পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী ও শান্তির দূত বিশ্বনবী (সা.)

Untitled-42-419x336

এম. এ. সামাদ:
আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বার্তাবাহক মহানবী (সা.) সত্যদীনের অধীনে আরবের অজ্ঞাত, অখ্যাত, রিক্ত-নিঃস্ব, নিরক্ষর মরুবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করে তিলে তিলে গড়ে তুললেন মানব ইতিহাসের বিস্ময়কর এক জাতি, অপরাজেয় অপ্রতিরোধ্য মৃত্যু-ভয়হীন এক বিপ্লবী জাতি। এই জাতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া, তাদের নিরলস সংগ্রাম সম্পৃক্ততার ইতিহাস বিচার করলে জাতিটিকে পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী জাতি, যাদের বিপ্লবের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত অন্যায়, অবিচার ও অশান্তি দূর করে পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর রসুল নিজে উপস্থিত থেকে আবার পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়ে এই জাতিটি নিয়ে ৭৮টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেন, যার ফলে তাঁর জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপে সত্যদীন তথা শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। এর পরের ইতিহাস এই জাতিটির নিরবচ্ছিন্ন জয়ের ইতিহাস। মহানবীর (সা.) পবিত্র হাতে গড়া জাতিটি তৎকালীন দু’টি পরাশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে যারা ছিল সংখ্যা, অস্ত্র-শস্ত্র ও অর্থবলে মুসলিম বাহিনীর চেয়ে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী, তাদের উভয়কে এক এক করে নয়, একইসাথে সামরিকভাবে পরাজিত করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে নিয়ে আসলো। উম্মতে মোহাম্মদীই হয়ে গেলো পৃথিবীর একক পরাশক্তি। তাদের মোকাবেলা করা তো দূরের কথা, তাদের নাম শুনলেও শত্র“র অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো। ধনবলে, শিক্ষায়-দীক্ষায়, সামরিক শক্তিতে, উন্নতি-প্রগতিতে এই জাতিটি তখন ছিল পৃথিবীতে অদ্বিতীয়।
মুসলিম বাহিনীর এই বিস্ময়কর সাফল্যের নেপথ্যে ছিল মহান রাব্বুল আলামীনের সাহায্য। এই সাহায্যের ধারা অব্যাহত ছিল ততোদিন, যতোদিন পর্যন্ত জাতিটি বিশ্বনবীর (সা.) আদর্শকে আঁকড়ে ধরে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। অতঃপর এই আদর্শ যখন মুসলিম জাতি ত্যাগ করেছে, তখনই আল্লাহ তাদেরকে ত্যাগ করেছেন। ধীরে ধীরে তাদের উপরে নেমে এসেছে আল্লাহর শাস্তি। বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত জাতিটির ভাগ্যে জুটেছে পরাজয়, অপমান-লাঞ্ছনা। এ সম্পর্কে আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা – “যদি তোমরা অভিযানে বের না হও, তাহলে তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিয়ে তোমাদের উপরে অন্য জাতি চাপিয়ে দেব তোমরা (আল্লাহর) কোন ক্ষতি করতে পারবে না (কোর’আন সুরা আত-তওবাহ- ৩৯)। স্রষ্টার এই সাবধানবাণী অমান্য করার পরিণতিতে আজকের ১৬০ কোটির এই জনসংখ্যা সকল জাতির গোলামে পরিণত হয়েছে। তারা পৃথিবীতে ভয়াবহতম শাস্তি আর লাঞ্ছনার সম্মুখীন। এখন এই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটাতে আমাদেরকে রসুলাল্লাহর সেই লুপ্ত আদর্শকে ধারণ করতে হবে, প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হতে হবে। আসুন সংক্ষিপ্ত পরিসরে সেই বিপ্লবী আদর্শটি অবলোকন করি-

এক নজরে বিশ্বনবীর বিপ্লবের ২৩ বছর
মক্কা জীবন ৪৭৪৫ দিন

১। ৬১০ খৃঃ ২৭ শে রমজান হেরা পর্বতের গুহায় বিশ্ব-মানবতার মুক্তির জন্য বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) তওহীদের সুমহান বাণীপ্রাপ্ত হন।
২। রসুলের ডাকে সর্বপ্রথম তওহীদের দীক্ষায় দীক্ষিত হন স্ত্রী খাদিজা (রা:)। অতঃপর রসুলাল্লাহর স্বজনদের মাঝে তওহীদের আহবান জানান এবং তা ব্যাপকভাবে গোপনে প্রচার করতে থাকেন।
৩। একদিন রসুলাল্লাহ কোরায়েশ ও অন্যান্য গোত্রের লোকজনকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে জমায়েত করলেন। অতঃপর তাদেরকে প্রকাশ্যে তওহীদের পথে আহ্বান করলেন। কিন্তু কোরায়েশরা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল। আবু লাহাব রসুলাল্লাহকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করল।
৪। হযরত আলী (রা:), আবু বকর (রা:), ওসমান (রা:), ওমর ফারুক (রা:), যায়েদ (রা:), হামজা (রা:), সাদসহ (রা:) বেশ কিছুসংখ্যক সৌভাগ্যবান তওহীদ গ্রহণ করলেন। অতঃপর রসুলাল্লাহ তাদেরকে সাথে নিয়ে প্রকাশ্যে বালাগ কার্যক্রম (তওহীদের দাওয়াত) শুরু করলেন।
৫। তওহীদের বিরুদ্ধে মোশরেকদের কবিতাযুদ্ধ ও ঘৃণ্য মিথ্যা প্রচারণা শুরু হলো। তারা রসুলাল্লাহ ও তাঁর সঙ্গীদের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক বিরোধিতা শুরু করল।
৬। রসুলাল্লাহকে কাবাচত্বরে গলায় চাদর পেচিয়ে হত্যার প্রয়াস করা হয়, সালাহরত অবস্থায় তাঁর মাথায় উটের নাড়িভুড়ি চাপানো হয়। তাছাড়াও বিভিন্নভাবে তাঁকে হত্যার অপচেষ্টা করা হয়।
৭। তওহীদের দলভুক্ত হবার অপরাধে সুমাইয়া (রা:) ও তার স্বামী ইয়াসীরকে (রা:) মরুপ্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমতাবস্থায় বেশ কিছু মো’মেন আবু তালহার নেতৃত্বে আবিসিনিয়ায় হেজরত করেন।
৮। শিয়াবে আবু তালিবে সমাজচ্যুত ও নির্বাসিত মো’মেন মা ও শিশুদের আর্তচিৎকার; গাছের ছাল, লতা-পাতা, জুতার চামড়া ইত্যাদি খেয়ে কোন রকমে জীবন-ধারণ।
৯। তওহীদের দলের উপর থেকে অবরোধের অবসান।
১০। মেরাজ। পাঁচ ওয়াক্ত সালাহ প্রবর্তন। তওহীদের মহান আহ্বান তায়েফে প্রচারকালে তায়েফবাসীর নির্মম অত্যাচারে নবীজীর পবিত্র দেহমোবারক ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্তে রঞ্জিত হয়।
১১। হজ্বের মৌসুমে প্রথম আকাবার বায়াত সম্পন্ন হয় ১২ জন মদিনাবাসীর সমন্বয়ে। তওহীদের প্রচার কার্যক্রমে মাস’আব এবনে উমায়েরকে (রা:) আল্লাহর রসুল কর্তৃক মদিনা প্রেরণ।
১২। ২য় আকবার বায়াতে ৭২ জন মদিনাবাসীর অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর রসুলকে মদিনায় হেজরতের আহবান।
১৩। পৃথিবীর বুক থেকে তওহীদের অগ্নিশিখা চিরতরে নির্বাপিত করার চেষ্টায় মক্কার মোশরেক কর্তৃক রসুলাল্লাহকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অতঃপর তাদের ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে রসুলাল্লাহর মদিনায় হেজরত।

মাদানী জীবন ঃ ৩৬৫০ দিন

হেজরী ১: রসুলাল্লাহ মদিনায় সর্বপ্রথম মসজিদে জুম’আ পড়েন। মসজিদে নববী নির্মাণ ও মসজিদকেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ১৯ দফা কার্যক্রম শুরু হয়। মদিনা সনদ কায়েম হয়।
হেজরী ২: সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি। আযানের হুকুম নাজিল হয়। বদরের যুদ্ধসহ ছোটখাটো প্রায় ৮ টি সংঘর্ষ ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ঈদের সালাহ ও মাসব্যাপী সওম প্রবর্তন।
হেজরী ৩: উহুদের যুদ্ধে রসুলাল্লাহ গুরুতর আহত। হামযা (রা:) শহীদ। ছোটখাটোসহ প্রায় আটটি যুদ্ধ সংঘটিত।
হেজরী ৪: যাতুরিকা অভিযান, দ্বিতীয় বদর অভিযান ও যীকারাদ অভিযান। বীরে মাওনা।
হেজরী ৬: হুদায়বিয়ার সন্ধি। বনু লিহইয়ান অভিযান। ফিদাক সামরিক অভিযান। মোট চৌদ্দটি যুদ্ধ সংঘটিত।
হেজরী ৭: খায়বর বিজয়। ওয়াদিল অভিযান। মোট আটটি যুদ্ধ।
হেজরী ৮: মক্কা বিজয়। মুতার সামরিক অভিযান। তায়েফ অভিযান। মোট চৌদ্দটি যুদ্ধ।
হেজরী ৯: তাবুক অভিযান। সারিয়ায়ে খালেদ। সারিয়ায়ে আলী। মোট সাতটি যুদ্ধ।
হেজরী ১০: রসুলের জীবদ্দশায় সর্বমোট ৭৮টি জেহাদ সংঘটিত। তন্মধ্যে ২৮টি জেহাদে তিনি নিজে সোনাপতিত্ব করেন।

বিদায় হজ্বের ভাষণ

রসুলাল্লাহ কর্তৃক সকল মুসলিম ভ্রাতৃবন্ধনীতে আবদ্ধ থাকার নির্দেশনা। এছাড়াও তিনি যে সকল বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন তাহলে- পর সম্পদ ও রক্ত নিষিদ্ধ ও হারাম করা। সুদ নিষিদ্ধ ও হারাম করা। স্বামী স্ত্রী অধিকার নিশ্চিতকরণ।
জাতীয় জীবনব্যবস্থা হিসেবে কোর’আন এবং সুন্নাহকে ঘোষণা দেওয়া। একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কোর’আন সংবিধান ও সুন্নাহ অনুসারী শাসকের আনুগত্য বাধ্যতামূলক-করণ। দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির ব্যাপারে কঠোর সাবধানবাণী।

প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.) এর
ওফাতের পর প্রাপ্ত সম্পদ
১) ১টি চাটাই,
২) ১ টি বালিশ (খেজুরের ছাল দিয়ে ভর্তি) ও
৩) কয়েকটি মশক
১) ৯টি তরবারি,
২) ৫টি বর্শা,
৩) ১টি তীরকোষ,
৪) ৬টি ধনুক,
৫) ৭টি লৌহবর্ম,
৬) ৩টি জোব্বা (যুদ্ধের),
৭) ১টি কোমরবন্ধ,
৮) ১টি ঢাল এবং
৯) ৩টি পতাকা। (তথ্যসূত্র:- সিরাতুন্নবী- মওলানা শিবলী নোমানী)

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ