সওমের মাসে আমরা কতটুকু তাকওয়া অর্জন করতে পারলাম?

রাকীব আল হাসান
যে কোনো আমল (কাজ) করার পূর্বে তার আকীদা (সঠিক উদ্দেশ্য, সম্মক ধারণা) বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আপনি খাদ্য গ্রহণ করবেন, কিন্তু কেন খাদ্য গ্রহণ করবেন তা না জানলে ঐ কাজের ফল উল্টোও হতে পারে। আপনি জানেন যে, সুস্থ থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তাই আপনি পুষ্টিকর, স্বাস্থকর (যা আপনাকে সুস্থ রাখবে, কর্মক্ষম রাখবে) খাদ্য গ্রহণ করেন। আবার ডাইরিয়া হলে আপনি জানেন যে, পানিশূন্যতা দূর করতে হবে, তাই তখন স্যালাইন খান। অর্থাৎ আপনি উদ্দেশ্য বুঝে কাজ করেন। আপনি খাচ্ছেন উদ্দেশ্য বুঝে, তাহলে সারাদিন না খেয়ে থাকবেন (রোজা করবেন) সেটাও নিশ্চয় উদ্দেশ্য বুঝেই করা উচিত। চলুন তাহলে সওমের উদ্দেশ্য বুঝে নেওয়া যাক।
মহান আল্লাহ বলেন, “হে মো’মেনগণ, তোমাদের উপর সওম (রোজা) ফরদ করা হয়েছে, যেরূপ ফরদ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” [সুরা বাকারা- ১৮৩]। খেয়াল করুন, প্রথমেই আল্লাহ সম্বোধন করলেন মো’মেনদেরকে। অর্থাৎ সওম (রোজা) কেবল মো’মেনদের জন্য, অন্য কারো জন্য নয়। তাহলে মো’মেন কারা? আল্লাহ বলেছেন, “মো’মেন শুধুমাত্র তারা, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর কোনো সন্দেহ পোষণ করে না, জীবন ও স¤পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় (হেদায়াহ ও সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য) জেহাদ (সংগ্রাম) করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ (সুরা হুজরাত-১৫)। মো’মেন হবার শর্তই হলো ঈমান আনার পর আল্লাহর হুকুম তথা যাবতীয় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজের জীবন ও স¤পদ কোরবান করে প্রচেষ্টা, সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। যারা এটা করবে না তাদের জন্য সওম নয়।
এবার দেখুন প্রাগুক্ত আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ কেন মো’মেনদের উপর সওম ফরদ করলেন সে প্রসঙ্গে পরিষ্কার করে বলেই দিলেন, “যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” অর্থাৎ সওম আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনে সাহায্য করবে।
তাকওয়ার অর্থ সাবধানে জীবনের পথ চলা। অর্থাৎ জীবনের পথ চলায় ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-বেঠিক দেখে চলা, অসৎ কাজ পরিহার করে সৎ কাজ করে চলা, আল্লাহ ন্যায়-অন্যায়ের যে মাপকাঠি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, সেই মাপকাঠি মোতাবেক জীবনের পথ চলা। যারা অমন সাবধানতার সঙ্গে পথ চলেন তাদের বলা হয় মুত্তাকি। সুরা ফাতেহার পর সুরা বাকারা দিয়ে কোর’আন আরম্ভ করেই আল্লাহ বলছেন, “এই কিতাব সন্দেহাতীত।” (এটা) মুত্তাকিদের (সাবধানে পথ চলা মানুষদের) জন্য হেদায়াহ (সঠিক পথ প্রদর্শনকারী)” (সুরা আল-বাকারা: ২)। যারা মুত্তাকি, কিন্তু হেদায়াতে নেই- সঠিক পথে নেই, তাদের পথ দেখাবার জন্যই এই কোর’আন। অন্যান্য ধর্মে, এমন কি আল্লাহকে অবিশ্বাসকারী নাস্তিক কমিউনিস্টদের মধ্যেও বহু মানুষ আছেন যারা সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-অঠিক দেখে জীবনের পথ চলতে চেষ্টা করেন। তারা মিথ্যা বলেন না, মানুষকে ঠকান না, অন্যের ক্ষতি করেন না, যতটুকু পারেন অন্যের ভালো করেন, গরীবকে সাহায্য করেন ইত্যাদি। তারা মুত্তাকি, কিন্তু তারা হেদায়াতে নেই, তারা মো’মেন না। তাদের হেদায়াতে অর্থাৎ তওহীদে আনার জন্য কোর’আন।
যারা মো’মেন না, যারা হেদায়াতে নেই তারা তাকওয়া অর্জন করলে আল্লাহর দীনের কোনো উপকার হবে না, এজন্যই মহান আল্লাহর কাছে মো’মেনদের তাকওয়ার মূল্য আছে, মো’মেন না হলে তার তাকওয়ার কোনো মূল্য মহান আল্লাহর কাছে নেই। তাই মো’মেনদেরকে ডেকে আল্লাহ সওম (রোজা) করতে বলেছেন।
এবার আমরা বোঝার চেষ্টা করব কীভাবে সওম আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করে। তাকওয়া অর্জন করতে হলে প্রথমত প্রয়োজন হলো আল্লাহর জিকির (আল্লাহকে স্মরণে রাখা)। একজন মো’মেন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আল্লাহকে স্মরণ করবে, সারাদিন যত কাজ করবে প্রত্যেকটা কাজেই আল্লাহকে স্মরণ করবে। আল্লাহকে স্মরণ করা মানে সশব্দে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা নয় বরং যে কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কথা বিবেচনা করাই হলো আল্লাহর স্মরণ। একজন মো’মেন আল্লাহকে স্মরণে রেখে, আল্লাহর হুকুমকে স্মরণে রেখে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সমাজে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠায় নিজের জীবন ও সম্পদ কোরবান করবে, দীন প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। যত ক্ষুধা, দারিদ্র আসুক, জীবনের ঝুঁকি আসুক সে পিছু-পা হবে না, সত্যের উপর অটল থাকবে, সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। একজন দোকানদার পন্য বিক্রি করার সময় আল্লাহর হুকুমের কথা স্মরণ করে ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকবে, খারাপ পন্য ভালো পন্যের সাথে মিশিয়ে ক্রেতার সাথে প্রতারণা করবে না। একজন কৃষক আল্লাহর আদেশ-নিষেধের কথা স্মরণ করে অন্যের জমির মধ্যে নিজের জমির আইল প্রবেশ করাবে না। ধনবান ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা স্মরণ করে দরিদ্রকে দান করবে, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেবে, অন্নহীনের জন্য অন্ন দান করবে। ডাক্তার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিষ্ঠার সাথে রোগীর চিকিৎসা করবে, রোগীর প্রতি অন্যায় করবে না। এভাবে প্রত্যেকটা কাজে আল্লাহর হুকুমের স্মরণ করাটাই হলো তাকওয়া। যখন একজন মো’মেন সওম থাকে তখন সারাদিন সে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় অন্ন গ্রহণ, স্ত্রী-সঙ্গ ও যাবতীয় পাপকর্ম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ সওম অর্থ কেবল পানাহার থেকেই দূরে থাকা নয়, বরং সকল পাপকর্ম থেকেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। সওম-পালনকারী ব্যক্তির ক্ষুধা, তৃষ্ণা তাকে সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সারাদিন পানাহার থেকে বিরত আছে, অর্থাৎ সে আল্লাহর হুকুমের প্রতি আনুগত্যশীল। আল্লাহর এই স্মরণই তাকে অন্যান্য পাপকর্ম থেকেই বিরত রাখে। এভাবে সে তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু বর্তমানে দেখা যায় রমজান মাসে অন্যায়-অবিচার অব্যাহতভাবে চলতে থাকে, মানুষ পাপকর্মে ঠিকই লিপ্ত হয়? কেউ কেউ বলেন, রমজান মাসে মানুষের মাথা গরম থাকে, মারামারি, ফাটাফাটি বেশি হয়। অর্থাৎ রমজান মাসে আমরা সওম পালন করেও তাকওয়া অর্জন করতে পারছি না। এর কারণ হলো- আমরা তো আল্লাহর সাথে এই অঙ্গীকারই করিনি যে, “আমরা আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানব না।” আমাদের সমাজ চলে মানবরচিত হুকুম-বিধান দিয়ে, আর আমরা ব্যক্তিগত জীবনে কেবল আল্লাহর কিছু হুকুম মেনে সওয়াব কামানোর চেষ্টা করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই আমলগুলোর আকীদা, উদ্দেশ্যও বুঝি না।
এখন আমাদেরকে কলেমার (আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানব না) অঙ্গীকারে ফিরে এসে মো’মেন হতে হবে, তারপর উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সচেতন থেকে সওম পালন করতে হবে। আল্লাহর প্রতিটি হুকুম পালনের ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে, আল্লাহকে স্মরণে রাখতে হবে। তাহলে ইনশাল্লাহ আমাদের সওমপালন অর্থবহ হবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ