নিখুঁত জীবনব্যবস্থা প্রণয়ন মানুষের সাধ্যাতীত

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
একটি জীবনব্যবস্থা ছাড়া সামাজিক জীব মানুষের জীবনযাপন করা একেবারেই অসম্ভব। মানুষের কাছে কাম্য হচ্ছে এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা হবে সঠিক ও নির্ভুল; সেই ব্যবস্থা কার্যকরী করার ফলে মানুষ এমন একটি সমাজে বাস করবে যেখানে কোনো অন্যায় থাকবে না, সামাজিক, রাজনীতিক, আর্থনীতিক অঙ্গনে কোনো প্রকার অন্যায় থাকবে না, অবিচার থাকবে না। যেখানে জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তা হবে পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত। যেখানে চিন্তা, বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হবে সংরক্ষিত এবং মানুষে মানুষে সংঘাত, দ্ব›দ্ব, রক্তপাত থাকবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি সঠিক, নির্ভুল জীবন-বিধান কোথায় পাওয়া যাবে?
এ বিশাল বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন যে তাঁর এই সামাজিক জীবের জন্য একটি নিখুঁত জীবনব্যবস্থারও প্রয়োজন। আল্লাহপ্রদত্ত এই জীবনব্যবস্থারই নাম হচ্ছে দীন বা দীনুল হক অর্থাৎ সত্যদীন। মানবজাতি যদি কোনো কারণে এটিকে প্রত্যাখ্যান এবং তাদের জীবনে কার্যকরী না করে তবে অবশ্যই তাকে নতুনভাবে অন্য একটি জীবনব্যবস্থা তৈরি, প্রণয়ন করতেই হবে। এই প্রণয়নের ভিত্তি হতে হবে মানুষের বুদ্ধি, মেধা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। প্রশ্ন হচ্ছে- এই দুই প্রকার জীবনব্যবস্থার মধ্যে কোনটি গ্রহণ ও মানবজীবনে কার্যকর করলে কাক্সিক্ষত ন্যায়, সুবিচার, নিরাপত্তা, সুখ ও শান্তি পাওয়া যাবে? স্বভাবতই ক্ষুদ্র জ্ঞানের অধিকারী মানুষের পক্ষে অসীম জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহর মত নিখুঁত কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। এই ধারণাতীত বিশাল বিশ্বজগৎ যিনি সৃষ্টি করেছেন, যার একটি পরমাণুতেও কোনো খুঁত নেই, মানুষ জাতির জন্য তাঁর তৈরি জীবনব্যবস্থার চেয়ে অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা নিখুঁত হওয়া কি সম্ভব? মোটেই সম্ভব নয়।
এই নিখুঁত জীবনব্যবস্থা দিয়ে আল্লাহ পাক মানবজাতির শান্তির জন্য, মুক্তির জন্য যুগে যুগে নবী-রসুল পাঠিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আখেরি নবী, বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) কে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। তাঁকে আল্লাহ দায়িত্ব দিয়েছেন সমগ্র পৃথিবীতে সেই সত্যদীনটি প্রতিষ্ঠা করে শান্তি, সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আল্লাহ শেষ নবীকে এই বিশাল দায়িত্ব দিলেন এবং ঐ দায়িত্বের সঙ্গে ঐ কাজ করার কর্মসূচিও বলে দিলেন। আল্লাহপ্রদত্ত ওই কর্মসূচিতে মোট পাঁচটি দফা রয়েছে। পাঁচ দফা হলো- ১) ঐক্য, ২) শৃঙ্খলা, ৩) আনুগত্য, ৪) হেজরত, ৫) সংগ্রাম [আল হারিস আল আশয়ারী (রা.) থেকে আহমদ, তিরমিযি, বাব উল এমারাত, মেশকাত]।
দেখা গেল আল্লাহর তৈরি জীবনব্যবস্থা ও কর্মসূচির প্রভাবে উম্মতে মোহাম্মদী অতি অল্প সময়ে এমন একটি ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, দুর্দম, দুর্ধর্ষ পরাশক্তিধর জাতিতে রূপান্তরিত হলো যে তাদের সামনে পৃথিবীর আর সব পরাশক্তি মাথা নোয়াতে বাধ্য হলো। মাত্র ৬০/৭০ বছরের মধ্যে তারা অর্ধ দুনিয়াতে সেই শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করল। কেমন ছিল সেই সমাজ?
একজন সুন্দরী যুবতী সারা গায়ে অলঙ্কার পরে একা শত শত মাইল পথ ভ্রমণ করতে পারত, তার মনে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা জাগ্রত হত না। শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই সে তার ন্যায্য পারিশ্রমিক পেয়ে যেত, আর্থনীতিক মুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, দান অথবা যাকাতের টাকা গ্রহণ করার কেউ ছিল না। নারীরা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সাথে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে যে কোনো ভূমিকা রাখতে পারতেন। শুধু সমাজটিই সুন্দর হলো না, আল্লাহর জীবনব্যবস্থা সার্বক্ষণিক দ্ব›দ্ব-বিবাদ, মারামারি, কাটাকাটি ও জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষগুলোকে সোনার মানুষে রূপান্তরিত করল, যাদের নামের পরে আমরা আজও রাদিয়াল্লাহু আনহু (আল্লাহ যাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট) বলে থাকি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতির মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে এক সময় তারা সেই পাঁচ দফা কর্মসূচি ত্যাগ করল। এরপর থেকে ইসলাম বিকৃত হতে হতে গত ১৩শ’ বছরে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম দুনিয়া থেকে একেবারে হারিয়ে গেছে। এখন সারা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মের নামে যে ধর্মটি প্রচলিত আছে সেটি বাইরে থেকে দেখতে ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলেও আত্মায়, চরিত্রে, যোগ্যতায় তা প্রকৃত ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। যার ফলে এই বিকৃত ইসলাম সমাজে সামান্য শান্তিও দিতে পারছে না।
উপরন্তু যারা এই বিকৃত ইসলামের ধ্বজাধারী তারাই সেই ধর্মটিকে নিজেদের পেশায় পরিণত করেছে। নামাজ পড়ানো, মিলাদ পড়ানো, আকিকা করানো, মুসলমানি, বিয়ে পড়ানো, জানাজার নামাজ পড়ানো, কোর’আন খতম দেওয়া, খুতবা দেওয়া, ওয়াজ করা, ফতোয়া দেওয়া, তারাবি পড়ানো, মসজিদে আযান দেওয়া ইত্যাদি নানা প্রকার কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। সমাজের মানুষ শান্তিতে আছে না অশান্তিতে আছে, তারা ন্যায় বিচার পাচ্ছে না অবিচার পাচ্ছে, তারা খেয়ে আছে না না খেয়ে আছে এদিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই। অথচ উম্মতে মোহাম্মদিকে আল্লাহ সৃষ্টিই করেছেন ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করে মানবজাতির সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করার জন্য (সুরা ইমরান ১১০), এ দায়িত্ব আজকের ধর্মীয় নেতাদের আদৌ কি স্মরণে আছে?
আজ নিজেদের উদ্ভাবিত পথে চলে মানবজাতি যে অন্যায়, অশান্তি, অনাচার, অবিচারে ডুবে আছি, এ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদেরকে আল্লাহর দেওয়া সত্যদ্বীন ও কর্মসূচি গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধ হবার কোনো বিকল্প নেই।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ