ভৌগোলিক স্বার্থচিন্তা যেভাবে ঐক্যের অন্তরায়

সমষ্টিগত জীবন বা রাষ্ট্র পরিচালনায় খ্রিস্ট ধর্মের ব্যর্থতায় উদ্ভূত সমস্যার ফলে পশ্চিমা সভ্যতা আবিষ্কৃত বিভিন্ন জীবনব্যবস্থা তথা তন্ত্র-মন্ত্র সারা বিশ্বজুড়ে গ্রহণ করার ফলে মানুষের নৈতিকতায় একটি সাঙ্ঘাতিক পরিবর্তন এসেছে। আর তা হলো ভৌগোলিক রাষ্ট্র ধারণা বা যার যার সীমানার স্বার্থ সংরক্ষণ। ফলে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা সীমাবদ্ধ হয়ে গেল একটি সীমার ভেতর। অর্থাৎ একটি ভূ-খণ্ডের মানুষ তাদের নিজস্ব গণ্ডি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এই সীমার বাইরে যারা রয়েছে তাদের প্রতি কোন প্রকার দায়বোধকে তারা অস্বীকার করে বসলো। এতে করে ভৌগোলিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করলো। অপরদিকে নিজস্ব ভূ-খণ্ডের স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে বাকি রাষ্ট্রের কতটুকু ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে তারা মোটেও ভাবছে না। ব্যাপারটা এমন যে আমাকে সুখে থাকতে হবে, সেটা যদি অন্যের মৃত্যুর মধ্য দিয়েও হয়। স্বাভাবিকভাবেই একেকটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের এই ধারণা তাদেরকে প্রচণ্ড স্বার্থপর করে তুললো। তাতে করে স্বার্থ উদ্ধারে যাই করা হোক না কেন, তার সবই নীতিগতভাবে সঠিক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, লুণ্ঠন, শক্তিশালী দেশ কর্তৃক দুর্বল দেশের প্রতি চাপিয়ে দেওয়া দাসখত চুক্তি সব কিছুই এর মধ্যে পড়ে। তাই কে কার চাইতে শক্তিশালী হতে পারে এই নিয়ে দেখা দেয় প্রতিযোগিতা। আবার ভিন রাষ্ট্রের আক্রমণে অন্তরায় সৃষ্টি কিংবা ভয় দেখানোর জন্যও তারা প্রতিযোগিতায় নামলো। যার ফলে পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারের প্রতিযোগিতা। এতে করে দেখা যায় সাধারণ জনগণকে না খাইয়ে রেখে হলেও বহু রাষ্ট্র পাল্লা দেওয়ার জন্য মারনাস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে। কৃষি, আবহাওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাখাতে কম অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে অস্ত্র ক্রয় ও নতুন নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কারের পেছনে।
এই যে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার পেছনে পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে চলা, এটা শেষ পর্যন্ত মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বা এর শেষ কোথায়? এটা কি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে তার সম্মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? মোটেও নয়। এই প্রতিযোগিতা মানুষকে পশুর কাতারে নামিয়ে দিচ্ছে।
অপরদিকে আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখতে পাব আমাদের হয়েছে ভিন্ন রোগ। অন্যরা যেখানে ভৌগোলিক রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজ করে না, তেমনি আমরা জাতীয় ঐক্যহীনতা ও যথার্থ শিক্ষার অভাবে আরো ক্ষুদ্র পর্যায়ে নেমে ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে আবদ্ধ হয়ে গেছি। আমরা জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে নিমজ্জিত হয়ে যা-ই করছি তাকেও বৈধ বলে জ্ঞান করা হচ্ছে। সার্বজনীন স্বার্থের পরিবর্তে ভৌগোলিক স্বার্থে আটকে যাওয়ার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থে নেমে যাওয়ার এই অবস্থাটি আরো মারাত্মক এবং বিপজ্জনক। এতে আগের অবস্থায় যে দ্বন্দ্বটা রাষ্ট্র পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিলো তা এখন ব্যক্তি পর্যায়ে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ববোধও ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে। তাই অন্যদের তুলনায় আমাদের অবস্থা আরো করুণ, আরো দুঃখজনক। তাই শুধু ব্যক্তিস্বার্থ নয়, আমরা কি পারি না ভৌগোলিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে? কেননা আমরা এই পৃথিবীর যে যে প্রান্তেই থাকি না কেন আমরাতো একই দম্পতি অর্থাৎ আদি পিতা আদম (আঃ) ও আদি মাতা হাওয়া (আঃ) থেকে আগত, সুতরাং সে হিসেবে আমরা সবাই ভাই-বোন, আমাদের প্রত্যেকের অনুভূতিও একই রকম। পৃথিবীর সব জায়গার পরিবেশ একরকম নয়। প্রাকৃতিক সম্পদও সব স্থানে সমপরিমাণে পাওয়া যায় না। সুতরাং আমরা একই পৃথিবীর মানুষ নিজেদের ভাই-বোন মনে করে কি পারি না সমবণ্টন করে মিলে মিশে শান্তিতে বসবাস করতে? পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই কি এ শিক্ষা দেয় না? তাহলে আমরা কোথায় চলেছি? কেনই বা পৃথিবীর বুকে কল্পিত সীমারেখা টেনে বিভক্তি বাড়াচ্ছি? আমরা কি সমষ্টিগত ঐক্যের কথা চিন্তা করতে পারিনা?

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ