মুসলিম জাতির করুণ পরিণতির কারণ আল্লাহর রাস্তায় বের না হওয়া

এম আমিনুল ইসলাম:
মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তাঁর খলিফা হিসাবে (সুরা বাকারা- ৩০)। এই খলিফার কাজ হলো সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সত্য, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ তাঁর খেলাফত করা। এই খেলাফত করার কাজ কখনই ঘরে বসে হয় না এটা সাধারণ জ্ঞান। তাই এই খেলাফতের কাজ করতে হলে  বর্হিগত হতে হবে। এখন এই বর্হিগত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আকীদা পরিষ্কার থাকতে হবে। তবেই আমাদের বর্হিগত হওয়া সার্থক হবে।
আল্লাহর রাস্তা কী?
রসুল (দ:) একদিন মাটিতে একটা সরল রেখা টানলেন। তারপর ঐ রেখা থেকে ডানে বামে আরো কয়েকটি রেখা টেনে বললেন, এই সরল রেখাটি হচ্ছে আল্লাহর রাস্তা। আর ডানে বামে এই সকল হচ্ছে শয়তানের রাস্তা। এই বলে তিনি কোর’আন শরীফ থেকে একটি আয়াত পড়লেন, “হাজা সেরাতুল মোস্তাকীম।” অর্থাৎ এটাই সোজা রাস্তা। এই রাস্তা বলতে আল্লাহ এবং রসুল পৃথিবীতে দাগ টানা কোনো রাস্তার কথা বুঝান নি, এ দিক থেকে ওদিকে যাওয়ার রাস্তার কথা বুঝান নি। বুঝিয়েছেন পৃথিবীতে মানুষের জীবন চলার পদ্ধতি। মানুষ পৃথিবীতে কিভাবে, কী পদ্ধতিতে জীবন অতিবাহিত করলে সুখে-শান্তিতে, নিরাপত্তায় বসবাস করতে পারবে, কোনো ধরনের অন্যায় জুলুম রক্তপাত হবে না, এক কথায় ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা হবে না। এই পদ্ধতিকে আল্লাহ এবং রসুল সোজা রাস্তা হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
পৃথিবীতে আদম (আ:) থেকে শুরু করে শেষ নবী মোহাম্মদ (দ:) পর্যন্ত অসংখ্য নবী-রসুল আগমন করেছেন মানুষকে আল্লাহর এই সোজা রাস্তায় পরিচালনার জন্য। সকল নবী রসুল একই কলেমার দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুম দাতা নেই (সুরা আম্বিয়া- ২৫)। অর্থাৎ মানুষকে প্রথমে এই ঘোষণা দিতে হবে যে,  ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ সার্বিক জীবন চালাতে গিয়ে যেখানে আল্লাহর কোনো হুকুম আছে সেখানে আর কারো হুকুম মানব না। এই ঘোষণাই হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র মূল কথা, এটাই তওহীদ, এটাই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, এটাই সহজ সরল রাস্তা। এখানে অন্য কোনো শর্ত নেই, অন্য কোনো কাজের কথা নেই, যে জন্য এটাকে সহজ সরল রাস্তা হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ইবলিস যখন অহংকারের বশে আদমকে সেজদা করল না তখন আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে বের করে দিলেন। তখনই ইবলিস ঘোষণা দিয়েছিল যে, তুমি আমাকে যার জন্য জান্নাত থেকে বের করে দিলে তাকে আমি তোমার রাস্তা থেকে সরিয়ে দিব, এ কাজে সফলতা লাভ করার জন্য সে আল্লাহর কাছে কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত এবং আদমের শরীরের প্রতিটি ধমনীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা মঞ্জুর করেন। আল্লাহ এটাও বললেন যে, আমি যুগে যুগে পথ প্রদর্শক (নবী-রসুল) পাঠিয়ে মানুষকে হেদায়াত দিব। যারা আমার পাঠানো পথ প্রদর্শকদের  কথামত জীবন চালাবে তুমি তাদের কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু ইবলিস ঘোষণা দিলো যে, আমি তোমার অধিকাংশ বান্দাকেই নিয়ে নিব। তখন আল্লাহর সাথে ইবলিসের একটা স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়ে গেল এবং মানুষের দুনিয়ার জীবন পরিচালনায় দু’টি পদ্ধতি তৈরি হয়ে গেল। একটা আল্লাহর দেওয়া আরেকটা ইবলিসের তৈরি করা। এখন আল্লাহ যুগে যুগে নবী রসুলদের মাধ্যমে যে হেদায়াত পাঠিয়েছেন সেই মর্মে জীবন চালানো মানেই আল্লাহর রাস্তায় জীবন চালানো। আর তার ব্যতিক্রম করা মানেই ইবলিসের রাস্তা। কেননা রসুল বলছেন যে, এই সোজা রাস্তা থেকে ডানে বামে ইবলিস তোমাদেরকে ডাকতে থাকবে। আর ইবলিস এও ঘোষণা দিয়েছিল যে, আমি তোমার বান্দাদেরকে তোমার রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের ডানে বামে উপরে নিচে ওঁৎ পেতে থাকব।
আল্লাহর রাস্তায় কেন বের হবে?
আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘হে নবী! কাফের ও মোনাফেকদের বিরদ্ধে জেহাদ কর ও উহাদের প্রতি কঠোর হও’ (তওবা- ৭৩, তাহরীম- ৯)। নিশ্চয়ই আল্লাহ মো’মেনদের নিকট হইতে জান্নাতের বিনিময়ে তাহাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করিয়া লইয়াছেন (তওবা- ১১১)। হে মো’মেনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সংবাদ দিব না যাহা তোমাদেরকে রক্ষা করিবে মর্মন্তুদ শাস্তি হইতে? উহা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রসুলে বিশ্বাস স্থাপন করিবে এবং তোমাদের জীবন সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জেহাদ করিবে। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানিতে! আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করিয়া দিবেন এবং তোমাদেরকে দাখেল করিবেন জান্নাতে যাহার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহ। ইহাই মহাসাফল্য। এবং তিনি দান করিবেন তোমাদের বাঞ্চিত আরও একটি অনুগ্রহ : আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়; মো’মেনদেরকে সুসংবাদ দাও। (সুরা সফ: ১০-১৩)।
আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া বলতে কী বুঝায়?
বিভিন্ন নবী রসুলের জীবন ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে, তাঁরা সবাই আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছিলেন। তাঁদের উম্মাহগণও আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছিলেন। আমাদের নবী যাকে আল্লাহ সকল নবী রসুলদের এমাম করে সৃষ্টি করেছেন, সারা পৃথিবীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন তিনিও আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছিলেন। আল্লাহর হুকুম এবং রসুলের সুন্নাহ পালন করতে যেয়ে তাঁর আসহাবগণও আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছিলেন। হালকা অথবা ভারী সকল অবস্থায় আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য স্বয়ং আল্লাহ নির্দেশও দিয়েছেন। এখন এই বের হওয়ার অর্থই হবে দুনিয়ার যেখানে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত নেই, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত নেই, মানবতা প্রতিষ্ঠিত নেই সেখানে সত্য, ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বের হওয়া। এছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বের হলে তাকে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া বুঝায় না। এখানে মনে রাখতে হবে, মানুষের মুক্তির জন্য, সমাজে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টাই হলো জেহাদ।
আল্লাহর রাস্তায় কারা বের হবে?
সাধারণ জ্ঞানে একটি কথা আমরা সবাই বুঝি যে, যারা আল্লাহর রাস্তায় বের হবে তাদেরকে প্রথমেই আল্লাহর দলের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে অর্থাৎ প্রথমেই তওহীদ বা আল্লাহর হুকুম মানার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে তারপর আল্লাহর হুকুম তথা ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে ঘর-বাড়ি, আত্মীয়-পরিজন, সহায়-সম্পদ সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। রসুল (সা.) এবং তাঁর আসহাবগণ যা করছেন, যেভাবে করেছেন সেভাবে করতে হবে। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিদানকারী ছাড়া অন্য কারো জন্য এ পথে বের হওয়ার নির্দেশনা নেই, সম্ভবও নয়। এ জন্যই আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার নির্দেশনার আয়াতে আল্লাহ ‘হে মো’মেনগণ’ বলে সম্বোধন করছেন অর্থাৎ এ নির্দেশ শুধু মো’মেনদের জন্য।
আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া মানে মহাকল্যাণ:
মো’মেন জাতি যখন মানুষের মুক্তির জন্য, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দুনিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয় তখন তারা এই কাজের ফলাফল ভোগ করবে দুনিয়া এবং আখেরাত অর্থাৎ উভয় জাহানে। আল্লাহর ঘোষণা, রসুল এবং যাহারা তাঁহার সঙ্গে ঈমান আনিয়াছিল তাহারা নিজ নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জেহাদ (সংগ্রাম) করিয়াছে; উহাদের জন্যই কল্যাণ আছে এবং উহারাই সফলকাম (তওবা- ৮৮)। আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়াতে দিবেন সাহায্য ও বিজয় এবং আখেরাতে দিবেন ক্ষমা ও মহাসম্মানিত স্থান জান্নাত (সফ- ১২, ১৩)। আল্লাহর এই কথার দ্বারা আমরা বুঝতে পারি দুনিয়াতে উন্নতি, প্রগতি, সম্মান, ইজ্জত, গৌরব, রেযেক, ক্ষমতা সবই দান করবেন এবং আখেরাতে দিবেন জান্নাত।
আল্লাহর রাস্তায় বের না হওয়ার ফল: আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া যেমন মহাকল্যাণকর তেমনি বের না হওয়ার ফলও ভয়াবহ। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহর ঘোষণা, ‘তোমরা যদি (সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য) অভিযানে বের না হও তবে তোমাদের কঠিন শাস্তি দেব এবং তোমাদের বদলে অন্য জাতিকে মনোনীত করব। তোমরা তাঁর (আল্লাহর) কোনও ক্ষতি করতে পারবে না (কারণ) আল্লাহ সর্বশক্তিধর (তওবা ৩৮-৩৯)। আল্লাহ যে মিথ্যা ভয় দেখান নি তার প্রমাণ ইতিহাস। আল্লাহ ও তাঁর রসুলের (দ:) অর্পিত দায়িত্ব সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছেড়ে দিয়ে ফতোয়াবাজী ও আত্মার ঘষা-মাজায় ব্যস্ত হবার শাস্তি হলো এই যে, এই জাতিকে ইহুদি-খ্রিস্টান জাতিগুলোর দাসে পরিণত করে দেয়া হলো। অভিযানে বের না হবার অর্থাৎ জেহাদ ছেড়ে দেবার শাস্তি আল্লাহ বলছেন কঠিন শাস্তি ও অন্য জাতিকে মনোনীত করা অর্থাৎ তাদের গোলাম করে দেয়া। ঐ কঠিন শাস্তিটা শুধু এই দুনিয়ায় নয় ঐ দুনিয়াতে, আখেরাতেও। দুনিয়ার শাস্তি অন্য জাতির দাসত্ব কতখানি হৃদয়বিদারক তা ইতিহাস পড়ে দেখুন। যারা এই দ্বীনের প্রকৃত আকিদা স্বয়ং আল্লাহর রসুলের (দ:) কাছে থেকে শিক্ষা করেছিলেন তাদের একজন, আবু বকর (রা:) জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন- হে মুসলিম জাতি! তোমরা কখনও জেহাদ ছেড়ো না, জেহাদ ছাড়লে আল্লাহ তোমাদের অপমান অপদস্থ না করে ছাড়বেন না।
পরিশেষ:
আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য আল্লাহ এবং রসুলের নির্দেশ সুস্পষ্ট। এ কাজ এত কঠিন নয় যে, মানুষ করতে পারবে না আবার এত সহজও নয় যে, ইচ্ছা করলেই করা যায়। অবশ্য যাকে আল্লাহ মনোনীত করবেন, যার জীবন সম্পদ আল্লাহর পছন্দ হবে সেই শুধু এই মহা সৌভাগ্যের অধিকারী হবে। এ জন্য প্রয়োজন সুরা হুজরাতের ১৫ নং আয়াত মোতাবেক মো’মেন হওয়া এবং আল্লাহ প্রদত্ত পাঁচ দফা কর্মসূচী নিজের চরিত্রে গেঁথে নেওয়া।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ