মানবসমাজ ও পশুর সমাজের মধ্যে পার্থক্য

আমিনুল কবির
মানুষ পশু নয়, তাই মানব সমাজ আর পশুর সমাজও এক নয়। মানুষ হলো আশরাফুল মাখলুকাত, স্রষ্টা প্রদত্ত রূহের ধারক, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন অসাধারণ এক সৃষ্টি। তার সম্মান, মর্যাদা অন্য যে কোনো সৃষ্টির চেয়ে বহুগুণ বেশি। একই কারণে মানবসমাজও সর্বশ্রেষ্ঠ। অতুলনীয় কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো কেবল মানবসমাজেই দৃষ্টিগোচর হয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যে সমাজে অনুপস্থিত থাকে তাকে কখনও মানবসমাজ বলা যায় না।
মানবসমাজের প্রধানত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- ‘মানুষ তার স্বীয় ধর্মকে ধারণ করে সে সমাজ নির্মাণ করে। সমাজ পরিচালিত হয় ধর্মের ভিত্তিতে।’ মানুষের ধর্ম হলো মানবতা, মনুষ্যত্ব তথা মানবীয় গুণাবলী, যেমন অন্য মানুষের জন্য তার সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, দয়া, মায়া, সহমর্মিতা ইত্যাদি। ধার্মিক ব্যক্তি তার সত্ত্বাকে বিলিন করে দেয় অন্যের কল্যাণের উদ্দেশ্যে। অন্যের কষ্ট দেখলে, দুর্দশা দেখলে, বিপদ-আপদ দেখলে তার নিজের আত্মায় সে কষ্ট অনুভূত হয়। সমাজের সকল কিছুতেই সে কেবল নিজেকে দেখতে পায়। সমাজের কোনো মানুষ তো দূরের কথা কোনো জীবেরও এতটুকু দুঃখ তাকে পীড়া দেয়, আর সুখ তাকে আনন্দ ও সন্তুষ্টি প্রদান করে। ধার্মিক ব্যক্তি তার জীবন নির্বাহ করে শুধুই অপরের দুঃখ নিবারনের চেষ্টায়। কারণ সে জানে- অপরের কল্যাণে কাজ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানবজনমের স্বার্থকতা। এটাই জেহাদ, এটাই ধর্মযুদ্ধ, এটাই ধর্মের সর্বোত্তম কাজ। এই যে মানসিকতা, সর্বভূতে হিত সাধনার্থে প্রয়াস, অপরের মাঝে নিজেকে দেখা- এটাই মানবসমাজের বৈশিষ্ট্য। এ সমাজে কোনো স্বার্থচিন্তার স্থান থাকে না, শুধু থাকে বিনিময়হীন সেবা। স্বার্থচিন্তা ব্যতিরেখে যে যত বেশি সেবা প্রদান করতে পারে সে তত বেশি মর্যাদার অধিকারী হয়, তত বেশি তার কীর্তি প্রাপ্ত হয়।
অন্যদিকে পশুর সমাজ হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে সমাজ পরিচালিত হয় স্বার্থচিন্তার ভিত্তিতে। সেখানে প্রত্যেকেই আত্মস্বার্থে কাজ করে। সবসময় নিজেকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত থাকে। অন্যের প্রতি কোনো অনুভূতি থাকে না। এমন কি নিজের স্বার্থ হাসিলের পথে যত যুলুম দরকার হোক তার কোনো বাছ-বিচার করা হয় না, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের পার্থক্য থাকে না। এ সমাজে শক্তিই পরিণত হয় ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডে। প্রত্যেকের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় যে করেই হোক নিজের সর্বোচ্চ স্বার্থ আদায় করে নেওয়া। এখানে আত্মার কোনো স্থান থাকে না, থাকে শুধু দেহ। তাই দেহের প্রয়োজন পূরণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পশু বেঁচে থাকে শুধু উদরপূর্তি করার জন্য। সে সারাদিন চিন্তা করে কোন পশুকে আক্রমণ করবে, পরাভূত করবে, মাংস ভক্ষণ করবে। পাশাপাশি শঙ্কিতও থাকে এই বুঝি তার ওপর হামলা হলো, এই বুঝি তার তুলনায় শক্তিশালী কেউ তাকে ঠুকরে ঠুকরে খেল।
আপনি যদি পশুর সমাজে যান, অর্থাৎ কোনো ভয়ংকর বনে-জঙ্গলে প্রবেশ করেন তখন অবশ্যই আপনি খালি হাতে যাবেন না। কারণ সেখানে নিরাপত্তা নেই, যে কোনো সময় প্রাণ চলে যাবার সম্ভাবনা আছে। বন্য পশুর সামনে হাতজোড় করে দয়াভিক্ষা করলেও নিস্তার পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে দরকার পড়ে পাহারার। কিন্তু যে সমাজ, যে জগতে একজন আরেকজনের জন্য নিজের সত্ত্বাকে বিলিন করে দেয়, অপরের মাঝে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করে, অপরের সুখে নিজের তৃপ্তি খুঁজে পায় এমন সমাজে কি পাহারার দরকার পড়ে? বস্তুত পাহারা দিতে হয় পশুর সমাজে, মানবসমাজে তো কেবল সৌহাদ্র্য, ভ্রাতৃত্ব, দয়া-মায়া, ভালোবাসার সমাহার। সেখানে অনিরাপত্তার ছোঁয়াও লাগে না, তাই পাহারারও দরকার হয় না।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আজকের মানবজাতির! দুর্ভাগ্য কথিত মানবসমাজের! মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখানে কী না করতে হয়। এ সমাজে মানুষের নিরাপত্তার জন্য বাহিনী গঠন করতে হয়, চৌকি বসাতে হয়, দিবা-রাত্রি অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মানুষের জীবন-সম্পদ পাহারা দিতে হয়; বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির জন্য আবার প্রয়োজন পড়ে বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার, বডি গার্ডের বা পুলিশ ভর্তি গাড়ি বহরের। এর অর্থ কী দাঁড়ায়? এর অর্থ কি এটাই দাঁড়ায় না যে, আমরা যে সমাজে বসবাস করছি, যেখানে মানুষ মানুষের রক্তে হোলি খেলছে, উদায়াস্ত একজন মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে, ক্ষুধার্ত বাঘের মতো যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে দুর্বলকে আক্রমণ করছে, একজন আরেক জনকে জীবন্ত আগুনে দগ্ধ করছে, বাবা মেয়ের সম্ভ্রমহানি ঘটাচ্ছে, মেয়ে তার জন্মদাতা পিতা-মাতার গলায় ছুরি চালাচ্ছে, চার বছরের শিশুও ধর্ষিত হচ্ছে সে সমাজ আর মানুষের সমাজ নয়? কথিত এই মানবসমাজ আর পশুর সমাজের মধ্যে কার্যত কোনো তফাৎ আছে কি?
মানবতা-মনুষ্যত্ব হারিয়ে আজকের মানবজাতি ধর্মহীন পশুতে পরিণত হয়েছে। তাদের সমাজ পরিণত হয়েছে পশুর সমাজে। কারণ পাহারা দেওয়ার দরকার হলেই সে সমাজ আর মানুষের সমাজ থাকে না। এ কারণেই যুগে যুগে যখন ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখা গেছে তখন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাহারা বসানোর দরকার পড়ে নি, অস্ত্রের লাইসেন্স করার দরকার পড়ে নি; অথচ সমাজে কোনো অন্যায়-অবিচার ছিল না, অনিরাপত্তা ছিল না। এমনটা সম্ভব হয়েছিল কারণ তখন প্রতিটি মানুষ ছিল মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। আর আজ এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে কারণ এখন প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলে নিয়োজিত।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ