রসুলাল্লাহর কায়িক শ্রম

রিয়াদুল হাসান:

রসুলাল্লাহ তাঁর ব্যক্তিগত কাজে একান্ত প্রয়োজন না হলে কারও সাহায্য গ্রহণ করতেন না। তিনি যথাসম্ভব নিজের কাজ নিজেই সম্পাদন করতেন এবং লক্ষ্য রাখতেন যাতে অন্যের উপর বোঝা চাপাতে না হয়। তিনি কোন কাজকেই ছোট মনে করতেন না, বিশেষ করে যে পুরুষোচিত কাজগুলিতে অধিক কষ্ট সহিষ্ণুতা ও কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় তিনি আগ্রহ সহকারে অংশ নিতেন এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাতে লেগে থাকতেন।
আল্লাহর রসুল নবুওয়াত পূর্ববর্তী যুগে কা’বা ঘর পুনঃনির্মাণে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর চাচা আব্বাস (রা.) এবং অন্যান্যদের সঙ্গে পাথর বহনের কাজ করেছিলেন (বোখারি)। নবুওয়াত-পরবর্তী যুগেও মসজিদ নববী নির্মাণকালে তিনি কায়িক পরিশ্রম করেছিলেন। তাঁর এ অংশগ্রহণ ছিল একজন সাধারণ শ্রমিকের মতো। সাহাবীগণ মসজিদের এক একটি পাথর বহন করতেন এবং উদ্দীপনামূলক কবিতা পাঠ করতেন। রসুলাল্লাহও তাঁর সাথে সুর মিলিয়ে পাঠ করতেন, “হে আল্লাহ! পরকালের মঙ্গল ছাড়া আর কোনও মঙ্গল নেই। অতএব আনসার ও মোহাজেরদের ক্ষমা করুন” (শিবলী নো’মানীর সীরাতুন্নবী)।
মসজিদে নববী ছাড়াও অন্যান্য মসজিদ নির্মাণে রসুলাল্লাহ অন্যান্য সকলের সাথে কায়িক শ্রম দিয়েছেন। যেমন মসজিদে কু’বা নির্মাণকালে ভারী ভারী পাথর বহন করার একটি সময়ে তিনি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তবু তিনি কাজ থামান নি। তাঁর কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পেয়ে কয়েকজন সাহাবী ছুটে আসেন এবং আকুল হয়ে বলেন, ‘আমাদের পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হউক! আপনি দয়া করে রেখে দিন, আমরা তা বহন করব।’ তাদের অনুরোধে রসুলাল্লাহ সেই পাথর তাদের বহন করতে দিলেন কিন্তু নিজে গিয়ে আরেকটি সম-ওজনের পাথর বহন করে নিয়ে আসলেন (শিবলী নো’মানী, সীরাতুন্নবী)।
এক সফরে বকরী যবেহ করা হলো এবং তা রান্না করবার জন্য সকলেই নিজ নিজ কাজ বণ্টন করে নিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি জঙ্গল হতে কাঠ কেটে আনবার দায়িত্ব নিচ্ছি’। সাহাবারা ইতস্তত করতে লাগলেন। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘আমি বৈষম্য পছন্দ করি না’ (শিবলী নু’মানী, সীরাতুন্নবী)।
রসুলাল্লাহ বাড়িতে বা মসজিদে আগত মেহমানদের সেবাযতœ নিজেই করতেন। তাঁর ঘরে সবসময় মেহমান থাকত। এমনকি কোনও অমুসলিম মেহমানের আগমন ঘটলেও তিনি তাদের সেবা-যতেœ কোন ত্র“টি করতেন না। যেমন, আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট থেকে একদল প্রতিনিধি আগমন করলে রসুলাল্লাহ তাদেরকে নিজের কাছে রেখে স্বয়ং মেহমানদারির যাবতীয় দায়িত্ব পালন করলেন। সাহাবীগণ আরয করলেন, ‘আমরা তাদেরকে খেদমত করতে চাই।’। রসুলাল্লাহ বললেন, ‘এই লোকজন আমার সঙ্গীদেরকে বহু খেদমত করেছে। তাই আমি নিজে তাদের খেদমত করতে চাই ’(কাদী ইয়াদ, আশ-শিফা; শিবলী নু’মানী, সীরাতুন্নবী)।
এক সন্ধ্যায় এক ইহুদি এসে নবীজীর আতিথ্য গ্রহণ করল। নবীজী তাকে ভালভাবে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর রাতে ঘুমানোর জন্যে সবচেয়ে ভালো কম্বলটি তাকে দিলেন। কিন্তু ইহুদির মতলব ছিল খারাপ। সবাই যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন তখন ইহুদি কম্বলে পায়খানা-প্রশ্রাব করে ভোর হওয়ার আগেই পালিয়ে গেল। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় ভুলে তলোয়ার ফেলে রেখে গেল। নবীজী ফজরের সময় উঠে অবস্থা দেখে সবই বুঝলেন। কিন্তু কাউকেই কিছু না বলে কম্বল নিজেই পরিষ্কার করে ফেললেন। ইহুদির তলোয়ারটা ভালভাবে রেখে দিলেন। এদিকে বহু দূর যাওয়ার পর ইহুদির খেয়াল হলো সে তলোয়ার ভুল করে ফেলে রেখে গেছে। তখনকার দিনে আরবে একজন মানুষের তলোয়ার ছাড়া চলতো না। ইহুদি অনেকক্ষণ চিন্তা করল। তারপর সিদ্ধান্ত নিলো তলোয়ার ফেরত পাওয়ার জন্যে সে নবীজীর কাছে যাবে। ইহুদি দুরু দুরু বক্ষে নবীজীর কাছে হাজির হলো। নবীজী তাকে দেখে সমবেদনা প্রকাশ করে বললেন, ‘আহা! রাতে তোমার কতই না কষ্ট হয়েছে। কত কষ্ট হলে একজন মানুষ কম্বল নষ্ট করতে পারে। আর সেই লজ্জায় তুমি অন্ধকার থাকতেই চলে গেছ। আর যাওয়ার সময় ভুল করে তোমার তলোয়ারটা ফেলে রেখে গেছ। এই নাও তোমার তলোয়ার।’ নবীজীর ব্যবহারে ইহুদি মুগ্ধ হলো। অনুশোচনা এল তার মাঝে। ইহুদি সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করল।
শুধু মেহমানদের সেবাযতœ করেই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, বরং অভিভাবকহীনদের দেখাশুনার দায়িত্বও তিনি নিজের কাজ মনে করে গুরুত্ব সহকারে পালন করতেন। যেমন, মহানবী বলেছেন, “মিসকীন ও স্বামীহীনদের ভরণ-পোষণের জন্য যে ব্যক্তি উপার্জনের প্রচেষ্টা চালায়, সে হল আল্লাহর পথে মোজাহেদের মতো বা ঐ ব্যক্তির মত পুণ্যের অধিকারী সে হবে, যে দিনভর সিয়াম পালন করে এবং রাতভর দাঁড়িয়ে আল্লাহর জন্য সালাহ আদায় করে”(তিরমিযী)। এটা তিনি কাজেও প্রমাণ করেছেন। জুন্নাব ইবন আরুত (রা.) একজন সাহাবী ছিলেন। একবার রসুলাল্লাহ তাঁকে কোন এক যুদ্ধে প্রেরণ করলেন। এজন্য তিনি প্রতিদিন জুন্নাবের ঘরে গমন করে তার পরিবারের জন্য দুধ দোহন করে দিতেন (শিবলী নু’মানী, সীরাতুন্নবী)।
রোগীদের সেবাযতœ করা রসুলাল্লাহর আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি নিজে রোগীদের দেখাশুনা করতেন। মুহাম্মদ ইবন নাফে ইবন যুবায়র (রা.) হতে বর্ণিত: তিনি বলেছেন, আমি মহানবীকে সাঈদ ইবনুল আস (রা)-এর সেবা করতে দেখেছি। তখন আমি দেখলাম তিনি টুকরা কাপড়ের সাহায্যে সাঈদ ইবন আসকে (শরীরে) গরম সেক দিতেছেন (হাকিম আবু শায়খ ইস্পাহানী, আখলাকুন নবী)।
খন্দকের যুদ্ধের সময় মদীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে শহরকে ঘিরে ছয়দিনে দশ হাত গভীর পরিখা খননের কাজ সম্পন্ন হয়। এই খন্দক খননের সময় সাহাবীদের সাথে মহানবীও কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বারাআ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রসুলাল্লাহ (স) খন্দক খননের সময় মাটি উঠাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘ইয়া আল্লাহ্। আপনি না দিলে আমরা হেদায়াত পেতাম না (ইমাম বোখারি)।’ উক্ত রাবী আরেকটি হাদিসে বর্ণনা করেন, ‘আহযাবের দিন আমি রসুলাল্লাহকে দেখেছি যে, তিনি মাটি বহন করছেন, আর তাঁর পেটের শুভ্রতা মাটি ঢেকে ফেলেছে (বোখারি)।
বদরের যুদ্ধসহ অন্যান্য অনেক যুদ্ধে রসুলাল্লাহ স্বয়ং তরবারি হাতে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আলী (রা.) বলেন, ‘বদর যুদ্ধের দিন আমরা রসুলাল্লাহর পার্শ্বে থাকার চেষ্টা করছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্র“দের বেশি কাছাকাছি পৌঁছে তাদের মোকাবেলা করে যাচ্ছিলেন। বদরের সেই দিন তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল অন্য সকলের চেয়ে বেশি (আবু শায়খ ইস্পাহানী, আখলাকুন নবী)’।
এছাড়া মহানবী কোন শিষ্টাচার পরিপন্থী কাজ দেখলে তা বর্জন করবার উপদেশ দিতেন এবং তা শুধরিয়ে দিতেন। আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, মহানবী এক বেদুঈনকে মসজিদে প্রস্রাব করতে দেখলেন। এতে সাহাবীগণ তার প্রতি মারমুখী হলে তিনি বললেন, ‘ওকে শেষ করতে দাও’। সে প্রস্রাব শেষ করলে তিনি নিজে গিয়ে পানি এনে সেখানে ঢেলে দিলেন এবং লোকটিকে বলে দিলেন, মসজিদে প্রস্রাব করা উচিত নয় (বোখারি)।
আরেকদিন মহানবী মসজিদের দেওয়ালে কফ দেখতে পেয়ে কাঁকর দিয়ে তা মুছে ফেললেন। তারপর বললেন, ‘তোমাদের কেহ যেন সামনের দিকে অথবা ডান দিকে কফ না ফেলে, বরং সে যেন তার বাম দিকে অথবা তার বাম পায়ের নীচে তা ফেলে (বোখারি)।
রসুলাল্লাহর ব্যক্তিগত জীবনের এই সুমহান বৈশিষ্ট্যগুলি তাঁর উম্মাহর জন্য অবশ্যই অনুসরণীয় তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করা এবং এই উদ্দেশ্যেই তিনি আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। এই সংগ্রামকে বাদ দিয়ে কেউ যদি রসুলাল্লাহর ব্যক্তিগত এই আখলাক বা গুণাবলীগুলি অভ্যাস করে তাতে কেউ উম্মতে মোহাম্মদী হতে পারবে না, যে কাজের জন্য তিনি উম্মতে মোহাম্মদী গঠন করেছিলেন সেটা বাস্তবায়ন করেই উম্মতে মোহাম্মদী হওয়া যাবে। পাশাপাশি রসুলাল্লাহ যেহেতু মানবজাতির সর্বোত্তম আদর্শ তাই সর্বক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ সমাজকে সমৃদ্ধ, উন্নত, প্রগতিশীল সর্বোপরি শান্তিময় করবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ