প্রত্যেকেরই উচিত আগে নিজধর্ম সম্পর্কে ভালোভাবে জানা

হুমায়ূন কবির:
আল্লাহ সকল জাতিগোষ্ঠীতে ও জনপদে ঐ এলাকার ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ সহকারে তার নবী-রসুলদেরকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ঐ নবীদের বিদায়ের পরে তার শিক্ষা ও ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। ফলে ঐ এলাকার মানুষকে নতুন করে পথ দেখাতে আবির্ভূত হয়েছেন অন্য নবী যারা পূর্বের বিকৃত গ্রন্থকে রদ ঘোষণা করেছেন এবং নতুন বিধান জাতিকে প্রদান করেছেন। কেউ তাকে মেনে নিয়েছে, কেউ মেনে নেয় নি। এভাবে জন্ম হয়েছে একাধিক ধর্মের। কালক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এক এলাকার ধর্মের অনুসারীরা অন্য এলাকায় অন্য ভাষায় নাযেলকৃত ধর্মকে ধর্ম হিসাবে এবং ঐ ধর্মের প্রবর্তককে নবী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। যেমন ইহুদিরা ঈসা (আ.) কে আল্লাহর প্রেরিত বলে স্বীকার করে না, খ্রিস্টানরা আখেরী নবী মোহাম্মদ (দ:)-কে নবী হিসাবে স্বীকার করেন না, একইভাবে মুসলিমরা ভারতীয় অঞ্চলে ভারতীয় ভাষার মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত বুদ্ধ ও শ্রীকৃষ্ণ এঁদেরকে নবী হিসাবে স্বীকার করেন না। কিন্তু তাদের প্রচারিত ধর্মগ্রন্থের মধ্যে আখেরী নবীর আগমনের বহু ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখিত আছে যা গবেষণা করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ঐ ধর্মগুলিও আল্লাহরই প্রেরিত (যা এখন বিকৃত হয়ে গেছে), এবং স্বভাবতই সেগুলির প্রবক্তারা আল্লাহরই বার্তাবাহক অর্থাৎ নবী ও রসুল। আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠির মধ্যে কোন না কোন রসুল পাঠিয়েছি” (সুরা নাহল-৩৭)। এমন কোন জাতি নেই, যার কাছে সতর্ককারী (নাযের) আগমন করে নাই (সুরা ফাতির -২৫)।
কোর’আনের এইসব বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠির মধ্যে আল্লাহ বিভিন্ন যুগে নবী-রসুল পাঠিয়েছেন। মুসলিম হওয়ার শর্ত হিসাবে ঐ সব নবী-রসুলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা অবশ্য জরুরি। তাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করতেও আল্লাহ নিষেধ করেছেন এবং তাঁদের সকলকে নবী-রসুল হিসাবে বিশ্বাস করার ব্যাপারে মো’মেনদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে (সুরা বাকারা- ২৮৫, সুরা নেসা ১৫০-১৫২)। পবিত্র কোর’আনে মাত্র ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি যে আল্লাহ প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার বা মতান্তরে দু-লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রসুল পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “তোমার পূর্বেও আমি অনেক রসুল পাঠিয়েছি, যাদের মধ্যে কারো বিষয় তোমার কাছে বর্ণনা করেছি এবং তাদের মধ্যে কারো কারো বিষয় বর্ণনা করি নাই (সুরা মো’মেন-৭৯)। যদি সব নবীদের নাম-ধাম বৃত্তান্ত আল-কোর’আনে বর্ণনা করা হোত তাহলে একটি বিশ্বকোষের আকার ধারণ করত। প্রত্যেক নবী-রসুলগণ তাঁদের জাতির ভাষায় তথা মাতৃভাষায় ঐশীবাণী প্রচার করেছেন, যাতে তাদের জাতির লোকেরা সহজেই নবীর শিক্ষাকে বুঝতে ও অনুসরণ করতে পারে (সুরা এব্রাহীম-৫)। ঐসব ভাষা হিব্র“ পার্শী, সংস্কৃত, পালি, চীনা বা অন্য যে কোন ভাষাই হোক না কেন। সুতরাং অতীত জাতির নবীদের জানতে হলে আমাদের অবশ্য বিভিন্ন ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থগুলি যথা ‘বেদ-বেদান্ত, পুরাণ-গীতা-সংহীতা, উপনিষদ, মহাভারত, ত্রিপিটক, দিঘা-নিকায়া, জেন্দাবেস্তা, তওরাত-যবুর-ইঞ্জিল’ ইত্যাদি গবেষণা ও পাঠ করে কোর’আনের আলোকে অতীত নবীদের সম্বন্ধে সত্যিকার পরিচয় জানতে হবে। পাক-ভারত উপমহাদেশেও আল্লাহ নবী-রসুল-অবতার প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের প্রচারিত বাণী-ঐশীগ্রন্থ বিকৃত অবস্থায় হলেও ঐ জাতির মধ্যে এখনও বংশ-পরম্পরায় অনুসৃত হয়ে আসছে, তাদের ভক্ত-অনুরক্ত অনুসারীদের মাধ্যমে। ভারতবর্ষে আগত মহাপুরুষদের মধ্যে যুধিষ্ঠির, বুদ্ধ, মনু, শ্রীকৃষ্ণ, রাম, মহাবীর- এঁদের জীবন, দর্শন, প্রকৃতি ও ধর্মগ্রন্থ বিশ্লেষণ করে অনেক মনীষী তাদের গবেষণামূলক গ্রন্থে অসংখ্য যুক্তি, প্রমাণ, তথ্য, উপাত্ত উপস্থাপন করে মত প্রকাশ করেছেন যে এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত অবতার তথা নবী-রসুল।
এই উপমহাদেশসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা দেখি এক ধর্মের অনুসারীদের অজ্ঞতা এবং ভুল জানার কারণে তারা এক ধর্মের অবতারদেরকে, মহাপুরুষদেরকে আরেক ধর্মের ধর্ম গুরুরা, ধর্ম ব্যবসায়ীরা অসম্মান করেন, অপমান করেন, গালাগালি করেন। এটা দুনিয়াময় ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বীজ। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ যদি অন্য ধর্মের প্রভু এবং অবতারদের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে তারা দেখবে যে তারা সকলেই এক স্রষ্টার থেকে আগত, তাদের ধর্মগুলিও সেই প্রভুরই অবতারিত, এবং সকল ধর্মের অবতারগণ মানুষের কল্যাণার্থেই এসেছিলেন। এই সত্য জানতে পারলে প্রত্যেকেই সেই অভিন্ন স্রষ্টার অবতারদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি পোষণ করবে, তখন সকল ধর্মের অনুসারীদের হৃদয় থেকে অন্যদের প্রতি বিদ্বেষভাব বিদূরিত হতে বাধ্য। এভাবে সাম্প্রদায়িকতার অপচর্চা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। একটি উদাহরণ: ইউরোপে খ্রিস্টানরা যে ইহুদিদের উপরে হামলা চালিয়ে গত ১৯০০ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ ইহুদি হত্যা করেছে, তাদেরকে বিতাড়িত করেছে এ সবকিছুর গোড়ায় কারণ ছিল ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে জারজ সন্তান এবং মা মরিয়মকে ভ্রষ্টা বলে অপবাদ দিয়ে থাকে (নাউযুবেল্লাহ), এবং খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছে। ইহুদিরা এখনও যদি এই বিশ্বাসে উপনীত হয় যে, ঈসা (আ.) মুসার (আ.) মতোই আল্লাহর নবী ছিলেন, তারা নিশ্চয়ই আর তাঁকে ‘জারজ সন্তান’ বলে গালি দিতে পারবে না। একইভাবে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধরা শেষ নবী, বিশ্বনবী মোহাম্মদ (দ:) কে নবী হিসাবে অস্বীকার করে। তাদের অনেকে এতটাই ইসলাম-বিদ্বেষী যে কার্টুন, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, চিত্রকলা দিয়ে প্রায়ই ইসলামের নবীকে এবং পবিত্র কোর’আনকে অবমাননা করে চলছে যার ফলে অসংখ্য দাঙ্গায় প্রাণহানি, রক্তপাত ঘটেছে, আজও সেই আগুন জ্বলে যাচ্ছে কোটি ইসলামপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু গত ১৪০০ বছরে একজন মুসলিমও ঈসা (আ.)-কে নিয়ে কোন কটূক্তি করেছে বলে কেউ দেখাতে পারবে না। কিন্তু হিন্দুধর্মের যাঁরা অবতার তাদের ব্যাপারে মুসলিমদের সঠিক জ্ঞান নেই। ফলে তাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে সেই মহামানবদের হেয় করে কথা বলেছে, হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। এই কাজটি হিন্দুরাও করেছে- যেখানে যে সংখ্যাগুরু সেই সেখানে সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণ করেছে, তাদের উপাসনালয় ধ্বংস করেছে। এই কারণে ভারতীয় নবীদের সঠিক পরিচয় মানুষের সামনে তুলে ধরা দরকার।
আবার, সমস্ত দুনিয়ায় অন্যায় অবিচার অশান্তির মূল হচ্ছে ইহুদি-খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’। আত্মাহীন, স্রষ্টাহীন, নৈতিকতাহীন, দেহসর্বস্ব এই বস্তুবাদী সভ্যতাকে সব ধর্মের লোকেরাই অবলীলায় গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতি গোগ্রাসে গিলছেন। তাদের উচিত ছিল তাদের সামষ্টিক জীবন পরিচালনা করার জন্য জীবনবিধান দিতে যে মহামানবদেরকে স্রষ্টা আল্লাহ পাঠিয়েছেন, সেই অবতারের শিক্ষা তাদের গ্রহণ করা। তা না করে সবাই যার যার ধর্মীয় শিক্ষাটাকে ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন। কেউ মন্দিরের মধ্যে ঢুকিয়েছেন, কেউ মসজিদে ঢুকিয়েছেন, কেউ প্যাগোডায় ঢুকিয়েছেন, কেউ ঢুকিয়েছেন গির্জায়, আর ঐ সমস্ত উপাসনালয়ে বসে প্রত্যেক ধর্মের ধর্মজীবীরা ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা করে খাচ্ছেন। তারা তাদের অবতারদের শিক্ষাকে গ্রহণ করেন নি, সাধারণ মানুষকেও সঠিক শিক্ষা দেয় নি। ফলে সাধারণ মানুষ চিরকালই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকেছে, এখনও বঞ্চিতই আছে। তারা যদি তাদের সেই অবতারদের প্রকৃত শিক্ষাকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে মানুষ সত্যিই মুক্তি পাবে। তারা যদি প্রত্যেকে সত্যসন্ধানী মন নিয়ে তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থগুলি অভিনিবেশ সহকারে প্রণিধান করে তবে তারা বুঝতে পারবে যে, তাদের ধর্মের ধারাবাহিকতাই হচ্ছে ইসলাম নামক দীনটি। বিশ্বধর্মগুলির ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে যে ভবিষ্যদ্বাণী উৎকলিত আছে সেখানেও এই শেষ ইসলামের এবং শেষ নবীর উল্লেখ রয়েছে। তাদের অবতারগণ এই শেষ নবীর অনুসারী হওয়ার জন্য নিজ জাতিকে হুকুম দিয়ে গেছেন। অন্য ধর্মের অনুসারীরা যদি শেষ ধর্মগ্রন্থ কোর’আন পাঠ করে এবং এর বক্তব্য ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চিন্তা করে তাহলে খুব সহজেই তারা বুঝতে সক্ষম হবেন যে কোর’আন একটি ঐশীগ্রন্থ। সুতরাং মানবজাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা অপসারিত হবে। সমস্ত পৃথিবী যেভাবে অন্যায়, অবিচারে পূর্ণ হয়ে আছে, এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য সকলে মিলে একটি জাতিতে পরিণত হতে হবে। এই যে একজাতি হবে সেটার জন্য একটি ঐক্যসূত্র লাগবে। সেই ঐক্যসূত্র হলো স্রষ্টা, ঈশ্বর, আল্লাহর প্রেরিত শাস্ত্রগ্রন্থ আল কোর’আন। এই কোর’আনকে মেনে নেওয়ার জন্য সকল ধর্মগ্রন্থাদিতে নির্দেশ দেওয়া আছে। এখানে আমরা ভারতীয় নবীদের কথা বলতে পারি। সনাতন ধর্মের বহু ধর্মগ্রন্থে বিভিন্ন নামে শেষ নবীর উল্লেখ রয়েছে, যেগুলিতে শেষ নবীর জীবনের বহু ঘটনার বিবরণ ও লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে যা দিয়ে কোন সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ইসলামকে সত্যদীন বলে স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। বেদে পুরানে শেষ নবীকে কোথাও বলা হয়েছে কল্কি অবতার, কোথাও নরাশংস, কোথাও অন্তীম ঋষি, বৌদ্ধ ধর্মে তাঁকেই বলা হয়েছে মৈত্তেয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরবর্তীতে লেখার আশা রাখি। এ বিষয়গুলি সম্পর্কে জনসাধারণ বিশদভাবে অবগত নন, কারণ সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই একটি পুরোহিত শ্রেণি জন্ম নিয়েছে যারা ধর্মকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে। তারা ধর্মের ইজারা নিয়ে সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। কিন্তু সত্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের উচিত নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। তাহলে বিকৃতির ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিছু মহাসত্যের আলোকচ্ছটা অবশ্যই তাদের দৃষ্টিগোচর হবে। এই সত্যসন্ধানে সাহায্য করার জন্য সেই ধর্মগ্রন্থের উক্তিগুলি পাঠকের সামনে আমরা তুলে ধরছি। সুতরাং প্রত্যেকের প্রথম করণীয় হচ্ছে নিজ ধর্মের অবতারদের নির্দেশ মান্য করে তাঁরা আখেরি যুগে (কলিযুগে, Last Hour) যে অবতার ১৪০০ বছর আগেই আগমন করেছেন সেই নবী মোহাম্মদ (দ:) এর অনুসারী হওয়া। যদি নিজ ধর্মের অবতারদেরকে তারা সম্মান করেই থাকেন তাঁর নসিহত অবশ্যই তাকে শুনতে হবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ