বর্তমান দাজ্জালীয় সভ্যতা শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করতে ব্যর্থ

পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনা নিয়ন্ত্রিত একটি স্কুলে জঙ্গি হামলায় ১৩১ শিশুর মৃত্যুর এক সপ্তাহও পার হয়নি। পাকিস্তানে ভয়াবহ এই ঘটনায় বিশ্ববাসী যখন শোকে স্তব্ধ, এরই মধ্যে গত শনিবার অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের কোয়ার্নসেস শহরের একটি বাড়ি থেকে আট শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। ঐ বাড়ি থেকে আহত অবস্থায় এক নারীকে উদ্ধার করে পুলিশ। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, ঐ নারীকেই হত্যাকাণ্ডে দায়ী বলে সন্দেহ করেছে পুলিশ এবং তাকে গত কাল গ্রেফতার করা হয়েছে, যিনি নিহত আট শিশুর সাতজনের মা বলে জানিয়েছে তারা। শিশুর অধিকার সম্পর্কে যখন সারা পৃথিবীর মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও বিশ্বনেতারা অনবরত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন, তখন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে এরকম দুইটি ঘটনা সভ্যতার ধারক-বাহকদের ব্যর্থতাকেই প্রতীয়মান করে।
বর্তমান পৃথিবীতে যে যান্ত্রিক ও আত্মাহীন জীবনব্যবস্থা ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে, সেখানে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি, এটা একবাক্যে স্বীকার করে নিতে হবে। আজ শুধু পাকিস্তানের মতো অস্থিতিশীল দেশেই নয়, শান্তিপ্রিয় অস্ট্রেলিয়া বা স্থিতিশীল আমেরিকার মতো দেশগুলোতেও এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে যাচ্ছে। বছর খানেক আগে আমেরিকার একটি স্কুলে বন্দুকধারীদের গুলিতে বেশ কিছু শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটেছিল। ঐ ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সংবাদ সম্মেলনে কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমার সন্তানদের আমি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি’। এই কথাটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সৌজন্যতা বা রাজনৈতিক বক্তব্য বলে ছোট করে দেখলে অবিচার করা হবে। এটা চরম সত্য, এবং এই সত্যটি ব্যক্তি বারাক ওবামার ক্ষেত্রে যতটা না প্রযোজ্য তার চেয়ে অনেক বেশি প্রযোজ্য বর্তমান সভ্যতার ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্ক একটি দেশ যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, সেই দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি যখন অসহায়, তখন এই সভ্যতায় শিশুদের নিরাপত্তাদানে অন্যদের ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করার অবকাশ থাকে না। বাইরের কথা দূরে থাক, অনেকক্ষেত্রে পরিবারের কাছেই শিশুরা যথার্থ নিরাপত্তা পায় না। ঘনিষ্ঠ মানুষদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হতে হচ্ছে অবুঝ শিশুদের। এমনকি পরম নিরাপত্তার প্রতীক মা-বাবার হাতে খুন হচ্ছে শিশুরা। এই অবস্থা কিসের ইঙ্গিত বহন করে? নিঃসন্দেহে মানুষের আত্মিক অধঃপতন। আর এই অধঃপতন ঠেকাতে না পারলে কোনো আইন বা শাসনই শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
শিশুদের নিরাপত্তার জন্য পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন সংস্থা-সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বনেতারাও প্রতিনিয়ত শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় কেউ উপলব্ধি করতে পারছে না যে, অমানবিক সমাজব্যবস্থায় কোনো মানবিক বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আজকে যে সভ্যতাটি গড়ে ওঠেছে, সেটাতো নিতান্তই আত্মাহীন, জড়বাদী একটি অমানবিক জীবনব্যবস্থা। এখানে মানুষের আত্মিক ও চারিত্রিক বিকাশের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মানুষের সামষ্টিক জীবন থেকে ধর্ম, স্রষ্টা, নৈতিকতা, মানবতা ইত্যাদিকে পরিহার করে একটি ভোগবাদী দর্শনকে সবাই মিলে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখানে কোনো মানুষেরই অধিকার বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। এ কারণেই এই জীবনব্যবস্থা তথা সভ্যতা শিশুদের নিরাপদ সমাজ উপহার দিতে পারেনি। যতই ‘শিশুর অধিকার’ বলে বলে চিৎকার করা হোক, জড়বাদী এই সমাজব্যবস্থাকে অস্বীকার না করার আগ পর্যন্ত কারো অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হবে না।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ