বনি কুরাইজা: হত্যাকাণ্ড নাকি রাষ্ট্রদ্রোহীর দণ্ড? (তৃতীয় পর্ব)

মোহাম্মদ আসাদ আলী
(পূর্ব প্রকাশের পর) পাঠকরা নিশ্চয়ই ভাবছেন, বনি কুরাইজা গোত্র বিচারক হিসেবে সাদ (রা.) কে চাইল কেন? এর কারণ সাদ (রা.) ছিলেন আওস গোত্রের, আর আওসরা বনি কুরাইজার অনেক পুরোনো মিত্র। কাজেই বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা হয়ত আশা করেছিল সাদ বিন মোয়াজ (রা.) আর যাই হোক মিত্র গোত্রের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ফয়সালা দিবেন না।

আল্লাহর রসুল তাদের শর্ত মেনে নিলেন। সাদকে (রা.) বিচারের দায়িত্ব দেওয়া হলো। সাদ (রা.) সেখানে উপস্থিত হয়েই জানতে চাইলেন- তিনি যেই ফয়সালা দিবেন সেটাই সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিবে কিনা। নাকি আবার রায় প্রত্যাখ্যান করবে। ইহুদিদের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা পেয়ে সাদ (রা.) বললেন, এখানে আরও একজন আছেন, তাঁর মন্তব্যও প্রয়োজন (অর্থাৎ তিনি আল্লাহর রসুলের কাছেও জানতে চাচ্ছেন)। আল্লাহর রসুল বললেন, হ্যাঁ, তুমি যে ফয়সালা দিবে সেটাই কার্যকর হবে। অতঃপর যে দ- তাদের প্রাপ্য ছিল সেটাই সাদ (রা.) ঘোষণা করলেন এবং তাও আবার তাদের ধর্মগ্রন্থ তওরাতের আইন দিয়েই। দ-াজ্ঞা হলো- ‘বনি কুরাইজার প্রাপ্তবয়স্ক যোদ্ধাদের প্রাণদ- ও অন্যদের বন্দী করার’। অচিরেই সেই দ- কার্যকর করা হলো।

৪. ইসলামবিদ্বেষীদের অপপ্রচার কতটা যৌক্তিক?
পাঠক, গত কয়েকটি পর্বে খন্দক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বনি কুরাইজা অভিযানের যে বর্ণনা তুলে ধরলাম- তা কিন্তু আমার নিজের মনগড়া বক্তব্য নয়। সবই ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রের আলোকে বলা, আস্তিক-নাস্তিক কেউই তা অস্বীকার করতে পারবেন না। আশা করি এই ঐতিহাসিক আলোচনার পর পাঠকের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে এই বিশ্বাসঘাতক গোত্রটিকে কেন এতবড় দণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং তা কোন প্রেক্ষাপটে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কেন এই ইতিহাসের অবতারণা করলাম। করলাম এই কারণে যে, আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে বাংলার ইন্টারনেট জগতে ধুম্রজাল সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামবিদ্বেষী একটি মহল, আর তাতে বিভ্রান্ত হচ্ছে ইতিহাস অসচেতন ব্যক্তিরা। বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না যখন বিশ্বাসঘাতক বনি কুরাইজা গোত্রের বেইমানীর দণ্ডকে তারা ‘হত্যাকাণ্ড’ ‘গণহত্যা’ ইত্যাদি বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করেন! এই ইসলামবিদ্বেষীদের একটা মারাত্মক দক্ষতা হলো- ‘ইতিহাসকে কেটে ছেটে সুবিধাজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন’- বর্ণনা সত্য কিন্তু উপস্থাপনার দোষে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তারা সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনার বাইরে রেখে তাদের পছন্দের অংশবিশেষের উপর বিদ্বেষের প্রলেপ লাগিয়ে এমনভাবে পাঠকদের সম্মুখে উপস্থাপন করেন যা ইতিহাস অসচেতন ব্যক্তিমাত্রকেই প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়।

ব্লগে, ফেসবুকে এই ইসলামবিদ্বেষীদের কুৎসামূলক লেখালেখির সাথে যারা পরিচিত আছেন, তারা ভালোভাবেই জানেন বনি কুরাইজার শাস্তির ঘটনাটি নিয়ে কী পরিমাণ বিদ্বেষ ইসলামের বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়ে থাকে। এই মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তারা অসংখ্য লেখালেখি করেছেন, এখনও করে যাচ্ছেন। সাধারণত তারা ওই গোত্রের অপরাধগুলো এড়িয়ে যান, কোন পরিস্থিতিতে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হলো, তাদের অপরাধের ভয়াবহতা ইত্যাদি বিচিত্র কারণে বেমালুম ভুলে যান। যদি ক্ষীণকণ্ঠে দুই এক বাক্য বলেনও তাহলে এমনভাবে বলেন যেন ওটা কোনো অপরাধের মধ্যেই পড়ে না, সামান্য ভুল বোঝাবুঝি মাত্র। আসল অপরাধ হচ্ছে তাদেরকে দণ্ড দেওয়া। এতগুলো মানুষকে হত্যা করা হলো, একজন নবী কীভাবে এত নির্দয় হতে পারেন- এই প্রশ্ন তুলেই তারা বনি কুরাইজার যোদ্ধাদের হত্যার পুংখানুপুংখ বর্ণনা নিয়ে হাজির হন। তাদেরকে কীভাবে টানতে টানতে নিয়ে আসা হলো, শিরোচ্ছেদ করা হলো, কোথায় লাশ ফেলা হলো, কে চিৎকার করছিল, কার রক্ত কোথায় গড়িয়ে পড়েছিল- এইসবের বীভৎস ফিরিস্তি দিতে থাকেন। সেই ফিরিস্তি পড়ে আপনি ভাববেন, আসলেই তো! এতগুলো মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা!

আপনি যখন এই কথাটি ভাবছেন তখন ২০১৮ সাল। আপনি একটি রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক, একজন রাষ্টপ্রধান বা সেনাপতি নন, এমনকি সাধারণ সৈনিকও নন। আপনি না কোনো যুদ্ধের মধ্যে আছেন, আর না সম্প্রতি আপনার জাতি ভয়াবহতম অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে এবং কেউ সেই সঙ্কট থেকে ফায়দা লোটার জন্য আপনারই ছত্রছায়ায় থেকে আপনার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। যুদ্ধ সম্পর্কে আপনার প্রত্যক্ষ ধারণা নেই, যুদ্ধের নিমর্ম বাস্তবতা সম্পর্কে আপনি অনভিজ্ঞ। আপনি বাস করছেন একটি স্বাভাবিক পরিবেশে, শত্রুমুক্ত নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে। এই অবস্থায় তিনশ’ জন মানুষ কেন, একজন মানুষকে হত্যা করা হলেও আঁৎকে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু মাত্র ৪৭ বছর আগের বাংলাদেশে ফিরে যান, দেখবেন পথেঘাটে মানুষের মরদেহ পড়ে আছে, আর তারই পাশে জীবিতরা নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কেউ আঁৎকে উঠছে না। কারণটা যুদ্ধকালীন বাস্তবতা। আপনি যখন যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করবেন তখন ওই যুদ্ধের বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না।

আমার কথা হচ্ছে, পাকিস্তানি মিলিটারিরাও মানুষ, মুক্তিযোদ্ধারাও মানুষ। পাকিস্তানিরা বাঙালি মেরেছে, মুক্তিযোদ্ধারাও কি পাকিস্তানি মারেনি? পাকিস্তানিদের রক্ত গড়িয়ে পড়েনি? বোমার আঘাতে পাকিস্তানিদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েনি? ওদের স্ত্রী-সন্তান, মাতা-পিতা স্বজন হারানো বিয়োগব্যথা ভোগ করেনি? যদি ন্যায়ের পক্ষ অন্যায়ের পক্ষ বলে কিছু না থাকে, সব মৃত্যুই সমান অমানবিক হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধকে কী বলা হবে?

ইসলামবিদ্বেষীদের জন্য আমার আফসোস হয় এই কারণে যে, ইসলামকে খুনোখুনির ধর্ম প্রমাণ করতে তেমন কিছু খুঁজে না পেয়ে অবশেষে বেচারারা বিশ্বাসঘাতক বনি কুরাইজাকে দেওয়া ‘দণ্ড’কেই প্রধান উপজীব্য হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কতই না সিরাতের পাতা উল্টেছেন, কতই না হাদিস গ্রন্থ তোলপাড় করেছেন, এমন কিছুই পাননি যেখানে আল্লাহর রসুল নিরাপরাধ কাউকে হত্যা করেছেন। অগত্যা লজ্জার মাথা খেয়ে তাদেরকে চোখের পানি ফেলতে হচ্ছে ‘অপরাধীর দণ্ড’ নিয়ে, সাফাই গাইতে হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতার পক্ষে। ‘যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে মানবতা মুছে ফেল টিস্যুতে’ স্লোগান দিয়ে যারা রাজপথ মুখরিত করে রাখেন, তারাই কোন যুক্তিতে যুদ্ধাপরাধী বিশ্বাসঘাতক ইহুদি গোত্র বনি কুরাইজার জন্য কান্নাকাটি করে দুনিয়া ভাসিয়ে ফেলেন আমার বুঝে আসে না। হত্যা আর দণ্ডের মধ্যেকার পার্থক্য কি তারা বোঝেন না? . . . (চলবে)

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ