প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রকৃত শিক্ষা

রাকীব আল হাসান:
মানুষ আর দশটা প্রাণীর মতো নয়। সে দেহ এবং আত্মার সমন্বয়ে উন্নত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অসাধারণ একটি সৃষ্টি। সে একাধারে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি। তার এ শ্রেষ্ঠত্ব বা অপকৃষ্টত্ব নিরূপিত হয় তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কর্মের দ্বারা, আর এ চরিত্র নির্মাণ করে তার শিক্ষা। ‘প্রাণী’ মানুষকে আশরাফুল মখলুকাতে রূপান্তরিত করাই হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য। একটি পশুর মধ্যেও শিক্ষিত-অশিক্ষিতের ব্যবধান আছে। একটি শিক্ষিত ঘোড়া প্রভুর বাধ্য অনুগত থাকে, সে যুদ্ধের মাঠে প্রভুর জীবন রক্ষা করে, প্রভুর ইশারার অনুগামী হয়, শৃঙ্খলায় ক্ষিপ্রতায় সে অ-প্রশিক্ষিত ঘোড়া থেকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা থাকে। যে শিক্ষা মানুষকে চরিত্রে, চিন্তায়, কর্মে উন্নত করে সেটাই প্রকৃত শিক্ষা, আর যে শিক্ষা মানুষকে চরিত্রে, চিন্তায় কর্মে অধোগামী করে সেটা কুশিক্ষা। সকল সত্য ও ন্যায়ের উৎস মহান আল্লাহ। তিনিই মানুষের এবং সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের স্রষ্টা। সুতরাং মানুষের প্রথম শিক্ষাই হওয়া উচিত স্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, সকল জ্ঞানের উৎস হচ্ছেন স্রষ্টা। সেই মহান সত্তাকে বাদ দিয়ে কোনো জ্ঞান হতে পারে না। আবার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই স্রষ্টার পরিচয়, তাই সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও শিক্ষার মৌলিক অংশ। এ জ্ঞানকেই বলা যায় বিজ্ঞান। তৃতীয়ত, যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব; তাই তাকে জ্ঞান লাভ করতে হবে মানবজাতির শান্তিতে বসবাসের জন্য যে জীবনব্যবস্থা আল্লাহ তাঁর নবী-রসুলদের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন, সেই জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে। এক কথায় বলতে গেলে, একজন শিক্ষিত মানুষকে সবার আগে জানতে হবে, স্রষ্টার সাথে তার কী সম্পর্ক এবং তারপর জানতে হবে মানবজাতির সঙ্গে তার কী সম্পর্ক। এরপর জানতে হবে সৃষ্টির অন্যান্য বস্তুনিচয়ের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক। এ তিনটি বিষয়ে একজন ব্যক্তির যদি সঠিক ধারণা না থাকে তবে তাকে শিক্ষিত বলা যাবে না।
মহান আল্লাহ তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে যে জীবনব্যবস্থা দান করেছেন সেই ব্যবস্থা মোতাবেক পরিচালিত সমাজে শিক্ষার উদ্দেশ্যই হবে মানবতার কল্যাণ। আত্মিক, চারিত্রিক ও জাগতিক জ্ঞানের সমন্বয়ে এমন শিক্ষাব্যবস্থা হবে যেখানে শিক্ষক হবেন মানবতাবাদী, মহৎ, সত্যনিষ্ঠ মহান আদর্শের প্রতীক। তিনি শিক্ষাদানকে মানবজাতির প্রতি নিজের কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা (Duty and Responsibility) বলে এবং সকল জ্ঞানকে স্রষ্টার পক্ষ থেকে আমানত বলে মনে করবেন। শিক্ষাকে আজকের মতো পণ্যে পরিণত করা হবে না, এতে থাকবে ধনী-নির্ধন সকলের সমান অধিকার। আল্লাহর রসুল বলেছেন, “পূর্ববর্তী কেতাবে লিপিবদ্ধ আছে, ‘হে আদমের সন্তান! পারিতোষিক গ্রহণ ব্যতীত শিক্ষা দান কর, যেরূপভাবে পারিতোষিক দেওয়া ছাড়া শিক্ষালাভ করিয়াছ।” (ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে কুদসী)। এটা ইতিহাস যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে শিক্ষকগণ বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাদান করতেন। পরবর্তীতে ইসলাম কিছুটা বিকৃত হয়ে গেলে শিক্ষকগণকে তাদের সাংসারিক খরচ বাবদ বায়তুল মাল থেকে ভাতা দেওয়া হতো। যেহেতু শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, তাই ইসলামী রাষ্ট্রে শিক্ষা সার্বজনীন ও অবৈতনিক হয় (দেখুন: হাদিসে কুদসী-আল্লামা মুহাম্মদ মাদানী- ই.ফা.বা)। আল্লাহ বিনামূল্যে আদমকে (আ.) তাঁর সৃষ্টিজগতের জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন (সুরা বাকারা ৩১), সুতরাং তিনিও বনি আদমকে বিনা পারিশ্রমিকে সেই জ্ঞান অন্যকে দান করতে বলেছেন। এটাই সকল ধর্মের সনাতন শিক্ষা কেননা রসুলাল্লাহ বলেছেন এটা ‘পূর্ববর্তী কেতাবে লিপিবদ্ধ আছে।’ তাই প্রকৃত ইসলামের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষকে শিক্ষার্জন করতে গিয়ে কাড়ি কাড়ি অর্থ খরচের প্রয়োজন হবে না। তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যা অর্জন করে কেউ দুর্নীতিবাজ হবে না, স্বার্থের জন্য দেশ বিক্রি করার ষড়যন্ত্র করবে না। তারা হবে সুশিক্ষিত, নৈতিক চরিত্রে বলীয়ান সমাজের এক একটি আলোকবর্তিকা। তারা মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করবে, কোটি কোটি টাকার বিনিময়েও মানবতার ক্ষতি হয় এমন কাজ করার কথা তারা চিন্তাও করবে না। ছাত্রের কাছে একজন শিক্ষক হবেন শ্রদ্ধায় দেবতুল্য এবং ছাত্ররাও হবে শিক্ষকের আত্মার সন্তান। উম্মতে মোহাম্মদি নামক মহাজাতির শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রসুল। তিনি তাঁর জাতিকে শিক্ষা দিয়েছিলেন কীভাবে মানবজাতির কল্যাণে নিজেদের সমস্ত সম্পদ ও জীবন কোরবানি করে দিতে হয়। তিনি ভোগবাদ শেখান নি, তিনি শিখিয়েছেন ‘দানে সম্পদ বাড়ে, সঞ্চয়ে হ্রাস পায়’। রসুলাল্লাহর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সেই অবজ্ঞাত উপেক্ষিত নিরক্ষর আরব জাতি বিস্ময়কর বিপ্লব সম্পাদন করেছিল, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সামরিক শক্তিতে পৃথিবীর শিক্ষকের আসন অধিকার করেছিল। তাঁর সামনে বসে নারী-পুরুষ উভয়ই শিক্ষা অর্জন করতেন, কাজেই প্রকৃত ইসলামেও নারী-পুরুষ উভয়ই একই সঙ্গে শিক্ষা অর্জন করবেন।
সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে বিশ্বজগতে এবং মানবজাতিতে যে প্রাকৃতিক নিয়মগুলি বিরাজ করছে, মানুষ যখনই সেগুলির ব্যতিক্রম করার চেষ্টা করেছে, তখনই সে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। আজ আমাদের সমাজে যে অন্যায়, অরাজকতা, দুর্নীতি, অনৈক্য, অবিচার, বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে সেগুলি সবই প্রাকৃতিক নিয়মগুলিকে অস্বীকার করে জোর করে মানুষের মনগড়া বিধি-বিধান প্রয়োগ করার ফল। একজন শিক্ষিত মানুষ কখনোই প্রাকৃতিক নিয়মগুলির বাইরে যেতে চাইবে না। সে জানবে মানুষের জীবনে সঙ্কটগুলো কী কী, সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায়গুলো কী কী। সে তার জ্ঞানকে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে। এভাবে জ্ঞানের স্রোতধারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকবে। পাশ্চাত্য ‘সভ্যতা’র সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আগে পর্যন্ত আমাদের সমাজে স্রষ্টার দেওয়া মূল্যবোধ কিছুটা টিকে থাকায় শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক ছিল অনেকটা পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মতো। কিন্তু বর্তমানে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী জীবনদর্শনে প্রভাবিত সভ্যতা মানুষের ব্যবহারিক জীবনে স্রষ্টার বিধানের উপযোগিতা অস্বীকার করেছে। পরিণতিতে শিক্ষিত মানুষগুলি হয়ে পড়ছে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। শিক্ষিত সমাজের অবদানে প্রায় প্রতি বছর আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছি। চাকুরিগতপ্রাণ এ শ্রেণি একটি ভালো চাকরি পেলে বাবা-মাকে পর্যন্ত ভুলে যাচ্ছে। অফিসের কর্তাকে খুশি রাখতে পারলেই তার যথেষ্ট। এ শিক্ষাব্যবস্থা সার্টিফিকেটধারী অসংখ্য ব্যক্তির জন্ম দিচ্ছে। এরা যদি প্রত্যেকে নিজের উন্নতির পাশাপাশি জাতির ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকত তাহলে অন্তত পশ্চিমা জাতিগুলির মতো এ জাতির অবস্থারও বহুদূর উন্নয়ন সম্ভবপর হতো। কিন্তু আমাদের শিক্ষায় জাত্যবোধের শিক্ষা না থাকায় শিক্ষিতদের মধ্যে জাতির কল্যাণ সাধনের কোনো প্রেরণা নেই। তাই তারা জাতির সম্পদ লুট করে বিদেশী ব্যাংকে টাকা জমায়। সেই টাকা থেকে লাভবান হয় সেই পশ্চিমারাই। এভাবেই শিক্ষিতরাই এ জাতিকে দিন দিন পিছিয়ে দিচ্ছে।
আজকে জাতীয় রাজনীতিতে যে হিংসা, হানাহানি, আক্রমণ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, অহেতুক বিরোধিতা, সমস্ত দেশকে অচল করে দেয়ার সংস্কৃতি, রাজনীতিক হত্যাকাণ্ড, অর্থাৎ জাতীয় জীবনে এই যে নৈরাজ্য এটাও শিক্ষিত শ্রেণির কাজের ফল, এবং এর চর্চা শুরুই হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। অথচ কথা ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা লেখাপড়া করতে যাবে। বিভিন্ন বাবা মায়ের সন্তানেরা এক জায়গায় এসে পড়বে ভাইবোনের মতো, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের অপত্য øেহ- সব মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গনে একটি স্বর্গীয় পরিবেশ বিরাজ করার কথা। কিন্তু আজ সেখানে চলে দৈনিক মিছিল, শ্লোগান- অমুককে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত করো, অমুককে জবাই করো, ওমুকের লাশ ফেলে দাও। প্রতিপক্ষ রাজনীতিক দলের ছাত্রকে ছাত্ররা জবাই করে, পায়ের রগ কেটে দেয়, চোখ তুলে নেয়, তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। পত্র-পত্রিকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক ছাত্রকে আরেক ছাত্রের কোপানোর দৃশ্য আমাদেরকে প্রায়ই দেখতে হয়। এই ছাত্র নামের সন্ত্রাসীদের হাতে যখন জাতির নেতৃত্বের দায়িত্ব পড়ে তখন তাদের থেকে কেমন শান্তিময় জীবন আমরা আশা করতে পারি? ঠিক যেমনটা আজ দেখছি। শুধু ছাত্র নয়, শিক্ষকরাও অর্থ ও ক্ষমতার মোহে জাতীয় রাজনীতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করেন এবং নোংরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে যান। আজ ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতির অন্যায়ের শিকার হচ্ছে, শিক্ষক-রাজনীতির শিকার হচ্ছে, এমন কি তাদের একটি বড় অংশ ধর্ম ব্যবসায়ীদের ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতির কবলে পড়ছে।
যে ধর্মের দায়িত্ব ছিল মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করা, সেই ধর্মও আজ মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ। কারণ ব্রিটিশরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে আমাদেরকে তাদের তৈরি একটি বিকৃত বিপরীতমুখী ইসলাম শিখিয়ে গেছে। ধর্মও এখন একটি লাভজনক বৃত্তি বা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি ধর্মেই আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী একটি শ্রেণি ধর্মের ধারক-বাহক, আলেম, আচার্য সেজে টাকার বিনিময়ে ওয়াজ নসিহত করছে, মসজিদে, চার্চে, মঠে, মন্দিরে মানুষকে দিয়ে উপাসনা, প্রার্থনা করাচ্ছে। টাকা ছাড়া তারা কোনো একটি কাজও করেন না, এমন কি জানাজার নামাজ পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে পড়ান। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুরোহিত শ্রেণির সঙ্গে অর্থের লেনদেন ঘটে। তারা তাদের ওয়াজে নসিহতে মানুষকে কেবল নামাজ, রোজা, হজ্ব ইত্যাদি করার জন্য উপদেশ দেন, এগুলিকেই তারা ইবাদত ও ধর্মকর্ম বলে মনে করেন।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ