রসুলাল্লাহর আগমনের উদ্দেশ্য ও দীন প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর দেওয়া প্রক্রিয়া

Rasulullahorমাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে:

একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হোল রসুলাল্লাহকে আল্লাহ কেন পাঠালেন এবং রসুলাল্লাহ কী প্রক্রিয়ায় দীন প্রতিষ্ঠা কোরলেন। গুরুত্বপূর্ণ এইজন্য যে আল্লাহ নবী-রসুলদের মাধ্যমে যে তওহীদ ভিত্তিক দীন মানব জাতির জন্য দান কোরেছেন এবং শেষ নবীও যেটা মানুষকে শেখালেন সেটা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, ওটার শুধু খোলসটা আছে। আজ মোসলেম বোলে পরিচিত জাতিটি যেটাকে দীনুল ইসলাম বোলে তাদের জীবনে পালন কোরছে সেটা নবীর শেখানো ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত, কিন্তু কিভাবে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটার যে জবাব আমি এখন দেব সেটা এই বিপরীতমুখী দীনের অনুসারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা; শুধুমাত্র আল্লাহ যাদের হেদায়াহ কোরবেন তারা ছাড়া।
আল্লাহ তাঁর শেষ নবীকে পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত দীন (জীবন-ব্যবস্থা) অবলুপ্ত কোরে দিয়ে এই সঠিক দিক নির্দেশনা (তওহীদ, সেরাতুল মোস্তাকীম) ও এই সত্যদীন (জীবন-ব্যবস্থা, শরিয়াহ) প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিলেন- এই সত্য আমরা পাচ্ছি প্রত্যক্ষ, সরাসরি কোর’আনে তিনটি আয়াত থেকে (কোর’আন- সুরা তওবা ৩৩, ফাতাহ ২৮, সফ ৯), এবং পরোক্ষভাবে সমস্ত কোর’আনে শত শত আয়াতে। প্রশ্নটি হোচ্ছে- আল্লাহ শেষ নবীকে এই বিশাল দায়িত্ব দিলেন কিন্তু কেমন কোরে, কোন নীতিতে তিনি এ কাজ কোরবেন তা কি আল্লাহ তাঁকে বোলে দেবেন না? আল্লাহ সোবহান, অর্থাৎ যার অণু পরিমাণও খুঁত, ত্র“টি, অক্ষমতা, অসম্পূর্ণতা বা চ্যুতি নেই। কাজেই তাঁর রসুলকে আল্লাহ এক বিরাট, বিশাল দায়িত্ব দিলেন কিন্তু কেমন কোরে, কোন প্রক্রিয়ায় তিনি তা কোরবেন তা বোলে দেবেন না, তা হোতেই পারে না। কাজেই আল্লাহ তাঁর নবীকে ঐ দায়িত্বের সঙ্গে ঐ কাজ করার নীতি ও প্রক্রিয়া অর্থাৎ তরিকাও বোলে দিলেন। সমস্ত পৃথিবীতে আল্লাহর তওহীদ ভিত্তিক দীন প্রতিষ্ঠার নীতি হিসাবে আল্লাহ তাঁর রসুলকে দিলেন জেহাদ ও কেতাল- অর্থাৎ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সশস্ত্র সংগ্রাম; এবং ঐ নীতির ওপর ভিত্তি কোরে একটি পাঁচদফার কর্মসূচি। ঐ পাঁচ দফা হোল- ১) ঐক্য, ২) শৃঙ্খলা, ৩) আনুগত্য, ৪) হেজরত, ৫) জেহাদ, যুদ্ধ (হাদিস- তিরমিযী, মুসনাদে আহমেদ, আহমদ, বাব-উল-এমারাত)। পৃথিবীতে প্রচলিত অন্য সমস্ত জীবন ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় কোরে আল্লাহর দেয়া সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সত্যদীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ তাঁর শেষ নবীকে যে নীতি ও তরিকা (প্রক্রিয়া, কর্মসূচি) দিলেন সেটা দাওয়াহ নয়; সেটা কঠিন জেহাদ, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সশস্ত্র সংগ্রাম।
এর প্রমাণ আল্লাহর কোর’আন এবং তাঁর রসুলের জীবনী, কথা ও কাজ। আল্লাহ তাঁর কোর’আনে সশস্ত্র সংগ্রাম অর্থাৎ যুদ্ধকে মো’মেন, মোসলেম ও উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য ফরদে আইন কোরে দিয়েছেন সুরা বাকারার ২১৬ ও ২৪৪ নং আয়াতে, আনফালের ৩৯ নং ও আরও বহু আয়াতে। শুধু তাই নয় মো’মেন হবার সংজ্ঞার মধ্যেই তিনি জেহাদকে অন্তর্ভুক্ত কোরে দিয়েছেন। তিনি বোলেছেন- শুধু তারাই সত্যনিষ্ঠ মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ওপর ঈমান এনেছে এবং তারপর আর কোন দ্বিধা-সন্দেহ করেনি এবং প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ কোরেছে (কোর’আন- সুরা হুজরাত ১৫)। এই আয়াতে আল্লাহ মো’মেন হবার জন্য দু’টি শর্ত রাখছেন। প্রথমটি হোল আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান; এটির অর্থ হোল জীবনের সর্ব অঙ্গনে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, অর্থনীতি, শিক্ষা- এক কথায় যে কোন বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য আছে, আদেশ-নিষেধ আছে সেখানে আর কাউকে গ্রহণ না করা, কারো নির্দেশ না মানা যা পেছনে বোলে এসেছি এবং এ ব্যাপারে বাকি জীবনে কোন দ্বিধা, কোন সন্দেহ না করা অর্থাৎ তওহীদ। দ্বিতীয়টি হোল আল্লাহর ঐ তওহীদ, সার্বভৌমত্বকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন ও সম্পদ দিয়ে সংগ্রাম, যুদ্ধ করা। কারণ ঐ তওহীদ এবং তওহীদ ভিত্তিক দীন, জীবন-ব্যবস্থা যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা না হয় তবে দীনই অর্থহীন, যেমন বর্তমানের অবস্থা। এই দু’টি শর্ত হোল মো’মেন হবার সংজ্ঞা। যার বা যাদের মধ্যে এই দু’টি শর্ত পূরণ হোয়েছে সে বা তারা প্রকৃত মো’মেন আর যে বা যাদের মধ্যে এই দু’টির মধ্যে একটি বা দু’টিই শর্ত পূরণ হয় নি, সে বা তারা প্রকৃত মো’মেন নয়; এবং মো’মেন নয় মানেই হয় মোশরেক না হয় কাফের।
আল্লাহ জেহাদকে মো’মেন হবার সংজ্ঞার মধ্যে শর্ত হিসাবে দিলেন, কেতাল অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামকে ফরদে আইন কোরে দিলেন, তারপর সরাসরি হুকুম দিলেন- সশস্ত্র সংগ্রাম (যুদ্ধ) করো (বাকারা ২৪৪)। আরও বোললেন- সশস্ত্র সংগ্রাম (যুদ্ধ) কোরতে থাকো তাদের বিরুদ্ধে যে পর্যন্ত না সমস্ত অন্যায় অশান্তি বিলোপ হোয়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা হয় (আনফাল ৩৯)। এইসব সরাসরি হুকুম ছাড়াও সমস্ত কোর’আনে আল্লাহ ছয়শত বারের বেশি সশস্ত্র সংগ্রামের উল্লেখ কোরেছেন। আল্লাহর এই নীতির প্রতিধ্বনি কোরে তার রসুল বোললেন- আমি আল্লাহর আদেশ পেয়েছি পৃথিবীর মানুষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম (যুদ্ধ) চালিয়ে যেতে যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া এলাহ নেই এবং আমি মোহাম্মদ আল্লাহর রসুল এবং সালাহ্ প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত দেয় [হাদিস- আবদুল্লাহ এবনে ওমর (রাঃ) থেকে বোখারী]। এছাড়াও আল্লাহ তাঁর কোর’আনে এবং আল্লাহর রসুল তাঁর জীবনের কাজে ও কথায় সন্দেহাতীত ভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন যে আল্লাহর তওহীদ ভিত্তিক এই দীনুল ইসলাম, দীনুল হককে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার নীতি হোচ্ছে সামরিক, অর্থাৎ জিহাদ, কেতাল। আল্লাহ নীতি হিসাবে যুদ্ধকে নির্ধারণ কোরেছেন বোলেই তার নির্দেশে তাঁর রসুল মাত্র সাড়ে নয় বছরের মধ্যে কম কোরে হোলেও ১০৭টি যুদ্ধ কোরেছেন।
দীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ তাঁর রসুলকে যে পাঁচ দফা কর্মসূচি দিয়েছেন তার প্রথম চার দফা অর্থাৎ ১) ঐক্য, ২) শৃঙ্খলা, ৩) আনুগত্য, আদেশ প্রতিপালন, ৪) হেজরত হোল জেহাদ করার পস্তুতি এবং পঞ্চম দফা হোচ্ছে জেহাদ, যুদ্ধ। প্রথম চার দফা ছাড়া যুদ্ধ করা যাবে না। জেহাদকে, সশস্ত্র সংগ্রামকে আল্লাহ নীতি হিসাবে নির্ধারণ কোরেছেন বোলেই এই দীনে শহীদ ও মোজাহেদদের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা কোরে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার দেয়ার অঙ্গীকার কোরেছেন, জান্নাত নিশ্চিত কোরে দিয়েছেন (কোর’আন- সুরা সফ ১০-১২), এমন নিশ্চয়তা এই জাতির, উম্মাহর আর কোন শ্রেণি বা প্রকারের মানুষকে তিনি দেন নি। আল্লাহর এই নীতি নির্ধারণ তাঁর রসুল বুঝেছিলেন বোলেই তিনি ২৩ বছরের কঠোর সাধনায় যে সংগঠন গড়ে তুললেন সেটার ইতিহাস দেখলে সেটাকে একটি জাতি বলার চেয়ে একটি সামরিক বাহিনী বলাই বেশি সঙ্গত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এই বাহিনী তার জন্মলগ্ন থেকে শুরু কোরে প্রায় একশ’ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সশস্ত্র সংগ্রাম কোরে গেছে; এর সর্বাধিনায়ক (আল্লাহর রসুল) থেকে শুরু কোরে সাধারণ সৈনিক (মোজাহেদ) পর্যন্ত একটি মানুষও বোধহয় পাওয়া যেতনা যার গায়ে অস্ত্রের আঘাত ছিলো না; হাজারে হাজারে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেয়ার কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না।
তাহোলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে তওহীদ, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ভিত্তিক এই দীনকে সমস্ত পৃথিবীতে কার্যকর কোরে মানব জাতির জীবন থেকে সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও রক্তপাত দূর কোরে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করার জন্যই আল্লাহ তাঁর রসুলকে পৃথিবীতে পাঠালেন এবং ঐ কাজ করার নীতি হিসাবে নির্ধারিত কোরে দিলেন সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রাম এবং জেহাদ ভিত্তিক একটি ৫ দফার কর্মসূচি। তাঁর রসুল ঐ নীতি ও কর্মসূচির অনুসরণ কোরে গড়ে তুললেন এক দুর্দম, দুর্ধর্ষ, অপরাজেয় সামরিক বাহিনী যার নাম হোল উম্মতে মোহাম্মদী। এই উপলব্ধি (আকিদা) থেকে আজ আমরা লক্ষকোটি মাইল দূরে অবস্থান নিয়েছি।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ