মাসে সফরে বের হলেও সওম রাখেন। শুনে ক্রোধে বিশ্বনবীর (সা.) মুখ-চোখ লাল হয়ে গেল এবং তিনি মসজিদে গিয়ে মিম্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হামদ বলার পর বললেন-সেই সব লোকদের কী দশা হবে যারা আমি নিজে যা করি তা থেকে তাদের বিরত রেখেছে? আল্লাহর কসম তাদের চেয়ে আমি আল্লাহকে বেশি জানি এবং বেশি ভয় করি (হাদিস-আয়েশা (রা.) থেকে বোখারী, মুশলিম, মেশকাত)।
বস্তুত সফররত অবস্থায় সওম রাখার কষ্টকর অবস্থা থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য আল্লাহ সওম রাখতে নিষেধ করেছেন। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত। কিন্তু আল্লাহর রসুল দেখলেন, কিছু লোক সওমকে নিয়ে এতই বাড়াবাড়ি করছে যে, বাড়াবাড়ির আতিশয্যে সফরেও কষ্ট করে সওম রাখা শুরু করেছে, যা এই দ্বীনের ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। সুতরাং তিনি কঠোর সাবধানবাণী উচ্চারণ করে জাতিকে সতর্ক করে দিলেন এবং বিশ্বনবীর (সা.) ঐ ভর্ৎসনা শুনে তারা আবার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনলেন।
একই ধরনের ঘটনা আরেকদিন ঘটল নামাজের ক্ষেত্রে। একদিন একজন লোক এসে আল্লাহর রসুলের (সা.) কাছে অভিযোগ করলেন যে ওমুক লোক নামাজ লম্বা করে পড়ান, কাজেই তার (পড়ানো) জামাতে আমি যোগ দিতে পারি না। শুনে তিনি (সা.) এত রাগান্বিত হয়ে গেলেন যে -বর্ণনাকারী আবু মাসউদ (রা.) বলছেন যে- আমরা তাকে এত রাগতে আর কখনও দেখি নি (হাদিস- আবু মাসউদ (রা.) থেকে বোখারী)। এখানেও রাগান্বিত হবার একই কারণ- বাড়াবাড়ি! সহজ-সরল বিধানকে জটিল ও কষ্টসাধ্য করে ফেলা!
ইতিহাসে পাই, অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কোনো বিষয়ে মাসলা জানতে চাইলে বিশ্বনবী (সা.) প্রথমে তা বলে দিতেন। কিন্তু কেউ যদি আরও একটু খুঁটিয়ে জানতে চাইতো তাহলেই তিনি রেগে যেতেন। কারণ তিনি জানতেন ঐ কাজ করেই অর্থাৎ অতি বিশ্লেষণ ও ফতোয়াবাজী করেই তার আগের নবীদের জাতিগুলো সহজ-সরল দ্বীনকে জটিল ও দুর্বোধ্য করে ফেলে ধ্বংস হয়ে গেছে।
কাজেই আল্লাহ যেটুকু বলেছেন ও আল্লাহর রসুল যেভাবে করেছেন, আমাদের উচিত কেবল সেভাবেই আমল করা, বাড়াবাড়ি না করে ফেলা, দ্বীনকে জটিল করে না ফেলা। মনে রাখতে হবে, ইসলামের কোনো আমলই মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়, মানুষের উপকারের জন্যই।
একদিন এক ব্যক্তি নবীর (সা.) নিকট এসে অনুতাপের সঙ্গে বলল, ‘এই বদ-নসিব ধ্বংস হয়েছে।’ নবী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’
– আমি সওম থাকা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে ফেলেছি।
– তোমার কি একজন ক্রীতদাস মুক্ত করার ক্ষমতা আছে?
– না;
– ২ মাস সওম থাকতে পারবে?
– না।
– ৬০ জন গরিবকে খাওয়াতে পারবে?
– না।
এমন সময় এক লোক বড় পাত্রভরা খেজুর নিয়ে আসলো। তখন নবী (সা.) ঐ ব্যক্তিকে বললেন, ‘ঐ খেজুর নিয়ে যাও এবং স্বীয় গোনাহর কাফফারা হিসেবে সদকা দাও।’ সে বলল, এটা কি এমন লোককে দেব যে আমার চেয়ে অধিক গরিব? আমি কসম করে বলছি, আমার মতো গরিব এ এলাকায় আর কেউ নেই।’
তিনি এ কথা শুনে স্বভাবগত মৃদু হাসির চেয়ে একটু অধিক হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি তোমার পরিবারবর্গকেই খেতে দাও। (আয়েশা রা. থেকে বোখারী, ২য় খ–, ৮ম সংস্করণ; আ. হক,পৃ: ১৭৫)।
এ থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই? এক কথায় দ্বীনের সরলতার শিক্ষা পাই।
আল্লাহ মানুষকে কষ্ট দিতে চান না, পরিশুদ্ধ করতে চান। সওম না রাখার জন্য তিনি কাউকে জাহান্নামে দিবেন বা শাস্তি দিবেন এমন কথা কোর’আনে কোথাও নেই। তবে মো’মেন সওম (সংযম সাধনা) না রাখলে তার আত্মিক অবনতি হবে, তার কাক্সিক্ষত চারিত্রিক গুণাবলী অর্জিত হবে না, সে স্বার্থপর হবে। সমাজের মানুষগুলো সহমর্মিতা, ত্যাগ, ইন্দ্রিয়সংযম ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হবে না। ফলে সমাজ শান্তিদায়ক না হয়ে অশান্তিতে পূর্ণ থাকবে। কাজেই মো’মেনের কল্যাণের জন্যই সওমের নির্দেশ। কিন্তু বাড়াবাড়ির কারণে এই কল্যাণকর আমলটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে।
হাদিসটি থেকে আরেকটি শিক্ষা হচ্ছে সওম না রাখতে পারার কাফফারা বা ফিদিয়া এমনভাবে ধার্য করা যাতে সমাজ উপকৃত হয়, দারিদ্র্য দূর হয়। যেমন- দাসমুক্ত করা, দরিদ্র্যকে খাওয়ানো, সদকা দেওয়া ইত্যাদি। রমজান মাসে সদকা বা ফেতরা প্রদান করাও গুরুত্বপূর্ণ আমল যা মানুষের উপকারে আসে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়ন।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ