রাজধানীর ভাটারায় বিশাল জনসভা ও র‌্যালি

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২২ জুলাই ২০১৬ (শুক্রবার) রাজধানীর ভাটারা থানায় লালমাটির মাঠে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। হেযবুত তওহীদের আমীর মসীহ উর রহমানের সভাপতিত্বে ‘বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার নানামুখী ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ও সন্ত্রাস দমনে জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই’ শীর্ষক উক্ত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাটারা থানা আওয়ামলী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব শহিদুল আমীন খন্দকার।

প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগতরা ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুনসহ দলে দলে সভাস্থলে প্রবেশ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে পুরো মাঠ ও আশেপাশের এলাকায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় তাদেরকে জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার একটু পরেই মুষল

ধারে বৃষ্টি শুরু হওয়া সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হেযবুত তওহীদের এমাম ও অন্যান্যদের বক্তব্য শুনেন। সভা শেষে জঙ্গিবাদবিরোধী ব্যানার ও স্লোগানের সাথে একটি বিশাল র‌্যালি ভাটারার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তাতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা জানান দেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশকে নিয়ে এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে মন্তব্য করেন। তারা বলেন, জঙ্গিবাদকে ইস্যু করে মধ্যপ্রাচ্যে একটির পর একটি দেশ যেভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়েও সেই নোংরা খেলা শুরু হয়েছে। এই ষড়যন্ত্র কেবল এই দেশের বিরুদ্ধেই নয়, ইসলামেরও বিরুদ্ধে বলে তারা মন্তব্য করেন। তারা বলেন, ইসলাম ধর্ম, মহান আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে প্রশ্নবিদ্ধ ও কালিমালিপ্ত করা জঙ্গিবাদের বিশ্বায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য। দেশের তরুণ, যুুবকেরাও সেই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছে। তাদের ঈমানকে বিপথে পরিচালিত করা হচ্ছে। আর সম্পূর্ণ কাজটি করা হচ্ছে কোরআন হাদিসকে উদ্দেশ্যমূলক ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে।

অনুষ্ঠানে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “যেহেতু জঙ্গিবাদ একটি আদর্শিক বিষয়, মতবাদগত সন্ত্রাস, তাই একে মোকাবেলা করার জন্য শুধুমাত্র শক্তিপ্রয়োগ যথেষ্ট নয়। একে নির্মূল করার জন্য শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন একটি সঠিক আদর্শ যা দিয়ে বাস্তবিক অর্থেই জঙ্গিবাদকে ভ্রান্ত ও অসার মতবাদ হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব। আর সেই আদর্শটি রয়েছে হেযবুত তওহীদের নিকট।” তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সম্পূর্ণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।” এটা জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা যদি এই মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, তবে আমাদেরকেও শীঘ্রই ইরাক-সিরিয়ার ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।” তিনি বলেন, “এই সংকটকালে হেযবুত তওহীদ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সকলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা দলের একার পক্ষে এত বড় কাজ করা সম্ভব নয়।” তিনি এ কাজে সকলের সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভাটারা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব শহিদুল আমীন খন্দকার বলেন, “জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার যখন দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তারা প্রমাণ করতে চাইছে বাংলাদেশ একটি জঙ্গি দেশ, এখানে জীবনের কোনো নিরাপত্তা নাই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শরীরে জাতির পিতার রক্ত যতক্ষণ প্রবাহিত হচ্ছে ততক্ষণ তাদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেব না। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদের মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। আজ হেযবুত তওহীদ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে দল-মতের ঊর্ধ্বে ওঠে যেভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে একটি বাসযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”

অনুষ্ঠানে হেযবুত তওহীদের মুখপাত্র ও দৈনিক বজ্র্রশক্তির প্রকাশক ও সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা বলেন, হেযবুত তওহীদ গত ১৯ বছর ধরে ধর্মব্যবসা, ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে কাজ করে আসছে। জঙ্গিবাদ হচ্ছে ধর্মব্যবসার চূড়ান্ত রূপ। এই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা সারা দেশে কাজ করেছি। দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক সংকলন, জনসভা, গোলটেবিল বৈঠক, পথসভা, ডক্যুমেন্টারি প্রদর্শনসহ নানামুখী উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ করেছি। সেই কাজ করতে গিয়ে হেযবুত তওহীদ অতীতে বহু হয়রানি, নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এমনকি ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী আমাদের খ্রিস্টান ফতোয়া দিয়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে আমাদের এমামের বাড়িতে হামলা করিয়েছে, আমাদের দু’জন ভাইকে জবাই করে হত্যা করেছে। কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য, এই ভূ-খ-ের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য আমাদের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই জেহাদ চলবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে হেযবুত তওহীদের আমীর মসীহ উর রহমান বলেন, জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করার জন্য কেবল শক্তিপ্রয়োগ যথেষ্ট নয়। এর জন্য যে আদর্শিক মোকাবেলা অপরিহার্য সেই আদর্শ সরকারের সামনে তুলে ধরেছিলেন হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। তিনি বলেছিলেন, জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করার জন্য কোরআন ও হাদীসের অকাট্য প্রমাণ, ইসলামের প্রকৃত আকিদা ও যুক্তিভিত্তিক যাবতীয় দলিল, প্রমাণাদি আমাদের নিকট আছে। সরকার চাইলে সেই আদর্শ দিয়ে হেযবুত তওহীদ জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আমরা আজও এই আদর্শিক মোকাবেলার গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরছি। আমরা আশা করবো, আপনারা আমাদের এই প্রস্তাবনার কথা বিবেক দিয়ে উপলব্ধি করবেন এবং যদি তা যুক্তিসম্মত মনে হয় তবে আমাদের কর্মকা-ে সহযোগিতা করবেন।

অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদের ঢাকা মহানগরীর আমীর মোহাম্মদ আলী হোসেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন হেযবুত তওহীদের রামপুরা শাখার আমীর ফরিদ উদ্দিন রব্বানী। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ভাটারা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার্দি সরু, ভাটারা থানা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক টুটুল ব্যাপারী, বিশিষ্ট সমাজ সেবক এড: নাবিয়ার হোসেন, ভাটারা থানা যুবলীগের য্গ্মু আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন খন্দকার, ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি লোকমান হোসেন, ভাটারা থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাইদুল ইসলাম, হাবীব খান, স্থানীয় যুবলীগ নেতা আক্তার, টিটু, মিলন খন্দকারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সর্বস্তরের সহস্রাধিক জনসাধারণ।

২২জুন ২০১৬ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ভাটারায় হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে আয়োজিত জঙ্গিবাদবিরোধী জনসভায় প্রধান আলোচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তাঁর ভাষণের কিছু চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

সম্প্রতি বাংলাদেশে যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলো হয়েছে ইসলামের নামে এমন পৈশাচিক তা-ব এদেশে আগে ঘটে নি। একই ধরনের হামলা বেশ কয়েক বছর থেকেই চলে আসছিল সিরিয়া ইরাক আফগানিস্তানে। সেই দেশগুলো ধীরে ধীরে যুদ্ধ পরিস্থিতির শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশেষে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও আজ আক্রান্ত। এই আশংকা আমরা হেযবুত তওহীদ কয়েক বছর আগে থেকেই প্রকাশ করে আসছিলাম। আমরা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে, হ্যান্ডবিল, পুস্তিকা, ম্যাগাজিন, বই লিখে, প্রমাণ্যচিত্র বানিয়ে সেগুলো প্রচার করে, ৪০ হাজারেরও বেশি সেমিনার, র‌্যালি, পথসভা, জনসভা করে আমরা এই আশঙ্কা ব্যক্ত করছিলাম যে, যেভাবে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদীরা ষড়যন্ত্র শুরু করেছে, একটার পর একটা মুসলিমপ্রধান দেশকে টার্গেট করে শেষ করে দিচ্ছে, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকেও তারা টার্গেটে পরিণত করবে। একের পর এক গুপ্তহত্যাকা- চলছিল বহুদিন ধরে। এ সবই করা হচ্ছে ইসলামের নামে, স্বাভাবিকভাবেই ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো জঙ্গিদের মোকাবেলায় বার বার সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে শুধু দেশ আক্রান্ত নয়, শুধু মানুষ আক্রান্ত নয় – আক্রান্ত হয়েছে আমাদের প্রিয় ধর্ম ইসলামও।

সংকট মোকাবেলায় সরকার কি করছে?

সংকট নিরসন ও জনগণের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা ছাড়াও বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মসজিদে মসজিদে খোতবা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, মিডিয়াগুলি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছে, চিন্তাশীল জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞরা এ সন্ত্রাসের উৎপত্তির কারণ ও সমাধান নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করছেন। এতদিন অনেকেই জঙ্গিবাদের উৎপত্তির জন্য মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে একচেটিয়াভাবে দায়ী করে এসেছেন। কিন্তু গুলশান আর শোলাকিয়ার হামলার ঘটনায় ইংলিশ মিডিয়ামে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া প্রভাবশালী বিত্তবান ঘরের সন্তানেরা অংশ নেওয়ায় সেই মাদ্রাসাশিক্ষা আর অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা আর টিকছে না। কেউ বলছে মসজিদ থেকে জঙ্গিবাদের উৎপত্তি হচ্ছে, কেউ বলছে পিস টিভি দেখে জঙ্গি হচ্ছে, কেউ বলছে ওয়াজ শুনে জঙ্গি হচ্ছে, কেউ বলছেন ইসলামী রাজনৈতিক দলের থেকে জঙ্গি হচ্ছে। তাদের কারো কথাই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। প্রকৃত সত্য হলো, ধর্মবিশ্বাসী মানুষ যেখানেই আছে সেখান থেকে জঙ্গিবাদের উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য মসজিদ পাহারা দিয়ে, ওয়াজ পাহারা দিয়ে, টিভি চ্যানেল বন্ধ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরদারী বাড়িয়ে, মাদ্রাসায় পুলিশ বসিয়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার রোধ করার যে চেষ্টা হচ্ছে যা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আজকে ইসলামপ্রিয় মানুষের ঈমানকে হাইজ্যাক করে ভুল পথে প্রবাহিত করা হচ্ছে। আল্লাহর রসুল (সা.) জেহাদ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন, পবিত্র কোর’আনে জেহাদের হুকুম আছে। তাই ইসলাম প্রতিষ্ঠার জেহাদের কথা বলে মানুষকে দিয়ে বহু ধ্বংসাত্মক কাজ করানো সম্ভব। যারা রাজনৈতিক ইসলামের অনুসারী তারা ভোটাভুটি, মিছিল, হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও, পেট্রল বোমা মেরে মানুষ হত্যা ইত্যাদিকে জেহাদ বলে প্রচার করেন। জঙ্গিবাদীরা মানুষ জবাই করাকে জেহাদ বলে মনে করছে। এখন এই পরিস্থিতিতে আমাদেরকে একটা স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে যে কোনটা প্রকৃত ইসলাম আর কোনটা বিকৃত ইসলাম, কোনটা সঠিক জিহাদ আর কোনটা জিহাদের নামে পথভ্রষ্টতা।

কোনটি সঠিক ইসলাম আর কোনটি বিকৃত ইসলাম তা নির্ণয়ের জন্য প্রথম কথা হচ্ছে, বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়। ইসলামের নামে অনেক তরিকা, ফেরকা, মাজহাব, মতবাদ পৃথিবীতে চালু আছে, সেগুলো কি মানুষকে শান্তি দিতে পারছে? নিরাপদ রাখতে পারছে? না। মুসলিম জাতিই বর্তমানে পৃথিবীতে সবচেয়ে নিগৃহিত, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও অশান্তিতে নিমজ্জিত জাতি। অথচ ইসলাম অর্থ শান্তি। অর্থাৎ ফলেই বোঝা যাচ্ছে ইসলামের যে রূপগুলো পৃথিবীতে চালু আছে সেগুলো আল্লাহ রসুলের ইসলাম নয়। এই কথাটি আমরা গত একুশ বছর ধরে বলে আসছি।
আজকে প্রমাণিত হচ্ছে যে ইসলামের নামে যেভাবে সন্ত্রাস, অপরাজনীতি এবং ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার চলছে, যে যেভাবে পারছে মানবতাবিনাশী, সমাজ বিনাশী, মানুষের জন্য ক্ষতিকর কর্মকা- ঘটিয়ে যাচ্ছে এটা আল্লাহ রসুলের ইসলাম না। আল্লাহ রসুলের ইসলাম কি ছিল?

শেষ নবী মোহাম্মদের (সা.) মাধ্যমে যে শেষ জীবন-বিধান স্রষ্টা প্রেরণ করেছিলেন তা মানবজাতির একাংশ গ্রহণ ও সমষ্টিগত জীবনে কার্যকরী করার ফলে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি অংশ অর্থাৎ নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে কী ফল হয়েছিল তা ইতিহাস। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মানুষ রাতে শোওয়ার সময় ঘরের দরজা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত না, রাস্তায় ধনসম্পদ ফেলে রাখলেও তা পরে যেয়ে যথাস্থানে পাওয়া যেত, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানী প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, আদালতে মাসের পর মাস কোন অপরাধ সংক্রান্ত মামলা আসতো না। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল হয়ে গিয়েছিল। এই স্বচ্ছলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মানুষ যাকাত ও সদকা দেওয়ার জন্য টাকা পয়সা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো কিন্তু সেই টাকা গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যেত না।

রসুলাল্লাহ (সা.) চরম অত্যাচারের মুহূর্তেও বিধর্মী কাফেরদের ধ্বংস কামনা করেন নি, ধ্বংসের অনুমতিও দেন নি। তিনি উম্মতের জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন যে, মানুষকে ধ্বংস করার মধ্যে নয়, বরং শান্তিময় জীবন উপহার দেওয়ার মধ্যে ইসলামের স্বার্থকতা নিহিত। আল্লাহর রসুলের ইসলাম আর মুফতি-ফকিহদের ইসলাম এক নয়। আজকে ইসলামের নাম করে যারা বিনাশের প্রলয়নাচন শুরু করেছে তাদের ইসলাম আর আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলামের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।

প্রকৃত ইসলামের সংগ্রাম মানুষকে শান্তি দেওয়ার জন্য, আর এরা সেই মানুষকেই বিনাশ করে নিজেরা জান্নাতে যেতে চায়। আল্লাহ-রসুলের ইসলাম চায় মানবজীবনে সার্বিক নিরাপত্তা, এরা চায় আতঙ্ক-ভয়-ত্রাস। আল্লাহ-রসুলের ইসলাম চায় সম্প্রীতি, এরা চায় আক্রোশ-বিদ্বেষ আর রক্তপাত। যারা ইসলামকে ব্যবহার করে স্বার্থোদ্ধার করে ও বিধ্বংস ডেকে আনে, তারা কেবল মানবতার শত্রুই নয়, তারা ইসলামেরও শত্রু।

জঙ্গিবাদের সূত্র ধরে সা¤্রাজ্যবাদীরা একটার পর একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে আক্রমণ চালাচ্ছে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া একটার পর একটা সমৃদ্ধ দেশ ধ্বংসস্তূপ আর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বনী আদম মাটির সঙ্গে মিশে গেছে যাদের অধিকাংশই মুসলিম। তারাই আজকে কোটি কোটি সংখ্যক উদ্বাস্তু হয়েছে। সুতরাং জঙ্গিবাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলাম, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলিম।

সুতরাং তাদের এই ইসলাম আল্লাহ রসুলের ইসলাম না।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মবিশ্বাসী মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই, বিলোপসাধন বা অস্বীকার করারও কোনো সুযোগ নেই। কাজেই একটাই করণীয়- তাদের ইসলাম সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা বা আকিদা সঠিক করে দেওয়া যেন তারা যে কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ভুল পথে না যায়। তারা বুঝতে পারবে যে মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো কথা-কাজ বা চিন্তা সবই গোনাহের কাজ। আর মানুষের তথা মানবজাতির উপকার হয় বা কল্যাণ হয় এমন কথা কাজ বা চিন্তা সবই সওয়াবের কাজ। তাই একটি কাজের আগেই তারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করে সঠিক পথ ও ভুল পথ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে।

শুধু শক্তি দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব নয়

জঙ্গিবাদ আদর্শিক বিষয়। যারা জঙ্গি হচ্ছে তারা একটি ভ্রান্ত আদর্শকে সঠিক মনে করে সেটা প্রতিষ্ঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে তাদের ধর্মীয় আবেগ ও ঈমান জড়িত। তারা যা করছে পার্থিব লাভের আশায় করছে না, পরকালীন প্রতিদানের আশায় করছে। এজন্য শক্তি প্রয়োগ করলে তাদের ঈমান আরো বলিষ্ঠ হচ্ছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই চেতনা প্রবাহিত হচ্ছে। বল প্রয়োগে জঙ্গিবাদ দমনের বা নির্মূলের চেষ্টা চালালে সেটার ফল হবে উল্টো, জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পাবে। পরিণামে আমরাও পরাশক্তিদের তোপের মুখে পড়ে যাবো। সুতরাং এখন আমাদের নিজেদের স্বার্থে জঙ্গিবাদকে কার্যকর পদ্ধতির দ্বারা মোকাবেলা করতে হবে। সেটা হলো- সত্য আদর্শ দিয়ে মিথ্যা আদর্শ জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করতে হবে। যারা জঙ্গিবাদের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালায়, তারা কোর’আন হাদিস, ইতিহাস ইত্যাদি থেকে নানা যুক্তি, তত্ত্ব ও তথ্য তুলে ধরে মানুষকে জঙ্গি হতে প্ররোচিত করে। তাদের সেই যুক্তিগুলোকে যদি ভ্রান্ত হিসাবে প্রতীয়মান করা যায় তাহলে অবশ্যই কেউ আর জঙ্গিবাদের দিকে যাবে না। জঙ্গিবাদের ভ্রান্ততা প্রমাণ করার জন্য কোর’আন হাদীসভিত্তিক যে যুক্তি তথ্য উপাত্ত দরকার তা আল্লাহর রহমে আমাদের কাছে আছে। এখন জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য দরকার এর ব্যাপক প্রচার।

এখন বাংলাদেশে সরকার যখন আহ্বান করছে দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে এগিয়ে আসার জন্য, আমরা জাতির কল্যাণে কাজ করার জন্য এগিয়ে এসেছি, কাজ করে যাচ্ছি। সবাইতো এগিয়ে আসবে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে কিন্তু তারা কী বলবে? তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের উপর গড়ে ওঠা সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন করতে অভিজ্ঞ কিন্তু জঙ্গিবাদের যে কোর’আন হাদীসভিত্তিক যুক্তি সেগুলোকে তারা কী দিয়ে প্রতিহত করবেন? সেটা আমরা তাদের কাছে তুলে ধরতে চাই যেন তাদের এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়। আমরা গত একুশ বছর ধর্মের নামে চলা অধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। তাই এ কাজের অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।

ঐক্যবদ্ধ হতে হবে কীসের ভিত্তিতে?

এটা সবাই উপলব্ধি করছেন যে জাতিকে এখন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ঐক্য হবে কীসের উপরে? এটা জানা কথা যে ঐক্য অনৈক্যের উপর শক্তিশালী। এত বড় একটি বৈশ্বিক সংকট, একে জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। গত ৪৫ বছরে আমাদের জাতিটিকে ধর্মীয়ভাবে, রাজনৈতিকভাবে শত শত ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যতভাবে সম্ভব বিভাজন আর বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের সংকটকালে তাদের মধ্যে বিরাজিত এই বিভক্তিরেখাগুলো মুছে দিয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা একান্ত অপরিহার্য, নয়তো দেশই থাকবে না। এই ঐক্য হতে হবে সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সেটা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অপরাজনীতি, দুর্নীতি অনৈক্য ইত্যাদি যাই হোক না কেন – যেটা অন্যায় সেটাকে অন্যায় বলতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে চলবে না। আমরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম ঐদিকে গণতন্ত্রের নামে সন্ত্রাস চলবে, দুর্নীতি চলবে, অপরাজনীতি চলবে তাহলে জঙ্গিবাদ দূর হবে না। কোনো অন্যায় আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও সেটাকে অবজ্ঞা করা যাবে না, কারণ সেটা থেকে হাজারো অন্যায়ের জন্ম হবে। সমস্ত অন্যায়ের নিচে চাপা পড়ে সমাজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরবে। এটাই সব ধর্মের মূল কথা। ইসলামের কলেমা – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হচ্ছে এটাই, সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে সত্যকে ধারণ করা। আমরা হেযবুত তওহীদ মানুষের সামনে তাদের মুক্তির জন্য এই সহজ সরল পথটি তুলে ধরছি।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ