মানব ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হলেন নব-সভ্যতার তুর্যবাদক এমামুযযামান

এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী (১৯২৫ - ২০১২ ঈসায়ী, ১৩৪৩- ১৪৩৩ হেজরী)
এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী
(১৯২৫ – ২০১২ ঈসায়ী, ১৩৪৩- ১৪৩৩ হেজরী)

মানবজাতির ঘোর ক্রান্তিলগ্নে, যখন জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে মিথ্যা, অন্যায়, অবিচারের সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে, পৃথিবীর চারিদিক থেকে আর্ত মানুষের হাহাকার উঠেছে শান্তি চাই–শান্তি চাই, তখন অন্যায়ের এই করাল গ্রাস থেকে মানুষকে উদ্ধারের পথ দেখাতে সত্যের মশাল হাতে আবির্ভূত হলেন যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। যে সত্য ইসলাম ১৩০০ বছর ধরে বিকৃত হতে হতে বর্তমানে একেবারে বিকৃত ও বিপরীতমুখী হয়ে গেছে, সেই ইসলামের প্রকৃত রূপটি আবার উদ্ঘাটিত হলো। মানবজাতি যখন একের পর এক জীবনব্যবস্থা পরিবর্তন করে করে ক্লান্ত, হতাশ, তখন সেই মানবজাতির সামনে স্রষ্টার দেওয়া নিখুঁত এবং পূর্ণাঙ্গ শান্তিময় জীবনব্যবস্থার পুনরাবির্ভাব আল্লাহর কত বড় দান! যারাই যামানার এমামের সংস্পর্শে গেল, তাদের সামনেই উন্মোচিত হলো প্রকৃত ইসলামের অনিন্দ্যসুন্দর আলোকিত জগৎ। হাজার বছরের ফতোয়া, ফেকাহ আর ব্যক্তিগত মাসলা মাসায়েলের পাহাড়ের নিচে আকাশের মতো উদার, সমুদ্রের মতো বিশাল যে দীনুলহক, সত্যদীন চাপা পড়ে ছিল, সেই প্রকৃত ইসলামকে তার অনাবিলরূপে উদ্ধার করে মানবজাতির সামনে তুলে ধরলেন তিনি। তাঁর আবির্ভাবে নবসভ্যতার তুর্য বেজে উঠলো দিকে দিগন্তরে। সেই নবসভ্যতার তুর্জবাদক হেযবুত তওহীদ। মহান আল্লাহ যে মহাসত্য যামানার এমামের মাধ্যমে প্রকাশ করলেন, সেই সত্যের আলোকে সকলের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া এবং সত্য দিয়ে মিথ্যার কারাপ্রকোষ্ঠে কঠিন আঘাত করাই হেযবুত তওহীদের কাজ। আমরা বিশ্বাস করি, “সত্য এসেছে, সুতরং মিথ্যা বিলুপ্ত হবে। মিথ্যাতো বিলুপ্ত হবারই (সুরা: বনী-এসরাইল: ৮১); এবং আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর। ফলে সেই সত্য মিথ্যার মগজ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ নিশ্চিহ্ন হয় মিথ্যা (সুরা আম্বিয়া: ১৮)।
এমামুযযামান যা শোনালেন তা কি কেবলই আশার বাণী, ডুবন্ত মানুষের হৃদয়ে আশা জাগানিয়া একটি খড়কুটো মাত্র? না। নিছক আশার বাণী তিনি শোনান নি। তিনি জানালেন আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা। তিনি প্রদান করলেন মানবজাতির মুক্তির সেই কাক্সিক্ষত রূপরেখা যা বাস্তবায়িত হলে পৃথিবীর সকল মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে, অধিকার আদায়ের জন্য কাউকে বধির প্রকোষ্ঠে গলা ফাটাতে হবে না। এক বাবা-মা থেকে আগত মানবজাতি আবার এক জাতিতে পরিণত হবে, জাতি, গোত্র, বর্ণ ও ভূখণ্ডের কোন ভেদাভেদ থাকবে না। মিথ্যাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত পশুপ্রতীম মানুষেরা রূপান্তরিত হবেন সত্যনিষ্ঠ আদর্শ মানুষে। মানুষের মন থেকে নিরাপত্তাহীনতার বোধ অচেনা হয়ে যাবে, মানুষ পরস্পরকে সন্দেহ করবে না, ভালোবাসবে। সত্যিই এমন একটি সময় ছিল পৃথিবীতে যা এখন কল্পনার অতীত। সেই সময় আবারও আসছে এনশা’আল্লাহ।

বিশেষ অর্জন (Achievements)
১. ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন: তিনি তেহরিক এ খাকসারের পূর্ববাংলা কমান্ডার ছিলেন এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য ‘সালার এ খাস হিন্দ’ পদবিযুক্ত বিশেষ কমান্ডার নির্বাচিত হন।
২. চিকিৎসা: বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি তাঁর রোগীদের অন্তুর্ভুক্ত।
৩. সাহিত্যকর্ম: বেশ কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইয়ের রচয়িতা যার একটি ২০০৮ এর সর্বাধিক বিক্রয়কৃত বই। তাঁর বাঘ-বন-বন্দুক বইটি পাকিস্তান লেখক সংঘের (পূর্বাঞ্চল শাখা) সম্পাদক শহীদ মুনির চৌধুরীর সুপারিশে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে দ্রুতপাঠ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়াও তিনি পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা, ধর্ম ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গে প্রবন্ধ লিখেছেন।
. শিকার: বহু হিংস্র প্রাণী শিকার করেছেন যার মধ্যে চিতাবাঘ, বন্য শুকর, অজগর সাপ, কুমির প্রভৃতি রোয়েছে।
৫. রায়ফেল শুটিং: ১৯৫৪ সনে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তান দলের অন্যতম রায়ফেল শুটার হিসাবে নির্বাচিত হন।
৬. রাজনীতি: পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য (এম.পি.) নির্বাচিত হন (১৯৬৩-৬৫)।
৭. সমাজসেবা: হায়দার আলী রেডক্রস ম্যাটার্নিটি এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার হসপিটাল ও সা’দাত ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।
৮. শিল্প সংস্কৃতি: নজরুল একাডেমির আজীবন সদস্য।

কৈশোরে মাননীয় এমামুযযামান
কৈশোরে মাননীয় এমামুযযামান

মাননীয় এমামুযযামান করটিয়া, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারে ১৫ শাবান (লায়লাতুল বরাত) ১৩৪৩ হেজরী, মোতাবেক ১৯২৫ সনের ১১ মার্চ ২৭ ফাল্গুন ১৩৩১ বঙ্গাব্দ, শেষ রাতে নানার বাড়িতে (টাঙ্গাইল শহর) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কাটে করটিয়ার নিজ গ্রামে। শিক্ষাজীবন শুরু হয় রোকাইয়া উচ্চ মাদ্রাসায়। দুই বছর মাদ্রাসায় পড়ার পর তিনি ভর্তি হন এইচ. এন. ইনস্টিটিউশনে। এই স্কুল থেকে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৪২ সনে মেট্রিকুলেশন (বর্তমানে এস.এস.সি) পাশ করেন। এরপর সা’দাত কলেজে কিছুদিন অতিবাহিত করে ভর্তি হন বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে। সেখানে প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন যা বর্তমানে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ নামে পরিচিত। সেখান থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করেন।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী কমান্ডার এমামুযযামান
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী কমান্ডার এমামুযযামান

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এমামুযযামান
কোলকাতায় তাঁর শিক্ষালাভের সময় পুরো ভারত উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল আর কোলকাতা ছিলো এই বিপ্লবের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। আন্দোলনের এই চরম মুহূর্তে তরুণ এমামুযযামান ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন। সেই সুবাদে তিনি এই সংগ্রামের কিংবদন্তীতুল্য নেতৃবৃন্দের সাহচর্য লাভ করেন যাঁদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ্, অরবিন্দু বোস, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি অন্যতম। উপমহাদেশের দু’টি বৃহৎ ও প্রসিদ্ধ দল ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দান করেছিল যথা- মাহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং মোহম্মদ আলী জিন্নাহ’র নেতৃত্বে সর্বভারতীয় মুসলীম লীগ। কিন্তু এমামুযযামান এই দু’টি বড় দলের একটিতেও যুক্ত না হয়ে যোগ দিলেন আল্লামা এনায়েত উল্লাহ খান আল মাশরেকীর প্রতিষ্ঠিত ‘তেহরীক এ খাকসার’ নামক অপেক্ষাকৃত ছোট একটি আন্দোলনে। আন্দোলনটি অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও অনন্য শৃঙ্খলা ও বৈশিষ্ট্যের কারণে পুরো ভারতবর্ষব্যাপী বিস্তার লাভ করেছিলো এবং ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এমামুযযামান ছাত্র বয়সে উক্ত আন্দোলনে সাধারণ একজন সদস্য হিসেবে যোগদান করেও খুব দ্রুত তাঁর চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ও পুরাতন নেতাদের ছাড়িয়ে পূর্ববাংলার কমান্ডারের দায়িত্বপদ লাভ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড ও সহজাত নেতৃত্বের গুণে আন্দোলনের কর্ণধার আল্লামা মাশরেকী’র নজরে আসেন এবং স্বয়ং আল্লামা মাশরেকী তাঁকে সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে বিশেষ কাজের (Special Assignment)) জন্য বাছাইকৃত ৯৬ জন ‘সালার-এ-খাস হিন্দ’ (বিশেষ কমান্ডার, ভারত) এর একজন হিসেবে নির্বাচিত করেন। এটি ব্রিটিশদের ভারতবর্ষ ত্যাগ এবং দেশবিভাগের ঠিক আগের ঘটনা, তখন এমামুযযামানের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর।

শিকারী এমামুযযামান

১৭ বছর বয়সে মাননীয় এমামুযযামান প্রথম বাঘ শিকার করেন
১৭ বছর বয়সে মাননীয় এমামুযযামান প্রথম বাঘ শিকার করেন

ছোট বেলা থেকে সময় পেলেই বেরিয়ে পড়তেন শিকারে, রায়ফেল হাতে হিংস্র পশুর খোঁজে ছুটে বেড়াতেন দেশের বিভিন্ন এলাকার বনে-জঙ্গলে। সময় পেলেই বেরিয়ে পড়তেন শিকারে, রায়ফেল হাতে হিংস্র পশুর খোঁজে ছুটে বেড়াতেন দেশের বিভিন্ন এলাকার বনে-জঙ্গলে। শিকারের লোমহর্ষক সব অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে তিনি ‘বাঘ-বন-বন্দুক’ নামক একটি বই লেখেন যা পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয় এবং খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও সমালোচকদের দ্বারাও প্রশংসিত হয়।

পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত

১৯৬৩ সনে এম.পি. নির্বাচিত হওয়ার পর ফুলের মালা হাতে মাননীয় এমামুযযামান (বা থেকে দ্বিতীয়)
১৯৬৩ সনে এম.পি. নির্বাচিত হওয়ার পর ফুলের মালা হাতে মাননীয় এমামুযযামান (বা থেকে দ্বিতীয়)

১৯৬৩ সনে এমামুযযামান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য অর্থাৎ এম.পি. নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিপক্ষীয় মোট ছয়জন প্রার্থীই এত কম ভোট পান যে সকলের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। একজন সত্যভাষী সাংসদ হিসাবে তিনি ইয়াহিয়া সরকারের বহু অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক অঙ্গনের নৈতিকতা বিবর্জিত পরিবেশে তিনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না।

সমাজসেবক, চিকিৎসক এবং ক্রীড়াবিদ

Untitled-6তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান আবু সাঈদ চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি তাঁর রোগীদের অন্তুর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ নজরুল একাডেমির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ক্রীড়া অঙ্গনেও তিনি ছিলেন একজন অগ্রপথিক। ১৯৫৪ সনে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তান দলের অন্যতম রায়ফেল শুটার হিসাবে নির্বাচিত হন। সমাজসেবক হিসাবেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ১৯৬৩ সনে তিনি করোটিয়ায় হায়দার আলী রেডক্রস ম্যাটার্নিটি এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার হসপিটাল প্রতিষ্ঠা করেন যার দ্বারা এখনও উক্ত এলাকার বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। পরবর্তীতে তিনি সা’দাত ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন নামে প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নের জন্য একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

শৈশবের প্রশ্ন: মুসলিম জাতির দুরবস্থার কারণ কী?

ছোটবেলায় যখন তিনি মুসলিম জাতির পূর্ব ইতিহাসগুলি পাঠ করেন তখন থেকেই তাঁর মনে কিছু প্রশ্ন নাড়া দিতে শুরু করে। প্রশ্নগুলি তাঁকে প্রচণ্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়, তিনি এগুলির জবাব জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তাঁর শৈশবকালে প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ইউরোপীয় জাতিগুলির দ্বারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়ে তাদের অধীনতা মেনে নিয়ে জীবনযাপন করছিল। মুসলিম জাতির অতীতের সাথে বর্তমান অবস্থার এই বিরাট পার্থক্য দেখে তিনি রীতিমতো সংশয়ে পড়ে যান যে এরাই কি সেই জাতি যারা সামরিক শক্তিতে, ধনবলে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি অঙ্গনে যারা ছিল সকলের অগ্রণী? কিসের পরশে এই জাতি ১৪০০ বছর পূর্বে একটি মহান উম্মাহয় পরিণত হয়েছিল, আর কিসের অভাবে আজকে তাদের এই চরম দুর্দশা, তারা সকল জাতির দ্বারা পরাজিত, শোষিত, দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, দুনিয়ার সবচেয়ে হত-দরিদ্র ও অশিক্ষা-কুশিক্ষায় জর্জরিত, সব জাতির দ্বারা লাঞ্ছিত এবং অপমানিত?

আল্লাহ এমামুযযামানকে সত্যদীনের জ্ঞান দান করলেন

মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি ধীরে ধীরে অনুধাবন করলেন কী সেই শুভঙ্করের ফাঁকি। ষাটের দশকে এসে তাঁর কাছে এই বিষয়টি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে ধরা দিল। তিনি বুঝতে পারলেন কোন পরশপাথরের ছোঁয়ায় অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত আরবরা যারা পুরুষানুক্রমে নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে মগ্ন ছিলো, যারা ছিল বিশ্বের সম্ভবত সবচেয়ে অবহেলিত জাতি, তারাই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এমন একটি ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতিতে রূপান্তরিত হলো যে তারা তখনকার দুনিয়ার দু’টি মহাশক্তিকে (Super power) সামরিক সংঘর্ষে পরাজিত করে ফেলল, তাও আলাদা আলাদা ভাবে নয় – একই সঙ্গে দু’টিকে, এবং অর্ধ পৃথিবীতে একটি নতুন সভ্যতা অর্থাৎ দীন (যাকে বর্তমানে বিকৃত আকীদায় ধর্ম বলা হয়) প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সেই পরশপাথর হচ্ছে প্রকৃত ইসলাম যা আল্লাহর শ্রেষ্ঠ রসুল সমগ্র মানব জাতির জন্য নিয়ে এসেছিলেন। এমামুযযামান আরও বুঝতে সক্ষম হলেন আল্লাহর রসুলের ওফাতের এক শতাব্দী পর থেকে এই দীন বিকৃত হতে হতে ১৩’শ বছর পর এই বিকৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঐ সত্যিকার ইসলামের সাথে বর্তমানে ইসলাম হিসাবে যে ধর্মটি সর্বত্র পালিত হচ্ছে তার কোনই মিল নেই, ঐ জাতিটির সাথেও এই জাতির কোন মিল নেই। শুধু তাই নয়, বর্তমানে প্রচলিত ইসলাম সীমাহীন বিকৃতির ফলে এখন রসুলাল্লাহর আনীত ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যা কিছু মিল আছে তার সবই বাহ্যিক, ধর্মীয় কিছু আচার অনুষ্ঠানের মিল, ভেতরে, আত্মায়, চরিত্রে এই দু’টি ইসলামের মধ্যে কোনই মিল নেই, এমনকি দীনের ভিত্তি অর্থাৎ তওহীদ বা কলেমার অর্থ পর্যন্ত পাল্টে গেছে, কলেমা থেকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বই হারিয়ে গেছে, দীনের আকীদা অর্থাৎ এই দীনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণাও বোদলে গেছে।

 হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের মাধ্যমে তওহীদের ডাক

এমামুযযামানের বাড়ি ঐতিহাসিক দাউদমহল, এখানেই হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সূচনা
এমামুযযামানের বাড়ি ঐতিহাসিক দাউদমহল, এখানেই হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সূচনা

এই জাতির পতনের কারণ যখন তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, তখন তিনি কয়েকটি বই লিখে এই মহাসত্য মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পান। ১৯৯৫ সনে এমামুযযামান হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সূচনা করেন এবং মানুষকে প্রকৃত ইসলামে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানাতে থাকেন। তিনি বলেন, আল্লাহ ছাড়া জগতের সকল বিধানদাতা, হুকুমদাতা, সার্বভৌম অস্তিত্বকে অস্বীকার করাই হচ্ছে তওহীদ, এটাই এই দীনের ভিত্তি। সংক্ষেপে এর মর্মার্থ হচ্ছে আমি জীবনের প্রতিটি বিষয়ে যেখানেই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোন বক্তব্য আছে সেটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি যে বিভাগেই হোক না কেন, সেই ব্যাপারে আমি আর কারও কোন বক্তব্য, নির্দেশ মানি না। বর্তমান দুনিয়ার কোথাও এই তওহীদ নেই, সর্বত্র আল্লাহকে কেবল উপাস্য বা মা’বুদ হিসাবে মানা হচ্ছে, কিন্তু এলাহ বা সার্বভৌমত্বের আসনে আল্লাহ নেই। মানুষ নিজেই এখন নিজের জীবনব্যবস্থা তৈরি করে সেই মোতাবেক জীবন চালাচ্ছে। তওহীদে না থাকার কারণে এই মুসলিম নামক জনসংখ্যাসহ সমগ্র মানবজাতি কার্যতঃ মোশরেক ও কাফের হয়ে আছে। মাননীয় এমামুযযামান মানবজাতিকে এই শেরক ও কুফর থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় সেই কলেমায় ফিরে আসার ডাক দিয়েছেন। 

বিকৃত ইসলামের স্বরূপ উন্মোচন

আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি ধর্মজীবী মোল্লাদের রোষাণলে পতিত হন কারণ তিনি কোর’আন হাদিস ও ইতিহাসের আলোকে দ্ব্যার্থহীনভাবে প্রমাণ করেন যে, ইসলামে ধর্মব্যবসার কোন সুযোগ নেই। তিনি আরও প্রমাণ করেছেন যে, আজকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে যে বোমাবাজি, সন্ত্রাস, হানাহানি চলছে- এগুলি ইসলাম প্রতিষ্ঠার ভুল পন্থা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে যে মিছিল, হরতাল, জ্বালাও, পোড়াও ইত্যাদি করা হচ্ছে এগুলি ইসলামে নেই।

দাজ্জালকে চিহ্নিতকরণ, প্রতিরোধ এবং দুই শহীদের সম্মান

55বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আখেরী যামানায় বিরাট বাহনে চোড়ে এক চক্ষুবিশিষ্ট মহাশক্তিধর এক দানব পৃথিবীতে আবির্ভূত হবে; তার নাম দাজ্জাল। মাননীয় এমামুযযামান তাঁর লিখিত “দাজ্জাল? ইহুদি খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’!” নামক বইতে প্রমাণ করেছেন যে, পাশ্চাত্য বস্তুবাদী ইহুদি খ্রিষ্টান যান্ত্রিক ‘সভ্যতা’ই হচ্ছে বিশ্বনবী বর্ণিত সেই দাজ্জাল, যে দানব ৪৭৮ বছর আগেই জন্ম নিয়ে তার শৈশব, কৈশোর পার হয়ে বর্তমানে যৌবনে উপনীত হয়েছে এবং দোর্দণ্ড প্রতাপে সারা পৃথিবীকে পদদলিত করে চলেছে; হেযবুত তওহীদ পাশ্চাত্য ইহুদি খ্রিষ্টান সভ্যতার পরিচয় বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে দাজ্জালকে প্রতিরোধ করছে। বিশ্বনবী বলেছেন, “অভিশপ্ত দাজ্জালকে যারা প্রতিরোধ করবে তাদের মরতবা বদর ও ওহুদ যুদ্ধে শহীদের মরতবার সমান হবে (বোখারী ও মুসলিম)।”
বিশ্বনবীর হাদিস মোতাবেক হেযবুত তওহীদের প্রত্যেকে জীবিত অবস্থাতেই দুই জন করে শহীদের সমান। তাদের শাহাদাত লাভের বাস্তব প্রমাণও আল্লাহ দিচ্ছেন। সেটা হচ্ছে: চিকিৎসা বিজ্ঞানমতে মানুষ এবং সকল প্রাণীর মৃত্যুর সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাদের দেহ শক্ত হয়ে যাওয়া (Rigor Mortis))। কিন্তু হেযবুত তওহীদের সদস্য-সদস্যারা এন্তেকাল করার পর অর্থাৎ তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পরও তাদের দেহ শক্ত হয় না, তাপমাত্রাও স্বাভাবিক মৃতের ন্যায় শীতল হয় না। এটা প্রমাণ করে যে, দাজ্জাল প্রতিরোধ করার কারণে হেযবুত তওহীদের সকলকে মহান আল্লাহ জীবন্ত অবস্থাতেই শহীদ হিসাবে কবুল করে নিয়েছেন।

আল্লাহর মো’জেজা: হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা

তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতিক। নিঃশঙ্কচিত্তে তিনি সারাজীবন সত্যকে তুলে ধরেছেন, কোন বাধা-বিপত্তি-প্রতিকূলতার পরোয়া করেন নি। বিকৃত ধর্মের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে সত্যকে সাহসিকতার সঙ্গে ধারণ করার এক বিরাট আদর্শ তিনি স্থাপন করে গেছেন। তাঁর ঘটনাবহুল ৮৭ বছরের জীবনে একবারের জন্যও আইনভঙ্গের কোন রেকর্ড নেই, নৈতিক স্খলনের কোন নজির নেই। আধ্যাত্মিক ও মানবিক চরিত্রে বলিয়ান এ মহামানব সারাজীবনে একটিও মিথ্যা শব্দ উচ্চারণ করেন নাই। তিনি ইসলামের যে রূপ ও আকীদা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন সেটাই যে আল্লাহ রসুলের প্রকৃত ইসলাম তা আল্লাহ গত ২৪ মহররম, ১৪২৯ হেজরী মোতাবেক ২ ফেব্র“য়ারী ২০০৮ ঈসায়ী তারিখে একসঙ্গে অনেকগুলি মো’জেজা বা অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে সত্যায়ন করেছেন। এমামুযযামানের একটি ভাষণের মাধ্যমে এ মো’জেজাটি আল্লাহ ঘটিয়েছেন। এই মো’জেজার মাধ্যমে মানবজাতির জন্য বিরাট একটি সুসংবাদ আল্লাহ জানিয়েছেন। তা হলো: (১) হেযবুত তওহীদ হক-সত্য, (২) এর এমাম আল্লাহর মনোনীত এবং (৩) এই হেযবুত তওহীদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে আল্লাহ তাঁর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করবেন এনশা’আল্লাহ। রসুলাল্লাহ বলেছেন, পৃথিবীতে এমন কোন গৃহ বা তাঁবু থাকবে না যেখানে ইসলাম প্রবেশ না করবে [হাদিস- মেকদাদ (রা.) থেকে আহমদ, মেশকাত।] মো’জেজা ঘোটিয়ে আল্লাহ নিশ্চিত করলেন যে হাদিসে বর্ণিত সেই সময়টি এখনই, এবং হেযবুত তওহীদের মাধ্যমেই এই হাদিস সত্যে পরিণত হবে এনশা’আল্লাহ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ